#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(১৭)
…
ভোর হয়েছে হুর সবে নামাজ পড়ে উঠলো , ঘুমিয়েছিল একা বিছানায় আর ঘুম থেকে উঠেও কোথাও দেখতে পেলো না ।মনটা অজানা কারনে খুব খারাপ হয়ে আছে ।কেন যেন মনে হচ্ছে এই বিয়েটা হওয়া উচিত হয়নি ।কাল হয়তো নিজেদের বাড়িতে যেতে পারবে ।ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করলো । তবুও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।তার কিছুই ভালো লাগছেনা।
ফ্লোরে বসে মুখ চেপে ধরে কান্না করতে লাগলো , তখুনি রুমে আর্থার প্রবেশ করলো , চোখদুটো টকটকে লাল হয়তো সারারাত ঘুমায়নি ।হুরকে কান্না করতে দেখে দৌড়ে ওর কাছে চলে গেলো ।
হুরের সামনে হাটুগেড়ে বসে পড়লো , হুরের মুখটা দুহাতে ধরে বললো- কাঁদছো কেন মেয়ে , আমি এখানেই আছি , ভয় পাচ্ছো?
হুর আর্থার এর দিকে তাকিয়ে কান্নার গতি আরোও বাড়িয়ে দিলো , আর্থার ঘাবড়ে গেলো , মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করতে মন চাইলো , কিন্তু নিজের ইগো আর গম্ভীর স্বভাব এর জন্য তা পারলো না।
হুর কান্না করতে করতে বললো- আপনি আমাকে একা রেখে কোথায় চলে গিয়েছিলেন? আমার ভয় লাগছিল অনেক।
আর্থার ফোস করে শ্বাস ছাড়লো , একটা বাচ্চা মেয়েকে বিয়ে করেছে সে , এখন পেলে পুষে বড়ো করতে হবে তাকেই ।
– এই মেয়ে এদিকে তাকাও।
হুর ভেজা চোখে আর্থার এর দিকে তাকালো , আর্থার- এতো ভয় কিসের? এখানে কোনো বাঘ ভাল্লুক কিছুই নেই ।
হুর চমকে তাকালো , এরপর আর্থার এর থেকে দূরে সরে গেল, ফট করে বলে ফেললো – আপনাকেই ভয় লাগে , আপনি মানুষ খুন করেন , আপনার আরোও একজন স্ত্রী আছে , আপনার মেয়েও আছে ।
আর্থার শান্ত চোখে হুর কে দেখলো , হুরকে কন্ট্রোল এ আনাটা খুব জরুরী, আর্থার হুরের কাছে গিয়ে হুরের মাথাটা নিজের বুকে আগলে ধরলো , আর্থার এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে এটা করতে তার খুব বিরক্ত লাগছিল কিন্তু হুরকে শান্ত করতে হবে ।
– মেহবুবা আমি যা বলবো চুপচাপ শুনবে ।একটাও কথা বলবে না।
হুর বিড়াল ছানার মতো চুপ করে থাকলো , আর্থার বলতে শুরু করলো – দেখো আমি একজন সিক্রেট পুলিশ অফিসার এটা কেউই জানে না , ঐ বাড়ির ছেলে খুব বড়ো একটা ক্রিমিনাল তাই ওকে আটকে রেখে আমি ওর জায়গায় মেহেরিন মির্জার ছেলে সেজে আছি কারন এখানে আমার একটা মিশন আছে । এখন তুমি বলবে ওরা আমাকে চিনতে পারলো না? না চেনে নি কারন ঐ বাড়ির ছেলের চেহারার সাথে আমার চেহারার মিল আছে ।আর ঐ যে মেয়েটাকে দেখলে যাকে ডিভোর্স দিয়েছি ভেবেছো ও আসলে ঐ বাড়ির ছেলে নওশাদ এর স্ত্রী নাবিলা, নাবিলা ওর মেয়েকে ফেলে চলে গিয়েছিল , আর এই ডিভোর্স টা একটা নাটক ছিলো উনি আমার স্ত্রী না ।তুমিই আমার প্রথম স্ত্রী।
হুর সব শুনলো চুপ করে , ওর বিশ্বাস হচ্ছিল না , – মাম্মা পাপা জানে? আর আপনি যে খুন করেছিলেন?
আর্থার এর ইচ্ছা করলো হুর কে ইচ্ছা মতো দুইটা থাপ্পড় মারতে এতো প্রশ্ন কেন করবে – হ্যাঁ জানে , আর খুন যাদের করেছি ওরা খারাপ মানুষ ছিলো , আমার ক্ষতি করতে চেয়েছিল।
হুর – খুন করলে অনেক গুনাহ হয় , আপনি আর ওদের মারবেন না , ওদের আল্লাহ শাস্তি দেবেন।
আর্থার হুর করে সরিয়ে বললো – ঠিক আছে ।
হুর এবার খুশি হলো , এরপর মুখ ভার করে বললো , – শুনুন হাসবেন্ড আমার না মাম্মা পাপার কথা মনে পরছে , আচ্ছা আমরা কি এখানেই থাকবো? ঐ বাড়িতে কি যাবেন আর? ঐ বাড়ির ছেলেকে কি করেছেন? ওনার বাবা মা কি ওনাকে খুঁজবে না? আপনি ওনাদের ছেলে না সেটা কি ওনারা জানেন?
আর্থার – একটু চুপ করে শান্ত হয়ে থাকো সব বুঝবে সময় হলে ।
হুরকে একটা চকলেট ধরিয়ে দিয়ে আর্থার গেলো শাওয়ার নিতে , শাওয়ার নিয়ে ট্রাউজার পড়ে বের হলো ভুলে ।
হুর সেদিকে হা করে তাকিয়ে রইল, আর্থার সেদিকে খেয়াল না করে একটা শার্ট নিলো পড়ার জন্য, এরপর হুরের দিকে খেয়াল হতেই বললো- এদিকে এমন হা করে তাকিয়ে আছো কেন?
হুর – আপনি তো একেবারে আমার পাপার মতো , আমার পাপাও এমন ।
আর্থার – কেমন ?
হুর – ঐ যে আপনার পেটের দিকটা কেমন উচু নিচু , পিঠের দিকে হাত উচু করলে কেমন বাটারফ্লাই লাগে , অদ্ভুত।
আর্থার – ইডিয়েট।
আর্থার কিছু বললো না সোজা বাহিরে চলে গেলো রুম লক করে , এই মেয়েটার সাথে কথা বলাই মানে সময় নষ্ট।
হুর বুঝলো না রুমটা কেন লক করে রেখে গেলো ? রুমটা এবার পুরো ঘুরে দেখতে লাগলো , অবাক করা বিষয় রুমটা একদমই সাদামাটা, বারান্দা একটা তাও খুব ছোটো ,গ্ৰিল দিয়ে এতো সূক্ষ্ম ভাবে আটকানো যে খুব ক্ষুদ্র পরিমানের আলো আসে ।
হুর রুমটায় দেখার মতো কিছুই খুঁজে পেলো না , হতাশ হয়ে বসে রইলো ,যেহেতু ভোরে উঠেছে তাই আবার ঘুমে তলিয়ে গেলো , কিন্তু হুর বুঝলো না তার এই ঘুমটা ভোরে ওঠার জন্য না ,ঘুমটা ঘুমের ওষুধ এর জন্য।
হুর ঘুমানোর সাথে সাথে রুমটা ভয়ঙ্কর অন্ধকার এ ছেয়ে গেলো ,যেন অন্ধকার কোনো পাতালঘর , বন্দীঘর , জেলখানায় তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে ।হুর গভীর ঘুমে রূপকথার গল্পে হারিয়ে গেলো যেখানে সে আর্থার কে মনের অজান্তেই রাজকুমার হিসেবে কল্পনা করতে লাগলো ।
….
হুমায়রা হবে বাড়িতে ঢুকলো ,মায়ের রুমের দিকে যেতে লাগলো ,মাকে অসুস্থ দেখে গিয়েছিল, এখন বাহিরে মন মানছেনা তাই এসে পড়লো , হুমায়রার মনটা ছট্ফট করছে ,তার ভাই কোথায় কীভাবে আছে সেই চিন্তা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।ভাইকে ভীষণ ভালোবাসে সে ।যেতে যেতে নূরের রুমের সামনে পড়লো ,মেয়েটা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমচ্ছে,এই মেয়েটাকে হুমায়রার খুব আপন মনে হয় ,যেন খুব গভীর সম্পর্ক তাদের মধ্যে।
হুমায়রা নূরের কাছে গেলো , বিছানায় এককোনে বসে পড়লো ,নূরের দিকে গভীর দৃষ্টিপাত করলো , মেয়েটার মুখে নওশাদ এর চেহারার একটা ছাপ যেন হুমায়রা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো , হিসেব টা একটা জায়গায় গিয়েই গুলিয়ে যাচ্ছে।
” নূর কে?”
হুমায়রা নূরের বালিশের নিচে একাংশ কাগজের টুকরা দেখলো , আনমনে সেটা ধরে টান দিতেই পুরো কাগজ টা হুমায়রার হাতে চলে এলো । হুমায়রা চকিত নয়নে একবার কাগজ টা দেখলো , না বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না, দৌড়ে মায়ের রুমে গেলো ,দড়জা ধাক্কা দিতে খোলা গেলো না ।
আবারো ধাক্কা দিলো ,না দড়জা কেউ খুললো না ।
হুমায়রা একটু চিন্তিত হলো ,হয়তো মেহেরিন মির্জা ঘুমিয়ে আছেন ।
কিন্তু হঠাৎ জানালা দিয়ে নজর গেলো ভেতরে , চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়লো ।
পুরো মির্জা ভিলা কেঁপে উঠল এক মুহুর্তের জন্য।
……
হসপিটাল এর একটা কেবিনে হাতে পায়ে ব্যান্ডেজ নিয়ে বসে আছে নওশাদ, তার সামনে নাবিলা বসে আছে , তীক্ষ্ণ চাহুনি তার । নওশাদ ঘাবড়ালো না বরং সে ঠান্ডা চাহুনি দিয়েই বললো – তুমি কি চাও?
নাবিলা – আপনি জানেন।
নওশাদ তাচ্ছিল্যের হাসলো – ইউ ডিসার্ভ মি এন্ড আই ডিসার্ভ ইউ ।আমি মনে করি আমাদের একসাথেই থাকা উচিত।
নাবিলা কিছু বললো না চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষন এরপর বললো- আপনি যদি আমার সাথেই সারাজীবন কাটাতে চান আমি ক্লিয়ার করছি এটা যে আমি কখনোই আর মা হতে পারবোনা।
নওশাদ রাগে ফেটে পড়লো – ঐ আর্থার কে তো আমি দেখে নেব , আমার সব কেড়ে নিয়েছে ও , আমার মেয়েকে আমি কোথায় যেতে দেব না।ও কি যথেষ্ট নয় আমাদের জন্য।
নাবিলা রাগ মিশ্রিত কন্ঠে বললো- আপনার চরিত্র জঘন্য রকমের এর জন্যই এটা হয়েছে ,মেয়েকে ভুলে যান ,আমি জানি আমি কোনো পাপ করিনি আপনার সাথে সজ্ঞানে আমি ঘনিষ্ঠ হইনি আপনি আমার সাথে গেইম খেলেছেন আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি,ঐ লোকটার সাথে মোকাবেলা করতে আমাকে গুটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন, এখন নিজের মেয়েকে দেখে সবকিছু থেকে পিছিয়ে গেলেন, কিন্তু তাকে আর কখনোই ফিরে পাবেন না আপনি ।
কথাগুলো বলে নাবিলা কোথাও একটা চলে গেলো , এদিকে নওশাদ নাবিলার বলা কথাগুলো ভাবতে লাগলো , নাবিলা কে সে মনের অজান্তেই পছন্দ করতে শুরু করেছে ,নূর কে ছাড়া সে বাঁচবে না, এখন কি করবে সে ? আর্থার ছেড়ে দেওয়ার মানুষ না ও যে একটা ভয়ঙ্কর সাইকো সেটা নওশাদ খুব ভালো করেই জানে ।
হঠাৎ দড়জা দিয়ে প্রবেশ করলো কালো কোর্ট পরা একজন, নওশাদ কিছুক্ষন এর জন্য তাকে আর্থার ভাবলো চিৎকার করে বললো- তুই তুই আমাকে মারতে এসেছিস? আমি সত্যি ক্ষমা চাইছি মাফ করে দে ভাই ,আমি জীবনেও আর অন্য কোনো মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হবো না ।আমি জানি তুই মেয়েদের সাথে বেয়াদবি পছন্দ করিস না ।আই এম সরি ।
লোকটা ভেতরে আসলো মুখের মাস্ক সরাতেই নওশাদ আঁতকে উঠলো- তুই?
সামনের লোকটা দাঁত বের করে হাসলো – আজ্ঞে হ্যাঁ আমি ।বস আসলে তো তুমি আস্ত থাকতে না ।
নওশাদ রাগে হিসহিস করে বললো- বেইমান!
সামনের লোকটা আবারো হাসলো – এই নাও বস কথা বলবে তোমার সাথে ।
নওশাদ ফোনটা একপ্রকার ছিনিয়ে নিলো লোকটার থেকে ,কানের কাছে নিতেই ভয়ে ঘামতে লাগলো – প্রথম এবং শেষ সুযোগ দিলাম যা যেভাবে পারিস শুধরে যা ।তোকে ছাড়ছি কেবল তোর বোকামির জন্য কারন এটা না করলে আমি রেয়ান চৌধুরীর মেয়েটাকে বিয়ে করতে পারতাম না ।
কথাগুলো বলে বিকট শব্দে হাসতে লাগলো আর্থার নওশাদ এবার বুঝলো আর্থার কি বলতে চাইছে। নওশাদ তো নিজের অজান্তেই আর্থার এর একটা উপকার করে দিলো সেটা ও নিজেও জানে না।
আর্থার – তুই চেয়েছিলি আমাকে ফাঁসাতে আর এটার জন্য আমি আমার লক্ষ্যের প্রথম ধাপে পৌঁছাতে পারলাম তাই তোকে শুভেচ্ছা।
সামনের লোকটা এবার নওশাদ এর থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিলো – সুস্থ হলে নিজের বাড়ি চলে যেও ।আমি গেলাম এখানে মিষ্টি রাখা আছে খেয়ে নিও । জিন্দা মোবারক।
….
” আরেহ টুনির মা এখানে কি করো”
আহিয়া মুখে সবে একটু কফি দিয়েছিল সেটাও ছিটকে বেরিয়ে এলো।চোখ বড়বড় তাকিয়ে দেখলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুরুষ কার দিকে । ঠোঁটের কোনে মৃদু হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে আহিয়ার দিকে,,,,,
#মিহিকা_রোজা(লেখিকা)
চলবে,,,,,,
সবাই রেসপন্স করবেন আর নেক্সট নেক্সট যারা করবেন তাদের কমেন্ট করার দরকার নেই।আপনারা মন্তব্য করতে পারেন , সুন্দর হয়েছে , খুব সুন্দর, ভাই একটা লেখাকে এভাবে কি করে মন্তব্য করা যায় ।এই পর্ব সম্পর্কে আপনার মতামত টা দিতে পারেন , কোন অংশ খারাপ লেগেছে আমার কি করনীয় ভুলগুলো শুধরে দিতে পারেন ।
আর হ্যাঁ স্পয়লার এর ঘটনা ভুলে যান আমি সেটা আর লিখবো না , সেটা লিখতে গেলে গল্প খুব বড়ো হয়ে যাবে , আর আপনারা রেসপন্স করাই কমিয়ে দিয়েছেন তাই স্পয়লার টা ভুলে যান ।

