#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব_________১৮
রাতের ডিনারের সময় টেবিলটা সাজানো হয়েছে বেশ জাঁকজমকভাবে। আরিয়ান টেবিলের একপাশে বসেছে। তার চোখ বারবার এদিক ওদিক যাচ্ছিল ফালাককে খোঁজার জন্য। একটু পরেই ফালাক বাটি হাতে খাবার দিতে এল।
আরিয়ান তখন লক্ষ্য করল, ফালাক খুব নিপুণভাবে সবার পাতে খাবার তুলে দিচ্ছে। তার হাতের কাজ আর চলাফেরায় এক ধরণের অভিজাত সারল্য আছে।
খাওয়া শেষে আরিয়ান সুযোগ বুঝে ফালাকের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল—
”আপনার হাতের রান্না সত্যিই দারুণ ।
ফালাক উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেল।
ড্রয়িংরুমে আরিয়ান আর ফালাক দাঁড়িয়ে। আরিয়ান খুব শান্ত স্বরে ফালাকের সাথে কথা বলছে, তার চোখে সেই গভীর মুগ্ধতা। ফালাকও ভদ্রতার খাতিরে মাথা নিচু করে উত্তর দিচ্ছে। ঠিক এই মুহূর্তে সদর দরজা দিয়ে ঝড়ের বেগে প্রবেশ করে সাদ।
সামনের দৃশ্যটা দেখেই সাদের বুকের ভেতরটা জ্বলে ওঠে। আরিয়ান যেভাবে ফালাকের দিকে তাকিয়ে আছে, তা সাদের সহ্যশক্তির বাইরে চলে যায়। ওর ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমের সব কিছু ভেঙে চুরমার করে ফেলতে, আরিয়ানকে একটা চরম শিক্ষা দিতে। কিন্ত সাদ নিজেকে কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করে। চোয়াল শক্ত করে, রাগী চোখে গটগট করে এগিয়ে গিয়ে সোফায় বসে সাদ। সারা শরীর রাগে রি রি করছে।
ফালাক সাদের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে যায়। কিছুক্ষন পর কাঁপা হাতে এক গ্লাস শরবত সাদের দিকে এগিয়ে দেয়। কিন্তু সাদ আজ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। ফালাক গ্লাসটা সামনে ধরতেই সাদ এক ঝটকায় সেটা সরিয়ে দেয়। গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে খানখান হয়ে ভেঙে যায়, শরবত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সাদ এক মুহূর্তের জন্যও ফালাকের দিকে তাকায় না। তীব্র আক্রোশে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায় এরপর গটগট করে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে নিজের রুমে চলে যায়। যাওয়ার সময় পায়ের শব্দে পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে।
সাদের বাবা, মা, মিরা—সবাই স্তম্ভিত হয়ে এই দৃশ্য দেখে। সাদের বাবা সাদের এমন অভদ্র আচরণ আর রূঢ় মেজাজ দেখে ভীষণ রেগে যান। তিনি চিৎকার করে সাদের নাম ধরে ডাকতে গিয়েও থেমে যান অতিথির কথা ভেবে।
ফালাক মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। ওর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা জল। সবার সামনে এই অপমান ও মেনে নিতে পারছে না। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলে।
আরিয়ান অবশ্য এই ড্রয়িংরুমের কাণ্ড দেখার আগেই নিজের রুমে চলে গেছে। ও জানেই না নিচে সাদের এই ভয়াবহ তান্ডব এর কথা। পুরো মির্জা মঞ্জিলে এখন এক থমথমে অস্বস্তিকর নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।
_____
ঘন্টা খানিক পর ফালাক ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে। বুকটা ভয়ে দুরুদুরু করছে। ড্রয়িংরুমে সবার সামনে যে অপমানটা সাদ করল, সেটা ভাবতেই ফালাকের চোখে আবার জল চলে আসে। ফালাক নিজের রুমের দরজার সামনে গিয়ে একটু থামে, তারপর ভয়ে ভয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে।
রুমে পা রাখতেই পুরো ঘরটা যেন একটা আগ্নেয়গিরির মতো উত্তপ্ত মনে হলো। ফালাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকার থেকে একটা শক্ত হাত কবজি চেপে ধরে। পরমুহূর্তেই এক হ্যাঁচকা টানে সাদ দেয়ালের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে।
সাদের দুচোখ এখন লাল টকটকে হয়ে আছে, ঠিক যেন একটা ক্ষুধার্ত সিংহ। দেয়ালের সাথে ফালাকের পিঠ লেপটে আছে, ফালাকের দুপাশে হাত রেখে সাদ ওকে পুরোপুরি বন্দি করে ফেলেছে।
“এত কথা কিসের ওর সাথে? কী এমন মধু ঝরছিল ওর মুখে যে তুই ওভাবে দাঁড়িয়ে শুনছিলি?”
ফালাক ভয়ে কুঁকড়ে যায়। সাদের গরম নিঃশ্বাস কপালে লাগছে।
ইচ্ছে করছিল ওর চোখ দুটো উপড়ে ফেলি।
এই সব মনে মোমে বলছে কিন্তূ ফালাকের সামনে কিছু বললো না।রাগী চোখে তাকিয়ে আছে শুধু।
ফালাক ডুকরে কেঁদে ওঠে। কবজিতে সাদের আঙুলের চাপ বাড়ছে, বোধহয় দাগ বসে যাচ্ছে।
সাদ ফালাকের একদম গলার কাছে মুখ নামিয়ে আনে। সাদের চোখে এখন এক ভয়ংকর জেদ আর পাগলামি।
সাদ এক ঝটকায় ফালাককে ছেড়ে দেয়। ফালাক টাল সামলাতে না পেরে বিছানার ওপর পড়ে যায়। সাদ গটগট করে বারান্দার দিকে চলে যায়, ওর মেজাজ এখন আসমান ছুঁয়েছে। ফালাক বিছানায় বসে নিজের লাল হয়ে যাওয়া কবজিটার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। সাদের এই পাগলামি ফালাক কে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।
_________
ফালাক বিছানায় বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ঠিকই, কিন্তু ফালাকের মনটা বড্ড নরম। কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে দেয়। সাদের ওপর রাগ থাকলেও মনে পড়ে যায়, লোকটা রাগের মাথায় ডিনার না করেই ওপরে চলে এসেছে। সাদের মেজাজ যেমনই হোক, ও তো এই বাড়ির বউ। লোকটার পেটে ক্ষিধে রেখে ফালাক শান্তি পায় না।
খুব ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। সাদ তখনো রেলিং ধরে বাইরে তাকিয়ে আছে, পিঠটা যেন একটা শক্ত পাহাড়ের মতো অনড়। ফালাক খুব ভয়ে ভয়ে ডাক দেয়—
“শুনুন না… রাত তো অনেক হলো। নিচে যাবেন না জানি, তবে খেয়ে নিন কিছু। রাগ নাহয় পরে দেখাবেন, শরীরটা তো আর আপনার অপরাধ করেনি।”
সাদ কোনো উত্তর দেয় না। হয়তো শুনতেই পায়নি এমন ভান করে দাঁড়িয়ে থাকে। সাদের এই নীরবতা ফালাককে আরও কষ্ট দেয়। ফালাক আর দ্বিতীয়বার অনুরোধ করে না। জানে সাদ এখন জেদ ধরে বসে আছে।
ফালাক গুটি গুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিচে রান্নাঘরে চলে যায়। সবাই তখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফালাক একটা ট্রে সাজায়—সাদের পছন্দের খাবারগুলো খুব যত্ন করে তুলে নেয়। একটা পানির গ্লাস নিয়ে ফালাক আবার ওপরে নিজের রুমে ফিরে আসে।
রুমে ঢুকে দেখে সাদ এখন বিছানায় বসে আছে। কালো শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো। একদৃষ্টিতে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। ফালাক কাছে গিয়ে খাবারের ট্রে-টা টি-টেবিলে রাখে, তারপর প্লেটটা হাতে নিয়ে সাদের সামনে এগিয়ে দেয়।
সাদ প্লেটের দিকে একবার তাকায়, তারপর ফালাকের চোখের দিকে। ফালাকের চোখদুটো এখনো কান্নার কারণে একটু ফোলা। সাদ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। ভেতরের ভয়ংকর রাগটা বোধহয় ফালাকের এই সহজ যত্নের কাছে যেন একটু একটু করে হার মানতে শুরু করে।
ফালাক প্লেটটা সাদের খুব কাছে ধরে খুব নরম স্বরে বলে—
“বেশি কিছু না, এই অল্প কটা ভাত শুধু খেয়ে নিন। এরপর আমি আর বিরক্ত করব না আপনাকে।”
সাদ ফালাকের হাত থেকে প্লেটটা নেয় না, বরং একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে হাতের দিকে। ফালাকের আঙুলে এখনো সাদের চেপে ধরা লাল দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে আছে। সাদের পাথরের মতো শক্ত মনে এবার একটু অপরাধবোধ উঁকি দেয়।
সাদ চুপচাপ বসে থাকে। ফালাক বুঝতে পারে, এই মানুষটা নিজ থেকে হাত বাড়িয়ে খাবে না— ভেতরের জেদ এখনো অনেক শক্ত।
ফালাক আর কোনো কথা বাড়ায় না। বিছানার এক কোণে বসে পড়ে। হাত দিয়ে ভাত মাখাতে মাখাতে একটা ছোট লোকমা তৈরি করে সাদের ঠোঁটের কাছে ধরে।
সাদ এক পলক ফালাকের দিকে তাকায়। ফালাকের চেহারায় কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু একরাশ যত্ন। সাদ এবার আর বাধা দেয় না। সাদ মুখ খোলে আর ফালাক আলতো করে প্রথম লোকমাটা সাদের মুখে তুলে দেয়।
পুরো ঘরে এক অদ্ভুত নীরবতা। ফালাক একটা একটা করে লোকমা সাদের মুখে তুলে দিচ্ছে, আর সাদ যান্ত্রিকভাবে খেয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ফালাকের ওই হাতটার দিকে, যা কিছুক্ষণ আগে নিজেই নিষ্ঠুরভাবে চেপে ধরেছিল। ফালাকের কবজিতে লালচে দাগটা সাদের বুকে এখন তীরের মতো বিঁধছে।
খাওয়ানোর মাঝে ফালাকের আঙুল সাদের ঠোঁটে ছুঁয়ে যায়। ফালাক শিউরে ওঠে কিছুটা, কিন্তু নিজেকে সামলে নেয়। সাদ এবার আচমকা ফালাকের হাতটা নিজের হাতে নেয়। ফালাক চমকে তাকিয়ে দেখে সাদ লাল হয়ে যাওয়া দাগটার ওপর নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে খুব ধীরে ধীরে ঘষছে।
“খুব বেশি লেগেছে? আমি… আসলে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারিনি।”
ফালাক মাথা নিচু করে ফেলে। চোখে আবার জল চিকচিক করে ওঠে। লোকটা ধমকায়, অপমান করে, আবার এই লোকটাই পরম মমতায় নিজের অপরাধ স্বীকার করল। ফালাক অস্ফুট স্বরে বলে—
“জানি আপনি রাগ সামলাতে পারেন না। কিন্তু সবার সামনে ওভাবে গ্লাসটা না ফেললেও পারতেন। আমার খুব অপমানিত লাগছিল।”
সাদ কোনো উত্তর দেয় না। ফালাকের হাতটা নিজের ঠোঁটের কাছে নিয়ে আসে আর ওই লাল দাগটার ওপর খুব আলতো করে একটা চুমু খায়। ফালাকের সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। সাদের এই একটা ছোট্ট ছোঁয়া সব অপমান আর কষ্ট এক নিমেষে ধুয়ে মুছে দিচ্ছে। সাদ এমন টা করবে সেটা ফালাকের ধারণার ও বাইরে।
চলবে —

