শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(১৬)

0
27

#শূন্য_অর্থ_পূর্নতা(১৬)
….
হুর আর্থার কে ওর দিকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভরকে গেলো , ও তো এই লোকটার নামটাই এখোনো জানেনা , ভুলে গিয়েছে । নার্ভাসনেস এর জন্য না খাচ্ছিল বসে বসে ।

এদিকে আর্থার হুরের দিকেই তাকিয়ে ছিলো না ও তো ওর স্বপ্নে হুরকে থাপরা থাপরি করছিল।হুর দুহাতে নিয়ে আর্থার এর মুখের সামনে নিয়ে নাড়ালো ।চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে আর্থার চমকে তাকালো।হুরকে দেখলো একপলক ।
– কিসের নামাজ?

হুর ভেবেছিল আর্থার না করবে তবে এই প্রশ্নে ও অবাক হলো – না মানে বিয়ে হলে শুকরিয়া নামাজ পরা উচিত।

আর্থার – ওহ বলে ওয়াসরুমে চলে গেলো ,হুর এর মাথা চুলকাতে শুরু করেছে ,এই পোশাক পরিবর্তন করা জরুরি,মনে মনে ভাবলো- বিয়ে তো হলো,এখন এর সাথেই সংসার করতে হবে , কোনোভাবে কি ওনাকে ঘষামাজা করে ঠিক করা যায় না ?

ইতিমধ্যেই হিজাবের পিন খুলে ফেললো , হিজাব টা খুলে,একটা সবুজ গাউন পড়ে নিলো লাইট টা অফ করে এরপর চেয়ার টেনে ধপ করে বসলো , আপাতত চুলটা আঁচড়ে নেওয়া যাক , আর্থার বের হলে ও গিয়ে ওজু করবে ।
চুলের খোঁপা টা খুলতেই একরাশ ঘনো লালচে সোনালী রঙের চুল ফ্লোর ছড়িয়ে পড়লো। সিল্কি চুলগুলো একটা সোনালী দামী মোটা চিড়ুনি নিয়ে ধীরে ধীরে চুলগুলো আঁচড়াতে শুরু করলো ।নরম , সিল্কি হ্ওয়ার চুলগুলো আঁচড়াতে কোনো সমস্যা হলো না ।

হুর চেয়ারে বসে ছিলো , চুলগুলো ফ্লোরে ছড়াছড়ি ,মাথার তালুতে একধরনের সুগন্ধি তেল দিচ্ছিল তখন ।এটি দিলে তার মাথা হালকা লাগে ।
ওয়াসরুমের দড়জা খট করে খুলে যাওয়ার কারনে হুরের নজর সেদিকে গেলো , অসস্তি হলো ,ভয়ও লাগলো ।

এদিকে আর্থার হুরের দিকে ফিরেও তাকালো না , আলমারি থেকে সযত্নে তুলে রাখা দুটি জায়নামাজ বের করলো । এমন ভাব করলো রূমে যেন কেউই নেই আর্থার ছাড়া ।
সত্যি বলতে আর্থার ভুলেই গিয়েছিল হুরের কথা এখন ওর মাথায় ঘুরছে অন্য অন্য কথা নূর কে মনে পড়ছে ।কোলে নিতে খুব ইচ্ছে করছে আর্থার এর । বাচ্চা মেয়েটা ওকে পাপা পাপা করে ডাকে আর্থার এর মনে হয় সত্যি আর্থার নূরের বাবা ।
জায়নামাজ টা একপাশে রেখে হুরের দিকে তাকাতেই চমকে গেলো ,হুর ওর কার্যক্রম দেখছিল এতক্ষণ ‌। আর্থার কে তাকাতে দেখে কি করবে বুঝতে পারলো না চোখ সরিয়ে নিলো ।

আর্থার হুরের কাছে গিয়ে চুলগুলো একপাশ দিয়ে ধরে দিলো সজোরে টান ।
হুর আউ করে উঠতেই আর্থার দূরে সরে গেলো ।

– তুততমি কে ?
হুর ভয় পেয়ে তোতলাতে তোতলাতে বললো- আপনি কে? আপনার চোখ এমন বেগুন না মানে ভায়োলেট কালার কীভাবে হলো? জ্বীন ভুত না তো আপনি?

আর্থার বেডের এক পাশে ধপ করে বসে পড়লো ,- Rapunzel (রাপুনজেল)!
তুততমি কি হুর?

হুর এবার থতমত খেয়ে গেলো , আর্থার কে এমন বেকুবের মত চেয়ে থাকতে দেখে বলদের মতো নিজেও এগিয়ে আসলো আর্থার এর দিকে। আর্থার এর দিকে ঝুঁকে চোখ পিটপিট করে সরু চোখে তাকিয়ে ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিলো ।
– নাহ মানুষ মানুষ লাগছে ,আপনি এমন রাপুনজেল রাপুনজেল কেন করছেন? এখানে তো আমি!

আর্থার ভ্রু কুঁচকে বললো- দূরে সরো মেয়ে ।

হুর ভরকে গেলো , তড়িঘড়ি করে দূড়ে সরতে গিয়ে বেচারি চুলের সাথেই পা বেজে আর্থার এর বুকের উপর মুখ থুবড়ে পড়লো ।
আর্থার এর মনে হলো একটা তুলার বস্তা এসে পড়েছে ওর বুকের উপর, ঠেলেঠুলে সরিয়ে দিলো ।
– ইডিয়েট।
হুর ভয় পেয়েছে এবার,গালে হাত ও দিয়ে ফেলেছে যদি থাপ্পড় মারে!

আর্থার ওর সামনে নিচে হাঁটু গেড়ে বসলো , চুলগুলো হাতে তুলে নিয়ে হুরের ডান হাতে পেঁচিয়ে দিলো – এই ঘোড়ার লেজ নিয়ে যখন তখন উস্টা খেলে থাপড়ে সব দাঁত ফেলে দেবো ।

হুর কাদো কাদো হয়ে বললো- কাউকে ডেকে দিবেন ? কোনো মেইড কে!
আসলে আমার চুল গুলো আমি এখন সামলাতে পারছিনা ক্লান্ত আমি তাই কারোর হেল্প দরকার চুলগুলো বাঁধতে ।

আর্থার বাঁকা হেসে বলল – কেটে দেই আসো ।

হুর চমকে উঠলো ,চোখে পানি এসে জমলো , সেভাবেই বাচ্চাদের মতো করে বললো- আপনি জানেন এটা আমার কতো বছরের সাধনা! আমি লম্বা চুল নিয়ে জন্ম হয়েছিলাম আমার ভাই চুলগুলো কাটতে দেয়নি ভাইয়া যত্ন করে আমার চুলগুলো এতো সুন্দর রেখেছে আপনি আমার চুলকে অপমান করছেন,আমাকে করলেও কিছু মনে করতাম না ।
আমি যদি আপনাকে অভিশাপ দেই যে আপনি টাকলু হয়ে যাবেন, তখন সত্যি সত্যি টাকলু হলে আপনার কেমন লাগবে ।

আর্থার ড্যাবড্যাব করে হুরের দিকে তাকিয়ে আছে,এই মেয়ের কথা শুনে রীতিমতো মাথা ভনভন করে ঘুরতে এখন ,না চাইতেও কল্পনা করলো – চুল ছাড়া আর্থার!
নিজেই বলে উঠলো- ছিঃ কি জঘণ্য!

আর্থার – আসেন আপনার চুল বাধতে সাহায্য করি । কিন্তু দয়া করে চুপ থাকবেন, না হলে আপনার মুখে সুপার গ্লু লাগিয়ে দেবো ।

আর্থার মুখটা গম্ভীর করে হুরের চুলগুলো বাঁধতে সাহায্য করলো ,হুর চুলটা বেনী করলো । এরপর আর্থার এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো- আপনার নাম কি?

আর্থার হুরের এরকম প্রশ্নে এতটাই অবাক ,হলো যে কথা বলতেই ভুলে গেলো , কিন্তু উত্তর দিতে গিয়ে বুঝলো প্রশ্ন টা কঠিন ই করেছে হুর ।কোন নাম বলবে?
– আমি তোমার কি হই?
হুর – হাসবেন্ড।
– তাহলে নাম দিয়ে কি করবে? হানি,ডিয়ার , হাসবেন্ড এগুলো বলে ডাকবে ।

হুর – ওহ , আচ্ছা।
বলে ওয়াসরুমে চলে গেলো,ওজু করে এসে দেখলো আর্থার জায়নামাজ বিছিয়েছে ।
দুজনেই নামাজ পড়ে নিলো ।

নামাজ শেষে হুর মনে মনে বললো-এতো ভালো কিকরে হলো ?
হুর এর হঠাৎ মনে পড়লো ওর খুব খিদে পেয়েছে ,এতো রাতে কি খাবে?

আর্থার এর দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবলো এরপর বলে ফেললো – শুনুন হাসবেন্ড আমার খুব খিদে পেয়েছে ।
এদিকে আর্থার হুরের দিকে তাকিয়ে ছিলো ,এই বাচ্চাটাকে বিয়ে করেছে কোন দূঃখে সেটাই ভাবছিল।
হুর যখন দেখলো ওর দিকে আর্থার তাকিয়ে আছে ,হুর একটু জোরেই বললো- হাসবেন্ড!
আর্থার ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে এলো ,হুরের মুখোমুখি বসে টান দিয়ে নিয়ে কাছাকাছি সামনে বসিয়ে দিলো ।হুরের কাপাকাপি শুরু হয়ে গিয়েছে।

আর্থার হুরের দিকে ঝুকলো ,হুর পেছনের দিকে হেলে পড়লো , আর্থার হুরের মাথায় প্যাঁচানো হিজাব টা একটানে খুলে নিলো ।হুরের নীলাভ সবুজ চোখদুটো পর্যবেক্ষণ করে ফিসফিস করে বললো- তুমি দেখতে হুর পরির মতো সুন্দর।
হুর হঠাৎ লজ্জা পেলো – আপনিও সুন্দর।
আর্থার ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো – রাজকুমারীর মতো বৈশিষ্ট্য সব আছে তোমার মধ্যে।একটা কাজ করবে আমার সামনে হিজাব পরবে না ।
হুর আরোও খুশি হলো- আপনাকেও রাজপুত্র লাগে ,আগে কালো লাগতো কিন্তু বিয়ের পর মনে হয় সুন্দর হয়ে গিয়েছেন।

আর্থার মুচকি হেসে আবারো বললো- হ্যাঁ এরজন্য হয়তো তুমি এতটা বেকুব। মাথায় ঘিলু সব হাঁটুতে নেমে গিয়েছে ।

কথাগুলো বলে আর্থার উঠে চলে গেলো ।হুর সেদিকে তাকিয়ে ভাবলো -আমি কি করলাম? উনি কি আমাকে অপমান করে গেলো ।

আর্থার কিছুক্ষন পর হাতে কিছু একটা নিয়ে এলো ,হুর তাকিয়ে দেখলো একটা ট্রে , সেখানে একটা চকলেট কেক , খেজুর, বাদাম, ডেজার্ট,এক গ্লাস দুধ ।

আর্থার – নাও এগুলো খাও ।
হুর – আপনি খাবেন না?
আর্থার – না আমি রাতে খাই না।

হুর সবগুলো থেকে খেলো একটু একটু , আর্থার হয়তো বারান্দায় গিয়েছে ,ও খাবার খেয়ে একপাশ করে রাখলো ।

আর্থার ফিরে এসে একটা কাঠের বক্স দিলো ওর হাতে ,জিনিস টা কি সেটা জিজ্ঞাসা করলে আর্থার বললো গিফ্ট।
হুর খুশি হলো , আর্থার কে একটু বিশ্বাস হলো ওর ,ও গিয়ে লাগেজ থেকে একটা প্যাকেট বের করে দিলো , আর্থার সেটা দেখলো না রেখে দিতে বললো ।

…..
সকালে আশ্রম এর উদ্দেশ্যে বের হয়েছে হুমায়রা,মাকে ওষুধ দিয়ে এসেছে ,গত পাঁচ বছর ধরে মেহেরিন মির্জা একটা রোগে ভুগছেন । মানসিক রোগী এটা ,মাঝে মাঝে ব্যাবহার পরিবর্তন হয়ে গম্ভীর মেহেরিন তো কোনো সময় একদম বাচ্চা। হুমায়রার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এই রোগ টা শুরু হয়েছে ।তিনি তার ছেলে মেয়েকে সুখী দেখতে চান তাই তো আর্থার কে নওশাদ ভেবে নিজের বান্ধবীর মেয়ে নাবিলার সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন ।

আজ তো নওশাদ কে দেখতে কান্না শুরু করে দিয়েছিলো গতকাল আর্থার রূপী নওশাদ বলেছিল সে তার ফ্ল্যাট এ নিয়ে যাবে তার স্ত্রী কে । হুমায়রা এটাই শুনেছিল,হয়তো হুমায়রা ছিলো এখানে তাই আনেনি ,ভয় পেয়েছিল বোধহয় ! কথাটা ভেবেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো হুমায়রা ।তাকে ব্ল্যাকমেইল করে এখন তাকে ভয় পাওয়ার কি দরকার?
ভালোই হয়েছে কাউকে দাওয়াত দিতে দেয়নি ,নাহলে মানসম্মান শেষ হয়ে যেত ,দুই বিয়ে তাও এই পরিবারে! কিন্তু তারা তো আর ভেতরের খবর জানবে না।
নূরকে মেইডের কাছে রেখে এসেছে,কি জানি নূর কার মেয়ে? হুমায়রার আর ভালো লাগছে না।তার ভাইকে পেলেই হলো তার ।

যেতে যেতে আশ্রমের বাগান থেকে একটা নয়নতারা ফুল ছিঁড়ে নিলো ,কানে গুজতেই কারোর কন্ঠস্বর ভেসে এলো – মিস নয়নতারা,ফুল গাছেই শোভা পায় ,কানে নয় ।
হুমায়রা খুব বিরক্ত হলো ,তাকে ফুল ছেঁড়া নিয়ে কেউ কখনোই কিছু বলেনি ,কে বললো তাকে এই জ্ঞানের কথা!
পিছু ফিরতেই কথা বলতে ভুলে গেলো ,সব ভুলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল, শ্যামলা মুখখানা রোদের তাপে লাল হয়ে যাচ্ছিল।

সাদিক মুচকি হাসলো,নেভি ব্লু শার্ট এর হাতা গুটানো অবস্থায় আছে , সাদা প্যান্ট এর পকেটে হাত গুজে দুই কদম এগিয়ে এলো , ফিসফিস করে কানের কাছে বললো- তবে আপনার কানে এই ফুলটা শোভা পাচ্ছে মিস নয়নতারা।

হুমায়রা হকচকিয়ে গেল সাদিক কে এতো কাছে দেখে ,মুখটা ভয়ে শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেলো ,কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে দুই পা পেছনে সরে গেলো ।
নিজেকে সংযত করলো ,মনে মনে বললো- ছিহ হুমায়রা,তুই এমন লুচ্চার মতো একটা সুন্দর ছেলের দিকে তাকাতে পারিস না । ভালোবাসা তোর জন্য না ।পরে এই ভালোবাসা তোকে জ্বালিয়ে শেষ করে দেবে ।

হুমায়রা ফ্যাকাশে মুখে বললো- আপনি এখানে?

সাদিক সানগ্লাস টা খুলে হুমায়রার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল – আপনাকে দেখতে আসলাম মিস নয়নতা,,,,,,

কথাটা শেষ করতে দিলো না হুমায়রা, বিরক্ত কন্ঠে বললো- হুমায়রা হবে ওটা মিস্টার সাদিক ।
সাদিক অবাক হয়ে বললো- আপনাকে তো আমি আমার নামটাই এখন পর্যন্ত বলিনি,তাহলে ?
হুমায়রার ইচ্ছে করলো নিজের গালে ঠাস ঠাস করে দুইটা থাপ্পড় লাগাতে , এখন কি বলবে ও ।
কোনোমতে হরবরিয়ে বললো- আমি আসছি আমার কাজ আছে ।
বলেই দ্রুতপায়ে হেঁটে যেতে লাগলো ।
সাদিক সেখানেই দাঁড়িয়ে একটু জোড়ে জোড়ে বললো- লুকোচুরি লুকোচুরি গল্প
,তারপর হাতছানি অল্প,,,,,

লোকটার কন্ঠস্বর টাও মধুর শোনালো হুমায়রার কাছে , কিন্তু পিছু ফিরলো না , পালিয়ে গেলো ।গানটা সে দু একবার শুনেছে ,তবে এতোটা ভালো লাগেনি কখোনো।আজ সাদিকের গলায় যেন অন্যরকম লাগলো ।
” লুকোচুরি!নয়ন সাদির লুকোচুরি গল্প”

চলবে কি?
রেসপন্স করবেন সবাই।

#মিহিকা_রোজা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here