#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব______________৩৭
সময় যেন ডানা মেলে উড়ছে! ফালাকের প্রেগন্যান্সির এখন ৬ মাস চলছে। বাড়ির বড় বউয়ের কোল আলো করে নতুন অতিথি আসছে—এই খুশিতে সবাই যেন পাগলপ্রায়।
আয়ান আর ঈশানের আরেক কাণ্ড। দুজনে প্রতিদিন নতুন নতুন ছোট ছোট জামাকাপড়, আর খেলনা কিনে নিয়ে আসে। ফালাকের রুমের এক কোণে একটা আলমারি তো শুধু অনাগত বাচ্চাদের জিনিসপত্রেই ভরে গেছে।
“ভাবি, দেখো এটা কেমন? আমার বিশ্বাস আমার ভাতিজা এটা পরলে একদম হিরো লাগবে!”
ঈশান পাশ থেকে বলে “আরে রাখ তোর নীল! আমার মনে হচ্ছে ভাতিজি হবে। এই দেখো ভাবি, পিঙ্ক কালারের ফ্রিল দেওয়া জামাটা কত কিউট! আমি তো কাল আরও দুটো ড্রেস অর্ডার করেছি।”
ফালাক ওদের পাগলামি দেখে। চাচ্চু হওয়ার খুশি!
ফারদিন ওর কাজই হলো প্রতিদিন নতুন নতুন নামের লিস্ট আনা। আর মীরার তো পাগলামি আছেই।
_____________
৬ মাস পার হতেই ফালাকের শারীরিক অবস্থা কিছুটা পরিবর্তনের দিকে মোড় নিল। সাধারণ প্রেগন্যান্সিতে পেট যতটা বড় হয়, ফালাকের ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি বড় আর ভারী মনে হচ্ছে। ফালাকের চলাফেরা করতে এখন বেশ কষ্ট হয়, একটু হাঁটলেই ও হাঁপিয়ে ওঠে। সাদ বিষয়টা লক্ষ্য করে আর দেরি করল না।
________________
হসপিটালের কেবিনে ফালাককে আল্ট্রাসনোগ্রাফির জন্য পাঠানো হলো। সাদ বাইরে অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। ওর মনের ভেতর এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠা—ফালাক ঠিক আছে তো? বাচ্চাটা সুস্থ তো? কিছুক্ষণ পর ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে সাদকে নিজের চেম্বারে ডাকলেন।
“আসুন মি. মির্জা ।
সাদ কুঁচকানো কপালে ডাক্তারের সামনে বসল।
“ডক্টর, ফালাক ঠিক আছে তো? ওর পেটটা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বড় দেখাচ্ছে, ও খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে—কোনো সমস্যা নেই তো?”
” আনন্দের খবর হলো—ফালাকের গর্ভে একটি নয়, দুটি, টুইন (যমজ) বাচ্চা বড় হচ্ছে। সে কারণেই পেটটা বেশি বড় আর ওর কষ্টটাও একটু বেশি হচ্ছে।”
সাদ এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ‘টুইন’ শব্দটা ওর কানে বার বার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। একসাথে দুটো প্রাণের আগমন—এই প্রাপ্তি ও কল্পনা করেনি।
“টুইন!
“জি। তবে এখন থেকে ফালাককে দ্বিগুণ সাবধানে রাখতে হবে। ওর ডায়েট, ওর বিশ্রাম—সবকিছুর ওপর কড়া নজর দিতে হবে। ও এখন একাই তিনজনের শরীর বইছে।”
সাদ কেবিন থেকে বের হয়ে সোজা ফালাকের কাছে গেল। ফালাক তখনো বেডে শুয়ে আছে,মুখে চিন্তার রেখা। সাদ ফালাকের দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে পরম আবেশে কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল।
… ডাক্তার কী বলল? কোনো সমস্যা?”
সাদ ফালাকের পেটে হাত রেখে খুব নিচু স্বরে বলল—
” আমরা টুইন বেবি পেতে যাচ্ছি!”
ফালাকের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। পরক্ষণেই ওর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক স্বর্গীয় হাসি। দুজনে মিলে অনাগত দুই প্রাণের স্পন্দন অনুভব করতে লাগল। ফালাকের মনে হলো, ওর জীবনের সব না পাওয়া আজ আল্লাহ একসাথে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
____________
ডাক্তারের চেম্বারের ভেতরের আনন্দঘন পরিবেশটা মুহূর্তেই যেন হিমশীতল হয়ে গেল। ফালাকের যমজ সন্তান হওয়ার খুশিতে সাদের মুখে যে হাসিটা ফুটেছিল, ডাক্তারের পরবর্তী কথায় তা পাথরের মতো জমাট বেঁধে গেল। ডাক্তার ফাইলটা বন্ধ করে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে সাদের দিকে তাকালেন।
“মি.মির্জা , আমি দুঃখিত এই খুশির খবরের সাথে আপনাকে একটা কঠিন সত্যের মুখোমুখি করতে হচ্ছে। ফালাকের রিপোর্টগুলো খুব একটা সুবিধার নয়।”
সাদের হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
“কী বলতে চাচ্ছেন ডাক্তার? পরিষ্কার করে বলুন।”
“ফালাকের ইন্টারনাল কিছু কমপ্লিকেশন আছে। টুইন প্রেগন্যান্সি এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ, আর ওর শারীরিক গঠন এবং কিছু ইন্টারনাল ব্লিডিংয়ের হিস্ট্রি বলছে—ডেলিভারির সময় বড় ধরণের রিস্ক হতে পারে। সত্যি বলতে, বাচ্চা দুটোর চেয়ে ফালাকের জীবন বেশি ঝুঁকির মুখে। ডেলিভারির সময় ওর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা, ‘সারভাইভাল চান্স’ খুব কম।”
সাদের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। টেবিলের ওপর শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ হাত রাখল। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল,
“কোনোভাবেই ফালাকের কিছু হতে দেওয়া যাবে না ডাক্তার। আপনি কত টাকা চান? কোন হসপিটাল? কোন দেশের ডাক্তার? আমি পৃথিবীর সব সম্পদ উজাড় করে দেব, শুধু আমার ফালাককে আমার কাছে সুস্থ চাই।”
“আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করব মি. সাদ। কিন্তু পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন—ফালাক যেন এই কমপ্লিকেশনের কথা কোনোভাবেই জানতে না পারে। ওর মেন্টাল স্ট্রেস বাড়লে পরিস্থিতি আরও দ্রুত খারাপ হবে। ওর সামনে আপনাকে স্বাভাবিক থাকতে হবে।”
সাদ পাথরের মতো বসে রইল। কেবিনে ফিরে দেখল ফালাক নিজের পেটে হাত বুলিয়ে হাসছে। অনাগত সন্তানদের নিয়ে কত স্বপ্ন দেখছে!
সাদ ফালাকের পাশে এসে বসল। ফালাক সাদের হাতটা ধরে বলল—
আপনি খুশি তো? আমাদের দুজন সন্তান একসাথে আসছে!”
সাদ ফালাককে জড়িয়ে ধরে ,বুকের ভেতর তখন হাহাকার চলছে।
সাদ ফালাকের মাথায় নিজের থুতনি ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল। বাইরে যতোই হাসিখুশি থাকুক না কেন, সাদের ভেতরে এখন এক ভয়াবহ যুদ্ধের শুরু হলো—যে যুদ্ধে ওর একমাত্র প্রতিপক্ষ হলো নিয়তি।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে সাদ একটা কথাও বলল না। গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে যেন অন্য কোনো জগতে হারিয়ে গিয়েছিল। ফালাক বারবার জিজ্ঞেস করছিল কী হয়েছে, কিন্তু সাদ শুধু ফালাকের হাতটা শক্ত করে ধরে থেকেছে, যেন ছেড়ে দিলেই ফালাক কোথাও হারিয়ে যাবে।
বাড়িতে পা রাখতেই যেন খুশির বন্যা বয়ে গেল। ফালাকের যমজ বাচ্চা (Twins) হতে যাচ্ছে, বাড়ির সবার আনন্দ তখন বাঁধ মানল না। সাদের বাবা খুশিতে সবাইকে মিষ্টি খাওয়ানোর হুকুম দিলেন।
সাদ সবার এই উল্লাসের মাঝে শুধু একটা ম্লান হাসি দিল। কেউ জানল না, সেই হাসির আড়ালে ওর কলিজাটা কতটা রক্তাক্ত হচ্ছে। যখনই সাদ ফালাকের দিকে তাকাচ্ছে, ডাক্তারের সেই ভয়াবহ কথাগুলো কানে বাজছে— “সারভাইভাল চান্স খুব কম।” সাদ কাউকেও কিচ্ছু বলল না।
পরের দিন সকাল থেকেই সাদ কেমন যেন জেদ ধরে বসল। সাফ জানিয়ে দিল, ফালাককে আর এক মুহূর্তের জন্যও এখানে রাখা যাবে না। ও
ফালাককে নিয়ে সরাসরি লন্ডন যাবে ডেলিভারির যাবতীয় ব্যবস্থা ওখানেই হবে। সাদের এই হুট করে নেওয়া সিদ্ধান্তে বাড়ির সবাই অবাক।
সাদের বাবা আর চাচারা যখন বোঝাতে এলেন, সাদ ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে খুব শান্ত গলায় বলল—
“আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না। এখানকার মেডিকেল ফেসিলিটির ওপর আমার ভরসা কম। লন্ডনের যে হসপিটালের সাথে আমি কথা বলেছি, তারা টুইন প্রেগন্যান্সির স্পেশালিস্ট। আমি চাই ফালাক সেরা ট্রিটমেন্ট পাক।”
সাদের মা কিছুটা চিন্তিত হয়ে বললেন—
“কিন্তু সাদ, এই অবস্থায় ফালাককে নিয়ে অত লম্বা জার্নি করা কি ঠিক হবে? ও তো এখন এমনিতেই খুব দুর্বল।”
ফালাকও দাঁড়িয়ে সবটা শুনছিল। ওর মনটা কু গাইতে লাগল। সাদ কেন হঠাৎ এমন করছে? ধীরপায়ে সাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো।
“,আপনি কেন জেদ করছেন? আমি তো এখানে ভালোই আছি। বাড়ির সবার মাঝে থাকতে আমার ভালো লাগে।
সাদ ফালাকের দিকে তাকাতেই ওর হৃদয়ে মোচড় দিয়ে উঠল।
“প্রাইভেট জেটের ব্যবস্থা করেছি, সেখানে সব ধরণের মেডিকেল সাপোর্ট থাকবে। সাথে ডাক্তার আর নার্সও যাবে। তুমি শুধু আমার ওপর ভরসা রাখো।”
সাদের চোখের অস্থিরতা আর জেদ দেখে ফালাক আর না বলতে পারল না। বুঝল, সাদের এই জেদের পেছনে কোনো বড় কারণ আছে যা সে বলতে চাচ্ছে না। সাদের চোখে একটা অজানা আতঙ্ক ফালাক স্পষ্ট দেখতে পেল।
পুরো বাড়িতে মুহূর্তেই বিষণ্ণতা নেমে এল। সবাই যেখানে বাচ্চাদের আগমনের জন্য ঘর সাজাচ্ছিল, সেখানে এখন বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হলো। সাদ কাউকে বুঝতে দিল না।
___________________
সাদের নিজস্ব ম্যানর হাউসের সামনে দাঁড়ালো গাড়ি ,! “The heaven “! ফালাকের চোখ বিস্ময়ে চড়কগাছ।
বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই ম্যানর হাউসের সামনেটা লাল ইটের তৈরি, যার ওপর দিয়ে লতানো সবুজ আইভি গাছগুলো ওপরের দিকে উঠে গেছে। বাড়ির সামনে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত মখমলের মতো সবুজ ঘাসের লন,!
সাদ ফালাককে অতি সাবধানে গাড়ি থেকে নামিয়ে ভেতরে নিয়ে এল। ভেতরে পা রাখতেই ফালাক অনুভব করল এক রাজকীয় উষ্ণতা।
বড় হলরুমে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিশাল এক ঝাড়বাতি, যা থেকে সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে। নিচতলার মেঝেটা সাদা-কালো মার্বেলের, যা আয়নার মতো চকচক করছে।
ওপরের তলায় ওঠার জন্য ঘোরানো সিঁড়িটা রয়েছে, তার রেলিংগুলো ওপর হাতে খোদাই করা নকশা। প্রতিটি ধাপে মখমলের লাল কার্পেট বিছানো।
দেয়ালজুড়ে বড় বড় অয়েল পেইন্টিং।
সাদ ফালাককে নিয়ে গেল বেডরুমে। রুমটা বিশাল। চার কোণায় খুঁটি দেওয়া বিশাল এক বিছানা (Four-poster bed), যাতে ধবধবে সাদা রেশমি চাদর আর তুলতুলে ডজনখানেক কুশন রাখা। রুমের একদিকে বিশাল ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, যেখান থেকে লন্ডনের বিকেলের আকাশ আর দূরের গাছপালার সারি দেখা যায়। জানালার পাশেই রাখা দুটি আরামদায়ক ভেলভেট সোফা আর একটা ছোট ফায়ারপ্লেস, যেখানে পাইন কাঠ পুড়ছে ঘরটাকে উষ্ণ রাখার জন্য।
রুমের ভেতরটা এখন পাইন কাঠের পোড়া মিষ্টি গন্ধ আর রুম ফ্রেশনারের হালকা ঘ্রাণে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ।
সাদ নার্স রেখেছে তাড়াতাড়ি এখানেই ফালাকের টেককেয়ার করবে।
ম্যানর হাউসে ফালাকের দিনগুলো কাটছে এক অদ্ভুত মায়াবী ঘেরাটোপে। বাইরের আবহাওয়াটা বেশ ঠান্ডা, মেঘলা আকাশ আর ঝিরঝিরে বৃষ্টি লন্ডনের চিরচেনা রূপ। কিন্তু ঘরের ভেতরে সাদের কড়া নজরদারিতে ফালাকের জীবনটা যেন এক পুতুলের মতো হয়ে উঠেছে।
সাদ এখন বেশিরভাগ কাজ বাড়ি থেকেই সামলায়। ফালাকের শরীরটা এখন বেশ ভারী, এই সময়টাতে সাদ ওর ছায়া হয়ে আছে ।
সেদিন বিকেলবেলা। ফালাক আয়নার সামনে বসে নিজের চুলের সাথে যুদ্ধ করছিল। গোসলের পর চুলগুলো শুকিয়ে এমন জট পাকিয়ে গেছে যে চিরুনি কিছুতেই কাজ করছে না। বারবার চেষ্টা করে ফালাক ক্লান্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আয়নায় দেখল সাদ দরজায় দাঁড়িয়ে ওর এই অসহায় অবস্থা দেখছে।
সাদ ধীরপায়ে এগিয়ে এল। ফালাকের হাত থেকে চিরুনিটা কেড়ে নিয়ে ওকে আলতো করে বিছানায় বসিয়ে দিল।
সাদ কোনো কথা না বলে ফালাকের পেছনের দিকে বসল। আঙুল দিয়ে চুলের জটগুলো ছাড়াতে লাগল । সাদের মতো যে কিনা রাগী বদমেজাজি সব সময় মারামারি করতো সে আজ বড্ড মনোযোগ দিয়ে ফালাকের চুল ছাড়াচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর সাদ চুলগুলো তিন ভাগে ভাগ করে বেণী করতে শুরু করল। কিন্তু বেণী করতে গিয়ে সাদের অবস্থা নাজেহাল! কোনোটা ঢিলে হয়ে যাচ্ছে, আবার কোনোটা বেশি টাইট। সাদের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেছে, যেন কোনো বড় প্রজেক্টের কাজ করছে ও।
অবশেষে বেণী যখন শেষ হলো,!
আমি স্যুপ নিয়ে আসছি। একদম নড়বে না এখান থেকে।”
সাদ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ফালাক সেই আঁকাবাঁকা বেণীটা হাতে নিয়ে হাসতে লাগল।
রান্নাঘর থেকে গরম স্যুপের বাটিটা হাতে নিয়ে সাদ রুমে ফিরল, ফালাক আধশোয়া হয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝরে পড়া দেখছিল।
সাদ ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বেডসাইড টেবিলে বাটিটা রাখল। ধোঁয়া ওঠা চিকেন স্যুপের ঘ্রাণে ফালাকের ক্ষুধা যেন একটু চনমন করে উঠল।
সাদ নিজে একটা ছোট টেবিল ফালাকের সামনে টেনে নিল। চামচ দিয়ে স্যুপটা নেড়ে আলতো করে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে লাগল । ফালাক অপলক দৃষ্টিতে সাদের দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষটার কী নিপুণভাবে সবটা করছে!
সাদ এক চামচ স্যুপ ফালাকের ঠোঁটের কাছে ধরল।
“নাও,!
ফালাক এক চুমুক খেয়েই মুখটা একটু কুঁচকালো।
“একটু নুন কম হয়েছে মনে হয়, ।”
সাদ একবার ফালাকের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেই এক চামচ টেস্ট করল। তারপর গম্ভীর মুখে বলল—
“ডাক্তার নুন কম খেতে বলেছে। ব্লাড প্রেশার কন্ট্রোলে রাখতে হবে।
সাদ আবার এক এক করে চামচটা ফালাকের মুখে দিতে লাগল। ফালাক ছোট বাচ্চার মতো বাধ্য হয়ে খেয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে সাদের হাতের ছোঁয়া ওর ঠোঁটে লাগছে, আর ফালাকের হৃৎপিণ্ডটা যেন প্রতিবারই নতুন করে সাদের প্রেমে পড়ছে।
খাওয়ানো শেষ হলে সাদ একটা টিস্যু দিয়ে খুব যত্নে ফালাকের ঠোঁটের কোণ মুছে দিল। ফালাক আলতো করে সাদের হাতটা ধরল।
আপনি কি কোনো কারণে ভয় পাচ্ছেন? আপনি তো আগে এমন ছিলেন না। আপনার এই অতিরিক্ত যত্ন আমাকে মাঝে মাঝে একটু ভয় পাইয়ে দেয়।”
সাদ থমকে গেল। ওর চোখের মনিতে এক মুহূর্তের জন্য সেই লুকানো আতঙ্কটা খেলে গেল, যা লন্ডনের এই বাড়িতে আসার পর থেকে আড়াল করে রেখেছে।তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে একটা ম্লান হাসি দিল।
সাদ ড্রয়ার থেকে ফালাকের আয়রন আর ক্যালসিয়ামের ওষুধগুলো বের করল। ফালাক জানে না, সাদের প্রতিটি সতর্ক পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে ওকে হারানোর এক তীব্র হাহাকার। ওষুধ খাইয়ে দিয়ে সাদ ফালাকের গায়ের ওপর কম্বলটা ভালো করে টেনে দিল। ফালাক যখন চোখের পাতা বন্ধ করল, সাদ তখনো ওর শিয়রে বসে রইল।
এই মেয়েটাকে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না।
____________
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ফালাকের গগনবিদারী চিৎকার দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ল, সাদের পৃথিবীটা যেন মুহূর্তেই দুলে উঠল। লিভার পেইনের তীব্র যন্ত্রণায় ফালাক বিছানায় ছটফট করছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, আর মুখটা নীল হয়ে আসছে। সাদ দিশেহারা হয়ে নার্সদের ডাকল। তারা ফালাকের অবস্থা দেখেই আঁতকে উঠে বলল, “স্যার, দেরি করা যাবে না! লিভার ফাংশন ফেইল করছে, দ্রুত হসপিটালে নিতে হবে!”
অপারেশন থিয়েটারের বাইরে সাদ দরজায় কপাল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, একটু পর ডাক্তার রক্তভেজা গ্লাভস হাতে বেরিয়ে এলেন। তাঁর গম্ভীর আর করুণ মুখচ্ছবি দেখেই সাদের বুকটা কেঁপে উঠল।
“আই অ্যাম সরি মিস্টার মির্জা। উই আর ট্রাইং আওয়ার বেস্ট। কিন্তু আপনার ওয়াইফ এর অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। আমরা হয়তো শুধু বাচ্চাদের বাঁচাতে পারব, কিন্তু আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো প্রায় অসম্ভব। আপনি শেষবারের মতো চাইলে ওকে দেখতে পারেন।”
ডাক্তারের এই কথাগুলো সাদের কানে গরম সিসার মতো ঢুকল। সাদ আর কিছু শুনতে পেল না। ফালাক এখন একা এক অজানা পথে পা বাড়াচ্ছে? সাদ টলমল পায়ে ওখান থেকে বেরিয়ে এল। ফালাককে একা যেতে দেবে না।
সাদ হাতে কলম ধরল। আয়ানের উদ্দেশ্যে ওর শেষ চিঠি…
প্রিয় আয়ান,
তুই যখন এই চিঠিটা পাবি, তখন হয়তো এই শহরে আমাদের এক নতুন ভোরের সূর্য উঠবে, কিন্তু আমার আর ফালাকের জন্য সব সূর্য চিরদিনের জন্য ডুবে গেছে।
আয়ান, তুই তো জানিস, আমার জীবনটা আগে কেমন ছিল—পাথরের মতো শক্ত, নিরস আর একা। ফালাক যখন আমার জীবনে প্রথম এলো, আমি ওকে দুচোখে দেখতে পারতাম না। ওকে তাচ্ছিল্য করেছি, অবহেলা করেছি। কিন্তু ওই মেয়েটা তার সরলতা আর মায়া দিয়ে আমার ওই বিষাক্ত জীবনটাকে আমূল বদলে দিল। ও আমাকে নতুন করে বাঁচতে শিখিয়েছিল, আমাকে ভালোবাসার মানে বুঝিয়েছিল।
আজ অপারেশন থিয়েটারের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক্তার যখন বলল, ও আর থাকবে না —আমি বুঝলাম, আমার পৃথিবীটাও ওর সাথেই শেষ হয়ে গেছে। আয়ান, ফালাক বড় কোমল একটা মেয়ে রে! ও একা একা কোথাও যেতে খুব ভয় পায়। আমি কিভাবে একাকী ওই পরপারের দীর্ঘ রাস্তায় ছেড়ে দেই? ও যদি সেখানে গিয়ে আমার হাত খোঁজে? ও যদি আমাকে না পেয়ে কেঁদে ফেলে?
আমি ওকে একা ছাড়তে পারব না। ও যেখানে যাচ্ছে, আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরে ওখানেই যাচ্ছি। আমরা অন্য কোথাও এক হব।
আয়ান, আমার একটা শেষ অনুরোধ রাখবি? আমার অনাগত সন্তান দুটোকে তুই দেখিস। ওদের আগলে রাখিস। ওদের নিজের পরিচয়ে বড় করিস। ওদের বলিস, ওদের মা ছিল এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এক মানবী,!
ভালো থাকিস ভাই। মির্জা বাড়ির দায়িত্ব আজ তোর কাঁধে দিয়ে গেলাম। ফালাক ডাকছে রে, ওর খুব ভয় লাগছে… আমি যাচ্ছি।
— ইতি, তোর বড় ভাইয়া , সাদ মির্জা!
চলবে~~
( ফালাক আর সাদ কে নিয়ে আপনাদের অনুভূতি জানাতে চাইলে গ্ৰুপ আছে জানাতে পারেন। কমেন্টে গ্ৰুপ লিংক দেওয়া হলো )
#everyonefollowers #উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট

