#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২৬
#জান্নাত_সুলতানা
“তিয়ান কোথায়? দেখলাম না একবারও তোমার বন্ধু কে।”
নিজাম সিদ্দিকী গম্ভীর স্বরে কথাগুলো বলেই থামলেন। নির্ভাণ মাত্র ব্রেকফাস্ট করতে বসেছিল। সে নিজেও রাত থেকে এটা নিয়ে চিন্তিত। ইকবাল ও কিছু জানে না। ছেলেটা হঠাৎ করে কোথায় উধাও হয়ে গেলো বুঝতে পারছে না কেউ। নির্ভাণ এসব ভেবে বাবার প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারলো না। এরমধ্যে তার ফোন টা বেজে উঠলো। রাতেই সে খবর লাগিয়েছে। তিয়ান শহরে নেই। হয়তো গ্রামে।
সে ফোন হাতে সাইডে চলে গেলো। কিয়ৎক্ষণ বাদেই নির্ভাণ সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ইকবাল কে ডেকে উঠলো, “ইকবাল ফাস্ট আয়। আমাদের বেরুতে হবে।”
ইকবাল খাওয়া ছেড়ে তৎক্ষনাৎ বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলো। ডাইনিং টেবিলে থাকা সবাই তখন কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। ওরা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো।
—-
পুরো একটা দিন কেটে গেলো। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেলেও নির্ভাণ বা তার কোনো বন্ধুর ও খোঁজ নেই। সবাই চিন্তিত। তবুও বাড়ি ভরতি আত্মীয় স্বজনরা। সবাই নিজেদের মতো কাজে ব্যাস্ত।
“কি রে রেডি হবি না?” আফির কথায় ধ্যান ফিরলো সানায়ার। সে শোয়া থেকে উঠতে উঠতে বললো,
“হ-হ্যাঁ। যাই তো।”
আফি সাদা আর হালকা আকাশী রঙের একটা গাউন সানায়ার হাতে দিলো। সে নিজেও একই কালার নিয়েছে। মূলত মেয়েরা সবাই এই কালার পরবে। সানায়া গাউন টা হাতে নিয়ে ওয়াশরুম গেলো।
“নির্ভাণ ভাই আসেনি আপু?”
আফির সানায়ার দিকে তাকাল। চোখ দু’টো কেমন ঘুরঘুর করছে লিভিং রুম জুড়ে। চুল টা তখনও বেণী করা। সামনে দিয়ে এনে রেখেছে। গতকালের সেই বেণী এখনো খুলেনি মেয়ে টা। আফি দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। ওর একটা হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে বললো, “চলে আসবে।”
“কোথায় আছে এখন? অনুষ্ঠান একটু পর শেষ হয়ে যাবে।”
অস্থির কণ্ঠ মেয়ে টার। আফি নিজেও ঘড়ি দেখে। কেক ও চলে এসছে। নিজাম সিদ্দিকী একটু রাগারাগি করেছে। ছেলের এমন বেখাপ্পা কাজ ওনার একদম পছন্দ হলো না। পুরো অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে এখন উধাও সঙ্গপাঙ্গ নিয়ে।
ওরা লিভিং রুমে এসে শুনতে পেলো নিজাম সিদ্দিকী একান্ত কে এক পাশে নিয়ে ডেকে জিজ্ঞেস করছে,
“একান্ত কল ধরেছে বেয়াদব টা?”
“না বাবাই। তুমি টেনশন করো না। চলে আসবে।”
একান্তর নিজের মুখেও চিন্তার রেশ। সানায়া আজ দুপুরে খায়নি। মেঝো মামি ওকে খেতে নিয়ে গিয়েছে।
আফি যাচ্ছিল সেদিকেই। একান্ত আচমকাই সবার আড়ালে ওর হাত টেনে ধরলো। ফিসফিস করে বললো, “এতো সাজ কেনো? তোর ভাইয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান না-কি বিয়ের?”
“কই সাজলাম? একটু শ্যাডো আর লিপস্টিক, কাজ,,,,” আফিকে থামিয়ে দিয়ে একান্ত বিরক্তিকর স্বরে বলে উঠলো,
“হয়েছে। তোর এসব আমি চিনি না। শুনেও লাভ নেই। যা লিপস্টিক ধুয়ে আয় গিয়ে।”
আফি মুখ ভেংচি কেটে অন্য পাশে চলে গেলো। তার দুইটা মেয়ে ফ্রেন্ড এবং একটা ছেলে ফ্রেন্ড এসছে। একান্ত ওর যাওয়ার পানে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলো।
—-
সানায়ার ফ্রেন্ড রিক্তা আর তায়েবা এসছে। তায়েবা রিক্তা তো এসছে পর সানায়া কে বিরক্ত করেই যাচ্ছে নির্ভাণ ভাই কে নিয়ে। তবে সানায়া এগুলোর চেয়ে বেশি মনোযোগ সদর দরজার দিকে।
এরমধ্যে রাত বাড়ছে। কেক কাটার ও সময় হয়ে এসছে। সবাই তাই জড়ো হয়েছে এক পাশে। সানায়া উঁকি দিয়ে দিয়ে বারবার দেখছে এই ভীড় ঠেলে। প্রতিবার হতাশ সে। আসেনি মানুষ টা এখনো।
কেক কাটার ঠিক আগ মূহুর্তে এসে বাড়ির বাইরে গাড়ির শব্দ সবাই অবাক। একে একে ফারাজ সিদ্দিকী নেয়ামত সিদ্দিকী তিন ভাই বাইরে বেরুলো। তাদের পেছনে মহিলারা। নির্ভাণ ইকবাল এবং বিধস্ত তিয়ান আগে গাড়ি থেকে নামলো। নেয়ামত সিদ্দিকী দ্রুত গিয়ে তিয়ান কে ধরলো। ছেলেটার অবস্থা নাজেহাল। কাল অব্ধি ছেলেটা একদম ঠিক ছিলো। সবাই যখন এসব নিয়ে আলোচনায় মত্ত তখনই তিয়ান নিজেকে সামলে কোনো রকম বললো, “আমি ঠিক আছি। আপনারা অস্থির হবেন না। আপনাদের জন্য সারপ্রাইজ আছে।” ছেলেটা পাগল হয়েছে? এমন ক্লান্ত কেনো সে? প্রিয়ম মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার কেনো জানি একটু ও ভালো লাগছে না মানুষ টার এমন বিধস্ত রূপ। কেমন মলিন মুখ।
“নির্ভাণ? গাড়িতে কে?” ফারাজ সিদ্দিকী বললেন। নির্ভাণ গাড়ির দরজার দিকে চাইলো। ইকবাল দরজা খুলছে। নির্ভাণ কিছু না বলে সাইড হয়ে দাঁড়াল। আর তক্ষুনি গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো সিদ্দিকী বাড়ির দ্বিতীয় বড়ো ছেলে তুষার সিদ্দিকী। চমৎকার সুদর্শন দেখতে যুবকের মুখে বাড়ি ফেরার আনন্দ দেখা গেলো না। গম্ভীর সে থমথমে চেহারায় সবাই কে এক ঝলক দেখল মাত্র। ফারাজ সিদ্দিকী অবাক ছেলেকে দেখে। বিস্ময় নিয়ে আনমনে বলে উঠলেন,
“তুষার!”
সবাই অবাক হলেও সেহের ভীষণ খুশি। ভাইয়ের সাথে তার কথা হয় প্রায়। সে জানত ভাই আসবে।
এলোমেলো চুলের বেণী টা কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে বাঁ পাশে রাখা। হোয়াইট কম্বিনেশনে স্কাই রঙ টা কী দারুণ মানিয়েছে মেয়ে টাকে। গাউনে কেমন যেনো কিশোরী কিশোরী লাগছে না। বয়স টা যেনো একটু বেড়ে সুদর্শনা কোনো রমণী লাগছে। নির্ভাণ তপ্ত শ্বাস ফেলে পাশে তাকাতেই খেয়াল করলো তাকে ছাড়া আরো একজন মেয়ে টার সৌন্দর্য মোহময় দৃষ্টিতে অবলোকন করে যাচ্ছে। মূহুর্তেই যেনো পুরুষ টার চামড়ার নিচে কেরোসিন ঢেলে দেশলাই দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে এমন অনুভূতি হলো। রাগ বাড়লো তরতর করে। সেই সাথে শরীর কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। সে মায়ের কাছে বলে নিজের রুমের উদ্দেশ্য হাঁটা ধরলো। সানায়া ঠিক সেখানেই দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলো নির্ভাণ সেখান দিয়ে কখন যাবে। অবশেষে তাকে আসতে দেখে সে নড়ে-চড়ে আফির সঙ্গ ঘেঁষে লেপ্টে দাঁড়িয়ে। নির্ভাণ সেখান দিয়ে গেলে তো গেলে তবে যেতে যেতে মানুষ টা রক্তহিম করা কন্ঠস্বরে বলে গেল,
“ইচ্ছে করছে এক্ষুনি গোসল করিয়ে দেই।”
কেনো? তার শরীর থেকে কী বাজে গন্ধ আসছে? সানায়া বারকয়েক নাক নিচু করে নিজের শরীর শুঁকে দেখলো। না। কোনো বাজে গন্ধ নেই। তবে কেনো নির্ভাণ ভাই এমন কথা বললো?
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
