ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব____________৩৯

0
18

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব____________৩৯

ফালাক হালকা গোলাপি রঙের একটা ওভারকোট আর সাদা স্কার্ফ জড়িয়ে বাগানময় ধীরপায়ে হাঁটছে। কোলে ছোট্ট আইরা। আইরা ওর চোখ মেলে বাগানের রঙিন ফুলগুলো দেখছে আর হাত-পা ছুড়ছে।
পাশেই হাঁটছেন ন্যানি এলিজাবেথ। তার কোলে আরিশ। আরিশ যেন খুব মনোযোগ দিয়ে বাগানের বড় বড় গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির রহস্য বোঝার চেষ্টা করছে। সাদ আর ফালাক এর ছেলের নাম আরিশ আর মেয়ের নাম আইরা! আরিশ আর আইরার এখন ছয় মাস চলছে!

বাগান থেকে ফিরে ফালাক বাচ্চাদের নিয়ে তাদের রুমে ঢুকল। আইরা আর আরিশের এখন খাবারের সময় হয়েছে। ফালাক অতি সাবধানে দুজনকে তাদের ডাবল দোলনায় শুইয়ে দিল। লক্ষ্য করল, আরিশ আর আইরা দুজনই খুব ফুরফুরে মেজাজে আছে। ওরা দোলনায় শুয়ে শুয়ে হাত-পা ছুড়ছে আর নিজেদের মধ্যে আধো আধো ভাষায় কী যেন বলছে। ফালাক ওদের কপালে একটা করে চুমু দিয়ে দ্রুত কিচেনে গেল দুধ রেডি করতে।

কিচেনে গিয়ে ফালাক খুব সতর্কতার সাথে ফিডারগুলো স্টেরিলাইজ করে দুধ তৈরি করল।
দুধ নিয়ে ঘরে ফিরে ফালাক এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখল। আরিশ আর আইরা দুজনেই দোলনায় পা উঁচিয়ে খেলছে। আরিশ তার নিজের পায়ের আঙুল ধরার চেষ্টা করছে আর আইরা সেটা দেখে হাসছে। বাচ্চাদের এই চঞ্চলতা দেখে ফালাকের মনটা ভরে গেল।
কাছে গিয়ে ফালাক আইরাকে একটু চেক করতেই বুঝল, ওর ডায়াপারটা চেঞ্জ করা দরকার।
ডায়াপার চেঞ্জ করে আইরাকে ফ্রেশ করে নিয়ে ফালাক ফিডার হাতে নিল। ন্যানি এলিজাবেথ ঠিক সেই সময় রুমে ঢুকলেন। তিনি আরিশকে নিজের কোলে তুলে নিলেন ফিডার খাওয়ানোর জন্য। আর ফালাক আইরাকে নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে বসল।
আইরা ফালাকের কোল ঘেঁষে শুয়ে ফিডার খেতে শুরু করল। ওর ছোট ছোট হাতগুলো দিয়ে ফিডারটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করছে। ন্যানির কোলে আরিশও খুব শান্ত হয়ে দুধ খাচ্ছে।
পুরো রুমটাতে এখন এক শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ। শুধু বাচ্চাদের দুধ খাওয়ার একটা মৃদু শব্দ ফালাক মনে মনে ভাবছে , জীবনটা কত দ্রুত বদলে গেল। কয়েক মাস আগেও ও এই রুমে একা ছিল, আর আজ ওর চারপাশে দু দুটো প্রাণ।

_____________

সাদ রাতে বাসায় ফিরল, চোখ দুটো খুঁজে বেড়াচ্ছিল তার দুটো কলিজার টুকরোকে।

সাদ রুমে ঢুকেই দেখল ফালাক বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত। ব্রেস্ট ফিডিং করাচ্ছে! দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে একটা পাতলা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে বেরিয়ে এল। ভেজা চুল থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে, সেদিকে ওর কোনো খেয়াল নেই। সরাসরি গিয়ে বিছানায় বসা আরিশকে কোলে তুলে নিল। বাবাকে কাছে পেয়ে আরিশ আর আইরা যেন হাতে চাঁদ পেল; হাত-পা ছুড়ে আধো-আধো শব্দে তারা সাদের সাথে যেন গল্প জুড়ে দিল।
ফালাক কিছুক্ষণ আগে অন্য রুমে গিয়েছিল রুমে ঢুকেই দেখল সাদ বিছানায় বসে আরিশকে উঁচুতে তুলে খেলা করছে, আর আইরা সাদের পায়ের ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সাদের ভেজা চুল থেকে পানি পড়ছে! ফালাক ম্লান হেসে সাদের দিকে তাকালো। সাদের পরনে সাধারণ একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার, চুলগুলো অবিন্যস্ত, চোখে ঘুমের রেশ—অথচ এই অগোছালো সাদকে আজ ফালাকের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ মনে হচ্ছে।

“এই মানুষটা একটা আস্ত পাগল! ঠিকমতো চুল না মুছেই বাচ্চাদের কাছে চলে এলো! কোলে নেওয়ার জন্য একদম পাগল হয়ে থাকে,!

বাইরে থেকে এসে একটুও কি তর সয় না আপনার?”

সাদ কোনো উত্তর দিল না,!ফালাক একটা শুকনো টাওয়াল হাতে নিয়ে সাদের ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। সাদ তখন বিছানায় বাবুদের মাঝখানে বসে আছে। ফালাক সাদের মাথাটা টাওয়াল দিয়ে জড়িয়ে খুব যত্ন করে চুল মুছতে শুরু করল।

“এই! আপনি কি এখনো বাচ্চা আছেন? এভাবে ভেজা চুলে থাকলে তো আপনার ঠান্ডা লাগবেই, আপনার কি একদমই নিজের শরীরের দিকে খেয়াল নেই?”

সাদ ফালাকের হাতের ছোঁয়া পেয়ে একটু শান্ত হলো। মুখ না ফিরিয়েই হাসল।

“আমার খেয়াল রাখার জন্য তো তুমি আছোই ফালাক।

“তাও… এখন আপনি একা নন!আপনার ওপর এই তিনটে মানুষের জীবন নির্ভর করে। আপনার এই খামখেয়ালি কবে যে যাবে!”

সাদ এবার ফালাকের কোমর জড়িয়ে ধরে! কাছে টেনে বলে –

যাবে না এই খামখেয়ালি!

ছোট্ট রুমে আজ শুধু ভালোবাসা, বাচ্চাদের কলকাকলি আর এক দম্পতির পরম নির্ভরতা। আরিশ আর আইরা যেন বাবা-মায়ের এই ভালোবাসার ভঙ্গি দেখে আরও জোরে হাত-পা ছুড়তে লাগল।

_________________

আরিশ অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু আইরা আজ ঘুমাচ্ছে না! সাদ আইরাকে বুকে নিয়ে পায়চারি করে অবশেষে ওকে ঘুম পাড়াল। খুব সাবধানে শুইয়ে দিয়ে সাদ যখন সোজা হয়ে দাঁড়ায় , তখনই ওর চোখ গেল ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফালাকের দিকে।

ফালাক আজ একটি ধবধবে সাদা রঙের জামদানি শাড়ি পরেছে। এই মুহূর্তে ওকে যেন কোনো রূপকথার পরী মনে হচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুব ধীরলয়ে নিজের চুলগুলো গুছিয়ে একটা হাত-খোপা বাঁধছে। ঘাড়ের কাছের কয়েকটা অবাধ্য চুল অবহেলায় ঝুলে আছে। এদিকে সাদের তৃষ্ণার্ত চোখ জোড়া ওকে ঠিক কতটা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে,তা ফালাকের অজানা!
সাদ নিঃশব্দে ফালাকের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়ালো। ফালাক কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাদ ফালাককে পাজাকোলে তুলে নিল।

“একি? কী করছেন? ছাড়ুন!”

সাদ ফালাকের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল—
“চুপ! একদম কথা বলবে না।”

ফালাক অপ্রস্তুত হয়ে সাদের গলা জড়িয়ে ধরল। সাদ ফালাককে নিয়ে ধীরপায়ে ওদের পাশের রুমটার দিকে পা বাড়াল।

“হঠাৎ এভাবে কোলে নিলেন কেন?

সাদ থামল না। ফালাককে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। ফালাকের সাদা শাড়ির আঁচলটা মেঝের কার্পেট ছুঁয়ে লুটিয়ে পড়ছে।

সাদ অন্য রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। রুমের ফালাককে খুব আলতো করে বিছানায় নামিয়ে দিল, কিন্তু বাহুডোর থেকে মুক্ত হতে দিল না।
ফায়ারপ্লেসের আগুনের আভা ফালাকের সাদা শাড়িতে প্রতিফলিত হয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছে। সাদের নিঃশ্বাস ফালাকের ঘাড়ে পড়তেই শিউরে উঠল। ফালাক সাদের শার্টের কলারটা খামচে ধরে চোখ বুজল। সাদের দুহাত ফালাকের খোপাটা খুলে দিতেই একরাশ কালো মেঘের মতো চুল ছড়িয়ে পড়ল বিছানায়।

একরাশ মেঘের মতো চুলগুলো বিছানায় ছড়িয়ে পড়তেই সাদ ফালাকের চুলের ঘ্রাণে নিজেকে ডুবিয়ে দিল।
​সাদ নিজের টি শার্ট টা খুলে দূরে ছুড়ে মারলো!পেশিবহুল বুকটা ফালাকের নরম শরীরের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল! সাদের বাহুডোরে ফালাক নিজেকে সঁপে দিল এক পূর্ণ সমর্পণে। শাড়ির ভাঁজগুলো ক্রমে আলগা হয়ে এল, সেই রাতে সাদ আর ফালাক একে অপরের নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাস মেলালো, দুটি হৃদয়ের একে অপরের প্রতি তীব্র টান আর আত্মিক এক মিলন হলো ।

________________

ফালাক অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করল আরিশকে কোল সাদের থেকে নামাতে। ওর পছন্দের খেলনা দিল, ন্যানি এলিজাবেথকে ডাকল, এমনকি আইরাকে ওর পাশে শুইয়ে দিল—কিন্তু আরিশের এক কথা যেন , সে বাবার গলা ছাড়বে না। সাদ কোল থেকে নামাতে নিলেই সে মুখ লাল করে এমন চিৎকার দিয়ে কান্না শুরু করছে যে সাদের এসব দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে।

আপনি যান। ও একটু পর শান্ত হয়ে যাবে। এভাবে কোলে নিয়ে থাকলে তো আপনার দেরি হয়ে যাবে।”
সাদ আরিশের পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে ফালাকের দিকে তাকালো।

“না ফালাক, এভাবে কান্নায় রেখে আমি কাজে মন দিতে পারব না। আজ না হয় আরিশ আমার সাথেই অফিসে যাবে।

ফালাক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সাদ সত্যিই আরিশকে কোলে নিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়াল। সাথে নিল আরিশের ডায়াপার ব্যাগ আর দুধের ফিডার।

_____________

সাদ তার ব্ল্যাক মার্সিডিজ থেকে নামল, তখন সবার চোখ ছানাবড়া। বডিগার্ডরা দৌড়ে এসে দরজা খুলল, আর দেখল তাদের গম্ভীর বস এক হাতে ব্রিফকেস আর অন্য হাতে একটা ফুটফুটে শিশুকে আগলে ধরে আছেন। অফিসের রিসেপশন থেকে শুরু করে কেবিন পর্যন্ত সবাই আরিশকে দেখে মুগ্ধ। কয়েকজন এগিয়ে এল কোলে নিতে, কিন্তু আরিশ তার বাবার শার্টের কলার খামচে ধরে সবার দিকে এমনভাবে তাকালো যেন বলছে— “খবরদার! আমার বাবার কাছে কেউ আসবে না।”

আজকের প্রজেক্টটা ছিল কয়েক মিলিয়ন ডলারের। কনফারেন্স রুমের বিশাল টেবিলের চারদিকে নামী-দামী ইনভেস্টররা বসে আছেন। সাদ ভেতরে ঢোকা মাত্রই সবাই উঠে দাঁড়ালো, কিন্তু সবার চোখেমুখে বিস্ময়। সাদ নিজের চেয়ারে বসল, কোলে তার ছেলে। আরিশ তখন সাদের টাইটা নিয়ে খেলতে ব্যস্ত।

“জেন্টলম্যান, আজকের মিটিং শুরু করার আগে একটা কড়া নির্দেশ। কেউ উচ্চস্বরে কথা বলবেন না। কোনো তর্কা বিতর্ক বা চিৎকারের শব্দ যেন না শুনি। আমার ছেলে ভয় পেয়ে গেলে কিন্তু আপনাদের ক্যারিয়ারের জন্য সেটা ভালো হবে না। আশা করি কথা মনে থাকবে।”

পুরো মিটিং রুমে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। সবাই এতোটাই সাবধানে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিল যেন ফিসফিস করে কথা বলছে। সাদ মাঝে মাঝে ল্যাপটপে নজর দিচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে আরিশের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । আরিশও একদম শান্ত হয়ে বসে রইল পুরো সময়টা।

মিটিং শেষে সাদ নিজের কেবিনে ফিরে এল। আরিশকে সোফায় শুইয়ে ফিডার খাওয়াতে লাগল। ঠিক তখনই সাদের ফোনের স্ক্রিন জ্বলে উঠল। ফালাক ভিডিও কল দিয়েছে।
সাদ কলটা রিসিভ করে ক্যামেরাটা আরিশের দিকে ধরল।

“কী অবস্থা আপনাদের দুই সাহেবের? মিটিং কি সাকসেসফুল? নাকি আরিশ নিজেই প্রেজেন্টেশন দিয়েছে?

” সাকসেসফুল,!

ভিডিও কলের ওপাশে ফালাকের হাসিমুখ দেখে সাদের সারাদিনের ক্লান্তি নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। আরিশ তখন ফিডার শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে আর বড় বড় চোখ করে স্ক্রিনে তার মাকে দেখছে।

“আমি আসছি half an hour এর মধ্যে!”

“আচ্ছা! আরিশকে সাবধানে নিয়ে আসবেন। আর শার্টের বোতামটা একটু ঠিক করে নিন, আরিশ মনে হয় আপনার কলারটা টেনে একদম নষ্ট করে দিয়েছে।”

সাদ নিজের কলারের দিকে তাকিয়ে হাসল। সত্যিই আরিশের ছোট হাতের টানে সাদের স্যুটটা আজ অগোছালো হয়ে গেছে।

ভিডিও কলটা কেটে দিয়ে সাদ আরিশকে কোলে তুলে নিল। আরিশ ওর বুকের ওপর মাথা রেখে একটা লম্বা হাই তুলল। সাদ ওর কপালে চুমু দিয়ে বলল,
“চল বাবা, এবার বাড়ি ফিরি। তোর মা আর বোন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”

অফিসের করিডোর দিয়ে সাদ আবার বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন সবার চোখে মুখে শুধু একটাই কথা— ‘মির্জা স্যার যে এতোটা কেয়ারিং বাবা হতে পারেন, তা কল্পনার বাইরে ছিল।’

চলবে ~~

#everyonefollowers #উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট #গল্পপ্রেমী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here