প্রিয়_নীলপদ্ম —২০. #মুশরাফা_মিরা

0
38

#প্রিয়_নীলপদ্ম —২০.
#মুশরাফা_মিরা
[কোনো প্রকার কপি নিষিদ্ধ]

সারারাত বর্ষনের সমাপ্তি ঘটে সূর্যীমামার হাসিমুখের আগমনে।সকালের তীক্ষ্ণ রোদকে দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না ওরাতে কত ভারি বর্ষন-ই না হলো! এমন তো মানুষের জীবনও তাই-না?মুহূর্তের মাঝে পাল্টে যায়।বোঝাই যায় না কখন কি হয়।রোদের ঝলক তূর্যের চোখে লাগতেই ওর ঘুম হালকা হয়।হাত হাতড়ে খোঁজে কিছু তবে না পেয়ে কপালে ভাজ পরে,বাধ্য হয়ে চোখজোড়া মেলতেই হয় ওকে।চঞ্চল দৃষ্টিতে চাইলো আশেপাশে গেলো কই মেয়েটা?পুরো রুমটায় চোখ বুলায় কোথাও নেই।সাতসকা… ঘড়ির দিকে চাইতেই ভাবনা ওভাবেই আঁটকে যায় তূর্যের।সকাল সাড়ে দশটা!অলৌকিক ঘটনা তূর্যের জীবনের এটা।যে ছেলে প্রায় সারারাত জেগে ভোরে ঘুমালেও ছয়টার বেশিক্ষণ বিছানায় থাকে না।সে আজ দশটা পার করে দিয়েছে ঘুমিয়ে!অবাক হওয়ার মতোই ঘটনা।তরিগরি করে উঠে বসে।এতোক্ষণ কিভাবে ঘুমালো ও?এতো শান্তির ঘুম কবে ঘুমিয়েছে তা ওর ঠিকঠাক মনেও নেই। নৌমি মেয়েটা কি জাদু জানে?কিভাবে তূর্যের অভ্যেস বদলে দিলো।
বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে এগুতে এগুতে একা-একা বিরবির করে,

‘এভাবে আমায় বদলে নিও না মেয়ে।আমি যে তোমায় ছাড়া একদম মূল্যহীন হয়ে পরবো!’

_____________

তূর্য একেবারে ফিটফাট হয়ে নিচে নামলো।চোখ দুটো খুঁজছে তার বউকে।রান্না ঘরের দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে যায়।নৌমি একমনে কিছু একটা বানাচ্ছে। পড়নে ওর শাড়ি,ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুরো পিঠ জুড়ে।আচল ভাজ করে কাঁধে তোলা।একদম পাক্কা বউ লাগছে। বউ-ই তো তূর্যের বউ!তূর্য হাসলো একটু এরপর নিঃশব্দে নৌমির পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঠান্ডা হাত রাখে নৌমির শাড়ির ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা কোমড়ে,ঠোঁট রাখে নৌমির ঘাড়ে।একমনে কাজ করতে থাকা নৌমি হঠাৎ এমন স্পর্শে কেঁপে উঠলো,কোমড় বেঁকে গেলো কিঞ্চিৎ। স্পর্শকারীর চেহারা দেখতে হলো না ওকে এমনিতেই বুঝতে পারলো পিছনে কে দাড়িয়ে। তাই ওভাবে থেকেই বলে,

‘তূর্য জ্বালাবেন না এখন প্লিজ। কাজ করছি আমি,ছাড়ুন তো!’

থোড়াই শুনলো সেসব তূর্য। আরো স্পর্শের গভীরতা বাড়ালো। কোমড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরে নিজের দিকে ঘুরালো নৌমিকে।কপোলে চুমু খেয়ে বলে,

‘বিছানা ছেড়েছো কেন আমার আগে?’

নৌমি তূর্যকে দূরে সরিয়ে দিতে ওর হাত দুটো তূর্যের বুকে রাখে।ধাক্কা দিয়ে বলে,

‘আপনার সাথে বিছানা ছাড়তে গেলে আজ আর ওঠা হতো না,খাওয়া হতো না কিছু। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখেছেন কয়টা বাজে?’

‘এমন সুন্দরী পাশে থাকলে আশেপাশে কোনো দিকেই চোখ দিতে ইচ্ছে হয়না।বাই দ্যা ওয়ে আজকে তোমায় একটু বেশিই ভালো লাগছে যে।এমন গ্লো এর কারণ কি আমি?’

তূর্যের মুখে দুষ্টুমির ঝলক। নৌমি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে।শুরু হয়েছে ওকে জ্বালানো!মাথা নিচু রেখেই বলে,

‘জানি না আমি। আপনি যান তো এখান থেকে,কাজ করতে দিন আমায়।’

তূর্য আরেকটু ঘনিষ্ঠ হতে চাইলো নৌমির তবে পারলো না।ছ্যাকা পরলো ওর হাতের উপর। ব্যাথাতুর শব্দ করে ছিটকে দূরে সরে গেলো নৌমির কাছ থেকে।নৌমি হেঁসে উঠলো হাতে থাকা গরম খুন্তি নাড়াতে নাড়াতে বললো,

‘কি জনাব দূরে সরে গেলেন যে?ছ্যাকাটা একটু বেশিই লেগেছে নাকি,হু?’

তূর্য কটমটিয়ে চায় ওর দিকে। হাতটা তাড়াতাড়ি বেসিং-এর পানিতে চুবিয়ে ধরলো যাতে লাল না হয়ে যায়।দাত চিবিয়ে বলে,

‘বাঁদর মেয়ে সকাল সকাল মুডটা নষ্ট না করলে হয়না না তোমার?দিলে তো আমার হাতটা পুড়িয়ে!শেষে কিনা বউকে চুমু খেতে গিয়ে গরম খুন্তির ছ্যাকা খেতে হলো আমায়!’

নৌমি হাসি বহাল রেখেই বলে,

‘বেশি করেছি ছ্যাকা দিয়েছি।বলেছিলাম না কাজ করছি?তা-ও কেন এসেছেন জ্বালাতে?রাতে জ্বালিয়ে..’

বাকি কথা সম্পূর্ণ করার আগেই জিভে লাগাম টানে নৌমি।কি বলতে যাচ্ছিলো ও?সকালে তূর্যের লজ্জা দেওয়ার হাত থেকে বাঁচতে রান্না করতে আসলো।আবার নিজেই ওসব মনে করাচ্ছে এই লাগামহীন পুরুষটাকে?কিসব করছে ও?তূর্যের মতো হয়ে যাচ্ছে না দিনদিন? এদিকে আবারও নৌমিকে জ্বালানোর সুযোগ পেলো তূর্য।হাতটা ঝুলানো তোয়ালে মুছে নৌমিকে বলে,

‘কাল রাতে?কি করেছিলাম, উমমম আমার তো মনে পরছে না।আচ্ছা কি করে ছিলাম আমি?বলো তো!’

ব্যাস আবার.. আবারও শুরু হয়ে গেলো তূর্যের ট্যাপরেকর্ডার।যেসে ট্যাপরেকর্ডার নয় লাগামহীন ট্যাপরেকর্ডার।নৌমি এবার বিরক্ত হলো।চোখ জোড়া ছোট ছোট করে বলে,

‘আপনি যাবেন এখান থেকে?প্লিজ তূর্য, কাজ করছি আমি!’

নৌমির মুখের দিকে তাকিয়ে ঠাট্টা বন্ধ করলো ও।এগিয়ে এসে গাল ছুলো বললো,

‘খারাপ লাগছে না?রেস্ট নিলেই পারতে।’

‘রেস্ট নিলে আজ সকালে খাওয়া হতো না জনাব।’

‘বউগিরি শুরু হয়ে গেছে তোমার তাই-না? সরো তো বাকি কাজ আমি করছি।গিয়ে সোফায় বসে থাকো চুপচাপ।’

তূর্যের এই কথাগুলো ভালো লাগে নৌমির।মানুষটা যে ওকে ভালো রাখতে চায় এমনটা ওর জানা।তাই তো হাসায়,জ্বালায় আর দিনশেষে ভালোবাসে।এটুকুই তো চাওয়া ওর!তূর্য ওকে ছেড়ে হাত লাগালো বাকি কাজ শেষ করতে।নৌমিকে যেতে বলা হলেও গেলো না ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো তূর্যের পাশে।চেয়ে দেখলো ওর সুদর্শন, ভালো জামাইটাকে।রান্না শেষ করতে এগারোটা আসেপাশে বেজে গেলো।এরমাঝে নৌমিকে ও কোনো কাজ করতে দিলো না করতে গেলেও ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে। টেবিলে খাবার এনে নৌমিকে বসায় নিজের পাশে।নিজ দায়িত্বে খাবার বেড়ে দেয় নৌমির পাতে বলে,

‘খাও এবার সবটুকু শেষ করবে।এটুকু কেন তোমার শরীর? এক চিমটি ভাত খেলে হবে কিভাবে? বয়স তো বিশ কিন্তু ওজন বোধহয় পয়তাল্লিশও নেই গায়ে।’

নৌমি লুকিয়ে মুখ বাকায়।সবাই খালি ওকে খেতে বলে কিন্তু খাবেটা কিভাবে? রুচিতেও তো আসা লাগে তাই-না?জোড় করে পেটে ঠুসলেই কি হয় না-কি?তবে তূর্যের ওই সিরিয়াস মুখখানার দিকে চেয়ে মুখে কিছু বলার সাহস পেলো না।চুপচাপ খেতে লাগলো।তূর্য নিজ থেকে বলে,

‘বিশ্বাস করো নৌমি আমি যদি বাসায় থাকতাম না সবসময় তাহলে একমাস..একমাসে তোমায় ফিটফাট করে ফেলতাম। এভাবে পাটকাঠি হয়ে থাকতে দিতাম না’

নৌমি অপমানিত বোধ করলো এবার পাটকাঠি? ও এতোটাও শুকনা নয় তো।তবুও বাড়িয়ে বলছে লোকটা।তাই নিজের হয়ে সাফাই গাইলো,

‘মোটেও না আমি এতোটাও শুকনা নই যতটা আপনি বলছেন। আজকাল সবাই এমনই একটু ফিটফাট থাকে।এটাই পারফেক্ট ফিটনেস!’

‘পারফেক্ট ফিটনেস, হুহ্।চটকানা দিয়ে ফিটনেস বের করে দিবো।বেশি কথা বললে আরো এক প্লেট ভাত খেতে হবে তোমায়!’

‘কোনো কথাই বললো না!’

‘আচ্ছা’

খাবার টেবিলে কোনো কথা হলো না ওদের মাঝে।দুএকবার চোখাচোখি হলেও নৌমি ভেংচি কেটেছে আর তূর্য চোখ গরম করে তাকিয়েছে,এতটুকুই!

__________

রুমে এসে নৌমি শরীর এলিয়ে দিলো বিছানায়। শরীরের ব্যাথাগুলো জেঁকে বসেছে। তূর্য রুমে এসে দেখলো নৌমি চোখমুখ কুঁচকে বিছানায় পরে আছে।তূর্য চলন্ত পায়ে ওর পাশে গিয়ে বসলো।মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে স্বরে বললো,

‘কি হয়েছে বউ কষ্ট হচ্ছে?’

‘না!’

‘তাহলে?’

‘খারাপ লাগছে কেমন জানি।শরীরে ব্যাথা হচ্ছে!’

‘এসো আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি ঘুমালে ঠিক হয়ে যাবে সব।পাকনামি করে রান্না না করতে গেলেই পারতে!’

‘এ নিয়ে তো একবার বকলেন আবারও?’

তূর্য হাসলো নৌমির কথাতে।বললো,

‘আচ্ছা আর বকবো না,ঘুমাও এবার!’

শরীর ক্লান্ত থাকায় সহজেই ঘুম ধরা দিলো নৌমির চোখে। তূর্য ঘুমালো না চেয়ে দেখলো তার ছোটমোটো বউটাকে।মেয়েটা আসলেই একটু বেশিই আদুরে।আনমনে হেঁসে মেলে রাখা চুলগুলো গুছিয়ে রাখলো একপাশে তখন চোখ আটকালো গলার কাছের গুটিকয়েক লালচে দাগ।এগুলো ওর দ্বারাই সৃষ্টি! একটু শক্ত ভাবে দাগগুলোতে আঙুল ছোয়াতেই নৌমি কপাল কুঁচকে ফেলে।বোঝাচ্ছে তার ঘুমে যেন ডিস্টার্ব না করে আর।তূর্যে তা বুঝে নিয়ে আর জ্বালানো না। টি-টেবিলের ড্রয়ার থেকে মলম বের করে লাগিয়ে দিলো নৌমির উন্মুক্ত দাগগুলোতে।এরপর জড়িয়ে ধরে শুয়ে পরলো ওর পারসোনাল নরম কোলবালিশটাকে।

__________________

আরিফরা বাসায় ফেরে সন্ধ্যা নাগাদ। সকালে আসার কথা থাকলেও আসতে পারে নি তারা হুজাইফা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরাতে।তবে হাফসা খাতুন থেকে গেছে ওখানেই যতই হোক বোন,বোনের মেয়ে বলে কথা।থাকা তো উচিত! ড্রয়িং রুমে সকলে বসেছে একসাথে অনেক দিন পরে।তুলি চা করে নিয়ে এলো সকলের জন্য। আরিফ ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে,

‘তোমার আন্টি তোমায় দোষ দিচ্ছে তান।ছেলেমানুষী করে বলছে তুমি এসব ইচ্ছে করেই করেছো!’

বাবার কথা মন দিয়ে শুনলো তূর্য।এরপর হেসে বললো,

‘প্রোফেশন আর পারসোনাল লাইফ দুটো আলাদা বাবা।যে দোষী তাকে শাস্তি দিতেই হবে।আইন পরিবার, প্রিয়জন মানে না।আমি ক্যাপ্টেন তানজিম হিসেবে ওনাকে আইনের কাছে তুলে দিতে সাহায্য করেছি আত্মীয় হিসেবে না।উনি অস্ত্রপাচারের সাথে সরাসরি ইনভলভ! কিভাবে ছেড়ে দিবো?এতে যদি আমাকে দোষ দেয় নো প্রবলেম।’

আরিফ ছেলের কথায় একমত হলেন। তুলিও সায় দিয়ে বলে,

‘কি আশ্চর্য! অপরাধ করবে আনোয়ার ভাই আর দোষ দিবে আমার ছেলের!এগুলো তো ঠিক না।তুমি একথা আমায় বললে না কেন?আমায় সামনে বললে..’

আরিফ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্ত্রীকে খুঁচিয়ে বলে,

‘কি করতে ঝগড়া? তা পারতে তুমি?’

‘কেন ঝগড়া করবো কেন?উচিত কথা মুখের উপর বলে আসতাম!’

‘বাদ দাও আম্মু। আন্টি একটু পাগলাটে জানো তো!’

তাসফির কথায় তূর্য বলে,

‘হ্যা এসব বিষয়ে কথা বলাই ভালো।ওহ্ একটা কথা বলার আছে আমার ফ্যামেলি ট্র্যুরে যাচ্ছি।’

তূর্যের স্বাভাবিক চিত্তে বলা কথাটা সবার মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি করলো।ঘোরাঘুরি নিয়ে প্রায় সবারই আগ্রহ আছে এ পরিবারের। তাই তূর্য কথাটি বলা মাত্র সকলের চোখমুখ খুশিতে চিকচিক করে উঠলো।তাসফি অতি উৎসাহিত হয়ে বলে,

‘সত্যি?’

‘হু!’

নৌমি হাসি-হাসি মুখ করে জানতে চায় কোথায় যাচ্ছে তারা।তূর্য লাস্ট বারের মতো চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে,

‘সাজেক।সব প্ল্যান ডান!এখন শুধু যাওয়ার পালা।’

তাসফি অতি আনন্দে আর বসে থাকতে পারলো না।সোফায় দাঁড়িয়ে আনন্দিত গলাতে চেচিয়ে,

‘হুররেএ…. আমাদের গন্তব্য এবার সাজেক’

[রিচেক দেওয়ার সময়টুকু পাইনি।ভুল হয়ে থাকলে ধরিয়ে দিও সাথে আগাম ক্ষমাপ্রার্থী, হ্যাপি রিডিং]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here