আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_২৫

0
86

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২৫
#জান্নাত_সুলতানা

রাত আটটায় এসে নির্ভাণের দুই বন্ধু উপস্থিত হলো। লিভিং রুম পুরো টাই সুন্দর করে ডেকোরেট করা হচ্ছে। আকাশী রঙের আর সাদা রঙের বেলুন দিয়ে। সম্পূর্ণ টাই সেহেরের পছন্দে। প্রিয়মে প্রথমে ভাইয়ের ফেবারিট রঙ নিয়ে মজা উড়ালেও ডেকোরেশন সম্পূর্ণ হতে সবার সাথে সাথে সে-ও মুগ্ধ হলো। সানায়ার সাথে নিচে ঘুরঘুর করে সে অবাক হয়ে এসব দেখছিলো।

“আমার ভাইয়ের পছন্দ ইনিউক আছে। ঠিক না আপু? আজ থেকে আমার প্রিয় রঙ আকাশি আর সাদা।”

ইকবাল তিয়ান দুজনেই তখন সদর দরজার কাছে বেলুন লাগাচ্ছে সেটা খেয়াল করেনি ওরা কেউই।

“আর আমার সাদা।” প্রিয়মের কথা শেষ হতেই সানায়া বললো। প্রিয়ম অবাক হয়ে বলে উঠলো,

“তোমার না সাদা পছন্দ না?”

“তো কী হয়েছে? মানুষের পছন্দ সব সময় এক থাকবে এটাই বা তোকে কে বললো?”

প্রিয়ম আর কিছু বললো না। তার ইতিমধ্যে কিছুদিন বাদে ফাইনাল পরীক্ষার রুটিন দেওয়া হয়েছে। সে পড়ুয়া মেয়ে আজো পড়তে না পেরে ছটফট করছে। আবার বাড়িতে এমন সুন্দর আয়োজন আর সকল কাজিনদের আড্ডা ও মিস করতে চাইছে না। তাই তো সুড়সুড় করে আফির রুমের দিকে গেলো সবাই।

“তোর রুচিও কী এখন চৌদ্দ গিয়ে আটকাচ্ছে না-কি?”

ইকবালের কনুইয়ের খোঁচা খেয়ে ধ্যান ফিরলো তিয়ানের। গম্ভীর সে থতমত খেলো মূহুর্তেই। নিজের মায়ের পরে এই দুই বন্ধুই তার এখন আপন। সে চাইবে না একটা সম্পর্কের জন্য অনেক গুলো কাছের মানুষ কে হারাতে। সে ঘাড় নাড়লো। নিজেকে যথেষ্ট কুল দেখিয়ে জবাব দিলো, “এতোটা রুচির দুর্ভিক্ষ হয়নি আমার যে, এমন পিচ্চি একটা মেয়েকে পছন্দ করব।”

প্রিয়ম ফের নিচে এসেছিল। বাবা কল করেছে গেইট থেকে একটা কিছু রিসিভ করতে। তিনি কোথাও যাবে তাই বাড়িতে আসবে না এখন। আর এটার জন্যই সে আবার মায়ের কথায় এদিকে এসেছিল। পুরো কথা সে শুনেনি। তবে শেষের কথা তার বিশেষ ভালোও লাগেনি। কেনো লাগেনি সে জানে না। কিছু না বলেই মাথা নুইয়ে বেরিয়ে গেলো। তিয়ান এক পলক তাকিয়ে আবারও নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। যেনো এই মূহুর্তে এই বেলুন লাগানোর কাজ না করলে বিরাট কোনো ক্ষতি হবে।

——

মেয়েরা আগে থেকেই ছাঁদে ছিলো। ইকবাল, তিয়ান, এসেছিল সিগারেট খেতে। তবে মেয়েদের জন্য আর তা সম্ভব হয়নি। এখানে আফির ফোনে একটা গান চলছিল। আর এটাই সবাই বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছে। কেননা এখানে একমাত্র আফি আর রাফা ছাড়া কারোর ফোন নেই। রাফা আফির মধ্যে কোনো উৎসাহ দেখা না গেলো বাকিরা গানের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবেশ টা বেশ জমজমাট করে তুলেছে।
ইকবাল ওদের কাছে এসে গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো, “তোমরা গান শুনবে তাহলে এভাবে শোনার কী আছে? গিয়ে নির্ভাণ কে নিয়ে এসো। সামনা-সামনি কনসার্ট দেখার ফিল পাবা।”

সানায়া ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে বললো, “আমরা ঘুমিয়ে নেই ইকবাল ভাই, যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখব।”

“আপনি জানেন ভাইয়া এসব পছন্দ করে না। রাজি হবে না ইকবাল ভাই।” আফি বলে। তিয়ান ইকবালের কাঁধে চাপড় মারে। শুধু শুধু এসব বলার মানে হয় না। ভার্সিটিতে একবার কতটা জোরজবরদস্তি করে নির্ভাণ কে পারফর্ম করাতে হয়েছে এটা সেই জানে শুধু। সম্মানের ভয়ে সেদিন গান টা গেয়েছে নির্ভাণ। এর মানে এই না আবারও সে এসব করবে।

“আচ্ছা আমরা একবার বলে দেখি!” রাফার চোখে-মুখে আলাদা একটা অনুভূতি যেনো খেলা করছে। সানায়া মুখ ভেংচি কাটে। এই মেয়ে কে তার একদম সহ্য হয় না। আবার ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলাও যায় না। বড়ো মামি তাকে কত আদর করে। এখন সে যদি তার বাবার বাড়ির মানুষদের কষ্ট দেয় তবে তাকেই তো কষ্ট দেওয়া হয়! তাই না। সে এসব ভেবে আর কিছু বলতে পারে না।

সানায়া এব্যাপারে কোনো কথা বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে এক পাশে। আর বাকিদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে নির্ভাণ। সে সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে এসেছিল ফোনে কথা বলতে বলতে। সবাই তাকে দেখেই চুপ করে গেলো। নির্ভাণ গম্ভীর চোখে এক ঝলক সবাই কে দেখে অন্য পাশে চলে গেলো। সানায়ার তখন সেহের কে কাছে ডেকে কিছু একটা বলছে। সেহের গম্ভীর মুখে নাকের ওপর চশমা ঠেলে বললো, “যদি রাজি না হয়?”

“সবাই বলার পর যদি রাজি না হয় তখন তুই আবদার করবি। বুঝেছিস, তোর বার্থডে না! তখন রাজি না হয়ে যাবে কোথায়?”

সানায়া কথাটা সেহের কে বললেও সবাই শুনেছে। আর এটা বুঝতে পেরে বেচারি থতমত খেলো। তবে তার আইডিয়া সবার পছন্দ হয়েছে।
ইকবাল তিয়ান কে সাথে নিয়ে সবাই নির্ভাণের কাছে এগিয়ে গেলো। নির্ভাণ ফোনে তখন আর কথা বলছে না। সে ওদের এভাবে দেখেই গম্ভীর মুখ টা আরও গম্ভীর করে নিলো। এদের যে খুব ভালো করে জানা আছে তার।

“কী চাই?” লোকটার গুরুগম্ভীর গলা। সানায়া তৎক্ষনাৎ এক ঝটকায় গিয়ে আফির পেছনে নিজের দেহখানা আড়াল করে দাঁড়াল। ইকবাল মাথা চুলকে খ্যাক খ্যাক করে হাসলো। বললো, “তোর থেকে গান শুনতে চায় সবাই।”

নির্ভাণের চোখ-মুখ জুড়ে দেখা দিলো রাজ্যের বিরক্তি। দাঁতে দাঁত চেপে সে ছাঁদের রেলিঙ দেখিয়ে বলে উঠলো,

“জানের মায়া থাকলে সামনে থেকে সর।”

ইকবাল সত্যি সত্যি সরে গেলো। রাফা তখন পেছন থেকে ধীরে ধীরে বললো, “একটা শুনান না। সবাই কত আশা নিয়ে,,, ”

মেয়ে টা কথা আর সম্পূর্ণ করতে পারে না। আফি ওর হাত চেপে ধরলো। তিয়ান সুযোগ পেতেই ওদের থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। ইকবাল যেনো এখানে নেই। সেহের তখনও চুপ। সে ভয় পাচ্ছে এটা তার চোখে স্পষ্ট। সানায়া ওকে খোঁচা দিলো। তবে সে বড়ো বড়ো চোখ করে মাথা নেড়ে বোঝাল পারবে না। সানায়া ধীরে মাথাটা সামন্য উঁচিয়ে নির্ভাণের দিকে একবার চেয়ে মাথা নিচু করে বলে,

“সেহেরর জন্য একটা গান গাইলে কী এমন ক্ষতি হবে নির্ভাণ ভাই!”

নির্ভাণ ওর কথা শেষ হতেই সেহের কে এক পলক দেখে সিঁড়ির দিকে চলে গেলো। আর সেই সাথে সবাই দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। সবাই হতাশ, ফিরে গিয়ে আগের স্থানে বসলো।

“আপনার জন্য আমাদের সবার এই অবস্থা ইকবাল ভাই। আপনার কথা শোনা আসলেই উচিৎ না।”

আফি তো চোখ ছোট ছোট করে ইকবালের দিকে তাকিয়ে তাকে দোষ দেয়। ইকবাল জোর করে হাসে। বলে, “বাদ দাও ওই দেমাগি লোকের কথা। চলো আমরা অন্য কিছু খেলি।”

প্রিয়ম খেলার কথা শুনে অন্য সময় খুশি হলেও আজ সে পাটি ছেড়ে ওঠে দাঁড়াল।

“তোমার আবার কী হলো পিচ্চি?” তিয়ান ভ্রু কুঁচকে ওকে জিজ্ঞেস করলো। প্রিয়ম ব্যাঙ্গ করে বলে,

“পিচ্চি মানুষদের সাথে আপনারা খেলবেন? আপনাদের রুচি দুর্ভিক্ষ হয়েছে, প্রমাণিত হয়ে যাবে না!”

ওর এই কথা মানে কেউ বুঝুক আর না বুঝুক ইকবাল তিয়ান তো তৎক্ষনাৎ চোখ বড়ো বড়ো করে একে-অপরের দিকে চাইলো। কেউ কাউকে কিছু বলবে তার আগেই শোনা গেলো সিঁড়ি বেয়ে কারা যেনো ছাঁদে আসতে আসতে কিছু বলাবলি করছে। সবাই তাই আপাতত সেদিকে মনোনিবেশ করলো। একান্ত ছাঁদে আগে এলো। সিঁড়ির কাছে দরজা খুলে সে এক পাশে দাঁড়াল। হাতে তার একটা টুল।
নির্ভাণ তখন গিটার হাতে ছাঁদে প্রবেশ করলো। সবাই অবাক। নির্ভাণ এসে একান্তর নিয়ে আসা সেই টুলে বসলো। সবাই ফিসফাস করে। সানায়া নির্বিকার বসে। ইকবালের মুখ দিয়ে তখন গড়গড় করে বেরিয়ে এলো, “সানায়াশা দেখো সিস্টার তোমার আইডিয়া কাজে লেগেছে।”

সানায়া অবুঝ চোখে চেয়ে। বুঝে না কথার অর্থ।
একান্ত আফির বরাবর বসেছে। নির্ভাণ সানায়ার পেছনে। সানায়া ঘাড় বাঁকিয়ে একবার দেখে এরপর সোজা হয়ে বসলো।

“তো শুরু হচ্ছে আমাদের বহু অপেক্ষিত অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব।” আফি শুরু করে। ওর কথা শেষ হতেই একান্ত বলে উঠলো, “এক মিনিট, প্রথম পর্ব মানে? আরও পর্ব আছে না-কি?”

মেয়ে গুলো থতমত খেয়েছে এটা স্পষ্ট। আফি তখন কথা ঘুরায়। থমথমে স্বরে বলে, “না। মানে কালকের কথা বলছিলাম।”

“আচ্ছা এখন সবাই চুপ করো।” এরপর একটু থেমে সে ঘোষণা করলো,”এই মূহুর্তে গান করবে মিস্টার তাজওয়ার নির্ভাণ সিদ্দিকী। স্যার প্লিজ স্টার্ট করুন।”

গিটারের তারে সুন্দর করে নির্ভাণ আঙুল চালায়। নির্ভাণের গিটারে দেড়শোর ও বেশি সুর আছে। ইকবাল তিয়ান এই সুর কখনো শুনেছে বলে মনে পড়ে না। সানায়া তখন আফির দিকে আরো চেপে বসেছে। নির্ভাণের হাঁটু মেয়ে টার পিঠে স্পর্শ করে। চুলের বেণী ফ্লোর ছুয়ে আছে। নির্ভাণ সেদিকে দৃষ্টি স্থির রেখে গান ধরলো।

❝এই মন পড়েছে আমার
বড় দোটানায়,,,

সানায়ার ভ্রু কুঁচকে আসে। শেষমেশ এই পুরনো গান। সে যদিও এই গান আগে শুনেনি। অঙ্কুশ হাজরার মুভির গান সে কখনোই শুনে না। তবে গানের সাথে গিটারের টুংটাং শব্দ টা মনকাড়া একটা সুর।
ওর ভাবনার মাঝেই নির্ভাণ আবার শুরু করলো,

প্রেম বয়ে আনলো হঠাৎ
দমকা হাওয়ায়।
এই মন পড়েছে আমার বড়ো দোটানায়,,,,
প্রেম বয়ে আনলো হঠাৎ দমকা হওয়া।
এই আশিকি আশিকি,,,,
করলো কি জাদু হায়,,
এই আশিকি আশিকি,,,,
করলো কি জাদু হায়।
পুড়তে বসেছি, ভেবে পুড়তে বসেছি…
কখনো আগে হয়নি এমন আমার সাথে,,,
এই আশিকি আশিকি,,,,
করলো কি জাদু হায়,,
এই আশিকি আশিকি,,,,,,
করলো কি জাদু হায়,,❞

সবাই নিশ্চুপ মনোযোগ দিয়ে গান শুনছে। এরমধ্যে তিয়ানের ফোন বেজে উঠলো। সানায়া এতো সময় মাথা নুইয়ে গান টা অনুভব করছিলো। তাই হঠাৎ আউটসাইডার শব্দে বিরক্ত হয়ে সবাই তিয়ানের দিকে দৃষ্টিপাত করলো। তিয়ান অস্বস্তি নিয়ে সবাই কে সরি বলে অন্য পাশে গেলো। নির্ভাণ সুযোগ পেতেই গিটার নিয়ে ওঠে দাঁড়াল। সবাই তখন করতালি দিচ্ছে। নির্ভাণ সানায়ার মুখের একপাশ দেখতে পেলো। সে গান গাইতো না৷ কিন্তু কেনো জানি এই মেয়ের আবদার ও ফেলতে পারেনি। সে ছাঁদ থেকে নেমে যাওয়ার আগেও বারকয়েক মেয়ে টার দিকে তাকালো।

#চলবে…….

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here