#প্রিয়_নীলপদ্ম —১৭.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]
দুটো চড়ুই পাখি এসেছে, ওরা কদিন ধরেই নৌমির বারান্দায় আসে।চড়ুই পাখি দুটোকে নৌমির পছন্দ হয়েছে তাই কিছু খাবার রেখে দেয় বারান্দায় সাথে পানি।যাতে যখন ইচ্ছে ওই পাখিদুটো এসে খেতে পারে,তৃষ্ণা নিবারন করতে পারে।আজকে জোড় ভেঙে একটি পাখি আসাতে নৌমির কপালে ভাজ পরলো।আরেকটি পাখি কই?কেন আসলো না?এমন কতই না চিন্তা!খেয়াল করে দেখলো নৌমি, পাখিটি মুখে করে খাবার নিয়ে গেলো বোধহয় তার সঙ্গীনির জন্য। নৌমি একা-একাই হাসলো এসব দেখে।
এই পাখিটির মতো তার-ও তার সঙ্গীর কথা মনে পরে,একটু কাছে চায় কিন্তু তার কপাল কি ওর আছে?তূর্য বাবাজী তো কাজে ব্যস্ত বউয়ের কথা মনে করার সময় কই তার?তূর্য বাড়ি ছেড়েছে আজ একমাস হবে।নৌমি গোটা পাচেক বছর যতটা না তূর্যকে মিস করেছে তার থেকে এই একমাসে দ্বিগুণ মিস করেছে,করছে।রোজই ফোনে কথা হয় ওদের, সম্পর্কের জটিলতা নেই বললেই চলে এখন আর।তবে জটিলতা না থাকলেও রয়েছে কয়েক..কয়েক মাইলের লম্বা দূরত্ব।নৌমি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বারান্দা ছেড়ে ঘরে আসে।নৌমি এখন ঘর পাল্টিয়েছে বর্তমানে ও তূর্যের ঘরেই থাকে।মানুষটা না থাকুক তবে তার ছোঁয়া তো আছে এঘরে!হঠাৎ তাসফি দৌড়ে এসে হুড়মুড় করে রুমে ঢোকে।হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
‘বউমণি নিচে..নিচে চলো। দেখবে এসো টিভিতে কাকে দেখাচ্ছে!’
নৌমি তাসফির কথার পিঠে কিছু বলতে পারলো না এর আগেই তাসফি ওকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো নিজের সাথে। নৌমি কিছু বলার সুযোগটুকু পেলো না। নিচে এসে নিজেও তুলি আর হাফসা খাতুনের মতো হা হয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকে।তূর্য.. তূর্যকে দেখাচ্ছে টিভিতে।অনেক রিপোর্টার,ক্যামেরাম্যানদের সামনে স্বাভাবিক বদনে কথা বলছে।
‘আমরা বেশ কয়েকমাস ধরেই এই সন্ত্রাসীদের ধরার পরিকল্পনা করেছি।যদিও এর মূলে কে আছে এখনও ধরা যায়নি তবে অস্ত্রপাচারের সাথে যুক্ত অধিকাংশ সন্ত্রাসীদের ধরতে আমরা সক্ষম হয়েছি।আমরা এর মূলকেন্দ্রবিন্দুকেও ধরবো খুব শীগ্রই ইনশাআল্লাহ’
তূর্য এটুকু বলেই থামে।নৌমি দেখে তার একান্ত ব্যক্তিগত পুরুষটিকে।রিপোর্টারা আরো অনেক প্রশ্ন করে তূর্যকে, তূর্যও শান্তচিত্তে সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে।নৌমি গিয়ে সোফায় বসে গালে হাত দিয়ে মনোযোগ সহকারে তূর্যকে খেয়াল করতে থাকে।লাটসাহেব তো আরো সুন্দর হয়েছে দিনদিন। এমনিতেই কত মেয়ে ওনাকে দেখে ক্রাশ খায় আজকের পর নিশ্চয়ই আরো খাবে?নৌমি এসব ভেবে আরো চিন্তিত হয়ে ওঠে।মেয়ে মানুষের চিন্তার শেষ নেই তা-ও যদি হয় প্রিয় মানুষটি তাহলে তো আর কথাই নেই।
‘আরে এইডা হুজাইফার জামাই না?আনোয়ার দেখি! ও এইসব খারাপ কাজের সাথে যুক্ত, হায় আল্লাহ!’
হাফসার আকস্মিক উত্তেজিত কন্ঠে নৌমি তাকায় টিভির স্ক্রিনে। মেহেরবার বাবাকে দেখে নৌমি নিজেও চমকে ওঠে। আনোয়ার হোসেনকে সন্ত্রাসীদের সাথে দেখে চোয়াল ঝুলে পরার যোগাড় সকলের। তুলি তৎক্ষনাৎ আরিফুর রেহমানকে ফোন দেয় কি হচ্ছে না হচ্ছে তা জানার জন্য।আরিফ ডিউটিতে থাকার কারণে ফোন ধরতে পারে না।
‘দেখো.. দেখো তোমরা।সব জায়গায় নিউজ হয়ে গেছে আঙ্কেল এসব বাজে কাজের সাথে জড়িত!’
তাসফির কথার বিপরীতে আর কিছু বললো না কেউ। সবার মাঝে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। আনোয়ার হোসেনকে তো ভালোই ভেবেছিলো সকলে কিন্তু… কিছু মানুষ হয় যারা মনে ময়লা রেখে উপরে ফিটফাট থাকার চেষ্টা করে।আনোয়ার হোসেনের বেলাতেও তেমনই হয়েছে।
____________
দুপুরের খাওয়া শেষে নৌমি একটু শুয়েছিলো হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। ফোন স্ক্রিনে তূর্যের নাম দেখে মনেমনে খুশি হলেও তা প্রকাশ করে না।সকাল এতো ফোন দিলো তখন তো ধরেনি।নৌমিও ধরবে না এখন!
একবার..দুবার…তিনবার কল আসে নৌমি বসেবসে তা দেখে তবে ফোন উঠায় না।তবে কল কেটে যাওয়ার পরে যখন আর কল আসে না তখন আবার চিন্তা হয় লাটসাহেব রাগ করলো?ধূর!এর থেকে তো কল রিসিভ করাই ভালো ছিলো।নিজে এখন করবে?হ্যা তাই ভালো।কল করতে যাবে এর আগেই তাসফি ঘরের বাহির থেকে চেচিয়ে উঠে
‘বউমণি তান’দা ফোন দিচ্ছে, কোথায় তুমি?রিসিভ করো!’
তাসফি চলে যায়। কি ধূর্ত লোক রে বাবা।যেই না ওকে ফোনে পেলো না ওমনি তাসফির ফোনে ফোন দেওয়া হয়ে গেলো।ভাবনার মাঝে ফের ফোন বেজে ওঠে। এবার আর গড়িমসি করে না ও।তৎক্ষনাৎ কল রিসিভ করে।সাথেসাথে ওপাশ থেকে ভেসে আসে তূর্যের গমগমে কন্ঠ,
‘এই মেয়ে কোথায় ছিলে তুমি?কতবার কল করেছি!বলেছিলাম না যেখানেই থাকো না কেন কল করার সাথে সাথে ফোন রিসিভ করবে,হু?’
নৌমি ভেঙচি কাটে এপাশে।নিজেও ফুঁসে উঠে বলে,
‘আর কে জানো বলেছিলো আমি যত ব্যস্তই থাকি না কেন তুমি ফোন দিলে আমি তা রিসিভ করবোই। অথচ আমি সকালে কমসেকম পাঁচ-ছয় বার তো কল করেছিই!’
তূর্য বুঝলো প্যাচটা কোথায় লেগেছে। নিজের ভুল যেহেতু তাই রাগ করে থাকার কোনো মানে হয় না।
‘তাই অভিমান হয়েছে বুঝি?কি করি বলো,সকাল থেকে এতো ব্যস্ত ছিলাম যে ফোনটা নিজের সাথে পর্যন্ত ছিলো না। অবহেলায় রুমেই পরে ছিলো।সবকাজ শেষ করে মাত্র রুমে আসলাম এসেই তোমাকে ফোন দিয়েছি! আমি স্যরি বউ।’
এই আহ্লাদী কথার পিঠে নৌমি অভিমান করে থাকে কিভাবে?আর..আর পুরুষটা যে কতটা ব্যস্ত ছিলো তার একটু ঝলক তো নিজেও দেখেছে সকালে টিভিতে। তাই রাগ ভুলে চিন্তিত হলো
‘আপনি খাননি কিছু?এমন করেন কেন?নিজের দিকেও তো খেয়াল দিতে হবে না-কি?’
‘বউ রাগ করবে জানতাম তাই আগে তার রাগ ভাঙাই পরে না হয় খাওয়া যাবে।’
‘হয়েছে এতো কথা বলতে হবে না। এখন ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে নিন।’
‘জো হুকুম মেরি মাহরানী!সকালের নিউজ দেখেছিলেন ম্যাডাম?’
হাত থেকে ঘড়ি খুলে বিছানার শরীর এলিয়ে দিয়ে বসে তূর্য।এতো কাজের ভিরে একটু রেস্ট নেওয়া-ও হয়না।নৌমি এদিকে নড়েচড়ে বসে। তূর্যের কথায় কথায় সকালের ঘটনাও ভুলে বসেছিলো ও।
‘হ্যা দেখেছিলাম। আনোয়ার আঙ্কেল এসবের সাথে যুক্ত!আমি ভাবতেই পারছি না।উনি আমায় কত স্নেহ করতেন। এতো ভালো মানুষ এসব করতে পারে এটা কল্পনাতেই আনা যায় না!’
‘কল্পনা নয় মেডাম ইহা বাস্তব।উপর থেকে কি আর মানুষ চেনা যায় বলো?প্রথমে সন্ত্রাসীদের ভিরে ওনার নাম দেখে একটু চমকে গেছিলাম। তবে কি আর করার।যে যা করবে তার কর্মফল-ও তাকে ভোগ করতে হবে।’
নৌমি একটু ভাবনায় নিমজ্জিত হয়। হঠাৎ কিছু মনে পরাতেই চোখমুখ কুঁচকে বলে,
‘এই আপনি ক্যামেরার সামনে এসেছেন কেন আজ?অন্যরা ছিলো না?’
হঠাৎ নৌমির একথার মানে বুঝলো না তূর্য। কপালে ভাজ ফেলে জিজ্ঞেস করে,
‘মানে?আমি থাকলে কি সমস্যা?কেসটার দায়িত্ব যেহেতু আমার ছিলো তাই আমিই তো থাকবে সামনে তাই-না?’
‘না থাকবেন না, এমনিতেই মেয়েরা আপনাকে বদ-নজর দেয়,ক্রাশ খায়।আজকের পর তো আরও এমন করবে!’
তূর্য বুঝলো নৌমির আসল সমস্যাটা কোথায়। বউ তার এসব বিষয়ে খুতখুতে হচ্ছে দিনকে দিন। ঠোঁট কামড়ে শব্দবিহীন হেঁসে উঠলো।আরেকটু জ্বালাতে বললো,
‘জেলাস মিসেস?মেয়েরা আমায় খারাপ নজরে দেখলে আমি কি করবো?আমি তো আর ওদের বাজে নজরে দেখি না, বলো?দেখি তো তোমাকে!’
নৌমি তূর্যের শেষের কথায় চোখ বন্ধ করে ফেলে।ব্যাটা বদ একটা!কথাটা আমলে না নিয়ে বলে,
‘দিনদিন সুন্দর হচ্ছেন মশাই রহস্য কি?’
‘বউয়ের ভালোবাসা, সামনা-সামনি ভালোবাসা নয় ইহা উড়ন্ত ভালোবাসা!বুঝলে?’
‘বয়েই গেছে আমার আপনাকে ভালোবাসতে, হুহ্।’
‘আচ্ছা, আমি তো বাসি এতেই হবে।’
তূর্যের সহজ স্বীকারোক্তি। আরো কিছুক্ষন কথার পরে তূর্যের ডাক আসে।এপর্যায় কল কাটা ছাড়া উপায় না দেখে বলে
‘রাখি তাহলে?’
নৌমির ইচ্ছে করছিলো আরো..আরো কিছুক্ষণ কথা বলতে তূর্যের সাথে তবে তূর্যের পরিস্থিতি বুঝে আর কথা বাড়ায় না।জোড়েজোড়ে শ্বাস নিয়ে মন খারাপ করে বলে,
‘মিস ইউ সো মাচ জনাব’
তূর্য সময় নিলো।বউয়ের কন্ঠ শুনে বুঝলো মেয়েটা সত্যিই ওকে খুব মিস করে।ও নিশ্বাস ফেলে হেঁসে বলে,
‘মি ঠু বেগম সাহেবা’
______________
নৌমির কিছু দরকারে বিকালে বাসা থেকে বের হতে হয়।তাসফিরও আসার কথা ছিলো তবে তাসফির বান্ধবীর বাড়ি যেতে হয়েছে কাজে।এদিকে নৌমিকেও যেতেই হতো তাই একা-একাই বাসা থেকে বের হয়।দরকারী কাজ শেষে বাসার সবার জন্য কিছু কেনাকাটা করার ইচ্ছে হলো হঠাৎ তাই সোজা ঢুকে পরে এখানের একটা শপিংমলে।তূর্যের সাথে ভুলবোঝাবুঝি শেষ হওয়ার পর থেকে তূর্যই ওর যাবতীয় খরচ দেয়।আগে আরিফ দিলেও তূর্য মানা করে দেয় এখন।তার একটাই কথা তার বউ সে ভরনপোষণ চালাবে এখন।আগের কথা বাদ এখন থেকে নৌমির সকল দায়িত্ব তূর্যের।
ঘুরে-ঘুরে দেখে টুকটাক কিনতে কিনতে অনেক্ক্ষণ সময় কেটে যায়।হাত ভর্তি ব্যাগ নিয়ে শপিংমল থেকে বের হতেই থমকে দাঁড়ায় ও।সামনে দাঁড়ানো মানুষ দুটিকে দেখে বিস্ময়ে নৌমির চোখজোড়া ডিম্বাকৃতির হয়।এরা…কিভাবে?
চলবে….?
[কাদের দেখে নৌমি চমকে উঠলো?বলতে পারবে পাখি?হ্যাপি রিডিং]

