#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(৩)
…
তীব্র চাবুকের আঘাত করার মতো শব্দ ভেসে আসছে কানে ।হুর মাত্রই উঠে দাঁড়িয়েছে এই জায়গা থেকে বের হওয়ার জন্য। শব্দ গুলো কেমন কানে এসে বাড়ি খাচ্ছে। গাড়িগুলো বাড়ির বাহিরেই দাঁড়িয়ে আছে । হঠাৎ একটা মেয়েলি চিৎকার আর একটা পুরুষ এর আর্তনাদ এসে কানে বাড়ি খেলো ।
হুর চমকে উঠলো , মানুষের এমন আর্তনাদ ভেসে আসার কারন কি? ধীরে ধীরে সেদিকে এগিয়ে গেলো , পা কাপছে , গাড়ি দুটি কে পাড় করে বাড়ির সামনে যেতেই বুঝতে পারলো শব্দ বাড়ির পেছনে থেকে আসছে।
হুর সেদিকে যেতেই থ কতোগুলো রক্ত ছিটকে এসে মুখে লাগলো , কপাল মুখ রক্তে মেখে গেলো ।
হুরের রক্তে ভয়ঙ্কর ফোবিয়া আছে , সামনে এতো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি দেখে সাথে নিজেকে যমদূত এর সামনে আবিষ্কার করলো ।
ভগ্য তাকে সেখানেই কেন দাঁড় করায়? নিজের অবস্থান ভুলে চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়লো , হাত পা থর থর করে কাপছে ।নিজেকে বুঝাতে চাইছেন এটা সত্য না। সম্পূর্ণ মিথ্যা এটা , এটা সত্য হলে তার আর মুক্তি নেই।
নওশাদ তীক্ষ্ণ চোখে পর্যবেক্ষণ করলো হুরের সব কার্যক্রম, ইতিমধ্যেই চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে । ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে এক হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে পড়লো।নিজের হালকা চাপ দাড়িতে হাত দিয়ে কতক্ষন তাকিয়ে থাকলো হুরের দিকে ।
হুর মাটির দিকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নওশাদ এর দিকে তাকালো চোখ দিয়ে লবন পানির সমুদ্র বয়ে যাচ্ছে।
নওশাদ আচমকা হুরের মাস্ক এর উপর দিয়ে গাল চেপে ধরলো ।দেখা হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত সে হুরের চেহারা দেখার প্রয়োজন বোধ করেনি । হুরকে বোরকা পরা অবস্থায় দেখে চিনে ফেলেছে নওশাদ।এখনোও হুরকে দেখার প্রয়োজন মনে করলো না । প্রতিবারের মতোই ভুল বুঝে বসলো ।
নওশাদ – শিক্ষা হয়নি না? আমাকে ফলো করে এখানেও এসে পড়েছো।বাহ! তোমরা মেয়েরা এতো লোভী কেন ? ক্যামেরা কোথায় রেখেছিস?
আচমকা নওশাদ হিংশ্র হয়ে প্রশ্ন টা করে হুরকে মাটির সাথে চেপে ধরলো ।হুর কেমন নিশ্চুপ হয়ে আছে , কোনো ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছে যেন ।হাত পা ছেড়ে দিয়েছে ।
দৃষ্টি স্থির, হঠাৎ হুরের শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক ভাবে চলতে শুরু করলো , ছটফটাতে শুরু করলো ।
এদিকে নওশাদ সেদিকে কোনো তোয়াক্কা না করে প্রশ্ন করলো- পালিয়েছিস কীভাবে? কে তোকে পাঠিয়েছে বল।নাহলে আজ তোকে জানে মেরে ফেলবো ।
ছটফট করতে করতে হুরের চোখমুখ উল্টে এলো , নওশাদ এর খেয়াল হলো , ও এই মেয়েটাকে এখন মারতে চায় না , কে হুর কে পাঠিয়েছে তা না জানা অবধি ও হুরকে মরতে দেবে না ।
সুরকে এক ঝটকায় উঠিয়ে বসালো ।এখোনো হুরের দৃষ্টি থেমে আছে , নওশাদ কে এখন সে প্রচন্ড ভয় পাচ্ছে ।
নওশাদ একটানে হুরের মাস্ক টা খুলে ফেললো ।হুর দূর্বল হাতে নওশাদ কে থামাতে চাইলো কিন্তু পারলো না ।
শুধু বিড়বিড় করে বললো- আমার শরীর এর একাংশও যদি কোনো পরপুরুষ দেখে আমি আত্মহত্যা করবো ।
বিড়বিড় করে বললেও সম্পূর্ণ কথাটা নওশাদ শুনতে পেলো ।এই প্রথম বারের মতো সে হুরের মুখের দিকে তাকালো । রক্তমাখা মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই ।তবে হুরের এই কথাটা তাকে কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও অবাক করলো ।
নওশাদ এর সঙ্গীরা এতোক্ষণ তার পেছনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। একজন হঠাৎ বললো – স্যার একে আমাদের হাতে ছেড়ে দিন , মেরে গুম করে দেব ।
এই কথাটা শুনে নওশাদ অবচেতন মনেই কঠোর কন্ঠে বলে উঠলো – সবার চোখ নিচে , আমি এখান থেকে না যাওয়া পর্যন্ত কেউ চোখ তুলে তাকালে তার লাশ ফেলতে দুবার চিন্তা করবো না আমি ।
নওশাদ হুর কে পাঁজাকোলা করে তুলে গাড়িতে শুইয়ে দিয়ে নিজেই অবাক হয়ে গেলো একটু আগের নিজের বলা কথাটা ভেবে ।
গার্ড দের দিকে তাকিয়ে বললো- বাকি কাজটা তোমরা শেষ করে দ্রুত ফিরে আসো ।
সকলে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল নওশাদ এর যাওয়ার দিকে নওশাদ এর হঠাৎ করে বলা কথাটা সকলকে বেশ অবাক করেছে।
নওশাদ গাড়িতে বসে ড্রাইভ করতে করতে তার পিএ আয়ান কে কল দিলো ।
আয়ান – হ্যাঁ বস বলেন ।আমি এখুনি পোড়াবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি পাঁচ মিনিট লাগবে ।
নওশাদ গম্ভীর কন্ঠে বললো- হসপিটাল এ ফোন দিয়ে ভিআইপি কেবিন আর ফিমেল ডাক্তার রেডি রাখ। অবশ্যই চারপাঁচজন ।আমি পাঁচ মিনিট এ সেখানে পৌঁছাচ্ছি ।
বলেই ফোনটা কেটে দিল , পেছনে তাকিয়ে একবার হুর কে দেখতেই হকচকিয়ে গেলো , মুখটা কেমন বেঁকে হালকা ফ্যানা বের হচ্ছে।চোখের মনি ফ্যাকাশে।
নওশাদ এর মনে হলো বড়ো প্রমাণ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিলো ।
….
হুর কে ভিআইপি কেবিন এ রাখা হয়েছে ।এই হসপিটাল টা নওশাদ দের নিজেদের। বেষ্ট ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা করা হলো । কিছুক্ষন পর একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলো । নওশাদ কিছু জিজ্ঞেস করলো না , ইয়ান গিয়ে জিজ্ঞেস করলো ।
– ডাক্তার ম্যাম এর কি অবস্থা?
ডাক্তার কে একটু চিন্তিত দেখালো , তিনি উত্তর দিলেন – বাচ্চা একটা মেয়ে , ওনার রক্তের ফোবিয়া আছে , তাছাড়া উনি প্রচুর ভীতু। বড়োসড়ো স্ট্রোক হতে হতে বেঁচে গিয়েছে ।মিনি স্ট্রোক করেছেন তিনি । আপাতত চব্বিশ ঘন্টা অবজারভেশন এ রাখতে হবে ।
নওশাদ চমকে তাকালো – বাচ্চা মেয়ে?
ডাক্তার অবাক হয়ে বললো- সেকি স্যার আপনি আপনার স্ত্রীর বয়স জানেন না? আমি যেটা বুঝলাম উনার বয়স উনিশ কি বিশ বছর বয়স হবে ।উনি মানসিক ভাবে খুব দূর্বল, তাই আপাতত কিছু বলতে পারছিনা, কোমায় ও চলে যেতে পারে ।
ডাক্তার এর প্রথম দিকের কথা শুনে নওশাদ রেগে দাঁতে দাঁত চেপে বললো – তো এবার মানুষ এর বয়স হিসেব না করে চিকিৎসা করুন গিয়ে, পরে দেখা যাবে আপনার আয়ু হিসেব করা লাগবে আমার।
ডাক্তার নওশাদ এর কথায় ভয় পেয়ে চলে গেলো । নওশাদ হসপিটাল থেকে বের হয়ে গেলো ।বাসায় যাওয়া টা জরুরি নূর এর কথা মাথায় আসলো ।মেয়েটাকে দেখে না অনেক্ষণ হলো ।হয়তো ঘুমচ্ছে , নূরের মিষ্টি চেহারা টা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই নূরকে দেখার তৃষ্ণা বেড়ে গেলো ।
দ্রুত ড্রাইভ করে বাড়ির দিকে যেতে লাগলো।
…
শাওয়ার নিয়ে বের হলো নওশাদ, কোমড়ে এখনো টাওয়েল জড়ানো ।একটু অন্যমনস্ক লাগছে তাকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছে নিল ।
এরপর হঠাৎ হাতের দিকে তাকালো । সেখানে ছোট্ট একটা আঁচড়ের দাগ।
হুর নিজেকে বাঁচানোর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা করেছিল ।
হুরের কথা মনে উঠতেই কানে একটা কথা বাড়ি খেল – “বাচ্চা একটা মেয়ে ”
নীল রাঙা শার্ট টা গায়ে জড়িয়ে সাদা ট্রাউজার পড়ে , নূরের রুমে গেলো । গিয়ে দেখলো তার পাখি উঠে গিয়েছে ।
দুজন স্টাফ মুখ কালো করে বসে আছে । নওশাদ যেতেই তারা মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলো ।মুলত তারা ভয় পাচ্ছে যে হুরের পালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের কথা শুনতে হবে ।
নওশাদ গিয়ে তার পরী কে কোলে নিলো, বাবাকে দেখে দুহাত এগিয়ে দিলো নূর – আব.. আবাআ,আবিইই।
নওশাদ মেয়ের গালে টুপ করে একটা চুমু খেলো ।
– পাপা এসে গেছি প্রিন্সেস।চলো তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাই ।আজ তো তুমি দ্রুত ঘুমাবে বলে মনে হয় না ।পাপার সাথে গল্প করবে কেমন ?
নূর ছোট্ট দুই হাতে নওশাদ এর গলা জড়িয়ে আছে ।মুখ ঘসছে নওশাদ এর বুকে । নওশাদ ও তার ছোট্ট পরী কে বুকে জড়িয়ে রাখলো ।
যেতে যেতে খাবার নিয়ে বসে থাকা মেহেরিন মির্জা কে বলে গেলো সে খাবে না । তার জন্য যেন বসে না থাকে ।
মেহেরিন মির্জার মুখ কালো হয়ে গেলো । প্রতিদিন ছেলের একই উত্তর,তিনি প্রতিদিন ই আশা করে বসে থাকে হয়তো ছেলে কখনো বসে তার সাথে খাবে , গল্প করবে ।
দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ,সে রাস্তা সে নিজেই বন্ধ করেছিল, ভাবতেই বুকটা হাহাকার করে ওঠে। নিজের দোষ এ আজ এতোকিছু দেখতে হচ্ছে।
চলবে কি?
মিহিকা রোজা- Black Rose
রেসপন্স করবেন সবাই । শেয়ার, কমেন্ট, রিয়েক্ট করতে ভুলবেন না । এগুলো আমাকে অনুপ্রাণিত করে । আপনাদের জন্য এই গল্প চালিয়ে যেতে পারবো যতক্ষণ রেসপন্স করবেন।

