ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব_________১৯

0
24

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব_________১৯

পরের দিন সকাল। মির্জা মঞ্জিলের রান্নাঘরে বেশ হইচই। ফালাক, নীলা আর রিমা মিলে নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। সাদের মেজো চাচিও সেখানে আছেন, সবার সাথে গল্প করছেন। ফালাক মনোযোগ দিয়ে রুটি বেলছে, আর রিমা তরকারি নাড়ছে। রান্নাবান্নার গন্ধে আর মেয়েদের হাসাহাসিতে ঘরটা বেশ জমজমাট।
ঠিক তখনই দরজার কাছে এসে দাঁড়ায় সাদ। মাত্রই শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। পরনে একটা জিন্স প্যান্ট আর ব্ল্যাক টি-শার্ট। ভেজা চুলগুলো এখনো ঠিকঠাক আঁচড়ানো হয়নি। যে ছেলে কোনোদিন ভুল করেও রান্নাঘরের ত্রিসীমানায় আসে না, তাকে এভাবে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সবার কথা যেন মাঝপথে থেমে যায়। চাচি আর নীলা চোখাচোখি করে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
ফালাক পিঠ ফেরানো ছিল। হঠাৎ চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় পেছনে ঘোরে। সাদকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফালাক থতমত খেয়ে যায়। সাদ কোনো কথা বলে না, কারও দিকে তাকায় না-। শুধু ফালাকের চোখের দিকে একবার স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েই আবার গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের রুমে চলে যায়।
সাদ চলে যেতেই রান্নাঘরে টিপ্পনি আর হাসির রোল পড়ে। মেজো চাচি ফালাকের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন।

রিমা দুষ্টুমি করে বলে ” ভাবি, যাও তো… ভাইয়া মনে হয় তোমাকে খুঁজছে। যাও, দেরি কোরো না!”

ফালাক লজ্জায় রাঙা হয়ে যায়। হাত ধুয়ে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরের রুমে যায়। রুমে ঢুকতেই দেখে সাদ আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে সব জামাকাপড় ওলটপালট করছে। মেজাজটা এখনো খিটখিটে।
ফালাককে ঢুকতে দেখেই সাদ জিজ্ঞেস করে—

“আমার ওই ব্লু প্যান্টটা কোথায়? আমি কতক্ষণ ধরে খুঁজছি, পাচ্ছি না কেন? কাপড়গুলো ঠিকমতো গুছিয়ে রাখতে পারিস না?”

ফালাক অবাক হয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে যায়। অথচ প্যান্টটা একদম সামনের দিকেই ঝোলানো ছিল। প্যান্টটা টেনে বের করে সাদের দিকে এগিয়ে দেয়।

“এই তো সামনেই ছিল। আপনি ঠিকমতো দেখেননি মনে হয়।”

সাদ প্যান্টটা এক ঝটকায় ফালাকের হাত থেকে নেয়। ফালাকের আঙুলের সাথে সাদের আঙুল ছোঁয়। ফালাক দেখল সাদের চোখে এখন আর আগের মতো রাগ নেই, বরং এক ধরণের অস্থিরতা।
আসলে সাদের এই প্যান্ট খুঁজে না পাওয়া আসলে একটা বাহানা মাত্র। সাদ আসলে দেখতে চেয়েছিল ফালাক কার সাথে আছে বা কী করছে।

ফালাক প্যান্টটা এগিয়ে দিয়ে যেমনই পেছন ফিরতে যাবে, তখনই পায়ের কাছে পড়ে থাকা অগোছালো জামাকাপড় এ শাড়ির ভাঁজে পা আটকে যায়। নিজেকে সামলাতে না পেরে সামনে একটা হোঁচট খায়। সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল সাদ, ফালাক সরাসরি গিয়ে সাদের ওপর পড়ে।
সাদ একদম অপ্রস্তুত ছিল। ফালাকের ভার সামলাতে না পেরে পিছিয়ে যায় ফলস্বরূপ দুজন মিলে সরাসরি বিছানায় গিয়ে পড়ে। ফালাক সাদের বুকের ওপর আর সাদ বিছানায়।
মুহূর্তের জন্য পুরো ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ফালাকের লম্বা চুলের কয়েকটা গোছা সাদের মুখে এসে পড়েছে। সাদের দুহাত ফালাকের কোমরে শক্ত হয়ে চেপে বসে আছে আর ফালাক ভয়ে আর লজ্জায় সাদের টি-শার্ট আঁকড়ে ধরে রেখেছে। দুজনের নিশ্বাস একে অপরের মুখে লাগছে।
ফালাক থতমত খেয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু শাড়ির আঁচল সাদের ঘড়ির কাঁটায় আটকে গেছে। যতবার ওঠার চেষ্টা করছে, ততবারই সাদের আরও কাছে টেনে নিচ্ছে আঁচলটা।

“এত তাড়াহুড়ো কিসের?
সাদের কণ্ঠস্বরে এক ধরণের নেশা ধরানো টান। ফালাক লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতে পারছে না, মুখটা একদম লাল হয়ে গেছে। কাঁপা হাতে আঁচলটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে—

“আমি… আমি ইচ্ছা করে করিনি। নিচে জামাকাপড় পড়ে ছিল তাই…”

সাদ এবার ফালাকের চিবুকটা এক হাত দিয়ে আলতো করে ওপরে তুলে ধরে। ফালাকের চোখের মণি দুটো কাঁপছে। সাদ চোখের দিকে তাকিয়ে স্থিরভাবে বলে—

“নিচে যাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। এখন থেকে আমার কোনো কিছু না খুঁজে দিয়ে রুম থেকে এক পা-ও নড়বি না।”

সাদের এই কথা আর চাহনি ফালাকের মনে এক তীব্র শিহরণ জাগিয়ে তোলে। সাদ আস্তে করে আচল টা ছাড়িয়ে নেয়।
ফালাক সাদের বুকের ওপর আধশোয়া হয়ে আছে, আর সাদের এক হাত ফালাকের কোমরে। হোঁচট খেয়ে পড়ার ধাক্কায় আর ধস্তাধস্তিতে ফালাকের শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে অনেকটা সরে গেছে। নিচু হয়ে থাকার কারণে ফালাকের ফর্সা বক্ষদেশের উপরিভাগের রক্তিম আভা সাদের নজরে আসে। সেই সতেজ আর রুগ্ন শরীর থেকে সেরে ওঠা ফালাকের রূপ আজ যেন আগুনের মতো ।
সাদের স্থির,অতৃপ্ত দৃষ্টি সেখানেই আটকে যায়। চোখের মণি দুটো ছোট হয়ে আসে, এক অদ্ভুত পুরুষালি নেশা সাদের চোখে খেলা করে। যে সাদ সবসময় গম্ভীর আর পাথরের মতো শক্ত থাকে, সেও এই মুহূর্তে নিজেকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সাদের নিঃশ্বাস ভারি হয়ে ওঠে।
ফালাক যখন বুঝতে পারে সাদের নজর ঠিক কোথায়, মুহূর্তেই সাদের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে তাকায়। নিজের এই অবস্থা দেখে ফালাকের সারা শরীরে লজ্জার এক তীব্র ঢেউ খেলে যায়। ফর্সা মুখটা লজ্জায় টকটকে লাল হয়ে ওঠে, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন কান ফেটে বের হতে চাইছে।
তড়িঘড়ি করে এক হাত দিয়ে নিজের বুক আড়াল করে আঁচলটা টেনে নেয়। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় ফালাকের চোখ দুটো ভিজে আসার উপক্রম হয়। ফালাকের এই চরম লজ্জা দেখে সাদও এবার সচেতন হয়। দ্রুত নিজের চোখ সরিয়ে নেয়, অন্যপাশে জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। সাদের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, নিজের ভেতরের অস্থিরতা দমন করার চেষ্টা করছে।
পুরো ঘরে এখন এক শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা। ফালাক বিছানা থেকে তাড়াতাড়ি নেমে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের কাপড় ঠিক করতে করতে কাঁপছে। সাদ বিছানায় ওভাবেই আধশোয়া হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। ফালাক দ্রুত পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। দরজার বাইরে এসেই বুকে হাত দিয়ে লম্বা দম নেয়।
_

বিকেলের মিঠে রোদ মির্জা মঞ্জিলের বিশাল বাগানে খেলা করছে। নীলা, রিমা আর ফালাক সাথে ফারদিন মিলে পেয়ারা পাড়ার পরিকল্পনা করে। বাগানের এক কোণে বেশ বড় কয়েকটা পেয়ারা গাছ। ফালাক বেশ চটপটে, শাড়িটা একটু কুঁচি করে গুঁজে নিয়ে পেয়ারা গাছের নিচু একটা ডালে উঠে পড়ে। গাছটা খুব বেশি উঁচু নয়, তবে ডালগুলো বেশ পিচ্ছিল।
নিচে দাঁড়িয়ে নীলা আর রিমা ওড়না পেতে ধরছে পেয়ারা ধরার জন্য। ফালাক হাসিমুখে একটা ডাল ধরে ওপরের দিকে থাকা বড় পেয়ারাটার দিকে হাত বাড়ায়। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে বিপদ। গাছের ডালে পা রাখা মাত্রই পায়ের নিচ থেকে ডালটা স্লিপ করে। ফালাক ভারসাম্য হারিয়ে আর্তনাদ করে নিচে পড়ে যেতে থাকে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই বাগান দিয়ে আসছিল আরিয়ান। ফালাক যখন মাটিতে আছড়ে পড়তে যাবে, ঠিক তখনই আরিয়ান ওকে ধরে ফেলে। ফালাক সরাসরি মাটিতে না পড়ে আরিয়ানের বাহুডোরে এসে পড়ে।, যাতে চোট না পায়।
ফালাক ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল, কিন্তু শক্ত কোনো আশ্রয়ের ছোঁয়া পেয়ে চোখ মেলে দেখে আরিয়ান খুব উদ্বেগের সাথে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

“আপনি ঠিক আছেন তো?অনেক বড় চোট পেতে পারতেন!”

ফালাক অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে, বুকের ধুকপুকুনি তখনো থামেনি। ঠিক তখনই ওপরের বারান্দায় একটা বিকট শব্দ হয়।
সাদ ওপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল। ওপর থেকে স্পষ্ট দেখতে পায়— সাদের হাতের সিগারেটের আগুনটা যেন ওর নিজের বুকেই এসে লাগে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
সাদ হাতের কাছের ছাইদানিটা সজোরে মেঝেতে আছাড় মারে। ঝনঝন শব্দে কাঁচগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সাদের দুচোখ এখন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। গটগট করে বারান্দা থেকে ভেতরে ঢুকে যায়।

চলবে–
(বড় বড় কমেন্ট চাই)

#everyonefollowers #উপন্যাস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here