ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ #পর্ব___________৪১( শেষ পর্ব )

0
22

#ফালাক #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব___________৪১( শেষ পর্ব )

বাথটাব ভর্তি ফেনা আর রঙিন প্লাস্টিকের খেলনা হাঁস!

“আরিশ! একদম নড়বে না। চোখে শ্যাম্পু ঢুকে যাবে তো বাবা!”

আরিশ বাথটাবের পানি ছিটানোয় ব্যস্ত। সে দুই হাতে পানি থাবড়াচ্ছে আর সেই পানি গিয়ে সরাসরি সাদের মুখে আর চুলে লাগছে। সাদ পুরো ভিজে একাকার!

আরিশ: “বাবা! দেখো হাঁসটা ডুব দিচ্ছে! আইরাকে বলো আমার হাঁস যেন না নেয়!”

আইরা তখন তার বাবার কোলের কাছে লেপ্টে আছে। ওর মাথায় প্রচুর শ্যাম্পুর ফেনা, একদম সাদা পাহাড়ের মতো লাগছে। আইরা ওর ছোট ছোট হাত দিয়ে সাদের গালে ফেনা মাখিয়ে দিচ্ছে।

“বাবা! তোমার দাড়ি সাদা হয়ে গেছে! তুমি বুড়ো হয়ে গেছো!”

সাদ হেসে ফেলল। আইরাকে কোলে তুলে নিয়ে শাওয়ারের নিচে ধরল। আইরা ঠান্ডা পানির স্পর্শে চিৎকার করে উঠল, আর আরিশকে উদ্দেশ্য করে পানি ছিটাতে শুরু করল।

ঠিক তখনই ফালাক দরজায় এসে দাঁড়ালো। হাতে বাচ্চাদের টাওয়াল আর পরিষ্কার কাপড়। বাথরুমের অবস্থা দেখে কপালে হাত দিল। সাদের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে নিজেই বাচ্চাদের সাথে গোসল করছে।

একি অবস্থা করেছেন? আমি জানতাম আপনি নিজের অবস্থাও বারোটা বাজাবেন। আরিশ, আইরা—বাবাকে কেন ভিজিয়ে দিলে তোমরা?”

“আরে ফালাক, বকা দিও না তো। ওরা তো আনন্দ করছে। আরিশ, আইরা—তোমাদের আম্মুকে একটু ভিজিয়ে দাও তো!”

বাবার হুকুম পাওয়ামাত্র আরিশ দুহাতে পানি ছিটিয়ে দিল ফালাকের দিকে। ফালাকের শাড়ির আঁচল ভিজে গেল। ফালাক কৃত্রিম রাগ দেখিয়ে বলল—

“খুব হচ্ছে, তাই না? আপনারা তিনজনে মিলে এক দল হয়েছেন!

“আপনি আসলেই একটা বড় বাচ্চা।
জলদি যান, কাপড় পাল্টান। আরিশ আর আইরা,
এসো আমার সাথে, তোমাদের রেডি করে দিই।”

আরিশ আর আইরা টাওয়াল মুড়ি দিয়ে ঘরজুড়ে দৌড়াতে শুরু করল। সাদ বাথরুমের আয়নায় নিজের ভেজা অবয়ব দেখে হাসছে ।

সাদ একবারে শাওয়ার নিয়েই বের হলো কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে। চুল থেকে তখনো টপ টপ করে পানি পড়ছে। রুমে ঢুকে দেখল এক ভিন্ন দৃশ্য। আরিশ আর আইরা বিছানায় বসে খেলছে, ওদের পরনে কোনো জামা নেই।

সাদকে দেখামাত্রই দুটো ছোট মানুষ একযোগে চিৎকার করে উঠল। ফালাক পাশেই আলমারি থেকে কাপড় বের করছিল, সাদের দিকে তাকিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে হাসল।

“দেখুন আপনার ছেলেমেয়ের কাণ্ড! আমি কতক্ষণ ধরে কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু ওদের এক কথা—বাবা না এলে ওরা ড্রেস পরবে না। আপনার কাছেই নাকি রেডি হবে!”

সাদ মুচকি হাসল। এই পুঁচকে দুটোর আবদার মেটানোই যেন ওর এখন প্রধান কাজ। তোয়ালে দিয়ে নিজের চুলগুলো একটু মুছে নিয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গেল।

আরিশ, এদিকে এসো।”

সাদ আলমারি থেকে আরিশের জন্য একটা ছোট্ট নেভি ব্লু কালারের পলো শার্ট আর জিন্স বের করল। আরিশ খুব বাধ্য ছেলের মতো বাবার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। সাদ খুব যত্ন করে শার্টের বোতামগুলো লাগিয়ে দিল আর চুলে একটু জেল মেখে স্পাইক করে দিল। একদম সাদের ছোট সংস্করণ লাগছে আরিশকে।

এরপর এল রাজকন্যার পালা। সাদ আইরার জন্য একটা টকটকে লাল রঙের ফ্রক বের করল। আইরা ওর ছোট ছোট পা দুলিয়ে বিছানায় বসে ছিল। সাদ ফ্রকটা পরিয়ে দিল। সাদ খুব সাবধানে আইরার সিল্কি চুলে দুটো ছোট্ট ঝুঁটি করে দিল। আইরা আয়নায় নিজেকে দেখে খুশিতে তালি দিয়ে উঠল।
আইরা সাদের গালে একটা শব্দ করে চুমু খেল। আরিশ তখন নিজের পকেটে হাত দিয়ে পোজ দিচ্ছে।

“এবার যাও, দাদুর রুমে গিয়ে দেখো দাদু তোমাদের জন্য কী সারপ্রাইজ রেখেছে।”

বাবার কথা শোনামাত্রই ড্রেস পরে দুটো পিচ্চি এক দৌড়ে রুমের বাইরে চলে গেল। ওদের ছোট ছোট পায়ের আওয়াজ করিডোরে প্রতিধ্বনি তুলল।
ফালাক এতক্ষণ মুগ্ধ হয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল।

সাদ তখনো খালি গায়ে, ওর সুঠাম পেশিবহুল শরীরের ভাঁজে পানির কণাগুলো চিকচিক করছে।

বাচ্চাদের ছোট ছোট পায়ের শব্দ করিডোর দিয়ে মিলিয়ে যেতেই রুমের ভেতর এক অদ্ভুত শান্ত নীরবতা নেমে এল। ফালাক আলমারির কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে সাদের জন্য বের করা সুগন্ধি। সাদ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। খালি গায়ে, কোমরে তোয়ালে জড়ানো অবস্থাতেই দীর্ঘ পা ফেলে ফালাকের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল।
সাদ ফালাকের দুই হাত ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে । ফালাকের নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসার জোগাড়।

… ছাড়ুন। কেউ চলে আসবে তো।

সাদ কোনো উত্তর দিল না। গভীর কালো চোখের মণি দুটো তখন ফালাকের গোলাপি রঙের ঠোঁটের ওপর স্থির। সাদের ভেজা চুল থেকে এক ফোঁটা পানি টুপ করে ফালাকের কপালে পড়ল। স
ফালাক কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই সাদ খুব আলতো করে ফালাকের চিবুকটা উঁচিয়ে ধরল। তারপর নিবিড় আবেগে ও ফালাকের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।
ফালাকের হাতের সুগন্ধির শিশিটা হাত থেকে কার্পেটের ওপর পড়ে গেল। সাদের প্রশস্ত কাঁধে হাত রেখে নিজেকে সঁপে দিল।
কতক্ষণ পর সাদ মুখ সরালো, কিন্তু ফালাককে ছাড়ল না। ফালাকের কানের লতিতে মুখ ঘষতে ঘষতে ফিসফিস করে বলল—
দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে আসি!

ফালাক সাদের বুকে মুখ লুকিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নিল। হৃৎপিণ্ড ড্রামের মতো বাজছে যেন।

“আপনি আসলেই দুষ্টু হয়ে গেছেন।

সাদ হাসল। ফালাক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের এলোমেলো চুল ঠিক করতে ব্যস্ত। আয়না দিয়েই দেখল সাদ ওর দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির এক হাসি দিচ্ছে।

_________________

সাগরের ঢেউগুলো গর্জন করে এসে বালুচরে আছড়ে পড়ছে, আর সেই নোনা বাতাসের ঝাপটা এসে লাগছে ফালাকের মুখে। পরিবারের বাকিরা একটু দূরে হুল্লোড় করছে, ওরা বাড়ির সবাই আজ সমুদ্রের পাড়ে এসেছে বিকালটায়।
পরিবারের সবাই ঐদিকে দূরে ডাব খাওয়া আর ছবি তোলা নিয়ে ব্যস্ত,! ফালাক পানির একদম কিনারে দাঁড়ানো!
পানির দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য অতীতে ডুব দিল।
ওর মনে পড়ল সেই দিনগুলোর কথা, যখন মির্জা বাড়িতে একরাশ ভয় আর অনিশ্চয়তা নিয়ে পা রেখেছিল। কত রাত একা কেঁদেছে, একাকীত্ব গুনত! সাদের জন্য অপেক্ষা করতো। তখন ও জানত না যে একদিন এই মানুষটাই তার আকাশ হবে।
হঠাৎ এক জোরালো ঢেউ এসে ফালাকের পা ভিজিয়ে দিয়ে গেল। অদ্ভুত এক আবেশে ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। নিচু স্বরে, অনেকটা নিজের মনেই গুনগুন করে আওড়াতে লাগল—

“নিজেকে আমি বুঝিনি কখনো,
ছিলেনা যখন আসনি তখনও…
এলে সেখানে, অজানা যা ছিল মন,
আমার মাঝে আজ আমি আলোকিত।”

নিজের অজান্তেই চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। এ জল দুঃখের নয়, এ জল পরম প্রাপ্তির। আসলেও নিজেকে চিনত না, জানত না নিজের ভেতরে এতোটা ভালোবাসা আর শক্তি লুকানো ছিল। সাদ মির্জা জীবনে এসে ফালাকের অন্ধকার জগতটাকে প্রদীপের মতো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

সাদ ফালাকের থেকে কিছুটা দূরে বসে আছে। গভীর কালো চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে আছে ফালাকের ওই দূরন্ত নীল অবয়বের ওপর। বাতাসের তোড়ে ফালাকের শাড়ি আর চুল উড়ছে, সাদ মুগ্ধ হয়ে দেখছে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সুন্দরতম নারীটিকে ।

পকেট থেকে একটা জিনিস বের করল। একটা রুপোর নূপুর। ফালাক নিজেও জানে না, হারিয়ে যাওয়া এই নূপুরটা সাদ নিজের কাছে রেখেছে। সাদ এটা সবসময় নিজের কাছে রাখে এতে ফালাকের অস্তিত্ব অনুভব করে ।

সাদ যে এই মেয়েটাকে কতটা পাগলের মতো ভালোবাসে, তা কোনোদিন মুখে প্রকাশ করবে না। সাদ মির্জার ভালোবাসা তো এমনই—প্রকাশ্যে সে কঠিন রক্ষক, আর গোপনে সে এক নিঃস্বার্থ প্রেমিক।

_______________

ফালাক ভাবছে কতশত রাত বালিশ ভিজিয়ে কেঁদেছে, জানালার গ্রিল ধরে সাদের জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকত। আর আজ……..

সাদ ফালাকের ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফালাকের কাঁধে হাত রাখে । ফালাক ফিরে তাকালো, সাদের চোখে দেখতে পেল এক মহাসমুদ্রের চেয়েও গভীর ভালোবাসা। যে মানুষটা একসময় পাথরের মতো কঠোর ছিল, আজ তার চোখে ফালাকের জন্য এক অদ্ভুত আর্দ্রতা।

“আর কোনো অজানা অন্ধকার নেই ফালাক। তুমি শুধু আমার মাঝে আলোকিত নও, তুমিই আমার পুরো জগতটাকে আলো দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছ। আমার ‘নিশিরাতের জোনাকি’ আজ আমার ভাগ্যের ধ্রুবতারা হয়ে গেছে।”

​ফালাক সাদের বুকে মাথা রাখল। চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে সাদের শার্টে মিশে গেল। এই জীবনের সব চড়াই-উতরাই, ভয় আর চোখের জলের সার্থকতা ছিল এই মুহূর্তটুকুতেই।

​একটু দূরে বালুচরে আরিশ আর আইরা দৌড়াদৌড়ি করছে। আয়ানের ছেলে আযলান তার ছোট ছোট পায়ে হাঁটার চেষ্টা করছে , আর আয়ান-নীলা তাকে টেনে তুলছে। ঈশান-রিমা তাদের ছোট্ট রোজকে কোলে নিয়ে খুনসুটি করছে । সাদের বাবা-মা, চাচা চাচিরা আর দাদি একটু দূরে বসে তৃপ্তিতে নিজেদের সন্তানদের এই সুখের সংসার দেখছেন ।

​সাদ ফালাকের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে ।

“চলবে তো সারাজীবন আমার হাত ধরে? এই সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো বারবার ফিরে আসবে তো আমার কাছে?”

​ফালাক হাসল। স্নিগ্ধ সেই হাসি। সাদের বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দিয়ে সমুদ্রের দিগন্তের দিকে তাকালো।

“যতদিন এই হৃদস্পন্দন আছে… আমি আপনার ছায়া হয়েই থাকব।”

“আমি আসলেও জানতাম না যে জীবনটা এতোটা সুন্দর হতে পারে। আপনি না এলে আমি সারাজীবন অন্ধকারের মধ্যেই হারিয়ে যেতাম।”

সাদ ফালাকের চিবুক ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরে । সাদ আঙুল দিয়ে ফালাকের চোখের জল মুছে দিল।

“অতীতকে ওখানেই রেখে দাও ফালাক। আজ থেকে তোমার ডিকশনারিতে ‘অজানা’ ‘অন্ধকার’ বলে কিছু নেই। আজ তুমি শুধু আমার, আর আমি তোমার। আমাদের এই ছোট পৃথিবীটা এভাবেই আলোকিত থাকবে।”

সাদ ফালাকের কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায় । সমুদ্রের ঢেউগুলো ওদের পায়ের নিচে লুটিয়ে পড়ছে বারবার, যেন ফালাকের বলা ওই কথাগুলোর সাথে তাল মেলাচ্ছে।
ফালাক মনে মনে আবার আওড়ালো……

নয় মিছে আশা, নয় শুধু ভালোবাসা
নই অকারণ প্রেমে অন্ধ
জানি তুমি-আমি আমাদের তরী
আজব এক বন্ধুত্ব
তোমার ছোট তরী, বলো, নেবে কি?
চাঁদের আলো যদি ভালো লাগে
কাল হয়ে যায় ঝাপসা
তোমার এ তরী যদি চলে যায়
ফিরে আর আসবে না
যত ভালোবাসি তারে
দূরে রয়ে যাবে, তা তো আমি জেনেছি
এক পায়ে নূপুর তোমার, অন্য পা খালি
এক পাশে সাগর, এক পাশে বালি…….

​সমুদ্রের গর্জন, বাতাস আর মির্জা পরিবারের একঝাঁক মানুষের হাসাহাসি—সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। চটগ্রামের এই গোধূলি সাক্ষী রইল এক অবিনশ্বর প্রেমের, যা একদিন ভয় আর ঘৃণা দিয়ে শুরু হলেও আজ তা শেষ হলো এক অতলান্ত ভালোবাসায়।

— সমাপ্ত —

( ২/২/২০২৬ to ১৮/৩/২০২৬ এই সময়টা দারুন ছিল। ফালাক আর সাদ আমার সবসময় প্ৰিয় থাকবে ওদের ভীষণ মিস করবো সেই সাথে আমার পাঠকদের ও।। একটা গল্পের ভুল ত্রুটি থাকতেই পারে আমি জানি আমার এই গল্পটায় ও অনেক ভুল ত্রুটি আছে। তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি! সবাই ভালো থাকবেন 🌷🤍।।।)

#গল্পপ্রেমী #everyonefollowers #উপন্যাস #উপন্যাসপ্রেমী #গল্পফ্যাক্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here