#আপনার_হৃদয়ে_আমি
#পর্ব_২৯
#জান্নাত_সুলতানা
“নির্ভাণ ভাই অন্য কাউকে পছন্দ করে।”
রাফা নাক টেনে কাঁদে। কাল তারা ফিরে যাবে ব্যাগ গুছায় এলোমেলো হাতে। রাহা নিজের চুল আঁচড়ায়। বোন কে এমন কাঁদতে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে। জিজ্ঞেস করে,
“কাকে? আর তুমি এভাবে কাঁদছ কেনো?”
“কাঁদব না? আমি কী কম সুন্দর? তবুও তিনি আমাকে পছন্দ করলো না।”
“কেঁদো না।” রাহা বোন কে সান্ত্বনা দেয়। রাফা কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“নির্ভাণ ভাই স,,,,” রাফার কথা সম্পূর্ণ করার আগেই আফি বললো,
“রাফা তোর ফোন বাজে।”
সানায়া ও আফির সাথেই ছিলো। সে নির্ভাণ ভাই এটুকু শুনেছে। তবে আপু কেনো রাফার কথা সম্পূর্ণ শুনলো না এটা ভেবেই ভ্রু কুঁচকে আসে সানায়ার। আফি রুমের ভেতরে গেলেও সানায়া আর এখানে দাঁড়ায় না। শার্ট হাতে সোজা নির্ভাণের রুমের উদ্দেশ্যে হাটে।
নির্ভাণ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো ট্রাউজার পরনে অর্ধ উন্মুক্ত ভেজা শরীর নিয়ে। চুল বেয়ে তখনও কয়েক বিন্দু পানি ফ্লোরে পড়ছে। সানায়ার দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডর জন্য সেদিকেই স্থির হয়ে গিয়ে ছিলো। তবে লজ্জায় অস্বস্তি নিয়ে সে দ্রুত উলটো ঘুরে দাঁড়াল। নির্ভাণ ওর হাত থেকে শার্ট টা নিলো। গায়ে জড়িয়ে বাটন লাগাতে থাকে। সানায়া তখন চোখ পিটপিট করে তাকায়।
“ঘুমতে যা।” এটুকু বলেই নির্ভাণ থামল। সানায়া হাত মুচড়ায়। নির্ভাণ গিয়ে নিজের পিসির সামনে বসে। সানায়া গুটি গুটি পায়ে নির্ভাণের পেছনে দাঁড়ায়। নির্ভাণ কিছু কাজ করছে। সানায়া কে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে লক্ষ্য করে সে অনুমান করলো এই মেয়ের আবার কিছু চাই।
“কী হয়েছে? যাচ্ছিস না কেনো?”
কোথাও না কোথাও তার গম্ভীর স্বভাব মনে মনে চিৎকার করে চাইছিল মেয়ে টা এখানে কিছু টা সময় দাঁড়িয়ে থাকুক। আর সে ভোলোভালা চোখ দু’টো মন ভরে দেখুক। কিন্তু নিজের ব্যাক্তিত্বের কাছে তার মন ও হার মানে। সানায়ার কোনো জবাব না পেয়ে বললো, “রাত অনেক হয়েছে। ঘুমতে যা।”
“আম্মু কে বলুন না, তুষার ভাইয়ার দেওয়া ফোন টা যেনো আমাকে দিয়ে দেয়।” তুষার বেশ দামী দেখে নিজের ফুপিমণির মেয়ের জন্য একটা ফোন এনেছে। সানায়ার যেহেতু এখনো এসএসসি শেষ হয়নি তাই এই ফোন আপাতত সে ফুপিমণির হাতেই দিয়েছে। নির্ভাণ জানে সম্পূর্ণ টা। সে চায়না নিজের হৃদয়ে থাকা নারীর হাতে অন্য কারোর ফোন থাকুক। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে সে বললো,”রুমে যা।”
সানায়া বুঝে যায় নির্ভাণ তাকে নীরবে নিষেধ করে দিচ্ছে। মেয়ে টার মন অভিমান জমে ওঠে। মাথা নুইয়ে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে ভাবল বাবা থাকলে তার বাবাও নিশ্চয়ই তাকে ফোন কিনে দিতো যেমন টা তার বান্ধবী তায়েবার বাবা দিয়েছে। ওর এসব ভাবতে গিয়ে গলায় কিছু একটা দলাপাকিয়ে যায়। ঢোক গিলে সে। তখনই শুনতে পায় নির্ভাণ আবার বলে,
“কী?”
“আমার সব ফ্রেন্ডদের মোবাইল আছে। শুধু আমার নেই।” মেয়ে টা নির্বিকার বলেই গেলো। এরপর কথা শেষ আর অপেক্ষা করলো না। খুব তাড়াতাড়ি কক্ষ হতে বেরিয়ে গেলো। নির্ভাণ নিশ্চুপ নিজের কাজ তখনও করছে। সানায়া দরজায় দাঁড়িয়ে এটা দেখে ওর আরও কান্না পায়। ফোনের জন্য নির্ভাণ ভাইয়ের আগে যাদের সুপারিশ করলে ফোন পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো সবার কাছেই বলা শেষ। শেষে বাধ্য হয়ে না নির্ভাণ ভাইয়ের দোরগোড়ায় এসেছে। তবে এতেও লাভ হলো না। এই পাষণ্ড যুবক ও তার প্রতি একটু সদয় হলো না।
——
প্রতিদিনই সানায়া ঘুম থেকে ওঠে একবার নির্ভাণের রুমের দরজায় আসে। ঘুমঘুম চোখে নির্ভাণ ভাই কে ভয়ংকর সুন্দর দেখায়। আর যখন ফ্রেশ হয়ে আধো ভেজা মুখ নিয়ে টাওয়াল দিয়ে হাত মুখ মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বাইরে আসে তখন ভীষণ স্নিগ্ধ লাগে মানুষ টাকে। আজো সে নির্ভাণের রুমে উঁকি মেরেছিল। অথচ তার আজ একটু অভিমান করার উচিৎ ছিলো। কিন্তু ওই যে মধ্যরাতে মানুষ টা যখন জ্বরের ঔষধ হাতে তার রুমে উপস্থিত হয়েছিল ঠিক তক্ষুণি মেয়ে টার সকল অভিমান নিমেষেই উধাও হয়েছে। তার তো কথা টা মনে করেই আনন্দে হৃদয়ে দুলিয়ে উঠছে। মানুষ টা যদিও একটু বেশি তাকে কন্ট্রোল করে। তবে কেয়ারও করে। এটাও অস্বীকার করার নয়।
রুমে উঁকি দিতেই সানায়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। স্যুট বুট কেউ একজন হাতে ঘড়ি পরছে। সানায়ার বুকের ভেতর কেঁপে উঠলো। এই রুমে কী নির্ভাণ ভাই ছাড়াও অন্য কেউ আছে না-কি এটা ভাবনা মাত্রই মানুষ টার চেহারা সম্পূর্ণ দেখার পর সানায়ার বিস্মিত চোখ মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ হলো। মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো, “নির্ভাণ ভাই।”
কালো থ্রি-পিস স্যুটে প্রাপ্তবয়স্ক এক পুরুষ লাগছে। যা সাধারণত নর্মাল শার্ট কিংবা টি-শার্টে সচারাচর লাগেনা। সানায়ার ধ্যান ফিরলো নির্ভাণ কে স্যুট হাতে দরজার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। দ্রুত কদমে সে দরজা থেকে সরে এলো। লম্বা লম্বা কদমে গিয়ে ঢুকে পড়লো আফির রুমে। আফি ফ্রেশ হয়ে নিচেই যাচ্ছিল নাশতা করতে। সানায়া আসাতে সানায়ার সাথে দু’জনেই নিচে এলো। ডাইনিং টেবিল আজ বাবা চাচাদের ছাড়া আরও একটা কাউকে স্যুট পরা অবস্থায় দেখে আফির কৌতূহল বাড়ার আগেই সে লোকটার পেছনের ছোট ছোট আর্মিকাট চুল দেখেই বুঝে ফেললো এটা তারই সুদর্শন ভাই।
“কোথায় ইন্টারভিউয়ের জন্য যাচ্ছ?” নিজাম সিদ্দিকী ছেলের বেশভূষা দেখে জিজ্ঞেস করলেন। গম্ভীর মুখ ভদ্রলোকের। ছেলে চুপচাপ গম্ভীর স্বভাবের সাথে সাথে বেপরোয়া স্বভাবের এটাও অস্বীকার করা যায় না। তাই তো বাবা ছেলের সম্পর্ক টা দূরের মনে হবে প্রথম আলাপে।
“না। তোমাদের কোম্পানিতে যাচ্ছি।” নির্ভাণের নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব। সে নিজের মতো খেয়ে যাচ্ছে। সানায়া আজ আর নির্ভাণের পাশের চেয়ার দখল করতে পারেনি। সেখানে সেহের বসে আছে। সানায়া যদিও নির্ভাণ কে এইজন্য দেখতে একটু ঘাড় বাঁকাতে হচ্ছে তবে এতেও তার সমস্যা নেই। সে খুব সাবধানে নির্ভাণ কে দেখতে গিয়ে খেয়াল করলো রাফাও দেখছে নির্ভাণ কে। রাগের সাথে বিরক্তিকর নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো মুখ দিয়ে। ঠিক তখনই পাশ থেকে তুষার বললো,”রাতে আমি একটা ফ্যামেলি ডিনার রেখেছি। আমি সবাই কে লোকেশন জানিয়ে দেব। টাইমলি পৌঁছে যাবেন সবাই।”
চৌধুরী পরিবার আজ বাড়ি ফিরে যাবে। তাদের ফিরতেই হবে। খামারের দেখাশোনার জন্য লোক থাকলেও নিজেদের কাজ নিজেরা না দেখেশুনে রাখলে বদলি তেমন ভালো করে কাজ করতে চায় না। গাফলতি করে কাজ নিয়ে। অনেক জোড়াজুড়ি করেও যখন তারা রাজি হলো না তখন কথা হলো একান্ত রাফা রাহা থেকে যাবে। আর বড়োরা ফিরে যাবে। এতে অবশ্য আশরাফ চৌধুরীর তেমন মত ছিলো না। তবে ছেলের দিকে চেয়ে রাজি হলেন।
#চলবে……
[ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।]
