আপনার_হৃদয়ে_আমি #পর্ব_২৮

0
22

#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২৮
#জান্নাত_সুলতানা

“তুমি চলে যাবে? কিন্তু তোমার তো ছুটি আছে আরো।” আশরাফ চৌধুরীর কথা শেষ হইতে একান্তর চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। গম্ভীর স্বরে বলে উঠলো,

“বাড়িতে আসার আগে কী বলে নিয়ে এসছিলে?” আশরাফ চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে নেন৷ কী বলেছিলেন? মনে করতে পারেন না ভদ্রলোক। স্ত্রীর দিকে তাকাতেই স্ত্রী কিছু ইশারা করলো। তবুও বুঝলো না আশরাফ চৌধুরী। বরং বিরক্ত নিয়ে বলে উঠলো, “সোজা কথা বলো। তোমাদের মা ছেলের মতো মস্তিষ্ক এতো স্ট্রং না আমার।”

“ভাইজান আপনারা তো বলেছিলেন একান্ত কে বিয়ে করাবেন। রাফা কে বিয়ে দিবেন কিছুই তো করছেন না।”

ছোট ভাইয়ের কথায় হঠাৎ করে মনে পড়লো হ্যাঁ তিনি বলেছিলেন এক সময় এই কথা। সে ছেলের দিকে আঁড়চোখে চেয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আচ্ছা। আমি দুলাভাইয়ের সাথে কথা বলবো।”

একান্তর রাগ তড়তড় করে বাড়ে। এতোদিনে বলবে? কথাটা একদম অসহ্য লাগলো তার। সে দোসরা কোনো কথা না বলেই হনহনিয়ে গেস্ট হাউজে থেকে বেরিয়ে গেলো।

——

তুষার খুব গম্ভীর। গম্ভীর মানে খুবই গম্ভীর। নির্ভাণ তবুও সবার সাথে টুকটাক কথা বললেও তুষারের যেনো এতেও ঘোর আপত্তি। সে কোনো কথাই বলে না প্রয়োজন ছাড়া। বাড়িঘর, পরিবারপরিজন দুনিয়া উলটে গেলেও সে নিজের গম্ভীরতা ছেড়ে একটা কথা বলতেও নারাজ। আজ তিন দিন হয় এসছে, অথচ কারোর সাথে বসে দুটো কথা পর্যন্ত বলে না। খাবারের সময় খেতে আসে আর পুরো টা সময় নিজের রুমে গেইম খেলে কাটায়। আবার মাঝেমধ্যে রাতে বাইরে যায়। বাড়ির কারোর অবশ্য এতে কোনো মাথাব্যথা নেই। কারণ তুষার ছোটবেলা থেকেই এমন। আর বিদেশ ও পড়তে গিয়েছিল নিজের ইচ্ছায়। এবং ফিরেও এসছে নিজের ইচ্ছে।

চৌধুরী পরিবার এখন সিদ্দিকী বাড়িতেই আছে। কাল চলে যাবে তারা। রাতে বড়োরা খাবার শেষ আড্ডায় বসতেই ছোটরা যে যার মতো করে লিভিং রুম ছাড়ল। আশরাফ চৌধুরীর বোনের জামাইয়ের সাথে সম্পর্ক তেমন মিষ্টি নয়। একটু তিক্ত তাদের শালা দুলাভাই সম্পর্কটা। তারা দুজনেই বিশ। আর এইজন্যই সব সময় দুজনের মধ্যে বনাবনি হয় না। কিন্তু ছেলের জন্য এবার ইগো দেখালে চলবে না। রাত করে আশরাফ চৌধুরী নিজাম সিদ্দিকীর রুমে এলো। তন্বী রহমান ভাইয়ের সাথে কথা বলে চায়ের জন্য গেলো। আশরাফ চৌধুরী কিছু টা সময় আমতা আমতা করে কিছু বলতে চেয়েও পারে না। নিজাম সিদ্দিকী ব্যাপার টা বুঝতে পেরে আরও মজা নিলো। চুপচাপ ভদ্রলোক শালার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। ঠোঁট চেপে মিটমিট করে হাসেন আড়ালে। আশরাফ চৌধুরী গলা পরিষ্কার করেন। বলেন, “আফির বিয়ে দিবে না?”

“মেয়ে আমার, বিয়ে নিয়ে তোর কেনো মাথাব্যথা?” নিজাম সিদ্দিকী ভ্রু কুঁচকে রাখেন। আশরাফ চৌধুরী গোপনে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। সাধে কী আর মাথাব্যথা। তবে আচমকাই তিনি এমন এক কথা বললেন, যা শুনে নিজাম সিদ্দিকীর চোখ বড়ো বড়ো হয়ে এলো। থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি করতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো। তন্বী রহমান চলে আসাতে তিনি আর কিছু বলতে পারলো না। তাই দাঁতে দাঁত চেপে চা না খেয়েই ওয়াশরুমের দিকে চলে গেলেন। আশরাফ চৌধুরী চা খেলেন আস্তে-ধীরে এবং বোনের সাথে টুকটাক কথা শেষ বেরিয়ে এলো।

——

নির্ভাণ নিজের কোচিং সেন্টার থেকে বেরিয়ে বাইকে চেপে বসলো। তিয়ান আপাতত ইকবালের সাথেই থাকছে। আগে হোস্টেল থাকত। তবে সে একটা চাকরি পেলেই নিজেও একটা বাসা নিবে। নির্ভাণ ওকে সাহায্য করতে চাইছে। এইজন্য ফারাজ সিদ্দিকীর সাথে সেদিন কথা বলেছে। তাদের কোম্পানির প্রায় সব দায়িত্বে তিনিই আছে। আজ ফারাজ সিদ্দিকী নির্ভাণ কে ডেকে পাঠিয়েছে। নির্ভাণ তাই অফিসের উদ্দেশ্য ছুটলো। বিশাল বড়ো কোম্পানি তাদের। সম্পূর্ণ টা তার বাপ চাচা তিনজন মিলে দেখেন।
নির্ভাণ যখন অফিসে এলো তখন প্রায় অনেক স্টাফরাই তাকে দেখা আড়ালে ফিসফাস করে আলোচনা করছিলো ফিউচার এমডি বলে।

নির্ভাণ সে-সব তোয়াক্কা না করেই সোজা দোতলায় গিয়ে ফারাজ সিদ্দিকীর কেভিনে চলে গেলো। নির্ভাণ বড়ো হয়ে এই নিয়ে চার বার কোম্পানিতে এসেছে। ফারাজ সিদ্দিকী ভাতিজাকে দেখেই লম্বাচওড়া হেঁসে একজন কে ডেকে কফি দিতে বললো।

“কফি চাই না।” একটু থেমে নির্ভাণ আবার বলে, “তিয়ান কে একটা সুযোগ দাও চাচ্চু।”

নির্ভাণের কথা শেষ ফারাজ সিদ্দিকী হাসলেন। ব্যাবসা টা পারিবারিক হলে-ও এখানে পরিশ্রম বেশি ফারাজ সিদ্দিকীর। আর তিনি চান এই কোম্পানি টা ভবিষ্যতে এমন কারোর অধীনে থাকুক যে ওনারই মতো জিনিয়াস।

——

সানায়া বিকেলে আবার গোসল দিয়েছে। কেনো দিয়েছে? সেদিন যে নির্ভাণ ভাই ওই কথা বললো সেইজন্যই দিয়েছে। নির্ভাণ ভাই একটু পর ফিরবে। আজ তিন চারদিন ধরেই সে নির্ভাণ ভাই আসার আগে আবারও গোসল দেয়। ওই যে শরীর থেকে বাজে গন্ধ যেনো না আসে সেইজন্য। অথচ এসব করতে গিয়ে শরীর টা কেমন আজ গুমগুম করছে। নিশ্চয়ই রাতে জ্বর আসবে। সন্ধ্যায় সে সবার শেষ নাশতা করতে এলো। নির্ভাণ এই অসময়ে ডাইনিং টেবিলে থাকবে সানায়ার ধারণা ছিলো না। মেয়ে টার ভেজা চুল দেখে কিছু টা অবাক হলো নির্ভাণ।

“অসময়ে গোসল দিয়েছিস কেনো?”

“আপনি সেদিন বললেন আমার শরীর থেকে বাজে স্মেল আসে।” সানায়ার কণ্ঠে কিছু টা অভিমান লুকিয়ে আছে যেনো। নির্ভাণ অবাক। সে এই কথা কবে বললো? কী আশ্চর্য! তার তো এমন কিছু মনে পড়ছে না। স্মৃতি শক্তি কী দুর্বল হয়ে গেলো?

“কখন?” নির্ভাণ মনে মনে কয়েকদিন আগের স্মৃতিচারণ করে এলো। তবুও এমন কিছু সে বলেছে বলে মনে করতে পারলো না।

“আপনি না সেদিন আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গোসল দেওয়ার কথা বললেন।”

গোসল! গোসল! বারকয়েক কথাটা মনে মনে আওড়াতেই মনে পড়লো সেই তিক্ত মূহুর্ত টা। রাগের পাশাপাশি হাসিও পেলো। তবে সে সব কিছু চাপা দিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো, “ওটার অর্থ এটা ছিলো না।”

“তাহলে কী ছিলো?” সানায়া কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে। বুঝতে পারে না কোনো কিছু। নির্ভাণ কণ্ঠ খাদে নামিয়ে জবাব দিলো,

“এটা বোঝার মতো ক্ষমতা এখনো হয়নি তোর।”

“আমি বুঝি। আপনি বলুন।”

নির্ভাণ বলে না। নিশ্চুপ সে চুপচাপ নাশতা শেষ করে চলে যাবে ঠিক তক্ষুণি সেখানে এসে উপস্থিত হলো তুষার। ছেলেটাকে দেখেই নির্ভাণের মুখ টা অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। সে যেখানে ওঠে দাঁড়িয়ে ছিলো তার ঠিক দুটো চেয়ার পড়ে গিয়ে আবারও পানির গ্লাস হাতে নিয়ে পানি খেলো। সানায়া তুষার কে আঁড়চোখে দেখে আবারও নিজের মতো খেতে লাগলো। এরমধ্যে সে শুনতে পেলো নির্ভাণ বলছে, “শার্ট টা রুমে দিয়ে যাবি। এখনই।”

গতকালের সেই শার্ট সানায়া যত্ন করে শুকিয়ে নিজের কাছে রেখেছে। ধুয়ে পর্যন্ত শুকায়নি সে। কারণ এটাতে নির্ভাণ ভাইয়ের গন্ধ আছে ধুয়ে ফেললো গন্ধ টা চলে যাবে না? এটা ফিরত দিতে হবে ভেবেই সানায়ার মন টা খারাপ হয়ে গেলো। নির্ভাণ হনহনিয়ে চলে যাচ্ছে। সানায়া অসহায় দৃষ্টিতে কয়েক সেকেন্ড সেদিকে চেয়ে রইলো।

“তোমার রেজাল্ট কবে দিবে?” আচমকাই তুষারের মুখ থেকে এমন প্রশ্নে কিছু টা অপ্রস্তুত হলো সানায়া। এটা অপ্রত্যাশিত যে তুষারের মতো গম্ভীর একজন মানুষ তার রেজাল্ট সম্পর্কে জানতে চাইছে। নির্ভাণ বা বাড়ির অন্য সব সদস্যদের সাথে সানায়ার সম্পর্ক টা যতোটা সহজ তুষারের সাথে ঠিক তেমন টা না। তাই কথোপকথন বেশি বাড়ল না। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সে চটজলদি ডাইনিং ছেড়ে চলে গেলো। পেছন থেকে তুষার ওর যাওয়া দেখলো। মেয়ে টার লম্বা চুলের বেণী হাঁটার তালে তালে দুলছে। তুষার অনুভব করলো তার হার্ট বিট ও সেভাবেই তাল মিলিয়ে চলছে। কী অদ্ভুত! দেশবিদেশ ঘুরে এসে কী সে তবে বাবার বোনের বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পড়লো!

ওদিকে তুষারের এমন চাহনি দোতলায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকা নির্ভাণের শরীরে যেনো কাঁটার মতো বিঁধছে। সে চুপচাপ চোয়াল শক্ত করে নিজের রুমে ফিরে সোজা ওয়াশরুম চলে গেলো। শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো সেটার নিচে। ঝরনা থেকে পানি পড়ে মূহুর্তেই বলিষ্ঠ দেহখানা ভিজিয়ে দিলো। গা থেকে টেনে শার্ট খুলতে খুলতে নির্ভাণ বিড়বিড় করলো, “যে চোখ তোকে ভিন্ন নজরে দেখে, ওই চোখ গুলো ঘৃণা করি আমি।”

#চলবে……..

[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here