শেহরোজ – ১৮ #ইসরাত_জাহান_দ্যুতি

0
20

#শেহরোজ – ১৮
#ইসরাত_জাহান_দ্যুতি

***

দুটো এলিয়নেই এনএসআই-এর ইনটেলিজেন্স অফিসার। রমেশচন্দ্রকে আহত অবস্থাতে পেয়েই তাকে নিয়ে দুজন অফিসার বিদায় নিলো। বাদ বাকি সকলে বিস্ফোরণ শেষ হলেই ছড়িয়ে পড়ল বাড়ির চারপাশে।

বাউন্ডারি টপকে ইব্রাহীম আকাশকে নিয়ে দৌড়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে শেহরোজ আর শেহনানের থেকে। তাই অফিসারদের নজরে পড়ে গেল ওরা দুজনই। মুহূর্তেই শুরু হলো ওদের লক্ষ করে গোলাগুলি।

ইব্রাহীম পৌঁছে গেছে গাড়ির কাছে৷ আকাশকে ভেতরে তুলেই পিছু ফিরে দেখল রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে আসছে তাদের টিমের সব থেকে যোগ্য দুই সদস্য। আর ওদের পেছন পেছন চারজন ইনটেলিজেন্স—গুলি ছুঁড়ছে লাগাতার। সাব্বির ইঞ্জিন চালু করে তাগিদ দিলো‚ “দাঁড়িয়ে থেকেন না‚ ইব্রাহীম ভাই। জলদি উঠে পড়ুন৷”

ভেতরে চলে এলো ইব্রাহীম। দরজা খুলে রাখল গাড়ির। সাব্বির স্টিয়ারিং হুইল ধরে প্রস্তুত হয়ে থাকল গাড়ি ছাড়ার। কিন্তু তাদের অপেক্ষার মাঝে আচমকা শেহনানের আর্তনাদ কানে এসে পৌঁছল। পায়ে গুলি খেয়েছে শেহনান। তা দেখতে পেয়েই ভয়ে বুক কেঁপে উঠল তাদের৷ আকাশ জ্ঞান হারায়নি এখনো৷ ইব্রাহীমের কাঁধে মাথাটা এলিয়ে নেতিয়ে আছে সে। নিজের ব্যথার মাঝেই চিন্তিত‚ শঙ্কিত সুরে জিজ্ঞেস করল ইব্রাহীমকে‚ “ওরা দুজন কি ধরা পড়ে গেল‚ ভাই?”

কী জবাব দেবে বুঝতে পারছে না ইব্রাহীম। শেহনান থেমে না পড়লেও গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। ওদের থেকে মাত্র দশ হাত দূরত্বে ইনটেলিজেন্স বাহিনী৷ ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনায় বেশি। কিন্তু সেটা তো হতে দেওয়া চলবে না।

শেহরোজ আর শেহনানের উচ্চতা আর স্বাস্থ্য প্রায় কাছাকাছিই। সামান্য বেশি হবে শেহরোজ শেহনানের থেকে৷ শেহনানের অবস্থা দেখে সে কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই ওকে কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটল। আর সে সময়ই গাড়ির দরজার মুখে বসে ইব্রাহীম গুলি আরম্ভ করল অফিসারদের লক্ষ করে৷ শেহনানের ঠোঁটের কোনে হাসি ফুটল তাতে। ইব্রাহীমের দেখাদেখি সাব্বিরও হাত গুটিয়ে বসে রইল না৷ আচমকা সামনে থেকে গুলি ছুটে আসতে দেখে অফিসারগুলো থমকে গিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলো৷

পৌঁছে গেল শেহরোজ। গাড়িতে বসা মাত্রই সাব্বির ছেড়ে দিলো গাড়িটা। শেহরোজ বসেছে সাব্বিরের পাশে৷ পেছনের সবাইকে শেহরোজ বলল‚ “যতটা সম্ভব সিটে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করবে।”

ফাঁকা সড়কে কালো হাইস কমিউটারের পেছনে ধেয়ে আসছে সাদা এলিয়ন। হাইসের দু পাশ দিয়ে কয়েকটা বুলেট বাতাসে শিস কেটে চলে গেল এদিক সেদিক। সাব্বিরের ড্রাইভিং দক্ষতা বরাবরই প্রশংসনীয়। গুলিগুলো যেন গাড়ির চাকাতে না এসে লাগে তার জন্য ডানে বামে বাউলি কেটে চলার চেষ্টা করছে। ফাঁকা সড়ক বিধায় ইচ্ছামতো চালাতে পারছে সে। তার এঁকেবেঁকে চলার কারণে ওরা ঠিকঠাক গুলি লাগাতে পারছে না গাড়িতে। কিন্তু এভাবেই বা কতক্ষণ? পিছু না ছাড়াতে পারলে মুশকিল৷ ম্যাগাজিনে গুলি ভরা হতেই কাজে নেমে পড়ল শেহরোজ। ঝুঁকি নিয়ে জানালার বাইরে শরীর অর্ধেক বের করে শুরু করল পালটা আক্রমণ। প্রথম বুলেটটাই এলিয়নের উইন্ডশিল্ড ভেঙে চৌচির করে দিলো। ওতেই হলো কাম তামাম। গাড়ির ড্রাইভার চমকে গিয়ে যেন থমকে পড়েছে৷ এবং গতি কমতে শুরু করেছে গাড়িটার। কেউ মরেছে কিনা তা বোঝার চেষ্টাও করল না শেহরোজ আর আক্রমণও থামাল না। পরপর আরও তিনটা বুলেট ছুঁড়ল সে। সামনের চাকার একটাতে গিয়ে আঘাত লাগল৷ পঞ্চম গুলিটা মাপঝোঁক করে পৌঁছে দিলো সে সামনের দ্বিতীয় চাকাটাই৷

এনএসআই কর্মকর্তাদের চিন্তাভাবনা করতে আসলে দেরি হয়ে গিয়েছিল বলেই পরিণতি ভালো হলো না তাদের৷ তারা ধারণা করেনি সামনের গাড়ি থেকে আক্রমণ এলেও এভাবে আসবে বা কেউ এভাবে ঝুঁকি নিয়ে গুলি ছুঁড়বে। তাদের এই ভাবতে না পারার সুযোগটাই দারুণ কাজে লাগাতে পেরেছে শেহরোজ।

নিশ্চিন্তে ভেতরে এসে বসল সে। সাব্বিরও আরামে ছুটতে থাকল গন্তব্যের পথে। আকাশ‚ ইব্রাহীম আনন্দিত হলেও শেহনান নাখোশ। বলে উঠল‚ “অপারেশন সাকসেস হলো না আমাদের৷ আজকের মতো সুযোগ আর পাবো না রমেশকে ধরার জন্য।”

এই ব্যাপারটা নিয়েই শেহরোজের মাথা গরম হয়ে আছে। “আমি তখন নিষেধ করেছিলাম গুলি ছুঁড়তে”‚ মুখোশটা একটানে খুলে রক্ষস্বরে বলল ও৷ “আমি কমান্ডো অ্যাটাক করতে চেয়েছিলাম।”

“কমান্ডো অ্যাটাক কী?” জিজ্ঞেস করে বসল সাব্বির। এমন কিছু তো তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি!

“সবকিছু অন্ধকার করে দিয়ে নক-আউট গ্যাস ছড়িয়ে হোস্টেজ সিচুয়েশনে চূড়ান্ত আক্রমণ চালায় স্পেশাল ফোর্স”‚ ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতেই জবাব দিলো শেহনান। “একটা মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ ছড়াত ঘরটাই। ওই গন্ধ নাকে যাওয়া মাত্রই সেন্স হারাত রমেশ। গোলাগুলির প্রয়োজন পড়ত না‚ সে পালাতেও পারত না।”

সাব্বির মাথা দুলাল—বুঝতে পেরেছে ভঙ্গিতে। পরিকল্পনাটা আলোচনা করা হয়েছিল। কিন্তু এটাকেই কমান্ডো অ্যাটাক বলে তা সে বোঝেনি৷ ওদিকে পেছনে বসা ইব্রাহীম জিভে কামড় দিলো৷ এই পরিকল্পনার কথা তার মাথা থেকে বেরিয়েই গিয়েছিল। ভীষণ লজ্জা আর অপরাধবোধও জাগল মনে৷ আজকের অপারেশন ব্যর্থ হলো একমাত্র তার কারণেই। শেহরোজের মুখপানে তাকাল আড়চোখে। দাড়িভর্তি মুখটার কঠিন গম্ভীরতা দেখেই বুঝে গেল কী সাংঘাতিক রেগে আছে সে। নিশ্চয়ই এও ভাবছে—অপদার্থ যোদ্ধা তার টিমের সদস্যগুলো! এবং এ ভাবনা আসলেই সত্য৷ এসপিওনাজ দুনিয়ার একজন দুর্ধর্ষ স্পাই এজেন্টের কাছে তার মতো অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা অযোগ্যই। এবার আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করছে ইব্রাহীম‚ কেন শেহরোজ একা এই মিশনের দায়িত্ব নিতে চেয়েছিল আর কেন ওদের প্রতি চরমভাবে বিরক্ত ছিল শুরুতে!

***

বেলা ৫:৩০ টা।

মাথার ওপর ফ্যানটা বনবন করে ঘুরছে। থমথমে চেহারায় ফোনটা হাতে নিয়ে বসে আছে শাজ টেবিলের এক প্রান্তে৷ আর অন্য প্রান্তে বসে মোচড়ামুচড়ি করছে ওর দুই ছাত্র-ছাত্রী। সাথে অঙ্কও কষছে।

সেই দুপুরে শাজ ঢুকেছে মিনা আন্টির বাসায়। সে আর ওর ছাত্র-ছাত্রীও একইভাবে বসে আছে এক নাগাড়ে তিন ঘণ্টা। বলা ভালো বসতে থাকতে বাধ্য হয়েছে ওরা৷ কারণ হলো—গত এক মাস সে পড়াতে আসতে পারেনি। তাই জঘন্য বদমেজাজি মিনা আন্টি এক মাসের পড়া ছেলে-মেয়েকে বসিয়ে আজ একদিনেই ওর থেকে আদায় করিয়ে নিতে চায়। কোনোভাবেই সে ওকে সন্ধ্যা ছটার আগে এখান থেকে বের হতে দেবে না। চুপচাপ মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো গতিও নেই। নয়ত তার হেঁড়েকন্ঠশ্রী ওর কানের পর্দা ফাটিয়ে দেবে।

কিন্তু এ মুহূর্তে মিনা আন্টির থেকেও রাগটা কাজ করছে বেশি ওর নিজের চাচার ওপর। একটু আগেই কল করেছিলেন ওকে খালিদ উসমান। তার কলের অপেক্ষায় ছিল শাজ সকাল থেকে৷ তিনি মূলত এতখানিই ব্যস্ত থাকেন নিজের পেশাতে—তাকে কল করা মাত্রই ফোনের ওপাশে পাওয়া মুশকিল৷ অথচ ঝুমা শেখ তাকে যখন তখন কী করে ফোনে পায় কে জানে!

চাচার সঙ্গে কথা বলেছে শাজ দক্ষিণখানের বাড়িটির ব্যাপারে। শেহরোজকে কেন তিনি বাড়ি ভাড়া দিতে গেলেন তা সে জিজ্ঞেস করতেই জানালেন খালিদ সাহেব‚ “ঝুমার রিকুয়েস্টে রাজি হতে বাধ্য হলাম‚ আম্মু। সেদিন হঠাৎ ফোন করেই ভাই…ও ভাই করে উঠে এমনভাবে রিকুয়েস্ট শুরু করল ওই ছেলের জন্য! তুই তো জানিস ওর নাটুকে স্বভাব। আমি পাছে বললাম ছেলের খোঁজ খবর না নিয়ে আর তোর পারমিশন না নিয়ে রাজি হতে পারছি না। তো ছেলের যা ব্যাকগ্রাউন্ড জানাল তাতে মনে হলো ভালো সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে। আমি সময় চেয়ে ওর ভার্সিটিতে ওর ব্যাপারে খবরও নিতে পাঠিয়েছিলাম। বছর দুই ধরে মানুষ বিশ্বাস করা তো মুশকিল৷ কিন্তু ওই ছেলের ব্যাপারে বেশ ভালো রিপোর্টই পেলাম।”

“সে বাকিংহাম প্যালেসের প্রিন্স উইলিয়াম হোক”‚ দাঁত চেপে কটমটিয়ে বলে উঠল শাজ। “তাও তোমার রাজি হওয়া উচিত হয়নি‚ কাকু। কীভাবে পারলে আমার ইমোশনকে হার্ট করতে?”

“আহা সোনা! রাগ কোরো না‚ বাচ্চা। আমি অনেক চিন্তাভাবনা করেই রাজি হয়েছি৷ মূলত রাজি হতে বাধ্য করেছ তুমিই। ঝুমা বলল সেদিন কারা যেন তোমার ওপর অ্যাটাক করেছিল‚ তোমাকে তুলে নিয়ে যেতে চাইছিল তারা। আমি এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে বলেছি আমার পরিচিত কিছু লোককে। তারা যতদিন না এ ব্যাপারে কোনো ভালো খবর দিতে পারছে‚ ততদিন আমি তোমার বাইরে বের একা যাতায়াত অ্যালাও করছি না। তাছাড়া তুমি হুটহাট একা একা ওই বাড়িতে গিয়েও থাকছ আজ-কাল৷ আমি আগেই বলেছিলাম ওখানে থাকতে হলে তোমাকে তোমার দাদী আর কেয়ারটেকার মঞ্জুরকে নিয়ে থাকতে হবে৷ কিন্তু তুমি সেটা মানছ না৷ ওখানে তুমি একা গিয়ে এক সপ্তাহ কেন‚ তোমাকে একদিন থাকতে দিতেও রাজি না আমি। আবার তুমি তোমার দাদীকে নিয়ে থাকতেও চাইছো না। তাই চিন্তা করলাম তোমার ওখানে একা থাকাটা বন্ধ করতে হলে ঝুমার কথামতো ভাড়া দিয়ে দেওয়ায় ভালো। আর আরেকটা নির্দেশনা তোমার জন্য। আপাতত ভার্সিটি যাওয়াটা বন্ধ রাখতে হবে তোমাকে৷ পড়াশোনা থেকে জীবনের মূল্য বেশি। এই বিপদ না কাটা পর্যন্ত তুমি কোথাও বের হতে পারবে না একা একা।”

এইতো! এরপরই চাচার সঙ্গে শাজ পনেরো মিনিট যাবৎ তর্কবিতর্ক করে এক অদ্ভুত হুমকি দিয়ে চাচার সিদ্ধান্তের কাছে হার মানে। ওর হুমকি—শেহরোজ ওই বাসাতে থাকলে সেও গিয়ে থাকতে শুরু করবে ওখানেই৷ তখন চাচা কী করে শেহরোজকে ওর সঙ্গে একই ছাদের তলায় সহ্য করেন সেটাই দেখবে সে। কিন্তু এই হুমকির চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার হলো—খালিদ উসমান এ কথাগুলো শুনেও কোনো তোয়াক্কাই করেননি। আর তাতেই জেদটা আরও বেশি চেপে গেছে শাজের মনে। ওই বাড়িতে সে শেহরোজকে কখনোই মানবে না। উচ্ছেদ করিয়েই ছাড়বে সে শেহরোজকে। কঠিন এই জেদ থেকেই শাজ দখল করতে ছুটবে নিজের বাড়িকে—এ কথা খালিদ সাহেব ভালোই জানেন।

মাঝেমধ্যেই শহরের বাইরে সম্পূর্ণ একা সময় কাটানোর হুজুগ চাপে ওর। যেহেতু ঢাকার বাইরে কোথাও একা যাওয়ার অনুমতি‚ সুযোগ‚ কোনোটাই নেই। তাই যখন মন চায় তখনই সে চলে যায় দক্ষিণখানে নিজের একাকী পড়ে থাকা বাড়িটাতে। তারপর যে কদিন ইচ্ছা হয় সে কদিন একার মতো একা কাটায় ওখানে৷

তবে শাজের হুমকিকে তোয়াক্কা না করার কারণ‚ খালিদ উসমান নিজেই চান শাজ ওই বাড়িতেই থাকতে শুরু করুক। সেখানে কেবল শেহরোজই তো থাকছে না৷ আড়ালে সাব্বির ওরফে শাজের একমাত্র ভাই আইয়াজও থাকছে।

গুলিস্তানে শাজ আর এখন নিরাপদ নয় এবং ওখানে নিরাপত্তার বেষ্টনী দেওয়াও সম্ভব নয় ওকে৷ কিন্তু এই মুহূর্তে এসবের কোনো কথায় আপাতত ওকে বুঝতে বা জানতে দেওয়াও চলবে না৷ বরং শেহরোজের পরিচয় জানলেই বিচ্ছিরিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে শাজ৷

শেহরোজকে অবিশ্বাস তো করবেই—খালিদ উসমান আর আইয়াজকেও ভুল বুঝবে ও। আইয়াজকে তো শাজ রীতিমতো পরই ভাবে। কারণ‚ বাংলাদেশের চেয়েও পরদেশ আমেরিকাকেই আপন মানে আইয়াজ।

এবং খালিদ সাহেব যথেষ্ট জানেন ভাতিজির রাগ‚ অভিমান আর জেদ কেমন। যে সত্য মেয়েটা তাকেও জানাতে ভরসা পায়নি—তা উদ্ঘাটন করতেই ভিনদেশী স্পাই এজেন্টকে পাঠিয়েছেন তিনি। এ কথা জানা মাত্রই যে শাজ রাগে-দুঃখে সব লণ্ডভণ্ড করে ফেলবে।

ঠিক সন্ধ্যা ছটাতেই শাজ মুক্তি পেলো দজ্জাল মহিলা মিনার থেকে৷ বাসা থেকে বের হওয়ার পর রাস্তায় এসে উঠতেই ওর চলা থেমে গেল সামনে এক সিএনজি চালককে দেখে। “এটা সেদিনের সেই লোকটাই তো! বাহ্‚ আবার দেখা হয়ে গেল?” মনে মনে বলে সে এগিয়ে এলো সিএনজির কাছে‚ “আসসালামু আলাইকুম‚ মামা। চিনেছেন আমাকে?”

কর্নেল রাশিদ কপট চমকানোর ভঙ্গিতে তাকালেন। কয়েক মুহূর্ত শাজের মুখপানে চেয়ে চিনতে চেষ্টা করার নাটকটাও করলেন নিখুঁতভাবে। তারপর হঠাৎ ফিক করে হেসে বললেন‚ “আম্মাজান আপনে? ওয়ালাইকুমসসালাম। ভালা আছেননি? আসেন আসেন উইডা পড়েন। দ্যাকছেন আল্লাহই আবার আমাগো মুলাকাত করাইয়া দিলো?”

শাজ মুচকি হেসে উঠে পড়ল ভেতরে৷ “ঠিকই বলেছেন। আজকে গুলিস্তান চলেন।”

“আইচ্ছা। আইজক্যা কিন্তু আপনের সেদিনের বাড়তি ট্যাহা ফেরত দিমু।”

না করতে গিয়েও করল না শাজ কর্নেলের গলায় জেদ বুঝতে পেরে। জবাবে হাসল শুধু৷

পরমুহূর্তে বাসায় পৌঁছেই সে তাড়া দিলো দাদীকে—জামা-কাপড় গোছগাছ করে নেওয়ার জন্য৷ ইতোমধ্যে আয়শা খাতুনকে খালিদ সাহেব রাজি করিয়ে নিয়েছেন শাজ বাসায় ফেরার পূর্বেই৷ তাই কোনো কথা বাড়ালেন না বৃদ্ধা৷ একদম রাত আটটার মাঝে জরুরি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে শাজ বেরিয়ে পড়ল বাসা থেকে। ঝুমা শেখকে কোনো প্রকার বিদায় জানিয়ে এলো না সে‚ কেবল মহিলা শেহরোজের পক্ষে থাকার জন্য। তবে সে জানে‚ মহিলা রণচণ্ডী হয়ে কালকের মধ্যেই পৌঁছে যাবে দক্ষিণখানের বাড়িতে।

খয়েরী রঙা হ্যাচব্যাক গাড়ির বুটে সমস্ত জিনিস নিজেই তুলে দিয়ে শাজ বসল গিয়ে ড্রাইভিং সিটে। আজ গাড়ি চালাবে সে-ই। কারও কোনো সাহায্য নেবে না৷ পাশের সিটে দাদী কোলে বুস্তানকে নিয়ে বসেছেন। গ্যারেজ থেকে বেরিয়ে ওর হ্যাচব্যাক রাস্তায় ওঠা মাত্রই পেছন পেছন চলতে শুরু করল সাদা টয়োটা৷ এবং চালকের স্থানে আইয়াজ আর তার পাশেই বসা কর্নেল রাশিদ।

***

নক্ষত্রনিবাসের বেসমেন্টটা মোটামুটি বড়োই। যেখানে পাঁচজন পুরুষ আরামেই থাকতে পারছে‚ ঘুমাতে পারছে। যেমন এ মুহূর্তে বিছানায় চিৎপটাং হয়ে আছে আহত আকাশ। আর তার ড্রেসিং বদলে দিচ্ছে মেডিক ইব্রাহীম। ভোররাতে ব্যর্থ মিশন থেকে ফিরেছে ওরা সবাই৷ তারপর গুলিবিদ্ধ শেহনান আর আকাশের গুলিগুলোকে ইব্রাহীম বের করে ফেলার পর পালাক্রমে ওদের সেবাশুশ্রূষা করেছে সবাই মিলেই। তবে ওদেরকে মুগ্ধ করে হান্টার টিমের মেজাজি কমান্ডার শেহরোজই বেশি পাশে থেকেছে আহত সঙ্গীদের। এজন্য বাকি সবার ঘুম পরিপূর্ণ হলেও তার ঘুমটা ঠিকঠাক হয়নি৷

বিকাল চারটার দিকে শেহরোজ বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল। এখন বাজে রাত দশটা প্রায়৷ বালিশের পাশে রাখা ফোনটা হঠাৎ ভাইব্রেট করে ওঠে তার। গভীর ঘুমে তলিয়ে থাকলেও বিছানা কেঁপে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঝট করে চোখ মেলল সে—সহজাত অভ্যাস। সাব্বির কল করছে। বিরক্তি নিয়ে ফোন কানে ঠেকাল‚ “বলো কতদূর?”

“আর মাত্র সাত-আট মিনিট‚ ভাই৷ ইব্রাহীম ভাই রেডি আছে তো?”

“বেসমেন্টের ঘরে মনে হয়। ডাকছি আমি।”

সাব্বির ফোন কাটলে বিছানা ছাড়ল শেহরোজ। ইব্রাহীমকে কল করতে করতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। চোখদুটো রক্তজবার মতো লাল হয়ে আছে তার। অপারেশন সফল হয়নি আবার ঘুমটাও ঠিকঠাক হয়নি বলে মেজাজটা বেশ খিটমিট হয়ে আছে। ইব্রাহীম ফোন রিসিভ করলে তাকে বলল‚ “শাজ বাসার কাছাকাছিই। আপনি রেডি?”

“চুলে তেল লাগানো শেষ হলেই রেডি‚ ক্যাপ্টেন।”

“ওয়ান মিনিট বরাদ্দ”‚ বলেই ফোনটা কেটে সে ঘরের স্লাইডিং ডোর খুলে চলে এলো ছোটো সুইমিংপুলটার কাছে।

উন্মুক্ত গা‚ পরনে কেবল হাফ প্যান্ট‚ আর সব সময়ের ঝুঁটি বাঁধা চুলগুলো খোলা। হিমেল হাওয়ায় তা উড়ছে এলোমেলো। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে শেহরোজ মুখ তুলে চেয়ে আছে আকাশপানে। আজ বিশাল এক চাঁদ উঠেছে। চাঁদের রুপালী আলোয় চিকচিক করছে পুলের পানি। এ বাড়ির চারপাশে বেশ উঁচু করেই পাঁচিল তুলে দেওয়া। তাই নিজের সীমানার মাঝে ওমর সাহেব গাছ লাগিয়েছেন স্বাধীনভাবে। যেদিকেই চোখ যায় সেদিকেই চোখে পড়ে দেবদারু‚ নিম‚ সুপারি‚ নারিকেল‚ কৃষ্ণচূড়া‚ কাঁঠাল‚ লিচু আর আম গাছও। শহরের কাছাকাছি এমন সবুজ প্রকৃতির মাঝে এই নক্ষত্রনিবাস যেন সত্যিই স্বপ্নমহল। লম্বা করে শ্বাস টেনে নিলো শেহরোজ। মনটা একটু ভালো লাগছে। পুরোপুরি ভালো করার জন্য সাঁতরানোর সিদ্ধান্ত নিলো সে। নিমিষেই ঝাঁপিয়ে পড়ল পুলের মাঝে।

ওদিকে‚ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শাজ বিরতিহীন কলিংবেল চাপতে শুরু করল। তা দেখে দাদী ধমকে উঠলেন‚ “এই ছেড়ি‚ থামেক! কেয়াটিকার আসব তো না-কি?”

কথাটা শাজ কানেই তুলল না। গাড়ি থেকে নামার পরই ওর মনে হয়েছে বিরাট এক ভুল করে ফেলেছে সে আরও দ্রুত না এসে। তখন থেকেই বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছে‚ “আমার পুল… আমার পুল!” শেহরোজ এ বাসার কোন ঘরটি দখল করেছে—মূলত এই চিন্তাতেই ও অস্থির।

দরজাটা খুলে ওদের সামনে দাঁড়াল ইব্রাহীম। পরনে তার চেক লুঙ্গি আর হাফ হাতা হলুদ গেঞ্জি৷ চুলে মাখা একগাদা সরিষা তেল৷ তা আবার পরিপাটি করে এক পাশে সিঁথি কাটা‚ তার ওপর দেওয়া মাথায় টুপি। দুপুর থেকে পান চিবুতে চিবুতে মোটামুটি একটা লালচে রং এনেছে ঠোঁটে আর দাঁতে। এমনকি এ মুহূর্তেও তার মুখের ভেতর পান গোঁজা। সেটা গালের এক পাশে জমা করে লম্বা এক সালাম দিলো আয়শা খাতুনকে‚ “কিমুন আছেন‚ ও খালা? আমি বাবর। চিনবের ফারছেননি?”

কানে কম শুনলেও চোখে ঠিকঠাকই দেখেন বৃদ্ধা। তাই মোটেও চিনলেন না ইব্রাহীমকে‚ চেনার কথাও না৷ তবুও তার দুর্বল স্মৃতিশক্তির সুযোগ নিয়ে ইব্রাহীম গড়গড় করে মিথ্যা আরম্ভ করল‚ “আমি আফনের গিরামেরই ছাওয়াল‚ খালা। খালিদ ভাই কইছিল মঞ্জুর ভাইরে থাকপার। মঞ্জুর ভাই ব্যবসা ধরিছে তো৷ তাই হেতে আমারে এহানে কামে লাগায় দেছে।” বলা শেষেই দন্তবিকাশ হাসি দিলো সে৷ আর সেই হাসি দেখে শাজ বিরক্ত এবং অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠল‚ “বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে বায়োডাটা দিচ্ছেন আপনি?”

অর্ধেক বের করা জিভ কেটে কানে ধরল ইব্রাহীম। জলদি দুজনের মালপত্র ভেতরে আনা শুরু করলে শাজ স্কার্ট হালকা তুলে ধরে ছুটল ওর ভাইয়ের ঘরটাই৷ যে ঘরটা আইয়াজের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন ওমর সাহেব৷

“আমার পুল! ইয়া আল্লাহ‚ আমার পুল কি সহিসালামত আছে?” বলতে বলতেই আইয়াজের ঘরে ঢুকল শাজ। এক সেকেন্ড দাঁড়াল না স্লাইডিং ডোর খোলা দেখতে পেয়ে। দৌড়ে বেরিয়ে এলো সে ছাদে৷ আইয়াজের ঘরটা ছাদের সঙ্গেই সংযুক্ত। আর ছাদেই ছোটো পুলের ব্যবস্থা করেছেন ওমর ছেলে-মেয়ে আর সব থেকে বেশি বউয়ের শখকে মাথায় রেখে৷ বউ না থাকলেও ছেলে-মেয়ে তো আছে। এই ভেবেই বড়ো ভাইয়ের থেকেও অর্থ সাহায্য নিয়ে বাড়িটাকে স্বপ্নের মতোই বানিয়েছেন তিনি।

ছাদের আলো নেভানো থাকলেও চাঁদের আলোয় শাজ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে—গৌর বর্ণের কোনো এক পুরুষ পুলের এপাশ থেকে ওপাশ কী দারুণ ভঙ্গিতে সাঁতরে চলেছে। মুগ্ধই হলো সে৷ এত ভালো সাঁতার সে জানে না বলেই কি? উহুঁ‚ ভেজা শেহরোজকে চিনতে ওর অসুবিধা হয়নি৷ এমন পেশীবহুল বলিষ্ঠ শরীরের পুরুষকে খোলা বেশে দেখে প্রেমে পড়ার আগ মুহূর্তে নারী মন যেমন মুগ্ধ হয়‚ সেও হয়েছে তাই। কী এক আবেশে ডুবে অজান্তেই মন্থর পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল সে পুলের পাড়ে। নির্নিমেষ দেখল কিছুক্ষণ শেহরোজকে। তারপর দেখল পূর্ণ নক্ষত্ররাজকে আর ঝিরঝিরে বাতাসে দোল খাওয়া প্রকৃতিকে। শেহরোজের কাছাকাছি এলেই বুকের ভেতর কেন যে ডামাডোল শুরু হয়! সেই ডামাডোলে সব কিছুই ওলট-পালট হয়ে যেতে চায়।

মুখে অকস্মাৎ পানির ঝাপটা এসে লাগল শাজের আর অমনি ছিটকে বেরিয়ে এলো সে এলোমেলো অনুভূতির কল্পজগত থেকে।

“হচ্ছেটা কী‚ হুঁ? কতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে এভাবে দেখছ আমাকে?” হাত পানির ওপর দু পাশে মেলে দাঁড়িয়ে পড়েছে শেহরোজ।

তার অমন সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়ে শাজ বিব্রত হলো‚ “দেখছি মানে? কীভাবে দেখছি?”

“দ্য ওয়ে নটি গার্লস লুক উইথ নটি আইস।”

অপ্রতিভ শাজ ব্যাপারটাকে চাপা দিতে দ্রুত গম্ভীর হলো। “আমার পুলে আপনি কী করছেন সেটা বলুন”‚ রূঢ়তার সঙ্গে বলে উঠল। “বাড়ি ভাড়া পেয়েছেন বলে বাড়ির যেখানে খুশি সেখানে প্রবেশাধিকার আপনাকে দিচ্ছি না‚ বুঝেছেন? ফার্স্ট টাইম ছাড় দিলাম। সেকেন্ড টাইম ভুল রিপিট হলে তখনই বেরিয়ে যেতে হবে কিন্তু।”

শান্ত‚ নির্বিকার চেহারায় শেহরোজ কয়েক পল শাজকে দেখে হঠাৎ এগিয়ে এলো ‚ যেখানে শাজ দাঁড়ানো। জিজ্ঞেস করল‚ “বেরিয়ে যেতে হবে? কোথায় বেরিয়ে যেতে হবে?”

“কোথায় আবার? এ বাড়ির বাইরে।” শেষ কথাটা কিন্তু সম্পূর্ণ বলার সুযোগ পেলো না শাজ৷ তার আগেই নাকে-মুখে গলগলিয়ে পানি ঢুকতে আরম্ভ করল ওর৷ পাশেই শেহরোজ দাঁড়িয়ে ওর নাকানিচুবানি খাওয়া দেখতে থাকল চুপচাপ৷ কথাটা শেষ করার আগেই ওর পা টেনে ধরে পানিতে ফেলে দিয়েছে সে। মেজাজটা ঠিকঠাক হয়নি তার এখনো৷

#নোট__ বলে রাখি‚ আর হয়তোবা ৬/৭ টা পর্ব বাকি আছে। আজকের পর্ব থেকে শেষ পর্ব অবধি শাজ আর শেহরোজের কেমিস্ট্রি চলবে পুরোদমে৷ আর এর মাঝেই চূড়ান্ত অ্যাকশন চলে আসবে‚ রহস্যের জটও খুলে যাবে।

টাইপো “মাকসুদা রত্না”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here