ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব_________১৭

0
23

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব_________১৭

পুরো বাড়ি তখন নিঝুম। মির্জা মঞ্জিলের করিডোরে শুধু ঘড়ির কাঁটার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
সাদ রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তার মেজাজ এখনো খিটখিটে। ফালাক চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, মাঝে মাঝে জ্বরের ঘোরে অসংলগ্ন কিছু বিড়বিড় করছে। সাদ একটু দ্বিধায় পড়ে গেলো। এসব সেবা যত্ন সে আগে কখনো কখনো করে নি। মাকে ডাকবে।। না থাক।
সাদ ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ওষুধের ফাইলটা দেখল। তারপর একটা বাটিতে জল নিয়ে ফালাকের শিয়রে এসে বসে।
ধীর হাতে ফালাকের কপালের ওপর থেকে চাদরটা সরাল। আগুনের মতো তপ্ত কপাল। সাদ রুমালটা ভিজিয়ে ফালাকের কপালে ছোঁয়াল। তপ্ত কপালে ঠাণ্ডা জলের স্পর্শ লাগতেই ফালাক শিউরে উঠে সাদের হাতটা খপ করে ধরে ফেলল।
ফালাক আধবোজা চোখে” ছেড়ে দিন… অনেক কষ্ট হচ্ছে… আম্মু…”
সাদ হাতটা ছাড়িয়ে নিল না। বরং আরও শক্ত করে ধরে রইল। ফালাকের এই অসহায়ত্ব দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু সে তো সাদ মির্জা! নিজের আবেগ প্রকাশ করা তার স্বভাবে নেই।

“চুপচাপ শুয়ে থাক। নড়াচড়া করবি না একদম। শরীর খারাপ হয়েছে তো হয়েছে, এতো ছটফট করার কী আছে?”

ফালাক এসব শুনলো না সে তো জ্বরের ঘোরে আছে।
সাদ সারারাত ফালাকের মাথার কাছে বসে রইল। প্রতি আধঘণ্টা পর পর জলপট্টি বদলে দিচ্ছে। দুচোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। এক হাতে ফালাকের হাতটা ধরে আছে আর অন্য হাতে জলপট্টি দিচ্ছে। ফালাক যখনই একটু ছটফট করছে, সাদ তখনই ধমক দিচ্ছে— “একদম নড়বি না বলছি! ঠিকমতো ঘুমো।”
মাঝরাতের দিকে ফালাকের জ্ঞান একটু পরিষ্কার হলো। চোখ মেলে দেখল বাতি নেভানো রুমে শুধু জিরো পাওয়ারের নীল আলো জ্বলছে। আর তার মাথার কাছে বসে সাদ তখনো রুমাল ভেজাচ্ছে। সাদের মতো একজন মানুষ, যে কিনা সারা এলাকার আতঙ্ক, সে আজ তার জন্য রাত জাগছে!
ফালাক খুব ক্ষীণ স্বরে বলল

“আপনি ঘুমাননি?ঘুমিয়ে পড়ুন… আমি ঠিক আছি।”

সাদ হাত থামাল না। চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে আছে ক্লান্তিতে।

“বেশি পণ্ডিতি করিস না তো! আমি ঘুমালে এই জলপট্টি কে দেবে? চুপচাপ চোখ বন্ধ করে থাক। সকালে জ্বর না কমলে তোকে ডক্টরের কাছে নিয়ে গিয়ে ইনজেকশন দেওয়াব, মনে থাকে যেন!”

ইনজেকশনের ভয় পেয়ে ফালাক আবার চোখ বন্ধ করল। তবে তার ঠোঁটের কোণে এবার এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। এই মানুষটার রাগের আড়ালে এক বিশাল ভালোবাসার পাহাড় লুকানো আছে। সাদ তাকে ‘তুই’ করে বলছে, ধমকাচ্ছে—কিন্তু এই ধমকটা যেন পৃথিবীর সবচাইতে মিষ্টি সুর ফালাকের কাছে এখন।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে সাদের চোখটা একটু লেগে এসেছিল। ফালাক তার জ্বরের ঘোরেই দেখল সাদ মাথার কাছে বসেই তার হাতের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। ফালাক অতি সাবধানে তার অন্য হাতটা বাড়িয়ে সাদের চুলে একটু স্পর্শ করল। পরক্ষণেই ভয়ে হাত সরিয়ে নিল—যদি মানুষটা জেগে গিয়ে আবার ধমক দেয়!
সকালে যখন বাড়ির সবাই রুমে উঁকি দিল, তখন তারা দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ফালাক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আর সাদ মাথার কাছে বসেই ফালাকের হাতটা ধরে ঘুমিয়ে আছে। সাদের মা মুচকি হেসে ইশারা করলেন কাউকে ডাকতে না।
সকাল দশটায় সাদের ঘুম ভাঙল। দেখল ফালাক তার দিকে তাকিয়ে আছে। গায়ের উত্তাপ এখন একদম নেই।

“জ্বর আছে?”

ফালাক মাথা নেড়ে জানাল নেই। সাদ আবার আগের মতো গম্ভীর হয়ে গেল।

“ভালো। এখন উঠে ফ্রেশ হ। আর খবরদার, আজকের পর যেন আর জ্বর না আসে। আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিলি!”

সাদ গটগট করে ওয়াশরুমে চলে গেল। ফালাক বিছানায় বসে রইল একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে।

____________

দুই দিন পর ফালাক এখন পুরোপুরি সুস্থ। তার গায়ের জ্বর ভাবটা নেই, বরং মুখে ফিরে এসেছে এক চিলতে সজীবতা। সকালে গোসল সেরে আয়নার সামনে দাঁড়াল, তার মনে পড়ে গেল গত দুটো রাতের কথা। জ্বরের ঘোরে সবটা স্পষ্ট না দেখলেও সাদের যত্নশীল হাতের ছোঁয়াটা তার স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
ফালাক ড্রয়ার থেকে কাপড় বের করছিল, তখনই সাদ রুমে ঢুকল। হাতঘড়িটা পরতে পরতে ফালাকের দিকে একবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
“কী ব্যাপার? আজই এত কাজ করার শখ হয়েছে কেন? এখনো তো মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে আছে।”

“আমি এখন একদম ঠিক আছি। আপনি চিন্তা করবেন না।”

সাদ ‘চিন্তা’ শব্দটা শুনেই একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। দ্রুত জানালার দিকে তাকিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল—

“আমি চিন্তা করছি না। আমি শুধু চাইছি না তুই আবার অসুস্থ হয়ে আমার ঘুমের আর সময়ের বারোটা বাজাস। সুস্থ যখন হয়েছিস, এখন নিজের যত্ন নে।”

সাদ চলে যাচ্ছিল, কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার থামল। পকেট থেকে একটা ছোট ওষুধের পাতা বের করে টেবিলের ওপর রাখল।

“এই ভিটামিনটা রোজ রাতে খাবি। আর খবরদার, আজ যেন তোকে রান্নাঘরে বেশিক্ষণ না দেখি। মা আছে চাচি আছে, ওরা সামলাবে।”

ফালাক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সাদ তাকে ধমকাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই ধমকের আড়ালে এক অদ্ভুত অধিকার ।
নিচে নামতেই মিরা, রিমা আর নীলা ফালাককে ঘিরে ধরল। মিরা দুষ্টুমি করে ফালাকের কানে ফিসফিস করে বলল—
“জানো ভাবি, ভাইয়া যে তোমাকে এভাবে ধমকিয়ে সেবা করবে তা আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি।
ফালাকের গাল দুটো আবার সেই বেলি ফুলের গাজরার দেওয়ার দিনের মতো লাল হয়ে উঠল।
________

বিকেলের শান্ত মির্জা মঞ্জিলে একটি দামী কালো গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামলেন আরিয়ান আহমেদ। পরনে ধূসর রঙের একটি ব্লেজার, চোখে চশমা। চেহারায় এক ধরণের আভিজাত্য আর গাম্ভীর্য। তিনি লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন এবং কয়েকদিন থাকার জন্য সাদের বাবার অনুরোধে এই বাড়িতে এসেছে।
আরিয়ান ভেতরে ঢুকতেই বাড়ির বড়রা তাকে সাদরে গ্রহণ করল। ড্রয়িংরুমে বসে সবার সাথে কথা বলছিলেন তিনি। আরিয়ানের ব্যক্তিত্ব প্রখর।
ঠিক সেই মুহূর্তে ফালাক রান্নাঘর থেকে ট্রে হাতে করে ড্রয়িংরুমে এল। তার পরনে মেরুন রঙের একটি সুতি শাড়ি, ভেজা চুলগুলো আলগা করে পিঠে ছেড়ে দেওয়া। অসুস্থতার ধকল কাটিয়ে ফালাকের চেহারায় এখন এক মায়াবী স্নিগ্ধতা।
ফালাক যখন ট্রে-টা টেবিলের ওপর রাখল, আরিয়ানের নজর গিয়ে স্থির হলো তার ওপর। আরিয়ান একদম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফালাককে দেখতে লাগল। ফালাকের শান্ত চাহনি, তার সহজাত সরলতা দেখে আরিয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ভাবতেও পারেনি এই বাড়ির ভেতরে এত স্নিগ্ধ কোনো মেয়ে থাকতে পারে।

আরিয়ান মনে মনে ভাবছে “এই মেয়েটি কে? এত সাধারণ পোশাকেও ওর ভেতরে এক অদ্ভুত আভিজাত্য আছে। লন্ডনের চাকচিক্যভরা জীবনেও তো এমন পবিত্র সৌন্দর্য দেখিনি।”
আরিয়ান একদৃষ্টিতে ফালাকের দিকে তাকিয়ে রইল। ফালাক মাথা নিচু করে চলে যেতে চাইল, তখন আরিয়ান খুব মার্জিত স্বরে ডাক দিল—

“শুনুন…”

ফালাক থমকে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ানের চোখের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ফালাককে একটু অস্বস্তিতে ফেলল।

“আপনি কি এই বাড়ির মেয়ে?

আরিয়ানের প্রশ্নে ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সবাই একটু চুপ হয়ে গেল। আরিয়ান জানে না ফালাক এই বাড়ির বড় বউ। সে ভাবছে ফালাক হয়তো এই পরিবারেরই কোনো অবিবাহিত সদস্য।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে ধীরপায়ে নেমে এল সাদ। সাদ কোনো কথা না বলে, আরিয়ানের দিকে একবারও না তাকিয়ে ড্রয়িংরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তার এই হঠাৎ চলে যাওয়াটা আরিয়ানকে বেশ অবাক করল।
সাদের মা ফালাকের পরিচয়টা পরিষ্কার করতে গিয়ে মাত্র বলতে শুরু করেছেন—
সাদের মা: “আরিয়ান বাবা, আসলে ফালাক হচ্ছে সাদের—”
কিন্তু তার কথা শেষ হওয়ার আগেই সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেন সাদের বাবা। তার সাথে কয়েকজন ব্যবসায়িক পার্টনার। আরিয়ানকে দেখেই তিনি সব ভুলে হাসিমুখে এগিয়ে এলেন।

“আরে আরিয়ান! কখন এলে বাবা? তোমার বাবা তো বারবার ফোন করে খোঁজ নিচ্ছেন। চলো চলো, আমার সাথে।

আরিয়ান চাইলেও আর ফালাকের পরিচয়টা তখন জানতে পারল না। সাদের বাবার কথায় সে বাধ্য হয়ে ঐদিকে চলে গেলো। তবে তার মনের এক কোণে ওই শান্ত মেয়েটির ছবিটা গেঁথে রইল।

চলবে–
( কালকেও গল্প আসবে no টেনশন ❤️)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here