#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২৭
#জান্নাত_সুলতানা
“তিয়ান ভাইয়ের কী হয়েছে কিছু জানো আপু?”
প্রিয়মের প্রশ্ন শেষ হতেই সানায়া ভ্রু কুঁচকে নিলো। সকাল সকাল তিয়ান ভাই নিয়ে কেনো পড়েছে এই মেয়ে? তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রিয়মকে উলটো জিজ্ঞেস করলো, “ওনার কী হয়েছে আমি কী করে জানব? গিয়ে ওনাকেই জিজ্ঞেস কর।”
প্রিয়ম আর কিছু বলে না। বইয়ের দিকে দৃষ্টি স্থির রাখে। ওর রুমে রাফা রাহা থাকে। তাই ওকে আজ দুই রাত সানায়ার সাথেই থাকতে হচ্ছে। আজো রাত চার টায় ওঠে পড়তে বসেছে। সানায়া বুঝে না জেএসসি পরীক্ষার জন্য এতো পড়তে হয়? সে তো এতো পড়েনি। তবুও প্লাস পেয়েছিলো। তবে এবার সন্দেহ আছে প্লাস নিয়ে। নির্ভাণ ভাই বলেছে ভালো রেজাল্ট করলে এবার ঘুরতে নিয়ে যাবে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত।
নিচে শোরগোল পেয়ে ওরা দু’জন নিচে এলো। তিয়ানকে ইকবাল নির্ভাণ ধরাধরি করে বাড়ির ভেতর আনছে। হঠাৎ কী হলো কেউ বুঝে না। পরে জানা গেলো সে দুর্বল। তাই জ্ঞান হারিয়েছে। এপর্যায়ে এসে নিজাম সিদ্দিকী ছেলেকে চেপে ধরলেন।
“কী হয়েছে বলবে প্লিজ?”
“আন্টি গতকাল সকালে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছে আঙ্কেল।” ইকবালের দীর্ঘ শ্বাস শেষ হওয়ার আগেই নিজাম সিদ্দিকী হুংকার ছাড়লেন,
“তোমরা মানুষ? এতো বড়ো একটা ঘটনা, তোমরা কিভাবে আমাদের না জানিয়ে থাকতে পারলে?” ইকবাল আরও জানাল তিয়ানের মায়ের অবস্থা বেশি ভালো না। অন্যদিকে তিয়ান এতো দখল নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অবশ্য হওয়া টাই স্বাভাবিক। মায়ের এমন অবস্থায় তার অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। দুনিয়ায় আপন বলতে একমাত্র মা ছাড়া কেউ নেই। দুঃশ্চিন্তায় অসুস্থ হওয়া টা অস্বাভাবিক না।
বাড়িতে মূহুর্তে কেমন থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি করলো। তিয়ান তখনও অচেতন হয়ে সোফায়। নির্ভাণ বন্ধুর মাথার কাছে ফ্লোরে বসে আছে। ইকবাল পরিবেশ বুঝে ধীরে ধীরে বললো,”আমরা চেয়েছিলাম, তিয়ান নিষেধ করেছে৷ সে চায়নি বাড়িতে উৎসব আনন্দ নষ্ট হয়।”
“এখন ওনার কাছে কেউ আছে কী?” নেয়ামত সিদ্দিকী জিজ্ঞেস করেন। ইকবাল মাথা নাড়ে। তিয়ানের এক দূরসম্পর্কের বোন আছে। তিয়ান গতকাল থেকে এসব নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছে সেইজন্যই সেই বোন জোর করেই তাকে বন্ধুদের সাথে পাঠিয়েছে। তবে সকাল হতেই সে অস্থির হয়েছে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য।
——
সন্ধ্যায় সানায়া আফির রুমে বসে ছিলো। তখনই আফি নিজের ফোনে একটা মুভি বের করে বললো, “চল এটা দেখি আজ। খবরদার সানা এটা দেখে হাসবি না।”
“দেখব না আমি।” বলতে বলতে ফোনের সামনে থেকে ওঠে গেলো। আফি ভ্রু কুঁচকে নিলো। জানতে চাইলো,
“তোর না অনেক ইচ্ছে ছিলো এই মুভি টা দেখার?”
“এখন নেই আর।”
“কেনো?”
“এমনই।”
ওদের কথোপকথন শেষ সানায়া খেয়াল করলো রাফা আফির ওয়াশরুম থেকে বেরুচ্ছে। তাই আর এটা নিয়ে কথা বাড়াল না। আফির থেকে ফোন নিয়ে ফেসবুক ওপেন করে রিলস দেখতে শুরু করলো।
——
“তুমি একটু আমার ফোন টা ধরো। আমি নিচে থেকে ভালো দেখে একটা ওড়না নিয়ে আসি। গোধূলির সাথে দুটো ছবি তুলবো।”
এটা বলে সে নিচে চলে গেলো। সানায়া ইউটিউব ঘেঁটে দেখতে দেখতে সেই মুভির একটা ক্লিপ হঠাৎ সামনে পড়ে গেলো।
“কী করছিস তুই?”
নির্ভাণ একটু আগেই হসপিটাল থেকে ফিরেছে। সানায়া তখনও এই খবর জানে না। তবে হঠাৎ প্রশ্নে চমকে উঠলো সানায়া। হাত থেকে ছিটকে ফোন টা ফ্লোরে পড়ে গেলো।
সানায়া কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্ভাণ ঝুঁকে ফোন টা তুলে নিলো। স্ক্রিনে দুই সেকেন্ড চেয়ে রূঢ় স্বরে বলে উঠলো,
“এতো অবাধ্যতা কেনো পছন্দ তোর?”
সানায়া পেছনে সরে যায়৷ রাফা মেয়ে টা তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে। সানায়া কিছু বলার আগেই নির্ভাণ ফোন টা নিয়ে হনহন করে সিঁড়ির দিকে গেলো। সানায়া পেছন থেকে ডেকে বললো, “এটা রাফা আপুর ফোন।”
নির্ভাণ রাগান্বিত দৃষ্টিতে এক পলক ওকে দেখে রাফা কে ফোন টা দিতে দিতে কিছু বললো। তবে সানায়া সেটা শুনতে পেলো না। নির্ভাণ যেতেই রাফা ও মুখ অন্ধকার করে সেখান থেকে চলে গেলো। সানায়া তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে নখ খুঁটতে খুঁটতে ভাবুক হয়। তার কী করা উচিৎ? নির্ভাণ ভাইয়ের মনোযোগ পেতে আরও একটু অবাধ্য হবে কী!
—–
সেদিনের পর কেটেছে অনেকদিন, তিয়ানের মা অবশেষে হসপিটালে তিন দিন থাকার পর মারা গিয়েছে। সিদ্দিকী পরিবার থেকে সবাই গিয়েছিল শেষ বিদায়ে। এরপর আবারও ফিরে এসছে। যে যার মতো কাজেও ব্যাস্ত। তবে বন্ধু কে সামলে নিতেই নির্ভাণ দুদিন গ্রামে ছিলো। আজ বাড়ি ফিরবে। সানায়া গার্ডেনেই ঘুরঘুর করে। মানুষ টা কখন আসবে সেই অপেক্ষা।
“ফ্রেঞ্চ কিস বুঝিস, হুঁ?”
নির্ভাণের কঠিন মুখ। রক্তহিম করা কণ্ঠস্বর। সানায়া কথাখানা শুনেই চমকে উঠলো। সে গতকাল রাতে টাইটানিক মুভিটা দেখেছে। নির্ভাণ ভাই সেদিন নিষেধ করা স্বত্বেও অবাধ্য হয়েছে সে। নির্ভাণ জানার কথা নয় সে এটা দেখেছে। কিন্তু কিন্তু, এই উপরোক্ত প্রশ্নের অর্থ কী? সে তো মুভি দেখার পরপরই এই কিসের ডিটেইলে গুগুলের সাহায্য নিয়ে এটা সম্পর্কে জেনে ফেলেছে। লজ্জিত, ভয়ার্ত মুখ মেয়ে টা কপালের ঘাম মুছতে বারবার হাত তুলে। তালু দিয়ে ঘাম মুছে। নিশ্চয়ই এবার সে একটু বাড়াবাড়ি করেছে। তবে নিজেকে শান্ত রাখার ব্যার্থ চেষ্টা করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাত মুচড়ায়। ওর এমন ভাবভঙ্গি সামনে দাঁড়ানো নির্ভাণ ফের বলে উঠলো,
“আরেকবার হাত নড়লে হাত বেঁধে দেব।”
“আমি আমার ইচ্ছে মতো চলতে যাই। সবার মতো নর্মালি লাইফ টা এনজয় করতে চাই। আপনি কেনো আমার সব কিছুতেই হস্তক্ষেপ করেন, আপনার ইচ্ছে মতো আমাকে কেনো চলতে হবে? আপনি যা বলবেন তা কেনো আমাকে শুনতে হবে! একটু ভালোবাসি বলেই কী আপনার সব কথা শুনে চলতে হবে? কতদিন পর দেখা একটু ভালোমন্দ কথা হবে। তা না করে এসেই শুরু হয়েছে খবরদারী।” সানায়া মনে মনে কথাগুলো বললেও মুখে বলার মতো দুঃসাহস সে দেখাতে পারবে না।
“আমি জানি না।”
সানায়া ছোট করে মিথ্যা জবাব দেয়। নির্ভাণ ত্বরিত মেয়ে টার সম্মুখে এসে দাঁড়াল। গম্ভীর চোখে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বললো,
“বাহ্! সানা বাহ্! মিথ্যা বলতে শিখেছিস!”
“আহ্ ব্যাথা পাই নির্ভাণ ভাই।”
নির্ভাণ মেয়ে টার হাতের কব্জি চেপে ধরে। পেছনে সুইমিংপুল। সানায়ার ভয়ে ভয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে আঁড়চোখে পেছনে তাকায়। ছেড়ে দিলেই পানিতে পরবে সে। শরীর সামন্য শক্তিটুকুও নেই নির্ভাণ ভাই কে ধাক্কা দেওয়ার। শরীর শিরশির করছে মেয়েটার। পায়ের নিচে জমিনটাও নড়বড়ে যেনো। এসবের বাইরে ও সে নির্ভাণ ভাই কে কখনো ধাক্কা দিয়ে নড়াতে পারবে না। এমন বলিষ্ঠ দেহের মানুষের সাথে সে কিছুতেই পেরে উঠবে না তার মতো চুনোপুঁটি।
“উম, মিথ্যা বলার সময় মনে ছিলো না? কেনো অবাধ্য হোস? আর কেনো মিথ্যা বলিস আমায়?”
“আর করবো না। এবারের মতো ছেড়ে দেন নির্ভাণ ভাই।”
ক্রন্দনরত কণ্ঠস্বর মেয়ে টার। নির্ভাণ রেগে আছে। এটা বুঝতে পেরে সানায়া নিজের জেদ থেকে সরে এলো। অনুনয় করতে শুরু করে। কিন্তু নির্ভাণ শুনে না। হাতটা আচমকাই ছেড়ে দিলো। আর সাথে সাথে ঠান্ডা পানি স্পর্শ করলো সানায়াকে। হাতরেও সে কিনার পায় না। সে সাতার জানে। তবুও কেনো জানি রাগ-ক্ষোভ সব মেয়ে টার মধ্যে চেপে বসলো। ডুবে যেতে দিলো ভারী শরীর টা। কয়েক সেকেন্ডে চুপচাপ নিজের শরীর ছেড়ে দিলো। আর পানির অতলে হারিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো। এরমধ্যে একবার চোখ খুলে আবছা দেখতে পেলো নির্ভাণ ভাই নিজের পকেট থেকে কিছু বেড় করছে। প্রানেশা এটুকু দেখে চোখ বন্ধ করলো। ঠিক তক্ষুণি ঝাপ করে পানিতে কারোর লাফিয়ে পড়ার শব্দে ওর মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
আর সাথে সাথে সে পানির নিচ থেকে মাথা তুললো। এলোমেলো ভেজা চুলগুলো মুখ থেকে কোনো রকম সরিয়ে তাকাল নির্ভাণের দিকে। নির্ভাণ মেয়ে টার চেহারা দেখেই বুঝে ফেললো সব ওর নাটক। সে নিজের মুখের পানি মুছে বাঁ হাতে। দাড়ি চকচক করছে বিন্দু বিন্দু পানি কণায়। রাগে চক্ষুদ্বয় দিয়ে আগুনের ফুলকি বেড় হচ্ছে যেনো। সানায়া আস্তে করে ঢোক গিলে। নির্ভাণ ওর দিকে তাকিয়ে কটমট করে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
“আজকে যদি হাতের নাগালে পেয়েছি থাপ্পড় মেরে আমি তোর ড্রামা বের করবো। ড্রামাবাজ ষ্টুপিড।”
সানায়া কে আর পায় কে। সে কোনো রকম পানি থেকে ঝটপট ওঠে গেলো। ভেজা শরীরে ওড়না মেলে দিতে দিতে ঠোঁট উলটে বললো,
“এখন শোধবোধ হয়েছে।”
“তবে প্রফিটটা তোলা রইলো, সানায়া এহমাদ।”
মেয়ে টা শুনেছে বলে মনে হচ্ছে না কারণ তার আগেই দ্রুত পা ফেলেছে বাড়ির দিকে। নির্ভাণ নিষ্প্রভ দৃষ্টে চেয়ে রইলো মেয়ে টার যাওয়ার পানে। গায়ে থাকা পোষাক শরীর সঙ্গে আঁটসাঁট হয়ে লেপটে আছে। নারীসুলভ সমস্ত ভাজ ফুটে উঠেছে কামিজ ভেদ করে। সেদিকে কোনো খেয়াল নেই এই দস্যি মেয়ের। বাড়ির লিভিং রুমে কোনো পুরুষ থাকতে পারে কথাটা মাথায় আসামাত্র নির্ভাণ পানি থেকে ওঠে গেলো। নিজের বড়ো বড়ো পায়ের লম্বা কদম ফেলতে ফেলতে সামনে এগিয়ে যায়। গা থেকে টেনে শার্ট খুলে দ্রুত। আর পেছন থেকে মেয়ে টার গায়ে জড়িয়ে দেয় কালো পানিতে ভেজা শার্ট। সানায়া তাকায়। তবে তার আগেই নির্ভাণ ওর সামনে চলে গেলো। পুরুষ টার গায়ে শুধুমাত্র ভেজা একটা স্যান্ডো গেঞ্জি।
সানায়া হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। একটু সময়ের ব্যবধানে কোনো মানুষের মতিগতি কিভাবে পালটে যেতে পারে সেটা এই তাজওয়ার নির্ভাণ সিদ্দিকী কে না দেখলে সানায়ার অজানাই থেকে যেতো।
#চলবে…….
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
