#হিপনোটাইজ
#তাজনিন_তায়্যিবা
পর্ব:53
ম্লান আলোয় ভিজে আছে চারপাশ। জানালা দিয়ে আসা বাতাসে কাঁপছে পর্দা। ত্রিজয়ের চোখ স্থির হয়ে আছে নিস্পার মসৃণ গোলাপি, ঠোঁটের নিখুঁত বাঁকে।
অদৃশ্য কবিতায় লেখা ঠোঁটের প্রতিটি রেখা অপ্রকাশিত কোনো গোপন অনুভূতির ডাকে শিহরিত করছে ত্রিজয়ের হৃদপিন্ড। দূরত্ব কমে আসে,মুহূর্ত ভারী হয়ে ওঠে নীরবতায়।নিস্পা কিছু বুঝে উঠার আগেই ত্রিজয়ের নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যায় তার ঠোঁটের কিনারা।
সময় থমকে যায়,শব্দ হারিয়ে যায়,নিস্পা গুটিয়ে নিতে চায় নিজেকে,বারবার শতবার অবশ দু হাতে ঠেলে সরাতে চায় ত্রিজয়কে।অথচ ত্রিজয় লাগামহীন, তার ঠোঁট সম্পূর্ণ মিশে যায় নিস্পার ঠোঁটের নরম বাঁকে।উষ্ণতা, শিহরণ, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা আর হৃদয়ের অগণিত না-বলা কথা মিলেমিশে যায় নিস্পার ঠোঁটের মৃদু কাঁপনে।
সময় কাটে,এক মিনিট দু মিনিট, টানা বিশ মিনিট পর নিস্পার কোমল অধর জোড়ার মাঝে নিজের রুক্ষ ঠোঁটের রাজত্ব চালিয়ে থামে ত্রিজয়।অতঃপর নিস্পার কানের লতিকার সংস্পর্শে গিয়ে হাস্কি টোনে আওড়ায়,
“সো হালাল মুড।”
নিস্পা হাঁপাচ্ছে, বুক উঠানামা করছে দ্রুত।
চোখের কোনে জমেছে জল, ঠোঁট লাল হয়ে উঠেছে অতিরিক্ত, ক্রোধের বশবর্তি হয়ে নিস্পা ধাক্কা দিয়ে দূরে সরালো ত্রিজয়কে।কোমল মুখে ছড়িয়ে পড়েছে রক্তিম আভা,কন্ঠ জ্বলে উঠেছে আক্রোশে,
“কি করলেন টা কি এটা?”
ত্রিজয় কিঞ্চিৎ টলে তবে পেছালো না এক ইঞ্চিও, অপরাধবোধ নয়, বরং অদ্ভুত এক তৃষ্ণায় ক্ষুধার্ত বাঘের মতো এগিয়ে এলো নিস্পার আরও ঘনিষ্ঠে,নিরেট কন্ঠে বললো,
“হালাল কাজ করেছি মিসেস চাটনি।”
নিস্পা এলোপাতাড়ি হাতে ঠোঁট ঘষলো তার,ক্ষুব্ধ কন্ঠে বললো,
“ছিঃ বোমি পাচ্ছে আমার।সরুন।”
ত্রিজয় সরলো না,বরং উন্মাদের মতো এগিয়ে এসে অধর ডোবালো নিস্পার কৃষ্ণকুন্তলে,বুক ভরে ঘ্রাণ নিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“হালাল কাজটা সম্পূর্ণ করতে দেও চাটনি,বাসরের কলঙ্ক লাগিয়ে নেও সর্বাঙ্গে।”
নিস্পা ত্রিজয়কে ধাক্কা দিয়ে,ঝাঝালো কন্ঠে বললো,
“ছাড়ুন আমাকে।”
ত্রিজয় ছাড়লো না,নিস্পাকে বালিশের সাথে চেপে ধরে ঠোঁট দাবালো নিস্পার ফর্সা ঘাড়ে,নেশাময় কন্ঠে বললো,
“প্লিজ চাটনি একবার।”
ত্রিজয়ের লাগামহীন স্পর্শে শিউরে উঠলো নিস্পার তনু হৃদয়,ত্রিজয়ের রুক্ষ অধরের অপ্রতিরোধ্য আঁচড়ে রাগে কেঁপে উঠলো শরীর।অগ্নিঝরা কন্ঠে চেচিয়ে বললো,
“থু,আপনাকে ঘৃনা লাগছে আমার।”
ত্রিজয় তপ্ত শ্বাস ফেললো,নিস্পার ঘাড় থেকে মাথা তুলে বললো,
“ওকে ফাইন, আই উইল ইউজ হেলমেট।”
সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুচকে নিলো নিস্পা,তাজ্জব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“হোয়াট দ্যা হেলমেট?”
ত্রিজয় ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসলো,কামুক নয়নে এগিয়ে গেলো নিস্পার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,
“ব্লু বেরি ফ্লেভারস মিসেস চাটনি।পুরো একশো টাকায় কিনেছি।কাজে না লাগালে টাকা টা অপচয় হবে।”
সহ্যের সমস্ত সীমা অতিক্রম হলো এবার,রাগে ঝাঝিয়ে উঠলো নিস্পার মস্তিষ্ক,ত্রিজয়ের এমন বেহায়াপনা সহ্য করতে না পেরে ধারালো নখ দিয়ে দু হাতে খামচে ধরলো ত্রিজয়ের চোখ মুখ,বজ্র কন্ঠে চেচিয়ে উঠলো,
“এতো জঘন্য কেন আপনি?”
নিস্পার নখের আঁচড়ে ওষ্ঠাগত ত্রিজয়ের প্রান,নিস্পার হাত ঝাড়া মেরে সড়ে এলো দ্রুত,মুখের কোমল ত্বকে ধারালো নখের আঁচড় পড়তেই চামড়া ছিলে যাওয়া জ্বালা হলো, বিরক্তি মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“উফস!”
“এতো জঘন্য কেন তোমার নখ?”
ত্রিজয়কে ঠেলে উঠতে নিলো নিস্পা,উষ্মা কন্ঠে বললো,
“ঘর থেকে বের হন, নয়তো আমায় যেতে দিন।”
ত্রিজয় উঠতে দিলো না নিস্পাকে,দুই হাটু নিস্পার দু’দিকে দিয়ে চেপে ধরলো নিস্পার পাতলা শরীর,হিসহিসিয়ে বললো,
“নো চাটনি, আজ তো প্রতিশোধ নিয়েই ছাড়বো আমি।”
নিস্পা শুখনো ঢোক গিললো,গলা ভিজিয়ে বললো,
“একদম বাজে বকবেন না,ছাড়ুন বলছি।”
ত্রিজয় নিজের আঙুল চেপে ধরলো নিস্পার অধর জোড়ার মাঝে,অস্ফুটে বললো,
“হুশশ,,,,,”
কেঁপে উঠলো নিস্পা,দগ্ধকর শিহরনে দম বন্ধ হয়ে আসলো আচানক,ভিরিক্কি কন্ঠে বললো,
“আপনি কিন্তু ঠিক করছেন না।”
ত্রিজয় তার টাই টা খুলে নিলো এক টানে তারপর নিস্পার দু হাত বাঁধতে বাঁধতে বললো,
“আমার হালাল বউ, আমি যা করবো তাই ঠিক।”
কথাটা বলেই নিজের শার্ট খুলে ফেললো ত্রিজয়।পুরুষালী উন্মুক্ত শরীরের আকর্ষণীয় বাঁক কব্জা করে নিলো নিস্পার মস্তিষ্ক, ভেতরে শুরু হলো স্নায়ুযুদ্ধ।
ত্রিজয় ঝুকে এলো, তার উন্মুক্ত বুক স্পর্শ করলো নিস্পা উঠানামা করা ঢেউখেলানো বুকের সাথে,ত্রিজয় হাত বাড়িয়ে ড্রয়ার খুলতেই,অজানা আশঙ্কায় বরফের মতো জমে গেলো নিস্পা,শ্বাস রোধ হয়ে এলো কণ্ঠনালী তে,সে কম্পিত কন্ঠে আওড়াল,
“দেখুন আপনি,,,, ”
ত্রিজয়ের হাতে নেইলকাটার দেখে থেমে গেলো নিস্পা,হিহ্বলতায় হারালো বাক,তাজ্জব হয়ে তাকালো ত্রিজয়ের চোখের দিকে।
ত্রিজয়ের মুখ জুড়ে আঁচড়ের দাগ,নিস্পার নখ প্রায় অনেকটা ডেবে গিয়ে ফর্সা মুখে দেখা দিয়েছে লাল ক্ষত।অথচ লোকটার দৃষ্টি শান্ত।ভনীতা নেই অভিমান অভিযোগ কিছুই নেই,অনুভুতি শুন্য নীল দুচোখ কেমন বিরক্তিমাখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিস্পার হাতের বড় বড় নখ গুলোর দিকে।
ব্যাপারটা ধরতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো নিস্পা,পরক্ষণেই উত্তেজিত হয় বললো,
“এই কি করতে চাইছেন আপনি?”
ত্রিজয় ভ্রুকুটি তুলে তাকালো নিস্পার দিকে,তারপর আচমকাই নিস্পার নখে নেইলকাটার চালাতে চালাতে বললো,
“শুনেছি বাসর রাতে সবাই বেড়াল মারতে চায় অথচ আমি বেড়ালের নখ কাটতে চাইছি।ঠাডা পরা কপাল আমার।”
ত্রিজয়ের কথায় চোখ মুখ কুচকে নিলো নিস্পা,চোখ ছোট ছোট করে বললো,
“আপনি নখ কাটার জন্য এভাবে আমার হাত বেধেছেন?”
ত্রিজয় চোখ উল্টে তাকালো,অপ্রলম্বিত কন্ঠে বললো,
“তো কি ?বাসর করার জন্য বাধলে শুধু হাত নয়,হাতের সাথে মুখটাও বাধতাম।একদম কালো পলিথিন দিয়ে।”
নিস্পা চুপ হয়ে গেলো।একটা শীতল দমকা হাওয়া বইতে শুরু করলো তার কানের লতিকা স্পর্শ করে।মৃদু শিরশিরানি উপলব্ধি হলো তার।ত্রিজয় মনযোগ দিয়ে নখ কাঁটছে নিস্পার,তার দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে রাখার দৃশ্য আর নীল চোখের কুচকানো ভাজ বিমোহিত করলো নিস্পাকে,নিজের অজান্তেই ধ্যান জ্ঞান হারিয়ে তাকিয়েই রইলো মেয়েটা,ত্রিজয়ের ওই মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে পলক ফেলতেও ভুলেছে বোধহয়।
হটাৎ করেই ফোন বেজে উঠলো ত্রিজয়ের।যান্ত্রিক বস্তুটির উচ্চ শব্দে নড়েচড়ে উঠে নিস্পা।বের হয় ভাবনার সুতো ছিড়ে।ত্রিজয় ততক্ষণে ফোন হাতে নিয়ে উঠে গিয়েছে।সোজা গিয়ে দাঁড়িয়েছে বেলকনিতে,নিস্পা ঠোঁট টিপে উঁকি দিলো সেদিকে,ত্রিজয়ের উন্মুক্ত পিঠের দর্শন হতেই ছ্যৎ করে উঠলো বুকের ভেতরটা,লাজুক ভঙিতে দ্রুত সরিয়ে নিলো নয়ন।পরপরই ত্রিজয় তাকালো পেছনের দিকে,নিস্পাকে পরখ করে কানে চাপলো ফোন,গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“হ্যাঁ ইভান বলো।”
অপরপ্রান্ত থেকে ভেসে এলো ইভানের চুপসানো কন্ঠ,
“কি করছেন স্যার?”
ত্রিজয় চটপট জবাবে বললো,
“তোমার বোনের সাথে বাসর করছি।”
ফোনের অপর প্রান্তে বসে থাকা ইভান ফুসে উঠলো রাগে,দাঁতে দাঁত পিষে বিরবির করে বললো,
“শালা মা*দারচো*দ তোর মেইন সুইচে ঝমে ধরুক।”
ইভানের কোন উত্তর না পেয়ে তাড়া দেখালো ত্রিজয়,বললো,
“কি হলো কি কারণে ফোন করেছ বলছো না কেন?লেট হচ্ছে আমার।”
ফোস করে দম টানলো ইভান,মিইয়ে আসা কন্ঠে বললো,
“না মানে আসলে আপনি যেই জায়গায় যেতে বলেছিলেন সেই জায়গায় যাওয়ার পথে একটা ছোট রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছি স্যার।”
“তো?খাবারের ম্যানু বলতে ফোন করেছ আমায়?”
“না স্যার,মানে আমি ভুলে আমার মানিব্যাগ টা ফেলে রেখে এসেছি, খাবারের বিল দিতে পারছি না।”
“তো?”
“তো স্যার গত এক ঘন্টা যাবৎ হোটেলের থালাবাসন ধুতে ধুতে আমার জীবন হুইল ফাউডারের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে।আমার ফোনে কিছু টাকা বিকাশ করুন স্যার।”
ত্রিজয় সটান হয়ে দাড়ালো,রয়েসয়ে বললো,
“শোন ইভান।তোমার বোনের সাথে বাসর করতে এসেছি অথচ তোমার বোন আমাকে দিয়ে তার নখ কাটাচ্ছে।তুমি এক কাজ কর রিভেঞ্জ হিসেবে আজকে সারা রাত ওই থালাবাসন গুলোই ধোও।আমি কাল সকালে টাকা পাঠাবো।”
ইভানের মুখটা ওমনি চুপসে গেলো,তাড়াহুড়ো করে বলতে চাইলো,
“কিন্তু স্যার,,আমা,,,,,
টু টু শব্দ হয়ে কেটে গেলো ফোন।ইভান রাগে জেদে ফোনটা আছাড় দিতে গিয়েও সামলে নিলো,ক্রোধে নিজের মাথার চুল টেনে ধরে বললো,
” শালা কিপ্টার বাচ্চা,অভিশাপ দিলাম তোর দশটা বাচ্চা হোক,ওদের জামাকাপড় ধুইতে ধুইতে তোর জীবনও ত্যানা ত্যানা হয়ে যাক।”
________________
আকাশে মেঘের গর্জন।শেষ রাতের দিকে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।নিস্পা একাই ঘুমোচ্ছে তার ঘরে।ত্রিজয় আর বিরক্ত করে নি।মধ্যরাতে সেই যে গিয়েছে আর আসে নি।নিস্পাও আর খোঁজ নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি কোথায় গিয়েছে।বরং চিন্তা মুক্ত হয়ে ফ্রেস ঘুম দিয়েছে।
রাত সাড়ে তিনটে তখন বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে।ত্রিজয়ের বাড়ির সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে আয়মান।নিস্পার সাথে এক বৃষ্টিস্নাত রাতের কল্পনায় ভিজছে আনমনে,বিরহ বেদনা বুকে নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে বাড়িটির দিকে।ঠিক কোন ঘরে নিস্পা আছে নির্দিষ্ট জানে না আয়মান তবে তার দু চোখ হন্যে হয়ে খুজছে,এক নিষিদ্ধ বাসনায় তড়পাচ্ছে হৃদয়।নিস্পাকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্খায় দাউদাউ করে পুড়ছে বুক পাজর।জ্বলছে,ভিষণ বাজে ভাবে জ্বলছে,আকাশ ভেঙে নেমে আসা তুমুল বর্ষনও নেভাতে পাড়ছে না এই অগ্নিসংযোগ, কমাতে পারছে না এই অকারণ পোড়ার জ্বালা।
হটাৎ করেই একটা গাড়ি ছুটে আসার সাই-সাই শব্দে কান খাড়া করলো আয়মান।সতর্ক দৃষ্টিতে আশপাশে নিজর বুলিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো একটা মোটা গাছের পেছনে।আয়মান কে চরমভাবে আশ্চর্য করে গাড়িটা এসে দাড়ালো ত্রিজয়ের বাড়ির সামনেই।আয়মান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো গাড়িটার দিকে,চিনতে খুব একটা সময় নিলো না আয়মান,এটা যে এমপি মশাই এর গাড়ি সে বিষয়ে নিশ্চিত সে।
ভাবনার মাঝেই গাড়ি থেকে বেড় হলো তাকরিম।হাতে ছাতা নেই, সঙ্গে কোন গার্ড নেই।বের হওয়া মাত্রই বৃষ্টিতে ভিজে গেলো পুরো শরীর। অথচ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না তাকরিম।সে বিরহী দৃষ্টিতে তাকালো ত্রিজয়ের বাড়ির দিকে,মনে মনে আওড়াল,
“তুই কেন ফিরে আসছিস না আলো?স্বইচ্ছায় একবার ফিরে আয়,এমন ভাবে আগলে রাখবো পৃথিবীর কোন শক্তি তোকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না।”
গাড়িতে হেলান দিয়ে রাস্তার উপর বসে পড়লো তাকরিম।দমবন্ধকর যন্ত্রণায় কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে তার,কল্পনায় আসছে নিস্পা আর ত্রিজয়ের ঘনিষ্ঠ দৃশ্য,আচ্ছা এই বৃষ্টি ভেজা রাতে ওরা কি করছে?বদ্ধ ঘরের নিষিদ্ধ কামনায় হারিয়ে যাচ্ছে না তো?ফ্লোরেন্সার পবিত্র শরীরে লেগে যাচ্ছে না তো ওই অশুভ প্রিন্সের দেওয়া কলঙ্কের দাগ?বিদঘুটে ভয়ংকর প্রশ্নগুলো কল্পনায় আসা মাত্রই ধড়ফড়িয়ে উঠলো তাকরিম ,বক্ষপটে শো শো করে শুরু হলো প্রবল ঘূর্ণিঝড়। বুকের বা পাশে এক টুকরো স্বচ্ছ কাচ চূর্ণ বিচূর্ণ হওয়ার শব্দ হলো, হৃদপিন্ড ছিড়েখুঁড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা স্পষ্ট টের পেলো পরক্ষণেই।টের পেলো বুকের পাজর গুল হাজার হাজার টুকরোতে ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়ার আভাস,তাকরিম সহ্য করতে না পেরে ঘুষি বসালো গাড়ির উপর,প্রবল বেদনার বিষে নীল হয়ে যাওয়া কন্ঠ থেকে বেড়েলো শুধু চিৎকার,
“আয়ায়ায়ায়ায়ায়া।”
“ফিরে আয় আলেকজান্দ্রা।ওই সাদা কাগজের লিখিত নিয়ম ভেঙে চলে আয় আমার কাছে।আমার শুন্য বুক পরিপূর্ণ কর,ভালোবাসার আলিঙ্গনে।”
_____
নিস্পাকে ফেলে রেখে নিজের ঘরে ফিরে যায়নি ত্রিজয়।সেদিনের মতো নিস্পা যদি একা একা বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে যায় সেই আশঙ্কায় দরজার ওপাশ থেকে নড়ে নি এক বিন্দুও।একটা চেয়ার পেতে বসেছে নিস্পার ঘরের দরজার সামনে।কানে এয়ারপ্যাড লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে সে,কল্পনায় আঁকছে নিস্পার ছবি।বিরবির করে আওড়াচ্ছে,
“আমি প্রেমিক।অতৃপ্ত প্রেমিক।আমার প্রতিটি নিশি তোমার নামে লেখা,আমি ভালোবাসি, আমার প্রতিটি রুদ্ধশ্বাস বারবার বলে দেয় আমি কেবল আমার নীল রক্তের মেয়েকেই ভালোবাসি।”
“তুমি ফ্লোরেন্সা হও বা নিস্পা কিচ্ছু যায় আসে না আমার।আমি অভিশপ্ত তোমার অভিশাপে এটাই একমাত্র সত্য।”
“এক ভয়ংকর পূনর্মিলনের জন্য প্রস্তুত হও আমার অভিশপ্ত সুন্দরী।”
_______________
ভোরের আলো ফুটেছে মৃদু।আইরিশ বাড়ি ফিরে এসেছে মাত্রই।সেই কাল সকালে বেড়িয়ে মাত্রই ফিরলো,সময়ের হিসেবে বড্ড বেখেয়ালি লোকটা,সারাদিনে খায়ও নি মনে হচ্ছে,নিজের প্রতি তাকরিমের এমন উদাসীনতা ভাবায় প্রভাকে,সেই সন্ধ্যা রাত থেকে অপেক্ষা করতে করতে সোফাতেই শুয়ে ছিলো সারা রাত।তাকরিমের পায়ের শব্দে নড়েচড়ে উঠে মেয়েটা।তাকরিম খেয়াল করেনি প্রভাকে,সোজা বড় বড় পা ফেলে ধরলো সিড়ির পথ,ওমনি বাধা পড়ে পেছন থেকে,প্রভা কিঞ্চিৎ অধিকার বোধ দেখিয়ে ডেকে উঠে,জিজ্ঞেস করে,
“কোথায় ছিলেন?”
এই মূহুর্তে তাকরিমের বুকের ভেতরটা রক্তাক্ত,প্রভার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো মানসিকতা ধরে রাখতে পারল না কিছুতেই,মেজাজ দেখিয়ে বললো,
“কৈফিয়ত চাইছিস?”
প্রভার মুখ জুড়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে,বিষাদে রাঙা কন্ঠে বলে,
“আমি জানি কৈফিয়ত চাওয়ার অধিকার আমার নেই,কিন্তু তাই বলে কি জানতে পারি না?”
তাকরিম কঠিন কন্ঠে সাফসাফ বললো,
“না জানতে পারিস না।”
বুকের হাড়গুলো টনটন করে উঠলো প্রভার,ভিষণ ব্যাথায় ঝলসে গেলো অন্তঃপট,অন্তর্লীন কষ্ট চেপে বললো,
” আপনার ব্যাথা উপসম করতে না পারি ভাগ করে নিতে চাই আমি।”
তাকরিম শক্ত মুখে তাকালো প্রভার দিকে,অনমনীয় রূঢ় কন্ঠে বললো,
“যে ব্যাথা আমার সেটা একান্তই আমার।আমার আলেকজান্দ্রার দেওয়া ব্যাথা আমি বুকে বাধাই করে রাখবো আমৃত্যু।এতে আমার একটুও কষ্ট হবে না।”
ঠোঁট হা করে বড় শ্বাস টানলো প্রভা,নিস্প্রভ চোখ দুটো ঘুরিয়ে দেখলো তাকরিমের বৃষ্টিস্নাত ভেজা স্নিগ্ধ মুখ,কিছু একটা আঁচ করতে পেরে ভেতর টা হু হু করে কেঁদে উঠলো হটাৎ,ব্যাথাতুর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“ফ্লোরেন্সাকে দেখতে গিয়েছিলেন?”
কথা এড়াতে চাইলো তাকরিম,অদম্য কন্ঠে বললো,
“তোর না জানলেও চলবে।”
প্রভা মুচকি হাসলো,নির্লিপ্ত কন্ঠে বললো,
“টাকা আর ক্ষমতা দুটোই তো আছে আপনার তাহলে ছিনিয়ে নিয়ে কেন আসছেন না ফ্লোরেন্সাকে?”
তাকরিমের দৃষ্টি হটাৎ করেই পাল্টে গেলো,ফুটে উঠলো ঘন বিষাধের অন্ধকার ছায়া, আহত কন্ঠে বললো,
“এজন্যই তো পারছি না প্রভা।কারো বিয়ে করা লিগেল ওয়াইফকে চাইলেই ছিনিয়ে নিয়ে নেওয়া যায় না,তারউপর ত্রিজয় একজন ল ইয়ার।ক কে কলকাতা বানাতে দু সেকেন্ডও ভাববে না ও।”
“মেনেই তো নিয়েছেন ফ্লোরেন্সা অন্য কারো স্ত্রী। অন্যের স্ত্রীর প্রতি এতো কেন কৌতুহল রাখছেন তাহলে?”
প্রভার কথায় অনেক বেশি ক্ষুব্ধ হলো তাকরিম,নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে জোড়ালো একটা থাপ্পড় এগিয়ে নিয়ে হাত থামালো প্রভার গালের কাছে,প্রভা ভয়ে চুপসে গেলো, চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো আতংকে।
তাকরিম দাঁতে দাঁত পিষলো,খুব কষ্ট করে সামলালো রাগ,কড়া কন্ঠে বললো,
“কীসের স্ত্রী? এসব ফালতু বিয়ে মানি না আমি।জাস্ট খাতা কলমের একটা সাক্ষর আমার আলো অন্যের হয়ে যায় নি।কিছু দিনের অপেক্ষা ওদের ডিভোর্স করিয়ে নেবো আমি।ফারদার ওকে অন্য কারো বউ বলবি না বলে দিলাম।”
আর এক মূহুর্ত দাড়াতে চাইলো না তাকরিম হনহনিয়ে উঠে গেলো কয়েকটা সিড়ি,প্রভা তড়িঘড়ি পেছন ডাকলো পুনরায় ,
“দাড়ান।”
তাকরিম রাগে চোয়াল শক্ত করে বললো,
“তুই কি আমার হাতে মার খেতে চাস?”
প্রভা পেছন পেছন উঠে এসে দাড়ালো তাকরিমের কাছে,হাতে ধরে রাখা একটা খাম বেড় করে দিতে দিতে বললো,
“সে আপনি আমাকে মারতেই পারেন আপনার ইচ্ছেকে বরাবরই আমি সম্মান করি।”
প্রভার কথার দিকে তাকরিমের মনযোগ নেই,সে কপাল কুচকে তাকিয়ে আছে প্রভার হাতে ধরে রাখা খামের দিকে,তবে কিছু বুঝে উঠতে না পেরে কৌতুহলি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কি?”
“কিজানি, বাড়ির বাইরে গিয়েছিলাম একটা দরকারে, আসার সময় দেখি একজন বৃদ্ধা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে,আমি কাছে যেতেই আমার হাতে এটা দিয়ে পালালো।”
তাকরিম কপাল কুচকালো,দোদুল্যমান কন্ঠে বললো,
“তো এটা আমাকে কেন দিচ্ছিস তাহলে?”
সুফি দু সেকেন্ড চুও থাকলো, তারপর প্রকম্পিত কন্ঠে বললো,
“কারণ ওই বৃদ্ধা এই খামটা আইরিশ ভাইকে দিতে বলেছে।”
সুফির কথা শুনে তাকরিমের দু চোখ জ্বলে উঠলো, উৎকন্ঠিত স্বরে আওড়াল,
“হোয়াট দ্যা? ”
বিস্ময়ের ভারে কন্ঠ থেমে গেলো তাকরিমের,সংশয় ভরা কন্ঠে বললো,
“আমি আইরিশ এই কথা তো কারো জানা নেই,তাহলে ওই বৃদ্ধা কি করে জানলো?কে ওই বৃদ্ধা?”
“এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই খামেই আছে।”
চোখের ইশারায় খামটা দেখালো প্রভা।তাকরিম আর কিছু বললো না প্রভার হাত থেকে চিঠিটা তুলে নিয়ে সোজা চলে গেলো ঘরের দিকে।
অথচ প্রভা পাথরের মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইলো সেথায়,তাকিয়ে রইলো তাকরিমের যাওয়ার পানে,বিরবির করে আওড়াল,
“ভালোবাসবেন আইরিশ ভাই?একটু ভালোবাসবেন আমি যদি ফ্লোরেন্সা হয়ে যাই?”
______________
পরের দিন সকাল বেলা।বৃষ্টি কমেছে,তবে ভেজা ভেজা ভাব কাটেনি।বৃষ্টির পানিতে প্রকৃতি ধুয়েমুছে ধারণ করেছে নতুন রুপ।
ত্রিজয় একেবারে রেডি হয়ে নিচে নেমেছে।নিস্পা আর ফুলমতি বসে আছে ড্রয়িং রুমে।ত্রিজয় সোজা গিয়ে দাঁড়ালো তাদের সামনে,তারপর হুট করেই নিস্পার নিরাবেগ মুখের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে নিস্পার হাতটা মুঠোয় চেপে ধরে প্রতিক্রিয়া বিহীন বললো,
“চল।”
নিস্পা বুঝতে না পেরে কপাল কুচকালো,নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে শঙ্কুচিত কন্ঠে বললো,
“চল মানে?কোথায় যাবো আমি?”
“বরিশাল।ইমপর্টেন্ট কাজ পড়েছে আমার।”
“তো আপনার কাজ পড়েছে আমি কেন যাবো?”
ত্রিজয় স্বাভাবিক স্বরে বললো,
“কারণ তোমাকে একা রেখে যেতে চাই না আমি।”
নিস্পা ঠোঁট ফুলিয়ে কটমট করে বললো,
“আমি বাচ্চা না।আর একা কোথায় দাদি আছে আমার সাথে।”
ত্রিজয় ঘাড় বাকিয়ে তাকালো ফুলমতির দিকে,ফুলমতি পান চিবাতে চিবাতে হাসলো এক গাল,ভরসা দিয়ে বললো,
“তুমি চিন্তা কইরো না নাতজামাই, আমি আছি তো ওর কাছে,আমি দেইক্ষা রাহুম।আর মাইয়াডা তোমার লগে চইল্লা গেলে এতো বড় বাড়িতে খালি খালি লাগবো আমার।”
ত্রিজয় চোখ রাঙালো,ফুলমতির কথার উত্তরে বললো,
“বউ আমার পুরো ইন্টেক চাটনির প্যাকেট।টেস্ট করা তো দূর প্যাকেট খুলেও দেখিনি এখনো।আমি একা ফেলে রেখে যাই আর রপ্তানি হয়ে যাক এমন রিক্স তো আমি নিবো না বুড়ি।তোমার একা ফিল হলে নাহয় বুইড়ার ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি।”
চলবে,,,,,,,
(বর্তমান বরিশালই কিন্তু প্রাক্তন বাকের গঞ্জ।সেই আগের জায়গাতেই ত্রিজয়ের তিন সতিনকে পাঠানোর ব্যাবস্থা করছি।একটা জোড়ালো কাইজ্জা দেখার জন্য প্রস্তুত হও সব্বাই।)

