প্রিয়_নীলপদ্ম —১৮. #মুশরাফা_মিরা

0
34

#প্রিয়_নীলপদ্ম —১৮.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]

আয়রা-সামিদ দুই প্রেমিকযুগল ব্যস্ত ছিলো নিজেদের মাঝে কথোপকথনে। তবে সামনে নৌমিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে বিস্মিত হয় নিজেরা-ও। আয়রার চোখমুখে বিস্ময় আর আনন্দ খেলা করলেও সামিদের ব্যাপারটি ভিন্ন। বেচারা ভাবিসাহেবার সামনে এভাবে প্রেমিকার সাথে ধরা খাবে এমনটি ভাবে নি।লজ্জা লুকাতে সাজাতে লাগলো মিথ্যা কথার জ্বাল।তবে সে গুড়ে বালি করে আয়রা গিয়ে দু’হাতে ঝাপ্টে ধরে থমকে দাঁড়ানো নৌমিকে।

‘ও নৌমি!কতদিন পরে দেখা হলো আমাদের।তোমাকে বলেছিলাম না আমার কাটখোট্টা, বেরসিক প্রেমিক পুরুষের কথা?এ-ইযে তিনিই সেই!’

আয়রা শুরুর কথাটি অতি উৎসাহিত হয়ে বললেও শেষ কথাটি বললো কানেকানে যাতে সামিদ না শোনে।ভয় পায় কিনা!সামিদ নিজের চোখ লুকাতে ব্যস্ত ওদিকে নৌমি জহুরীর চোখে দেখছে সামিদকে।দেবর সাহেব তাহলে তার বান্ধবীকে ধরেছে,ভালো তো!
সামিদ আড়চোখে চাইলো আয়রার পানে চাইলো কপালে ভাজ ফেলে নৌমিকে কিভাবে চেনে এই পাগলী?বুঝে আসলো না ওর।এপর্যায়ে নৌমি মুখ খুললো। সামিদের উদ্দেশ্যে বললো,

‘সামিদ ভাই এসব কিভাবে কি?’

‘বউমণি আসলে মানে..’

কথা জড়িয়ে গেলো সামিদের।কিচ্ছু যে বলবে সে ভাষা পেলো না খুঁজে। আয়রা একবার নৌমি তো আরেকবার সামিদকে দেখছে।কি হলো ব্যাপারটা?নৌমি-সামিদ এরা পরিচিত?

‘নৌমি তুমি চেনো সামিদকে?’

‘হ্যা চিনি মানে খুব ভালো করে চিনি।আমার দেবরজীকে চিনবো না?’

নৌমি আয়রা দিকে তাকিয়ে সরল হাসলো।আয়রা চমকিত নয়নে নৌমির মুখের দিকে চেয়ে বলে,

‘মানেহ্.. কিভাবে কি?’

‘বউমণি আমারা একজায়গায় বসি?এই পাগলীকে যতক্ষণে বুঝিয়ে না বলা হবে ততক্ষণে ওর মগজে কিছু ঢুকবে না।চলুন একজায়গায় বসা যাক।’

‘আমি পাগল?আপনি..আপনি.’

‘একটা কথাও বলবে না আয়ু,চুপ!’

সামিদের উচ্চ আওয়াজে এমনিতেও ভয় আয়রার।তাই বেচারি না চাইতেও চুপসে গেলো।প্রতিবাদ করতে পারলো না সামিদের মিথ্যা অপবাদের।নৌমি হাসলো এদের কান্ডে।সামিদের কথায় সায় জানিয়ে চললো পাশের রেস্টুরেন্টে।

সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত হওয়ার দরুন একটু ভীর কম এই রেস্টুরেন্টে।ওরা গিয়ে বসলো একটা টেবিলে।আয়রা খালি উসখুস করছে কিছু বলার জন্য। বাঁচাল মানুষের এবার একটা জ্বালা এরা কথা না বলে থাকতে পারে না।আয়রাই শুরুতে বললো,

‘এখন তো সব খুলে বলো, তোমরা একেঅপরের কি হও?কিভাবে চেনো?সব..সবটা!’

নৌমি অধৈর্য আয়রাকে দেখে সামিদের উদ্দেশ্যে বলে,

‘ভালোই সঙ্গী জুটিয়েছেন সামিদ ভাই।যাইহোক আমাদের পরিচয় হলো আমি ওনার মামাতো ভাইয়ের বউ।বুঝলে?’

সামিদ শুরুর কথাটিতে হাসলো।তা মন্দ নয় একজন টেপরেকর্ডার জুটিয়েছে ও কপালে।আয়রা বুঝলো এদের সম্পর্ক ঠিক কেমন।নৌমি টেবিলে কনুই দিয়ে ভর রেখে বলে ওদের উদ্দেশ্যে,

‘তোমাদের কিভাবে পরিচয় হলো?বলো শুনি!’

‘আসলে আমি..’

‘চুপ! আমি বলছি খুলে সব’

ফের ধমকে বলে সামিদ।আয়রা মুখ ফুলায় কি পেয়েছেটা কি ওকে সামিদ?যখন-তখন খালি ধমকের উপরের রাখে ওকে।সামিদ আয়রার মুখ ফুলানো দেখে হেঁসে ফেললো।মেয়েটা আসলেই একটা বাচ্চা!

‘ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয় এনার সাথে আমার। একটা পোস্টে আমি কমেন্ট করেছিলাম কিন্তু কমেন্টটি আয়রার পছন্দ হয়নি তাই রুডলি রিপ্লাই দেয় আমায়।এরপর আমিও দি!ভেবেছিলাম ওখানেই হয়তো কাহিনি শেষ তবে না উনি আমার ইনবক্সে এসে কথা শুনায়।আমিও টুকটাক রিপ্লাই দিতাম।মজা পেতাম ওর কথাগুলোতে।বলতে পারেন ঝগড়া দিয়েই প্রেমের শুরু।আস্তে আস্তে ও একপাক্ষিক ঝগড়া থামিয়ে ফ্রেন্ডলি আচরণ করলো আমারও ভালো লাগলো।এরপর অচেনা মানুষ থেকে পরিচিত হলাম তারপর ফ্রেন্ড।লাস্টলি প্রেমিকযুগল।সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো আমাদের রিলেশনশিপে সবথেকে সাহায্য করেছে মামা,মানে আরিফ মামা।এরপর আরকি সহ্য করছি এই ননস্টপ বকবক করা রেকর্ডাকে!’

শেষ কথাটা হতাশ ভঙ্গিতে বললো সামিদ।নৌমি কিছু বলার আগেই ফুঁসে ওঠে আয়রা।চোখদুটো ছোটছোট করে বলে,

‘আমি বেশি কথা বলি?আপনি কি হ্যা?বেশি বেশী বলবেন না একদম!’

‘আচ্ছা কমকম বলবো এরপর, হু?’

নিজেকে যথাযথ শান্ত রেখে উত্তর দিলো আয়রার কথাটির। নৌমি গালে হাত দিয়ে দেখে এদের কান্ডগুলো।প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো বলে এরমধ্যে নৌমির ফোন বেজে ওঠে।তুলির কল পেয়ে নৌমি একটু পাশে যায়।আয়রা-সামিদ ঝগড়ার মজেছে। ঠিক ঝগড়া নয় খুনসুটি বলা চলে।এদের কথার কারনে তুলির কথাই শোনা হবে না ওর এখানে থাকলে।তাই দূরে গিয়ে কল রিসিভ করলো।

‘হ্যালো আম্মু?’

‘নৌমি শোন আমরা এখন হুজাইফা আপাদের বাসায় যাচ্ছি। আপা অসুস্থ হয়ে পরেছে সকালের পরপরই।খালাম্মার-ও শরীর খারাপ করেছে না-কি মাত্র ফোন দিয়ে জানালো।না গেলে হয় বল?’

‘সেকি!এতো ভালো খবর নয়।আপনি আর দাদিমা যাচ্ছেন?’

‘তাসফিকেও নিচ্ছি সাথে। মেহেরবাকে একটু বুজ দিতে পারবে।তোর বাবাও আসবেন শুনেছি। তবে চিন্তা হচ্ছে তুই একা থাকতে পারবি মা?কি করবো ভেবে পাচ্ছি না’

তুলির চিন্তিত স্বরে নৌমি তাকে অভয় দিয়ে বলে,

‘চিন্তা করবেন না। একটা রাতেই তো ব্যাপার।আমি থাকতে পারবো।আপনাদের ওখানে যাওয়াটা বেশি জরুরি।কখন রওনা হবেন?’

‘এতো এখনই তাসফি বাসায় আসলেই বের হবো।থাকতে পারবি একা-একা? নিয়ে যেতাম তোকেও কিন্তু..’

‘সমস্যা নেই আমি থাকতে পারবো।আপনারা সাবধানে যান।আর.. আর আমার ওই বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে নেই আম্মু!’

আরো কিছু কথা বলে তুলি ফোন কাটে।ফোন কাটতেই নৌমি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে। স্বামী ছাড়া শ্বশুর বাড়ি আসলে একটা মেয়েকে যে কতকিছুর সম্মুখীন হতে হয় তা নৌমি জানে।কত মানুষের অপমান যে সহ্য করতে হলো ওকে!যেমন হুজাইফার বাসায় ওকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে অপমান করা হয়েছিলো বিয়ের প্রথম বছর। কিশোরী নৌমি মানুষের কথার ধার সহ্য করতে না পেরে কেঁদে ফেলেছিলো।যদিও ওর হয়ে প্রতিবাদ করার জন্য ওর শ্বশুর বাড়ির লোক আছে তবুও কথাগুলো? অন্তরে মিশে গেছে একদম!নৌমি ডুবন্ত সূর্যের পানে তাকিয়ে ভাবছিলো সেসব এরমাঝে পিছন থেকে আয়রা এসে ওর দুবাহুতে ধাক্কা দেয়। নৌমি চমকে ওঠে আয়রার কান্ডে।ভয় পেয়ে বলে,

‘আয়ু ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে তো!’

আয়রা নিজের দিকে ঘুড়ালো নৌমিকে।এরপর একহাত নিজের কোমড়ে রেখে বলে,

‘কি এমন চিন্তায় বিভোর ছিলে যে এতো ডাকলাম তা-ও শুনলে না, হু?দুলাব্রোকে নিয়ে ভাবছিলে বুঝি?’

নৌমি মাথা নাড়িয়ে না বুঝায়।আয়রা বিশ্বাস করলো না। শুরু হয় নৌমি-তূর্যকে নিয়ে নানান কথা, জিজ্ঞেসা।নৌমি মাঝেমধ্যে ওর কথায় হাসে আবার কখনো ভ্রু-কুচকে তাকায় ওর দিকে কিংবা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়।

________________

কালকন্ঠ বাড়িতে এই পাঁচবছরে প্রথম একা রাত্রি যাপন করবে নৌমি।এ-র আগে কেউনা কেউ ছিলোই ওর সাথে তবে আজ একা সম্পূর্ণ একা।আয়রা-সামিদের সাথে সময় কাটাতে কাটাতে কখন যে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে সাতটার ঘরে ঠেকছে তা ও বোঝেনি।তাই বাড়ি ফিরতে আরো দেরি হলো ওর।আবার আকাশটাও গর্জে উঠছে ক্ষনেক্ষনে।যখন-তখন বৃষ্টি নামবে গগন কাপিয়ে।নৌমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করলো বাড়ি ফেরার আগে যাতে বৃষ্টি না নামে।সৃষ্টিকর্তা ওর প্রার্থনা শুনেছে।বাড়ির প্রবেশদ্বারে ঢোকার পরে বৃষ্টি নামলো মুশলধারে।নৌমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাগ্যিস বৃষ্টির আগে বাড়ি পৌঁছাতে পেরেছিলো!

ফ্রেশ হয়ে তূর্যকে কল করে।একা-একা সময় কাটছে না ওর।তাই তূর্যের সাথে কথা বললে সময়,ভয় লাগা সবটুকু কেটে যাবে ভেবে ফোন দেওয়া। তবে হায়,তূর্য কল রিসিভ না করে কেটে দিলো।সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ আসে,

‘Ekhane kotha balte parbo na Naumi. Kajera chap pruchur, free hye call korchi. Rag kora na lakshti’

নৌমির মন খারাপ হয়ে গেলো।তবে অভিমান বা রাগ করে না তূর্যের উপর। কেননা তূর্যের পেশাটাই এমন, ব্যস্ত থাকা স্বাভাবিক।তূর্যের এমন হুটহাট ডাক গুলো কিযে ভালো লাগে ওর!

আসার সময় নিজের জন্য চাইনিজ প্ল্যাটার এনেছিলো ও।ভাবলো খেয়েদেয়ে একটা জব্বর ঘুম দিবে। বৃষ্টির দিনে ঘুমিয়েও মজা,ভিষণ। ভাবনা অনুযায়ী নিচে নামলো।খাবার গরম করে এসে বসলো টিভির সামনের সোফায়। বৃষ্টি-টিভি-খাবার কম্বিনেশনটা দারুণ! তবে হঠাৎ কলিং বেল ভেজে ওঠার শব্দে নৌমি কেঁপে ওঠে। এ রাতে কে আসবে?কারো তো আসার কথা নয়।ভয় হলো মনের মাঝে।এই ঝড়ের রাতে যদি কোনো ডাকাত আসে?একা ও কিভাবে সামাল দিবে এসবের? ভাবলো দরজা খুলবে না।তবে বারংবার বেল ভেজে ওঠাতে নৌমি স্থীর থাকতে পারে না।ভয়ার্ত শরীর নিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। এপাশ থেকে ডাক দেয়

‘কে?কে দরজার সামনে?’

ওপাশ থেকে গমগমে নারীর আওয়াজ ভেসে আসে,

‘দরজা খোলো বউমা।আমি তোমার পাশের বাসার কাকি!’

জয়ন্তর আম্মু?বৃষ্টির শব্দে কন্ঠ ঠিক ঠাওর করতে পারলো না।ভেবেই নিলো জয়ন্তর আম্মু এসেছে।প্রতিবেশী যেহেতু আসতেই পারে।বেশি ভাবলো না ও মনে সাহস সঞ্চয় করে বোকা মেয়েটা দরজাটা খুলে ফেললো।তবে দরজার দাড়ানো জীবটিকে দেখে ভয়ে চেচিয়ে ওঠে,

‘ওমাগোওওও,নাআআআ!’

চলবে…?

[ফের সাসপেন্স দেখি কে বলতে পারে কাকে দেখে নৌমি চেঁচাল। ভালোবাসা পাখি, হ্যাপি রিডিং]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here