হিপনোটাইজ #তাজনিন_তায়্যিবা পর্ব:49

0
32

#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:49

স্রোতস্বিনী নদীর কলকলে জলধারার মতো নিঃশব্দে বয়ে গেছে একটি মাস। সময়ের অনিবার্য নিয়মে সেই মাসটিও মিশে গেছে ত্রিশটি ক্ষণস্থায়ী দিনে। অথচ জীবনের হিসেবের খাতায় নিস্পা হারিয়ে ফেলেছে দু’ দুটো ঘণ্টা,ডুবে গেছে অজানা এক অন্ধকার গহ্বরে। মনের গভীরে হটাৎ জেগে উঠা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব গুলো শিকল পরিয়ে দিয়েছে তাকে।সাময়িক সময়ের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছে তার সমস্ত সত্তা।

খুব কষ্ট করে নিজেকে সামলেছে নিস্পা।ট্রমা থেকে বেড়িয়ে নিজেই নিজেকে শান্ত করেছে।এতোগুলো দিন নিজেকে আটকে রেখেছে একা ঘরে। এই একমাসে ত্রিজয়ের সাথে গতানুগতিক দেখা হয়েছে দু’বার হবে।লোকটা কিছু একটা নিয়ে বেজায় ব্যাস্ত,হারানো জিনিস খুঁজে বেড়ানোর মতোই কিছু একটা হয়তো খুজছে,তবে নিস্পা তাতে মাথা ঘামায় নি।চুপচাপ নিজেকে নিয়ে ভেবেছে কেবল।

চোখে দেখতে পাওয়ার আনন্দ টা অনুভব হচ্ছে না।চোখের দৃষ্টি ফিরে পেয়েছে পর্যন্ত কোথাও কোন শান্তির চিহ্ন দেখতে পায় নি,কেবল ভয়ংকর অন্ধকার আর লোমহর্ষ কিছু দৃশ্য পাল্টে দিয়েছে তার পুরো জীবন। অতীত থেকে বর্তমান এখন কেবল ধোঁয়াশা।

তবে আর বসে থেকে সময় নষ্ট করতে চাইলো না নিস্পা।তার ভবিষ্যতের সীদ্ধান্ত তার নিজেরই নিতে হবে,আর তার সীদ্ধান্ত এটাই সে আর এক মূহুর্ত এই বাড়িতে থাকবে না, ওই খুনি স্বার্থপর জালিম লোকটাকে দ্বিতীয় বার কোন ক্ষতি করার সুযোগ দিবে না সে।

যেই ভাবা সেই কাজ,তুরন্ত কাবার্ডের দিকে ছুটে গেল নিস্পা,নিজের জামাকাপড় গোছানোর জন্য।কিন্তু গিয়েই চোখ কপালে,পুরো কাবার্ড ফাঁকা, একটা জামাকাপড়ও নেই সেখানে।

রাগে কিড়মিড় করে উঠলো নিস্পার মাথা।এতো এতো দিন নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া মেয়েটা হটাৎই ফিরে এলো নিজের চিরাচরিত রুপে,হনহনিয়ে ছুটে গেলো ত্রিজয়ের ঘরের দিকে।

নিজের ঘরে সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করছে ত্রিজয়।রাত বেশি নয়,সন্ধ্যা তখন।বৃদ্ধাঙুলটা তড়িৎ এর মতোই উঠানামা করছে মোবাইলের স্ক্রিনে।ঠিক তক্ষুনি ঘরে ঢুকে ঠিক তার সম্মুখে এসে দাড়ালো নিস্পা।ত্রিজয় চোখ তুলে এক পলক তাকালো,তারপর আবার মনযোগ দিলো মোবাইলে।

ত্রিজয়ের এমন নির্লিপ্তে এড়িয়ে যাওয়া টা একদমই সহ্য হলো না নিস্পার,কর্কষ কন্ঠে ছুড়লো প্রশ্ন,

“আলমারি ফাঁকা কেন?আমার ড্রেস কোথায়?”

হটাৎ জমে যাওয়া বরফের মতো মোবাইলের স্ক্রিনেই থেমে গেলো ত্রিজয়ের বৃদ্ধাঙুল।সে চোখ তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো নিস্পার মুখের দিকে,তারপর ভণিতা বিহীন ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“আমার ঘরে।”

নিস্পার কপাল কুচকে এলো,তেঁতে উঠে জিজ্ঞেস করলো,

“কেন?”

ত্রিজয় ফোন টা অফ করে গা এলিয়ে দিলো সোফায়,দু হাত দুদিকে মেলে দিয়ে শীতল কন্ঠে বললো,

“কারণ তুমি আজ থেকে এই ঘরেই থাকবে।”

নিস্পার আর বুঝতে বাকি রইলো না ত্রিজয়ের কথা,সে ঝাজালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো ,

“আমি সে কথা একবারও বলেছি?”

ত্রিজয় ভাবলেশহীন উত্তর দিলো,

“তোমার বলার জন্য অপেক্ষা করতে পারবো না আমি,বিয়ে করেছি কি বউকে রেখে ঘুমানোর জন্য নাকি?”

রাগে শরীর কেঁপে উঠলো নিস্পার,ক্রোধিত স্বরে বিরোধিতা জানিয়ে বললো,

“বিয়ে করেছেন ব্যাস!এইটুকুই।আমি আপনার বউ হয়ে যাই নি।”

ত্রিজয় তপ্ত শ্বাস ফেলে উঠে দাড়ালো,অহর্নিশ কপালে বৃদ্ধাঙুল ঘষে বললো,

“তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে বিয়ে করে ঘরে বউ না বোন এনেছি আমি।তাবে যাই হোক,বোন হিসেবেই আজ থেকে আমার বেডরুমে থাকতে হবে তোর।”

নিস্পা অবাক হলো, তিরিক্ষি কন্ঠে বললো,

“আপনি এভাবে কেন কথা বলছেন?”

ত্রিজয় সোজাসাপ্টা জবাবে বললো,

“বোনের সাথে এভাবেই কথা বলে।”

“আমি কি বলেছি আমি আপনার বোন?”

“আমি কি বলেছি নাকি?আমি জাস্ট মনে করেছি।”

“আপনি কি জানেন আপনি অসহ্য?”

“আমি পুরুষ অসহ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক।তোমরা মেয়েরা এই অসহ্য জিনিসটাই বেশি চাও।”

“চাই মানে কি বলতে চাইছেন আপনি?”

ত্রিজয় বাঁকা হাসলো,একহাত বাড়িয়ে চেপে ধরলো নিস্পার কোমর,তারপর মোহিত কন্ঠে বললো,

“এসো হাতেকলমে বুঝিয়ে দেই,অসহ্যের সীমা অতিক্রম করে তোমার সহ্যক্ষমতা ডাউনলোড করবো।”

নিস্পা নাক ছিটকে, দূরে সরতে চাইলো,নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে বললো,

“ছিঃ,এতো অসভ্য কেন আপনি?”

ত্রিজয় ঢোক গিললো,সমুদ্রের মতো দুটো নীল চোখ সরাসরি নিক্ষেপ করলো নিস্পার চোখের গভীরে,তারপর ধিরে ধিরে এগিয়ে নিয়ে এলো নিজের মুখ।ঘাড়ের মসৃন ত্বকে উত্তপ্ত গাঢ় নিঃশ্বাসের উপস্থিতি টের পেতেই শক্ত হয়ে গেলো নিস্পা,শ্বাস প্রশ্বাস থমকে গেলো বুকের মধ্যখানে।ত্রিজয় ফিসফিসালো,দুস্টু কন্ঠে বললো,

“অসভ্য কোথায় হলাম?আমি বাচ্চা ডাউনলোডের কথা বলিনি মেয়ে,জাস্ট সহ্যক্ষমতা ডাউনলোড করার কথা বলেছি।সহ্যক্ষমতা ডাউনলোড হলে বাচ্চা এমনিতেই ডাউনলোড হয়ে যাবে।”

এক মূহুর্তের জন্য লোপ পাওয়া বোধশক্তি ফিরে পেলো নিস্পা,ত্রিজয়ের এমন লাগামহীন কথায় কান জ্বলে উঠলো ঝাঁ ঝাঁ করে,দাঁতে দাঁত পিষে কিড়মিড় করে বললো,

“আপনার মতো অসভ্য লোকের বাচ্চার মা হলে নিজেকেই নিজের ঘৃনা হবে আমার।”

ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে,কোমরটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে মধ্যকার ন্যানো সেন্টিমিটার দূরত্ব ঘুছিয়ে নিয়ে বললো,

“হাউ ফানি।অসভ্য না হয়ে বাচ্চা দিবে কে তোকে?”

নিস্পা শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইলো ত্রিজয়কে,নিজেকে ছাড়ানোর প্রচেষ্টায় তৎপর হয়ে ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“আপনার ওভার থিংকিং বন্ধ করুন। আর একটা ফালতু কথা শুনতে চাইছি না আমি।আমি এক্ষুনি এই ঘর,,,,

” সরি এই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবো।ছাড়ুন আমাকে।”

ত্রিজয়ের কপালে ভাজ পড়লো এবার,রাশভারি কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাবি মানে?”

তুরন্ত প্রত্যুত্তর করে নিস্পা,

“বেড়িয়ে যাবো মানে বেড়িয়ে যাবো,বাংলাতেই তো বলছি।”

“আমি তোকে যেতে দিচ্ছি না কোথাও।”

ত্রিজয় সাপ সাপ জানায় তার সীদ্ধান্ত,অথচ নিস্পা মানতে নারাজ,সে জেদ বজায় রেখে শক্ত কন্ঠে বললো,

“একটা ব্রিটিশের কথা শুনতে বধ্য নই আমি।”

ত্রিজয়ের চোয়াল শক্ত,চোখ গরম করে বললো,

“আমি তোর হাসবেন্ড।”

নিস্পা এবারেও নিজের সীদ্ধান্তে স্থির থেকে বললো,

“আমি কোন ব্রিটিশকে হাসবেন্ড মানি না।যেতে দিন আমাকে।”

“বারবার এক কথা কেন বলছিস?”

“কারণ আপনি বারবার আমাকে আটকে দিচ্ছেন।”

“আমি আটকাচ্ছি আমার বিয়ে করা বউকে,হাসবেন্ড হিসেবে রাইট আছে আমার।”

“কীসের হাসবেন্ড?আপনি ব্রিটিশ, আপনি জালিম।একজন ব্রিটিশকে হাসবেন্ড হিসেবে মানি না আমি।

ত্রিজয়ের রাগ এবার চরম পর্যায়ে, ধৈর্যের বাধ ভেঙে এক ধাক্কায় নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দিলো নিস্পাকে,তারপর পাশের টি টেবিল টায় স্বজোরে লাথি বসিয়ে চেচিয়ে উঠলো,

“গোলামের বেডি আল্লাহর ওয়াস্তে থাম এবার,আর বলিস না। নিজেকে সত্যি সত্যি ব্রিটিশই ফিল হচ্ছে এখন।”

ঠিক যেভাবে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়েছিলো নিস্পাকে, ঠিক সেভাবেই আবার গিয়ে মুচড়ে ধরলো নিস্পার হাত,তারপর এক ধাক্কা দিতেই টাল হারালো নিস্পা,আচমকা গিয়ে পড়লো ত্রিজয়ের বিছানার উপর,ত্রিজয় সেভাবেই এগিয়ে এলো,নিস্পাকে সুযোগ দিলো না উঠে আসার।নিস্পা কিছু বলবে তার আগেই আঙুল রাখলো নিস্পার ঠোঁটের উপর,তারপর বক্র কন্ঠে বললো,

“ইউ নো বাঙালি হয় দুধেভাতে।আমি তো কেবল ভাত খাই। বাকিটুকু খেতেও দিচ্ছিস না, বাঙালি হতেও দিচ্ছিস না।দোষ কার?”

জ্বলন্ত শীশা ঢেলে দেওয়ার মতো জ্বলে উঠলো নিস্পার কান,সে চোখ খিচে বন্ধ করে বললো,

“আস্তাগফিরুল্লাহ কি জঘন্য কথা।

ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বললো,

” নাউজুবিল্লাহ,কি ডার্টি মাইন্ড।আমি গরুর দুধের কথা বলেছি বইন।”

নিস্পা রাগে ধাক্কা দিলো ত্রিজয়ের বুকে,ত্রিজয় স্বইচ্ছায় সরে গিয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়,নিস্পা নিজেকে সামলে উঠতে উঠতে বললো,

“আপনার দুধ আপনিই খান।অসভ্য।”

ত্রিজয় শুয়ে থেকেই টেনে ধরলো নিস্পার হাত,বাধা পেয়ে নিস্পা পেছন ফিরে তাকাতেই বললো,

“পুরুষ তো এই একটা জিনিসের কাছেই হেরে যায় মেয়ে,তুমি দেখছি দূর্বলতা বুঝে আঘাত করো।”

নিস্পা প্রচন্ড আক্রোশে ঝাড়ি মেরে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত,তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,

“আপনাকে আঘাত করতে পারলে সোজা ধারালো অস্ত্র দিয়ে করবো।একদম কলিজায়,যেনো বেঁচে থাকার চান্স না থাকে।”

_________

তখন প্রায় মধ্যরাত।চারদিক নিঝুম, গা ছমছমে নীরবতা।আকাশটা কালো কফিনের মতো অন্ধকার, এই অন্ধকারের মাঝেই রোবটের মতো হেটে যাচ্ছে নিস্পা।চোখে মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই,নিস্পন্দন বিমূঢ় চিত্তে সে কেবল হাটছে।তার পায়ের গতি রোবটের মতোই একঘেয়ে, নিথর।মনে হচ্ছে শয়তানি শক্তির মন্ত্রে বাঁধা পড়েছে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।নয়তো বা কোন অদৃশ্য ভ্রম কব্জা করে নিয়েছে তার মস্তিষ্ক।

**
অপরদিকে পঁচানব্বই বছর বয়সী বৃদ্ধা বেগম মালেকা আজ হটাৎই অসুস্থ হয়ে পড়লো, মৃত্যু যন্ত্রণায় শ্বাস আটকে গেছিলো হটাৎ, কিন্তু ডক্টর কিয়ান তাকে মরে যেতে দিবে না,যে কোন মূল্যে বাঁচিয়ে রাখবে তাকে।একমাত্র তার রুপাঞ্জেলের হাতেই মৃত্যু নিশ্চিত করবে বেগম মালেকার।

এক বিকৃত নির্মম ভাবনা মস্তিষ্কে ধারণ করে বছরের পর বছর সেবা সুস্রশা করে বেগম মালেকাকে বাঁচিয়ে রেখেছে কিয়ান,যদিও সৃষ্টিকর্তা না চাইলে এটা কোনভাবেই সম্ভব হতো না।

কিন্তু আজ অবস্থা গুরুতর হওয়ায় কাছের একটা হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয় বেগম মালেকাকে।কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর ডক্টর কিয়ান জানতে পারে এক শ্বাসরুদ্ধকর গোপন তথ্য।তথ্য গুলো হাতে পেয়েই পৈশাচিক আনন্দে বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানলো কিয়ান,মালেকাকে হাসপাতালে ফেলে রেখেই রওনা করল তাকরিমের বাড়ির পথে।

______

গত কয়েক দিন যাবৎ ত্রিজয় হন্যে হয়ে খুঁজে যাচ্ছে নিস্পার দাদিকে।অপারেশনের পর নিস্পা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার পর থেকেই ত্রিজয় তার বিষন্নতা দূর করার জন্য নিস্পার দাদিকে খুঁজে বের করার সীদ্ধান্ত নিলো।টানা বিশ দিন রাতদিন এক করে খোঁজার পর অবশেষে পেয়ে গেলো নিস্পার দাদি ফুলমতিকে।

আর সে জন্যই মাঝরাতে নিস্পাকে রেখেই বেড়িয়ে যেতে হয়েছিলো তার।কিন্তু ফুলমতিকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফেরার পর নিস্পাকে খুঁজে না পেয়ে বজ্রপাত হলো ত্রিজয়ের মাথায়।মেয়েটাকে সারপ্রাইজ দিতে এসে নিজেই সারপ্রাইজ হয়ে যাবে ভাবতেই পারে নি।

মেয়েটা যে তখন বলেছিলো বাড়ি থেকে চলে যাবে,সত্যি সত্যিই চলে যায়নি তো?এমন নানাবিধ চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো ত্রিজয়ের। ফুলমতিকে বাসায় রেখে তৎক্ষনাৎ বেড়িয়ে পড়লো নিস্পাকে খোঁজার জন্য।

_________________

অন্ধকার পথ ধরে এই একইভাবে রোবটের মতো হাঁটছে নিস্পা।হটাৎ অন্ধকার বিদীর্ণ করে দৌড়ে এলো আয়মান।শ্বাসকষ্টে হাপরের মতো হাঁফাচ্ছে সে,জেল পলাতক আসামীর মতোই পালাচ্ছেলো মনে হলো ,নিস্পার যান্ত্রিক পায়ের ধ্বনি থামার আগেই, বজ্রাঘাতের মতো ধাক্কা খেলো দু’জন।ধাক্কার তীব্রতায় প্রতিক্রিয়া দেখালো নিস্পা,সৎবিৎ ফিরে পেয়ে অস্পষ্ট উচ্চারণ করলো,

“আহ!দেখে চলতে পারেন না?”

আয়মানের চোখ বিস্ফারিত,প্রায় ছয় ছয়টি মাস পর নিস্পাকে দেখতে পেয়েই ভেতর থেকে ধেয়ে বেড়িয়ে এলো রুদ্ধশ্বাস,

“নিস্পাপ!”

আয়মানকে কখনো চোখে দেখে নি নিস্পা,আর এতোগুলো মাসে লোকটাকে ভুলেই গিয়েছে প্রায়,নয়তো একসময় এই লোকটার গায়ের ঘ্রাণও এক লামহায় চিনে ফেলতো সে,অথচ আজ চোখের সামনে দেখেও চিনতে পারলো না,কপাল কুচকে জিজ্ঞেস করলো,

“আপনি চেনেন আমাকে?কে আপনি?”

নিস্পার এমন প্রশ্নে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেলো আয়মানের হৃদয়। যেন কেউ ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার সমস্ত অনুভূতিগুলো টুকরো টুকরো করে দিয়েছে,আয়মান শুখনো ঢোক গিললো, ভাঙাচোরা বুক পাজর আর, দুঃসহ যন্ত্রণার ভাঁজ থেকে উগড়ে এলো কিছু শব্দ ,

“আমি আয়মান নিস্পা।আমাকে ভুলে গিয়েছ?সেই যে কত যত্ন করে আমার হাতটা আগলে ধরে রাস্তা পার হতে সব ভুলে গিয়েছো?”

অতি পরিচিত নামটা বজ্রপাতের ন্যায় ছুটে এসে আঘাত করলো নিস্পার কর্নকূহর।অচেনা দুঃস্বপ্নের অরণ্যে হঠাৎ আলো খুঁজে পাওয়ার পর যেমন অনুভুত হয়, ঠিক তেমন লোমহর্ষ অনুভূতি ঠিকরে পড়লো নিস্পার কন্ঠে,বাকরুদ্ধ হয়ে আওড়াল,

“আয়মান!”

আয়মান এগিয়ে এসে দু হাতে আঁকড়ে ধরলো নিস্পার হাত,তারপর আকুল কন্ঠে বললো,

“হ্যাঁ আমি,আমি আয়মান।”

বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো নিস্পার। চোখ ভিজে উঠলো কিঞ্চিৎ। হাপরের মতো হাঁপাতে থাকা ফুসফুসটা স্থির হলো, বিভ্রান্তি আর নিঃসঙ্গতার ভারে পিষ্ট মেয়েটা জানতে চাইলো,

“কোথায় ছিলেন এতোদিন?কত খুঁজেছি জানেন?”

আয়মানের কন্ঠে উত্তেজনা, সে নিস্পার হাতদুটো আরেকটু শক্ত করে ধরে বললো,

“ওই এমপি হাজারটা মিথ্যা মামলা আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে জেলে আটকে রেখেছিলো নিস্পা।”

নিস্পার বিশ্বাস হলো না,এমপি মানে আইরিশ ভাই,মানুষ টা এমন কিছু করতে পারে একদমই বিশ্বাস হচ্ছে না তার।সে বিহ্বলিত কন্ঠে অস্পষ্ট আওড়াল,

“এমপি?”

“হ্যাঁ নিস্পা।ওই লোকটা আমাকে দিনের পর দিন জেলে আটকে রেখে টর্চার করেছে।কি করেনি বলো,দেখো আমার শরীরের চামড়া পর্যন্ত একটু একটু করে ঝলসে দিয়েছে।”

আয়মান নিজের শার্টটা টেনে ছিড়ে উন্মুক্ত করলো নিজের শরীর।ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলোয় স্পষ্ট হয়ে উঠা আয়মানের শরীরের বিভৎস ক্ষত গুলো জ্বলজ্বল করে উঠলো, এমন দৃশ্য দেখে শিউরে উঠলো নিস্পা, ছলকে উঠলো তার নাজুক সত্ত্বা,সে তার কাঁপা হাতটা এগিয়ে নিয়ে দু আঙুল ছুইয়ে ফের গুটিয়ে নিলো,অস্ফুটে বললো,

“আপনি সত্যি বলছেন?”

আয়মান দগ্ধ স্বরে জবাব দিলো,

“আমার শরীরের আঘাতের চিহ্ন গুলো কি মিথ্যা মনে হচ্ছে নিস্পা?”

অথচ নিস্পার কেন জানি বিশ্বাস হলো না,ভেতর থেকে একটা অগাধ ভরসা বেড়িয়ে এলো তাকরিমের প্রতি,ভেতরে বসবাস করা ফ্লোরেন্সার নাজুক সত্ত্বা টা বিরোধিতা করে নিস্পাকে দিয়ে বলালো,

” ওই মানুষটা এতো জঘন্য কাজ করার মতো মানুষ নয় আয়মান।”

আয়মানের কন্ঠ শক্ত,নিস্পার কথার পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে বললো,

“তোমার হাত ধরে রাস্তা পার করে দেওয়ার অপরাধে আমাকে এভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে এটা কি জঘন্য কাজ মনে হয় না তোমার?”

কথাটা বলতে বলতে কিছু একটা খেয়াল করে থামলো আয়মান।তারপর ধিরে ধিরে নিজের হাতটা তুলে ছুইয়ে দিলো নিস্পার চোখের পাতায়,বিস্মিত কন্ঠে শুধালো,

“তুমি চোখে দেখতে পাচ্ছো নিস্পা!”

নিস্পা মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিলো,

“হ্যাঁ এক একমাস আগে চোখের অপারেশন হলো।”

খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠলো আয়মান,নিস্পার দুই গালে হাত রেখে উৎকন্ঠিত স্বরে বললো,

“আমার বিশ্বাস হচ্ছে না নিস্পা,তুমি সত্যি চোখে দেখতে পাচ্ছো?আমার যে কি খুশি লাগছে।অবশেষে তোমাকে পাওয়ার মাঝে আর কোন দেয়াল রইলো না,এখন নির্দিধায় তোমাকে বিয়ে করতে পারবো আমি,যদিও তখন বিয়ে করতে কোন অসুবিধা ছিলো না আমার,তুমিই বারন করে শত সহস্র বার ফিরিয়ে দিয়েছিলে আমাকে।”

নিস্পা কুন্ঠিত হলো,চোখ ছোট ছোট করে অপকটে জিজ্ঞেস করলো,

“ঠিক বুঝতে পারলাম না।”

ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো আয়মান,নিরুদ্বিঘ্ন, নির্বিকার কন্ঠে বললো,

“তুমি নিজেই তো বলেছিলে তোমার অন্ধত্বের কারণে তুমি আমার জীবনে জড়াতে চাও না।কিন্তু এখন তো তুমি দেখতে পাচ্ছো,তোমার চোখের দৃষ্টি ফিরে পেয়েছ।তাহলে আর কীসের সমস্যা?আমাদের মধ্যে আর কিসের ডিস্টেন্স।আমরা তো এখন এক হতে পারি বলো?”

নিরুদ্বিগ্ন কপালে অস্বস্থির ছাপ পড়ল নিস্পার,কঠিন গলায় বললো,

“এসব বলার সময় নয় এখন।”

আয়মান আবারও দু হাতে আগলে ধরলো নিস্পার দু হাত,তারপর আকুল কন্ঠে বললো,

“তোমাকে পাবার বেলায় আমার কাছে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।”

একটু ফুসরত নিয়ে থেমে থেমে বললো,

“বলো নিস্পা,তুমি আমার।একবার বলো।”

নিস্পা উত্তর দিলো না,অভিব্যক্তি পাথরের মতো শক্ত তার,সে ধীরে সুস্থে আস্তে আস্তে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো,শান্ত নির্লিপ্ত কন্ঠে বললো,

“আমার যেতে হবে, যেতে দিন আমায়।”

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো নিস্পা,আয়মানকে রেখে চলে যেতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে হাতের কব্জা টেনে ধরলো আয়মান, রাশভারি কন্ঠে বললো,

“কোথায় যাচ্ছো তুমি?এটা তো তোমার বাড়ির রাস্তা নয়,আর রাত তো অনেক হয়েছে এই রোডে কি করছো তুমি?

নিস্পা প্রত্যুত্তর করলো না।চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো কেবল।কি উত্তর দিবে সে?সত্যিই তো এতো রাতে কেন এসেছে সে এখানে,ওর তো ঘুমিয়ে থাকার কথা,তাহলে?তাহলে কেন এতো দূর চলে এলো সে।নিজের ভেতর পুনরায় দ্বন্দ্ব শুরু হলো নিস্পার,যার কোন সুরাহ খুজে পেলো না এই মূহুর্তে।

বিপরীত পক্ষ থেকে নিরবতা ব্যাতিত কোন উত্তর না পাওয়ায় ফুসে উঠলো আয়মান,কন্ঠ একটু চওড়া করে বললো,

“নিস্পা কিছু জিজ্ঞেস কিরছি আমি।”

নিস্পা চোখ তুলে চাইলো,দৃষ্টিজুড়ে থমথম করছে আষাঢ়ের আধার।এক ঝাক ফেরারি পাখির দল অস্থির হয়ে ডানা ঝপটাচ্ছে তার বুকের ভেতর।বিষাধে রাঙা কন্ঠে বললো,

“আমি কোথায় যাচ্ছিলাম আমি নিজেও জানিনা।”

আয়মান কপাল কুচকালো, বিক্ষুদ্ধ কন্ঠে বললো,

“মানে?তোমার কি মাথা খারাপ নিস্পা?চলো বাড়িতে পৌছে দেবো তোমাকে।”

আয়মানেত অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি বুঝতে পেরেই রেগে উঠলো নিস্পা,উল্কা কন্ঠে বললো,

“আপনি কি অধিকার দেখাচ্ছেন আয়মান?আমি কিন্তু আপনাকে কোন আশা দেই নি যে তার প্রেক্ষিতে আপনি আমার উপর অধিকার দেখাবেন।”

নিস্পার কঠোর কন্ঠে উগড়ে দেওয়া বানী থমকে দিলো আয়মানকে,নিরব দৃষ্টিতে মেয়েটাকে পর্যবেক্ষন করতে গিয়ে আবিষ্কার করলো নিস্পার নির্লিপ্ত চোখ,যেখানে তার প্রতি বিন্দু মাত্র অনুভব নেই এই মূহুর্তে।আয়মান হতাশার শ্বাস ফেললো, তাচ্ছিল্য স্বরে বললো,

“আধিকার দেখাচ্ছি না নিস্পা,তোমার ভালো চাইছি আমি।আর তোমার জন্যই জেল থেকে পালিয়েছি আমি,তোমাকে দেখার তৃষ্ণা জেলে বন্দী শেকলের ঘায়ের চেয়েও যন্ত্রণার,বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো আমার।”

নিস্পা একটু ইতস্তত বোধ করলো, প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে তাকালো আয়মানের দিকে,মানুষ টার শরীর ঝজড়া হয়ে আছে আঘাতের চিহ্নে,দু হাতের বাহুতে ব্লেড চালানোর অসংখ্য দাগের দিকে তাকালেই ছলকে উঠছে নিস্পা,অথচ এই লোকটা কি সুন্দর বলে দিলো তাকে না দেখতে পাওয়ার যন্ত্রণার কাছে এই ভয়ংকর যন্ত্রণা গুলো ফিকে,এটা কি সম্ভব? সত্যিই কি সে এতো বেশি মূল্যবান?

ভাবনার মাঝেই সাই সাই করে ছুটে এলো একটা একটা কালো রঙের মার্সিডিজ।গাড়িটা তীব্র স্প্রিডে ছুটে এসে থামলো আয়মানের নাক বরাবর।আর কিছু সেকেন্ড হেরফের হলেই আয়মান চাপা পড়ে পিষে যেতো প্রায়।

হটাৎ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় শিউরে উঠলো নিস্পা,শ্বাস আটকে শক্ত হয়ে গিয়েছে আয়মান।কয়েক সেকেন্ড নিরবতার মধ্যেই দরজা খুলে বেড়িয়ে এলো তাকরিম। তার উপস্থিতি অন্ধকারকে করে তুললো আরও ভয়ার্ত।নিস্পা তড়িৎ চোখ খুলে তাকালো তাকরিমের দিকে, তাকরিমের শক্ত রক্তিম চোখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে আওড়াল,

“আইরিশ ভাই।”

এদিকে আয়মানের বুকের ভেতর জমে উঠা মৃত্যুভয় মুহূর্তেই রূপ নিলো অগ্নিগর্ভ ক্রোধে।এক মূহুর্ত দেরি না করে সে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তীব্র ক্ষোভে দু’হাতে তাকরিমের শার্টের কলার চেপে ধরলো আয়মান,তাকরিম রুদ্ধশ্বাসে ফুসে উঠলো আরও কয়েক গুন,শ্বাসরোধ করা শক্তিতে আয়মানকে টেনে নিলো নিজের নিটোল বুকের কাছে, আগুনে জ্বলতে থাকা চোখে তাকিয়ে অগ্নি কন্ঠে বললো,

“কুত্তার বাচ্চা পালিয়ে যাবি কোথায়?কি ভেবেছিস জেল থেকে পালিয়ে বেঁচে গিয়েছিস?শালা কুত্তা,এই তাকরিমের হাত থেকে পালিয়ে মাটির নিচে গিয়েও বাঁচতে পারবি না।”

দম বন্ধ করা ক্রোধে আরেকটু শক্ত করে তাকরিমের কলার চেপে ধরলো আয়মান,ক্রোধিত কন্ঠে হিসহিসিয়ে বললো,

“ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছিস? সাহস থাকলে সেই সাধারণ আইরিশ হয়ে সামনে আয়, বুক চিতিয়ে লড়াই কর।”

তাকরিম ক্ষুব্ধ হয়ে পরপর চার পাঁচটা ঘুষি বসিয়ে দিলো আয়মানের নাকে মুখে।আক্রমনাত্মক কন্ঠে বললো,

“তোর সামনে তাকরিম দাঁড়িয়ে আছে এজন্যই জিন্দা আছিস,যদি আইরিশ থাকতো চিন্তাভাবনা ছাড়াই জবাই করে দিতো।”

আয়মান থুতু দিয়ে রক্তের দলা ফেললো মুখ থেকে তার পরপরই স্ব জোরে তাকরিমকে একটা ঘুষি দিয়ে বললো,

“কু*ত্তার বাচ্চা তোকে আজ আমি জবাই করে ফেলবো।”

তাকরিম কুটিল হাসলো, মুখে ভয়ংকর অভিব্যক্তি ফুটিয়ে বললো,

“”জবাই? ওটা তো এক মুহূর্তের খেলা। আমি তোর এমন হাল করবো যেন তোর প্রতিটি শ্বাসে ভয় ঢুকে, প্রতিটি রক্তবিন্দুতে আগুন জ্বলে আমার নাম শুনলেই।”

একটু থেমে তাকালো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিস্পার ভিতু নয়নের দিকে,তারপর শক্ত হাতে আরেকটি পাঞ্চ মেরে বললো,

“আমার হাতে মরার মানে শুধু মৃত্যু নয় যন্ত্রণার উৎসব।”

এবারকার আঘাতে ছিটকে দূরে সরে পড়লো আয়মান,তাকরিম সেদিকে ধ্যান না দিয়ে এলোমেলো পায়ে গিয়ে দাড়ালো নিস্পার সামনে,বিধ্বস্ত কন্ঠে বললো,

“তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন আলো?কি হয়েছে তোমার?এতো রাতে এখানে কেন এলে তুমি?”

নিস্পা পূর্ণ দৃষ্টি মেলে তাকালো তাকরিমের দিকে,তাকরিমের ফর্সা ত্বকে রক্ত জমে লালাভ বর্ণ ধারণ করেছে,অথচ চোখ দুটো ঝর্ণার ন্যায় শীতল শান্ত, কোন রুক্ষতা নেই, আছে কেবল নিস্পাকে নিবেদন করা এক বুক ভালোবাসা।

নিস্পা বেশিক্ষণ তাকালো না সে চোখে,দৃষ্টি নমিত করে ভঙ্গুর কন্ঠে বললো,

“আপনারা মারামারি বন্ধ করুন।আমার ভয় হচ্ছে।”

নিস্পার কোমল কন্ঠস্বর টা মূহুর্তেই ভেঙেচুড়ে মুষড়ে দিলো তাকরিমের অতিশয় শক্ত অভিব্যক্তি।মেয়েটাকে সামলে নেওয়ার জন্য মড়িয়া হয়ে উঠলো মস্তিষ্ক,দু হাত নিস্পার দু গালে রেখে আদুরে কন্ঠে বললো,

“ডোন্ট ওয়ারি মাই হার্ট।একদম ভয় পেয়ো না।আই লাভ ইউ হার্ট, তোমাকে জয় করার জন্য এমন ছোট খাটো হাজারটা যুদ্ধে অঅংশ নিতে হবে আমার।ভয় পেলে চলবে বলো?”

কথা বলার মাঝখানেই ধ্যান জ্ঞান খুইয়ে বসলো তাকরিম,সেই সুযোগে একটা মোটা বাশের খন্ড কুড়িয়ে নিয়ে তেড়ে এলো আয়মান,ক্রোধান্ধ হয়ে কাঁপতে কাঁপতে জোরালো আঘাত বসিয়ে দিলো তাকরিমের মাথার পেছনে,অগ্নি কন্ঠে হিসহিসিয়ে বললো,

“খেলা, ভোগ, ধ্বংস এই তিনটাকেই তোর গলার শেকল বানাবো আমি।তোর চোখের সামনে দিয়ে উদযাপন করবো ফ্লোরাকে জয় করার উৎসব।”

পরপরই আরেকটা আঘাত করার জন্য হাত উঠাবে তন্মধ্যেই ভেসে এলো নিস্পার আতংকিত কন্ঠস্বর,

“থামুন!বন্ধ করুন।কেই এমন রক্ত খেলায় মেতে উঠেছেন আপনারা?”

জোড়ালো আঘাতে মাথার পেছনে বেশ অনেকটা জায়গা ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে ঘার বেয়ে, সেই রক্তে রাঙা হয়েছে সাদা রঙের পাঞ্জাবিটা।নিস্পা তড়িঘড়ি এগিয়ে গেলো তাকরিম কে সাহায্য করতে,কিন্তু হতে দিলো না আয়মান বাশের খন্ড টা ছেড়ে ফেলে দিয়ে টেনে ধরলো নিস্পার হাতের কব্জা।নিস্পা বাধা পেয়েই আহত দৃষ্টিতে ঘুরে তাকালো,শক্ত কন্ঠে বললো,

“কি করছেন কি? ছাড়ুন আমাকে।”

ভেতর ভেতর ছটপট করতে থাকা পৈশাচিক সত্ত্বাটা বেড়িয়ে এলো আয়মানের,ফলস্বরূপ হায়নার থাবার ন্যায় চেপে ধরলো নিস্পার গ্রিবাদেশ,দাঁতে দাঁত পিষে প্রবল আক্রোশে আওড়াল,

“আমি তোমায় ভালোবাসি নিস্পা।আই লাভ ভেরি মাচ।আমাকে ভালোবাসার আগুনে পুড়িয়ে তুমি অন্যকারো কষ্টে উতলা কেন হচ্ছো?আমার কষ্ট চোখে পড়ছে না?”

আয়মানের চোখে রক্তলাল অশ্রুর ঝাপসা আস্তরন,সে উন্মাদের মতো বুকের বা পাশটায় পরপর কয়েকটা থাপ্পড় দিতে দিতে বললো,

“এই যে এই খানটা যে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে তোর বিরহে, যন্ত্রণায় পুড়ে যাচ্ছে ভেতরটা সেই যন্ত্রণা দেখতে পাচ্ছিস না?আমার বেলায় কেন বারবার অন্ধ হয়ে যাস?

আয়মানের মখ থেকে নিসৃত ধারালো বাক্যবাণ নিস্পাকে ঠিক কতটা বাজেয়াপ্ত করতে পেরেছে বোঝা গেলো না,তবে নিস্পার কঠোর চোখের কোটরে অশ্রু জমাতে সক্ষম হয়েছে ঠিকই।

এদিকে ধৈর্য সীমার বাধ ভাঙলো তাকরিমের,প্রচন্ড আক্রোশে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো মস্তিষ্কে। আয়মানের ছুড়ে ফেলা বাশের খন্ড টা এবার সে তুলে নিলো নিজের হাতে,ভেতরের পাশবিক ভয়ংকর দানবটাকে প্রশ্রয় দিয়ে ছুটে এলো আয়মানের দিকে,তারপর সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করলো আয়মানের দু পায়ে।চিৎকার করে বললো,

” শালা মা*দারচো*দ। আমি হাত চালালে মৃত্যু কেঁপে ওঠে,তুই তো মানুষমাত্র।”

আঘাতের তোপে টাল হারালো আগমান,পায়ের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলো পাকা রাস্তায়,তাকরিম টালমাটাল পায়ে এগিয়ে এসে দাড়ালো আয়মানের সামনে তারপর আয়মানের ঝলসে থাকা উন্মুক্ত বুকে পা রেখে বক্র কন্ঠে বললো,

“নিজের অবস্থান টা একবার ভাবা উচিত ছিলো, এমপি তাওসিফ তাকরিমের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা একদমই উচিত হয় নি তোর।”

তাকরিমের কথা শেষ না হতেই শুন্য থেকে ভেসে এলো ব্যাঙ্গার্থ কন্ঠস্বর,

“আসছে আমার বালের এমপি।”

অতি তাচ্ছিল্যজনক অপমান মিশ্রিত বাক্যটি ধেয়ে আসতেই রাগে ক্ষোভে দপদপ করে উঠলো তাকরিমের কপালের রগ,শিরা উপশিরায় প্রবাহিত হলো ক্রোধের বিষ। হাতে চেপে রাখা বাশের খন্ডটা সামনের দিকে ছুড়ে দিয়ে বিস্ফোরিত কন্ঠে চেচালো,

“হোয়াট দ্যা হেল।কে বললো? কে কথা বললো সামনে আয়।”

ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোকে ডিঙিয়ে উঠে এলো একটা লম্বা হাত,ঠান্ডা পা ফেলে ধিরে ধিরে তাকরিমের দিকে এগিয়ে এলো ত্রিজয়,রাশভারি কন্ঠে বললো,

“আমি এমপি মশাই।আপনার না হওয়া সতিন।”

ত্রিজয়কে দেখতেই তাকরিমের উজ্জ্বল চোয়ালে স্পষ্ট হলো হিংস্রতার রেখা,উদ্ভান্ডের মতো ছুটে গেলো ত্রিজয়ের কাছে,ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সহসা ত্রিজয়ের মসৃন কলারটা মুস্টিবদ্ধ করলো তাকরিম,দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে আওড়াল,

“জানোয়ারের বাচ্চা ওকে বউ বলিস অথচ দেখে রাখিস না কেন?এতো রাতে ও বাইরে এলো কি করে?কমন সেন্স নেই তোর?”

তাকরিমের রক্তাভ চোখের গভীরে চোখ রেখে ত্রিজয় ঠোঁট বাঁকিয়ে ছুঁড়ে দিলো শ্লেষমাখা হাসি। তার মস্তিষ্ক তখন শীতল হ্রদের মতো নিস্তরঙ্গ।উচ্চতায় দুজন সমান সমান, সুস্বাস্থ্যে কারও পক্ষে কাউকে হার মানানো সহজ নয়। তবু ত্রিজয়ের ফিটনেসে দৃঢ়তায় ভরা নজরকাড়া সৌষ্ঠব।অথচ তাকরিমের প্রশস্ত সুডৌল বুক নিঃশব্দে গোপন হয়ে আছে সাদা পাঞ্জাবির ভাঁজের আড়ালে।

এক অতিসাধারণ মেয়ের জন্য দুজনেই জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ডের ন্যায় মুখোমুখি দাঁড়ানো,দেখেই বোঝা যাচ্ছে কেউ কাউকে এক চুল পরিমাণ ছাড় দিতে নারাজ তারা,আর ত্রিজয় তো সে সুযোগ দিতে একদমই অপ্রস্তুত,তাকরিমকে কথার মারপ্যাঁচে পীড়া দেওয়াই যেন তার একমাত্র লক্ষ্য,

” আমার কি দোষ এমপি মশাই,রাতের বেলা বউয়ের সাথে একটু সাপ লুডু খেলবো ভেবেছিলাম, গোলামের বেডির সহ্যই হলো না।”

রস্য গলায় অতি সংবেদনশীল বাক্য উচ্চারণ করতেই মুড়ষে উঠলো তাকরিমের বক্ষপট,অন্তরের তাড়নায় ছটফটিয়ে উঠলো ভেতরের হায়না,নিজেকে সামলাতে না পেরে জোড়ালো মুষ্ঠাঘাত ছুড়ে দিলো ত্রিজয়ের মুখে,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“মুখে লাগাম টান বেয়াদব।ঠোঁট সেলাই করে দেবো।”

ঠোঁট কেঁটে কিঞ্চিৎ রক্ত বেড়োলো ত্রিজয়ের,অথচ খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখালো না,অভিব্যক্তি বরাবরের মতো ঠান্ডা রেখে বৃদ্ধাঙুল দিয়ে মুছলো ঠোঁটের উপরের রক্ত,তারপর বিদ্রুপ কন্ঠে বললো,,

“বাহ!দর্জির কাজ শিখেছেন নাকি?ভালোই হলো, আমার ভবিষ্যৎ বেবিদের পোশাক আপনাকে দিয়েই সেলাই করাবো।”

কথাটা বলতে বলতে গ্রিবা বাঁকালো ত্রিজয়,নিস্পার বিধ্বস্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে বক্র হেসে বললো,

“ঠিক বলেছিনা বাবুর আম্মু?”

বিরক্তি আর বিষাধে মুখ তেঁতো হয়ে উঠলো নিস্পার,কপালে ভাজ ফেলে আওড়াল,

“ওয়াক থু।”

পরিস্থিতি টা আরেকটু উত্তেজনা পূর্ণ করতে চট করেই ভেসে এলো ডক্টর কিয়ানের কন্ঠস্বর,

“বেবির আশা বাদ দিন মিস্টার ত্রিজয়।ডক্টর কিয়ান বেঁচে থাকতে আপনার ভ্রুন সারভাইব করার সুযোগ পাবে না।”

এমন একটা দূর্ধর্ষকর পরিস্থিতিতে ডক্টর কিয়ানের আগমন নিস্পার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ শিউরে তুললো,এক ভয়াবহ ঝড়ের আগাম সংকেত পেতেই কেঁপে উঠলো বুকগহ্বর।অতর্কিত ভয়ে নীল হয়ে গেলো নিস্পার মুখ।

এদিকে ঠোঁটে ঠোঁট টিপে তপ্ত শ্বাস ফেললো ত্রিজয়,বৃদ্ধাঙুল টা থুতনি তে ঘষে চাপা স্বরে আওড়াল,

“চলে এসেছে,আরেক আহাম্মক। এটারই কমতি ছিলো।”

বাক্য শেষ হওয়ার আগেই তাকরিম ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দিলো তার কলার,হিংস্র বাঘের ন্যায় তেড়ে গিয়ে লাথি বসালো ডক্টর কিয়ানের পেট বরাবর,হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,

“শালা জানোয়ার তুই এখানে কি করছিস?”

প্রবল আঘাত পেয়েও নিজেকে সামলে নিলো কিয়ান,বৃথা হাসার চেষ্টা করে বললো,

“আহ!রাগবেন না মন্ত্রী মশাই।আপনার কাছেই এসেছিলাম আমি।”

বাঁকা চোখে নিস্পার ভীতু ফ্যাকাশে চেহারায় নজর বুলিয়ে থেমে থেমে আওড়াল,

“কিন্তু এসে যে রুপাঞ্জেলকে দেখতে পাবো কল্পনাই করি নি।”

“আমার আলোকে এসব ফালতু নামে ডাকা বন্ধ কর।ধৈর্যের পরিক্ষা নিস না।সব ধ্বংস করে দেবো আমি।”

“আরেহ রাখুন তো আপনার ধ্বংস লীলা। আগে আমার কথা তো শুনুন।”

“কারো কথা শোনার প্রয়োজন নেই আমার।”

তাকরিম আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না,এখানে আর বেশিক্ষণ থাকলে তান্ডব হয়ে যাবে ভেবেই তাকালো নিস্পার শীর্নকায় মুখের দিকে,ভয়ে চুপসে যাওয়া মেয়েটাকে আর ভয় পেতে না দেওয়ার প্রতিজ্ঞায় এখান থেকে প্রস্থানের কথা ভাবলো।

তৎক্ষনাৎ এগিয়ে গিয়ে মুঠোবন্দি করলো নিস্পার কোমল হাত,মোলায়েম কন্ঠে বললো,

“আলো চল,আমি জানি তুমি আমার কাছেই এসেছ,তোমার হৃদয় ভুল করে হলেও আমাকেই চায়,আমার ভালোবাসা উপেক্ষা করার ক্ষমতা তোমার নাজুক হৃদয়ের নেই,কোন কালে হবেও না।”

নিস্পা কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না,ভয়ে বোধশক্তি নিস্ক্রিয় লাগছে তার,ডক্টর কিয়ানের মুখের দিকে তাকালেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে কিছুদিন আগের সেই বিভৎস দৃশ্য।যদিও সবার কাছে সেটা পঞ্চাশ বছর আগে ফেলে আসা অতীত কিন্তু নিস্পার কাছে তো এই ঘটনা এখনো জীবন্ত, দগদগে ক্ষতের মতো জীবন্ত।

ভাবনার মাঝেই বা হাতে টান পড়লো নিস্পার,ভ্রম কাটিয়ে পাশ ফিরতেই আঁতকে উঠল ভয়ে,ডক্টর কিয়ান শক্ত করে ধরে রেখেছে নিস্পার আরেক হাত।

তাকরিম সেদিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই বাঁকা হাসলো কিয়ান,ঠান্ডা কন্ঠে বললো,

“ব্র‍্যাক ইউনিভার্সিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে মাত্রই ভ্রমণ করে এলাম এমপি মশাই।”

কিয়ানের কথা শুনে ধ্বক করে উঠলো তাকরিমের বুক,ব্র‍্যাক ইউনিভার্সিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে তার সমস্ত দু নাম্বারি কালো ব্যাবসা রমরমা চলে,এই সংবাদ যদি একবার লিক হয় তাহলে তার পুরো ক্যারিয়ার এক মূহুর্তে ধ্বংস হয়ে যাবে।ডক্টর কিয়ান যে সেই হুমকিই দিয়েছে সে ব্যাপারে নিশ্চিত তাকরিম।অথচ তবুও নিস্পার হাতটা এক ইঞ্চিও আলগা করলো না সে,নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তা বাদ দিয়ে বরং আরও জোড়ালো ভাবে চেপে ধরলো নিস্পার হাত,রুদ্ধশ্বাসে বললো,

“আলেকজান্দ্রার ঊর্ধ্বে আমার দ্বিতীয় কোন দূর্বলতা নেই ডক্টর।আমি ওর হাত নিজের ধ্বংসের বিনিময়ে ছাড়বো না।প্রয়োজনে মৃত্যু কবুল।”

ডক্টর কিয়ানও ছাড়লো না নিস্পার হাত,নিস্পার প্রতি তার অঘাদ ভালোবাসার প্রমাণ দিতে বললো,

“আমিও যে এই হাত ছাড়তে নারাজ এমপি মশাই।যে কাউকে ধ্বংস করে হলেও রুপাঞ্জেলকে আমার হতেই হবে।”

এতোক্ষণে সবার কথোপকথনে আয়মান সবটা বুঝতে পেরে গিয়েছে,নিস্পাকে পাওয়ার প্রতিযোগিতায় সে একা নয়,আরো তিনজন প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়েছে তার মুখোমুখি,তাই শক্তি দিয়ে নয়,নিজেকে নত করে না হয় মিনতি করে চেয়ে নিবে নিস্পাকে,আয়মান এগিয়ে এলো, দু হাত রাখলো নিস্পার পায়ে,চিবুক নামিয়ে নিরেট কন্ঠে বললো,

“আমি তোমাকে ভালোবাসি নিস্পা।আমি তোর জীবনের প্রথম পুরুষ,তোকে না পেলে মরে যাবো আমি, কোন এক ভালোকাজের উপহার স্বরুপ তুই আমার হয়ে যা।”

ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে তাকালো সবার দিকে,এমন হৃদয়বিদারক মূহুর্তে সে হাসবে না কাঁদবে কিছুই বুঝতে পারলো না,তবে নিজের জায়গায় স্থির থাকতে পারলো না এক মূহুর্ত,এগিয়ে গিয়ে অকস্মাৎ দু হাতে জড়িয়ে ধরলো নিস্পাকে।

সহ্যের মাত্রা অতিক্রম করে দাঁতে দাঁত পিষলো নিস্পা,দু হাত দুজন ধরে থাকার দরুন নাড়ানোর সুযোগ নেই,পা দিয়ে যে লাথি মারবে সেই পথ ও বন্ধ,চার জনের জাতাকলে পিষে অসহায় মেয়েটা হাঁপিয়ে উঠেছে,হাত পা ধরা মানতে পারলেও ত্রিজয়ের অতিরিক্ত বাড়াবাড়িতে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষেপেছে মেয়েটা,সহ্য করতে না পেরে তিক্ত বিরক্ত কন্ঠে বললো,

“আহ!কি করছেন টা কি?মাঝরাস্তায় নোংরামি কেন করছেন?”

ত্রিজয় মুখ তুলে তাকালো নিস্পার কুচকানো চেহারার দিকে, তারপর ভনিতা না কিরে বললো,

“এটা নোংরামি না গোলামের বেডি, এটাকে বলে অধিকার আদায়ের লড়াই।”

“মানে?”

“একজন ধরলো ডান হাত,একজন ধরলো বা হাত,একজন ধরলো পা।আমার ধরার মতো আর কি আছে? তাই আমি পুরো শরীর টাই জড়িয়েই ধরলাম।অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে পিছিয়ে থাকা যাবে না।”

এদিকে ত্রিজয়ের এরুপ কাজে রাগে ফুসে উঠলো কিয়ান,নিস্পাকে ছেড়ে দিয়ে টেনে ধরলো ত্রিজয়ের কলার,ক্রোধে ফেটে বলল,

“আমার রুপাঞ্জেল কে ছাড় শুয়রের বাচ্চা।”

তাকরিম স্থির দাঁড়িয়ে নেই,সে পেছন থেকে টেনে ধরলো ত্রিজয়ের চুল,বাকরুদ্ধ স্বরে বললো,

“আমার আলেকজান্দ্রাকে ছাড় হাত কেটে আলাদা করে দিবো।”

আয়মান এক টান বসালো ত্রিজয়ের বাহুতে,চেচিয়ে বললো,

“নিস্পাকে ছাড়,জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবো তোকে।”

ত্রিজয় তোয়াক্কা করলো না এসব হুমকি ধামকিতে,নিস্পাকে ছেড়ে দিয়ে ঘুরে তাকালো তাদের দিকে, তারপর খোসমেজাজি কন্ঠে বললো,

“এতো হাইপার কেন হচ্ছেন আপনারা?আমি তো সমান ভাগেই ভাগ করে দিলাম।দুজনে দুটো হাত,আর তুই শালা রামচন্দ্র দুটো পা কেটে নিয়ে যা,আমি শরীর টা রেখে দেই।হিসেব বরাবর।”

ত্রিজয়ের ভাবলেশহীন বাক্যালাপে তিরতির করে নাকের পাটা ফুলে ফেপে উঠলো নিস্পার,নিজেকে কোনরকম সংবরণ করে উল্কা কন্ঠে বললো,

“মশকরা করছেন আপনি?এই পরিস্থিতিতে আপনার মজা করতে ইচ্ছে করছে?”

ত্রিজয় দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে তরাগ করে খুলল,ক্রোধান্ধ স্বরে বললো,

“পরিস্থিতি কেমন সেটাই তো বুঝতে পারছি না বইন,এতোদিন দুটো ছিলো মানলাম,এখন আরেকটা কোত্থেকে টপকালো?মানে তোর মধ্যে আছে টা কি?”

“আপনিও তো হাত ধুয়ে পড়ে আছেন,আমার মাঝে কি আছে আপনি জানেন না?”

“ছুইতেও দিলিনা,খাইতেও দিলি না, লবন দেখতেও দিলি না,কীভাবে বুঝবো তোর মাঝে কি আছে।”

“ফালতু কথা বলে মাথা কেন নষ্ট করছেন আমার?আমার মাঝে কি পেয়ে এরা পাগল হয়েছে এদেরকেই জিজ্ঞেস করুন।”

“আমার বউয়ের মাঝে কি আছে সেটা পরপুরুষের কাছে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই,একবার টেস্ট করার সুযোগ দিলে আমিই বলে দিতে পারবো তোর কোথায় কি আছে?”

“উফফ থামবেন?”

ক্ষুব্ধ মস্তিষ্কটা আর সংবরণ করতে পারলো না তাকরিম,পকেট থেকে রিভলবার টা বের করে তাক করলো ত্রিজয়ের দিকে,তরল কন্ঠে বললো,

“ওর কাছ থেকে দূরে সর,আমি কিন্তু সবগুলো কে শুট করে দেবো।”

ত্রিজয় ভ্রুক্ষেপ দেখালো না,বরং প্রতিরোধী সুরে বললো,

“আমি আমার বউকে নিতে এসেছি।ওকে নিয়ে তবেই যাবো। ”

তাকরিম ঠান্ডা মাথায় রিভলবারের ট্রিগার সেট করে বললো,

“আলেকজান্দ্রা আমার, ও আমার সাথে যাবে।”

ডক্টর কিয়ান সরাসরি এসে দাড়ালো তাকরিমের হাতে ধরে রাখা বন্দুকের নলের সামনে,বিদ্রুপ কন্ঠে বললো,

“আমি আমার রুপাঞ্জেলকে না নিয়ে এক পাও নাড়বো না।”

এদিকে সুযোগ লুপে নিলো আয়মান,তাকরিমের হাতের রিভলভারটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে সোজা চেপে ধরলো নিস্পার মাথায়,ক্রোধিত কন্ঠে বললো,

“নিস্পাকে নিয়ে যেতে না দিলে এখানে দুটো লাশ পড়ে যাবে।”

ত্রিজয় বরাবরের মতো এবারেও তাজ্জব,মানে যতবারই মীমাংসায় আসতে চায় ততবারই সংঘর্ষ বেধে যায়,এই কামড়াকামড়ি কন্টিনিউ করার ধৈর্য নেই ত্রিজয়ের, সে ধমকে উঠে বললো,

“আরেহ ভাই থাম তোরা।”

“বুকে পাথর বেধে এতোগুলো টাকা দিয়ে ওর চোখের অপারেশন করিয়েছি।এখন তোদের সিনেমা দেখে সেই পাথর কিডনিতে নাইমা আসছে।
ওরে ভাগ করার আগে টাকা দে আমি আমার কিডনি অপারেশন করাবো।”

নিস্পা তপ্ত চোখে তাকালো ত্রিজয়ের দিকে,মেজাজ দেখিয়ে বললো,

“এমন একটা অবস্থায় আপনার কি সত্যিই মজা করতে ইচ্ছে করছে?”

“আমি মোটেও মজা করছি না।আই এম সিরিয়াস।”

ঠান্ডা কন্ঠে বাক্য শেষ করেই, খুব দূর্ততার সাথে চোখের ভাষা পরিবর্তন করলো ত্রিজয়,সমুদ্রের মতো নীল চোখ জোড়ায় সঞ্চার করলো শীতিলতা,বিচক্ষণতার সাথে,তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জোড়ায় বিদ্যমান মাকড়সার জালের মতো হাজার হাজার ছোট ছোট জাল আবৃত করে নিলো তাকিরিমের মস্তিষ্ক,তারপর ধিরে ধিরে তরল কন্ঠে বললো,

“দেখুন এমপি সাহেব আমার সাথে আপনার যা শত্রুতা ছিলো মিটমাট।আপনার বোনকে আমি আর চাই না,আপনাকে বরং একটা আইডিয়া দেই,আপনার বোনকে ডক্টর সাহেবের সাথে বিয়ে দিয়ে দিন।ঠিক আছে?”

তাকরিম তাকিয়েই রইলো নিস্পলক,কোন শব্দ করলো না বাক্যাচ্চারন কিরলো না,কেবল ত্রিজয়ের হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে রোবটের ন্যায় মাথা নাড়ালো উপর নিচ।

ত্রিজয় রহস্য হাসলো, ঠিক একই ভঙিমায় এগিয়ে গেলো ডক্টর কিয়ানের দিকে,সম্মোহিত স্বরে বললো,

“কি ডক্টর সাহেব রাজি তো?”

ডক্টর কিয়ানও একই ভাবে রেসপন্স করল,নির্জিব প্রানীর মতো মাথা নাড়ালো কেবল।

ত্রিজয় এবার তার সম্মোহনী নীল চোখের দৃষ্টি ঘোরায় আয়মানের দিকে, মোহিমায়ি অদ্ভুত টোনে বলে,

“আর তুই ওর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সিনেমা না দেখিয়ে মেরে দে,শালা সব ঝামেলার মূল এই গোলামের বেডি, এরে আকাশে পাঠিয়ে দিয়ে চল আমরা ফ্রেন্ড হয়ে যাই।”

তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো নিস্পা,ঝাজালো কন্ঠে তিরস্কার করে বললো,

“আপনি যে ব্রিটিশ এবার প্রমাণিত হলো তো? কি সুন্দর তখন হাত পা কেটে ভাগ করে দিতে চাইলেন,আর এখন সোজা আকাশে পাঠিয়ে দিতে চাইছেন। বাহ!আপনি তো শুধু ব্রিটিশ নয়,ব্রিটিশের বাপ।”

অকস্মাৎ সচেতন মস্তিষ্ক কিছু একটা আঁচ করতে পেরে স্বগতোক্তিতে বিরবিরালো,

“কি হলো?”

নিস্প্রান দাঁড়িয়ে থাকা তিন তিনটি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে পুনরায় আওড়াল,

“সবাই এমন চুপ করে গেলো কেন?”

ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে শ্লেষ হাসলো,শান্ত ঠান্ডা কন্ঠে বললো,
“পাওয়ার অফ হিপনোটাইজ বেবি।”

নিস্পা বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়, বিহ্বলতায় হাত মুখে চেপে বললো,

“মানে আপনি তিনজনকে হিপনোটাইজ করে নিয়েছেন?”

ত্রিজয় অভিব্যক্তি কঠোর করলো,গম্ভীর কন্ঠে বললো,

“যা ইচ্ছে করেছি, এখন বাড়িতে চল।”

“আমাকে কেউ জোর করে এখানে আনি নি,আমি নিজ ইচ্ছেতেই এসেছি।তাই কেউ বললেই আমি চলে যাবো না নিশ্চয়ই।”

“মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিনক্রিয়েট করো না, ভালোয় ভালোয় না এলে ময়দার বস্তার মতো তুলে নিয়ে বাড়ি যাবো।”

“আপনি কিন্তু বেশি বারাবাড়ি,,,,,

বাক্য শেষ করার প্রয়োজন পড়লো না নিস্পার, তার আগেই ত্রিজয় বলে উঠলো,

” তোমার দাদি অপেক্ষা করছে।যদি এই মূহুর্তে না ফেরো তাহলে যেভাবে তোমাকে বিয়ে করেছিলাম সেইভাবে বিশ তলা ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রেখে তোমার দাদিকে বিয়ে করে নেবো।”

দাদির কথা শুনতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো নিস্পা,চোখে জ্বলে উঠলো দ্বিপ্তিমান খুশি,উত্তেজিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

“সত্যি?”

ত্রিজয় প্রতিক্রিয়া বিহীন উত্তর দিলো,

“সতিন ঘরে এলে বুঝবি সত্যি নাকি মিথ্যা।এক হিসেবে ভালোই হবে আমার যন্ত্রণা টা বুঝবি।”

নিস্পা মুখটা চুপসে ফেললো, ত্রিজয়ের কথার বিপরীতে রা রু করলো না আর।ত্রিজয় আর বিলম্ব করলো না,নিস্পার হাতটা শক্ত করে ধরে তাকরিমের দিকে তাকিয়ে বললো,

“এমপি মশাই আপনার ড্রাইভার কে বলুন আমাদের। কে বাড়িতে পৌছে দিতে।”

চলবে,,,,,,,,,,,,,

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here