#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১৮
#সমৃদ্ধি_রিধী
রিসোর্টের মাঝের বড় মাঠে দুটো বিছনার চাদর বিছানো। তাতে আহিয়ান এদিক থেকে ওদিকে হামাগুড়ি দিচ্ছে। ওর পাশে অনি বসা। অনি আহিয়ানকে ধরে দাঁড়া করিয়ে একটু হাটাচ্ছে আবার ছেড়ে দিয়ে ওকে নিজের মতো হামাগুড়ি দিতে দিচ্ছে। শুধু অনি একটু চড়কির মতো ঘুরছে এই যা।
অনি আহিয়ানকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। আহিয়ান নানান ধরনের অস্পষ্ট শব্দ করতে থাকে। অনি তাও ছাড়ে। আহিয়ান অনবরত মা মা মা করতে থাকে। অনি আহিয়ানকে নিয়ে উঠে বসে। ভ্রু কুঁচকে বলে,
“তোর মামা তার চাচার বাড়ি। এমন চাচার কোলে থেকে মামা করছিস কেনো? খালে চুবিয়ে নিয়ে আসবো। কত বড় সাহস!”
আহিয়ান ঠোঁট উল্টে তাকালো। অনি আহিয়ানকে ঠেসে কয়েকটা চুমু দিলো। আহিয়ান গালে হাত ঘষে। ভাবখানা এমন ও খুবই বিরক্ত। অনি চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে বলে,
“চাচির মতো করলি কেনো? তোকে আমি আরো চুমু দিবো।”
আহিয়ানকে আরো কয়েকটা চুমু দিলো। ক্রমে ক্রমে ঠোঁট উল্টিয়ে আহিয়ানের কেঁদে দেওয়ার মতো অবস্থা। আশেপাশে ফারিনকে দেখলেই কেঁদে দিবে এমন। অনি হেসে বলে, “আয়হায় তুই দেখি আমার বউয়ের মতো!”
আহিয়ান ঘাড় এদিক ওদিক ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকায়। এবার অনি আহিয়ানকে জাপ্টে ধরে বলে, “তোকে চিৎপটাং করি?”
বলে সাথে সাথে আহিয়ানকে উল্টো করে একবার ৩৬০° কোণে ঘুরিয়ে ফেললো। ব্যাস! আহিয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কাঁদা আরম্ভ করে দেয়। কান্না থামাতে গিয়ে অনি পড়ে বিপাকে। কান্না থামাতে মাঠে কিছুক্ষণ হাঁটাহাটি করে। তাও ছেলের কান্না থামে না৷ অনি আহিয়ানকে ফারিনের কোলে দিয়ে চুপচাপ সামনে থেকে কেটে পড়লো। আহিয়ান কাঁদছে কেনো– ফারিনের সেই বিষয়ক একটা প্রশ্নেরও জবাব দিলো না।
ফারিন কান্না থামিয়ে একটু স্বাভাবিক করতেই অনি আবার এসে নিয়ে গেল। ফারিন সেই সুযোগে শাড়ি, অর্নামেন্টস বের করে রাখে। আহসান মিনিট দুয়েক আগে মেসেজ দিয়েছে আদৃত-ইশা, অনি-ইনায়া বিকালের দিকে বের হবে। কিন্তু ওরা বের হবে না। আহিয়ানের ঠান্ডা লেগে যাবে এই অজুহাত দিয়ে রিসোর্টেই থাকবে আর তিনজন মিলে সময় কাটাবে।
ফারিনের মোবাইলে কল এলো। ফারিন মোবাইল নিয়ে দেখে আহসান কল করেছে। ফারিন রিসিভ করে আহসান ও পাশ থেকে ব্যস্ত গলায় বলে,
“মেসেজ সিন করে রিপ্লাই দাও না কেনো?”
“আহিয়ান কাঁদছিলো তাই রিপ্লাই দেয়নি।”
“ইশা যদি তোমাকে বের হওয়ার প্রপোজাল দেয় তাহলে তুমি একসেপ্ট করবে না। বুঝেছো?”
“কেনো কেনো? আমার ঘুরতে মন চায় না? তোমার জন্য আমি নিজে ঘুরাঘুরি কেনো মিস দিবো?”
“এমনিতেই তুমি ওদেরকে এনে কাবাবে হাড্ডি ঢুকিয়েছো। এখন যদি ওদের সাথে বের হও, তাহলে কিন্তু একটা দফারফা হয়ে যাবে ফৌজিয়া ফারিন।”
“তোমাকে ভয় পাই আমি?”
“যাতে ভয় পাও সেই ব্যবস্থা করবো?”
“কল কেনো করেছে সেটা বলো।”
“আমার ব্যাগে একটা শপিং ব্যাগ আছে সেটা বের করো।”
ফারিন কানে ফোন চেপে শপিং ব্যাগ বের করলো। আহসানকে বলে, “এখন?”
“ব্যাগটা খুলো, ওখানে একটা শাড়ি আছে। ওরা বের হয়ে গেল তুমি এটা পড়ে রেডি হবে, তারপর আমরা বাপ, বেটা, মা মিলে আমরা ঘুরবো।”
ফারিনের শাড়িটা মারাত্মক পছন্দ হয়েছে। ও শাড়িটার গায়ে হাত বুলিয়ে বলে, “শাড়িটা পছন্দ হয়নি। পরবো না আমি।”
“তোমার এই ধরনের শাড়ি পছন্দ আমি জানি। বেশি ভাব নিও না।”
ফারিন কথা এড়িয়ে গেল। বলে, “কোথায় আছো?”
“বেলকনিতে এলেই দেখতে পাবে।”
ফারিন কানের মোবাইল চেপে বেলকনিতে এলো। আহসান কানে ফোন চেপে চাদরের উপর বসা। তার একটু দূরে অনি আহিয়ানকে কাঁধে নিয়ে হাঁটছে। ইনায়া সেটা ভিডিও করছে। ফারিন বলে,
“আদৃত ভাই, ইশা কোথায়?”
আহসান হুট করে হেসে উঠলো। ফারিন বেলকনির বেতের চেয়ারে বসে। কপাল কুঁচকে আহসানকে প্রশ্ন করে,
“কি হলো? এভাবে হাসছো কেনো?”
“কেউ একজন সব সময় বলতো বউকে কিভাবে মানুষ সরি বলে? সে এখন বউয়ের পিছন পিছন সরি বলে ঘুরছে।”
“কে আদৃত ভাই?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কিভাবে দেখলে?”
“আদৃতকে কটেজ থেকে বের হওয়ার সময় সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুনলাম।”
“তোমার লজ্জা লাগে না ভাসুর হয়ে এসব শুনতে?”
“মানে খুব সুন্দর রাগ উঠে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় সব শুনেছি। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি আড়ি পেতে ছিলাম?”
“পাততেও পারো।”
“আজাইরা।”
“আহিয়ানের কাছে যাও তো একটু।”
আহসান পিছনে ফিরে অনি আর আহিয়ানকে একপলক দেখে নিলো। “কেনো? ঠিকই তো আছে।”
“ঘামিয়ে গিয়েছে কিনা দেখো।”
“ঘামালে?”
“ঘামিয়ে গেলে সোয়েটারটা খুলে ফেলো। ভিতরে ফুল হাতা জামা আছে সমস্যা হবে না। বাইরে রোদ।”
আহসান কল কেটে উঠে গেল। ফারিন বেলকনি থেকেই দেখে৷ দেখল আহসান আহিয়ানা সোয়েটার খুলে পুনরায় ওই চাদরের উপর এসে বসেছে। মোবাইল বের করে ফারিনকে কল করে। ফারিন রিসিভ করতেই বলে,
“৫০০ হাত দূর থেকে কিভাবে বুঝলে আহিয়ান ঘামিয়ে গিয়েছিল?”
“মাযেরা সব বুঝে।”
আহসান মাথা দুলায়। “শাড়িটা পছন্দ হয়েছে?”
“তোমাকে কেনো বলবো? তুমি আমার কে হও?”
“তোমার বাচ্চার বাপ হই।”
“এখন খুশিতে হাত তালি দাও।”
“তোমার কাছ থেকে আমার ছেলে অভদ্রতা ছাড়া আর কিছু শিখবে না।”
“তুমি নিজে ভালো?”
“তুমিও পাগল, আমিও পাগল। আমাদের ছেলেও পাগল।”
“আহিয়ানকে নিয়ে একদম আজেবাজে কথা বলবে না বলে দিলাম।”
“তুমি আহিয়ানকে নিয়ে এমন হাইপার হয়ে যায় কেনো?”
“জানি না। ওকে কেউ কিছু বললে সহ্য হয় না। আমার থেকে ওর বিষয়ে কারো প্রায়োরিটিও সহ্য হয় না। সেটা তুমি হলেও না।”
“আমাদের আরো ছেলেমেয়ে হলে?”
“নিবো না আমি। আমি আহিয়ানকে নিয়েই থাকবো।”
“যদি অজান্তেই হয়ে যায়?”
“তাহলেও আহিয়ান আমার কাছে ফার্স্ট প্রায়োরিটিই থাকবে। ও আমার কাছে কি তা শুধু আমিই জানি।”
“ওকে বিয়ে দিবে না তুমি? বিয়ে দিলে কি তোমার মতামত আর নিবে? একসময় দূরত্ব তো সৃষ্টি হবেই।”
ফারিন মুখ বিকৃত করে বলে, “মানে কি তুমি? ছেলের এক বছরও হয়নি।”
“সময় যেতে কি?”
“সেটা বড় হলে দেখা যাবে। আমি আর যাই করি না কেনো কুটনি শাশুড়ীর মতো ঝামেলা করবো না।”
“ইয়াহ আই নো। বুড়ো বয়সে আমার মাথা খাবে।”
“এখন খাচ্ছি না বলছো?”
“এখন খাচ্ছো ৫০ শতাংশ, তখন খাবে ১০০ শতাংশ। এটাই। কম বেশি।”
“এখনই ১০০ শতাংশ খাওয়ার ব্যবস্থা করছি দাঁড়াও।”
আহসান তাড়া দিয়ে বলে, “নিচে আসো। ইশা, ইনায়া, আমরা সবাই নিচে।”
“আচ্ছা আসছি।”
“ওদের কিন্তু শিখিয়ে দেওয়া কথাটাই বলো। আহিয়ানের ঠান্ডা লাগবে তাই আমরা যাব না।”
“দেখি বলবো।”
“ওকে নামো।”
ফারিন কেটে দিলো। রুমে এসে আগের বের করা শাড়ি, অর্নামেন্টস ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখে। আহসানের মেসেজ দেখেই ভেবেছিল ওরা না থাকলে ও সেজে বের হবে। আহসানের দেওয়া শাড়ি বের করে বেডের একপাশে রেখে মোবাইল নিয়ে রুম লক করে বেরিয়ে গেল।
_______-________-_______
সময় পাঁচটার আশেপাশে। আহসান, ফারিন রিসোর্টের দীঘির সামনে হাঁটছে। আহসানের কোলে আহিয়ান। ফারিনের পড়নে কালো শাড়ি, হালকা রঙের চাদর একপাশে নেওয়া। আহসানের কালো শার্ট, কালো হুডি। আহিয়ানের পড়নে কালো জিন্স প্যান্ট আর সাদা হুডি। হুডির টুপি দেওয়া মাথায়। টুপির উপর খরগোশের মতো দুটো কান খাড়া হয়ে আছে। নিজেরা অনেকগুলো ছবি তুলেছে একটু আগেই। আহিয়ান মোবাইল দেখলেই কেঁদে উঠছে বলে ওদের আরো ছবি দেখার ইচ্ছে থাকলেও আর তুলেনি।
ফারিন বুকে হাত গুঁজে হাঁটছে। আহসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এখানে বা আশেপাশে একটা রঙ্গন ফুলগাছ ছিল না?”
আহসান আশেপাশে তাকায়। তারপর ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে, “তোমার মনেও আছে?”
“থাকবে না কেনো?”
“তোমার ব্রেইন এতো ভালো?”
“বেটার দ্যান ইয়োর্স।”
“ডোন্ট ইউ নো অহংকার পতনের মূল?”
“লুক হু টকস।”
“সবার সাথে তো ভালো করেই কথা বলো। দেখতে শুনতে কি ভালো, আচার ব্যবহারও ভালো। কি মিশুক হাবভাব, বাপরে বাপ। তাহলে আমার সাথে এমন কেনো? আমার সাথে কথা বলার সময় মনের সব অহংকার বের হয়ে আসে না?”
“ইয়াহ। ঠিক ধরেছো তুমি। এত বড় ঠিক কথা শোনার জন্য তোমাকে কি উপহার দেওয়া যায় বলো তো?”
আহসান দাঁড়িয়ে যায়। ফারিনও থেমে যায়। কপাল কুঁচকে বলে, “দাঁড়িয়ে পড়লে যে?”
“তোমার অনেক বড় একটা কথা ধরে ফেলার জন্য এখন আমাকে চুমু দাও। মনে করো এটাই উপহার।”
ফারিন দাঁত কিড়মিড় করে তাকায়। আহসানের কোল থেকে আহিয়ানকে ছিনিয়ে নিয়ে নেয়। রাগী স্বরে বলে,
“তোমাকে দিয়ে আসলেই কিছু হবে না। তুমি একটা নির্বোধ, বেহায়া, নির্লজ্জ, চামার।”
“এতকিছু কেনো শোনালে?”
“তোমার একটা ছেলে আছে। এক বাচ্চার বাপ তুমি। তাও তো লুইচ্চামো কমে না।”
আহসান হাসলো। চোখে চশমা ঠেলে দুষ্ট হেসে বলে, “কেসা থা কালকা রাত?”
ফারিনের পা থেমে যায়। আহিয়ানকে একহাতে কোলে রেখে অপর হাতে আহসানের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
“বেহায়াপনা করবে না একদম। বাপ হয়েছো, এখন অন্তত মুখে লাগাম টানো।”
আহসান ফারিনের তাক করা আঙুল নিজের মুঠোয় নিয়ে নেয়। দুই পা এগিয়ে এসে বলে,
“বেহায়াপনা শুধু আমি করি? তুমি ভালো মনে হয়? মনে নেই লাস্ট নাইইইইইট….”
আহসান মিটিমিটি হাসলো। ফারিন কপাল কুঁচকে আহসানের মুঠো থেকে হাত ছাড়িয়ে নেয়। বড় বড় পা ফেলে উল্টোদিকে হাঁটা দেয়। “অসহ্য একটা।”
আহসান গা দুলিয়ে হাসলো। বড় বড় পা ফেলে ফারিনের কাছে এসে ফারিনের চলার সাথে পা মেলায়। আহিয়ানকে কোলে নিয়ে বলে,
“রঙ্গন ফুলের গাছ পুকুরের কাছে। ওইযে একদম ওই শেষপ্রান্তে। যাবে?”
“এটা জিজ্ঞাসা করার মতো প্রশ্ন?”
“তোমার কি আমার সাথে ভাব দেখাতে ভালো লাগে?”
সোজাসাপ্টা উত্তর, “হ্যাঁ।”
“তুমি কি জানো তুমি একটা ওয়েল-নোন কোম্পানির সম্মানীয় এমডিকে তোমার পিছনে পিছনে ঘোরাও? জাতি এহেন আচরণ মেনে নিবে না।”
“জাতি জানে এই সম্মানীয় এমডি কত বড় মাপের নির্বোধ?”
“ডোন্ট আন্ডারেস্টিমেট মি।”
ফারিন চুল উড়িয়ে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে, “হাহ!”
আহিয়ান আহসানের কাঁধে মাথা রাখে। আহসান ছেলের দিকে তাকায়। আহিয়ানের অবস্থা ঘুমে ঢুলুঢুলু। আহসান আহিয়ানের পিঠে আলতো করে চাপড় মারতে থাকে। আহসানের সারাশব্দ না পেয়ে ফারিন পিছনে ফিরে ওর দিকে তাকায়। আহসান আহিয়ানের পিঠে চাপড় মেরে আস্তে আস্তে হাঁটছে। ফারিন হুট করে বলে,
“আহিয়ানের বাবা দাঁড়াও।”
আহসান দাঁড়িয়ে যায়। ফারিন ছুটে ওর কাছে আসে। আহসানের পকেট থেকে ফোন বের করে। লক খুলে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ায়। ফারিন ফটো তোলার জন্য মোবাইল তাক করে বলে,
“আহিয়ানের দিকে তাকিয়ে যেভাবে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলে আবার দাও।”
আহসান ফারিনের কথামতো কাজ করে। ফারিন একটা ছবি তুলতেই আহসান ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন কপাল কুঁচকে বলে, “হেয়াটস ইয়োর প্রবলেম ম্যান? তোমাকে বলেছি আমার দিকে তাকাতে? ছেলের দিকে তাকাও।”
আহসান তাকালো। ফারিন পোজ বলে দিলো। কয়েকটা সেলফিও নিলো। হাঁটতে হাঁটতে ছবিগুলো দেখতে দেখতে বলে,
“চেহারা সুরত তো ভালোই তোমার। এত বয়স যে বোঝা যায় না।”
“হোয়াট ডু ইউ মিন বাই এত বয়স? আম অনলি থার্ডটি ফাইভ।”
“থার্ডটি ফাইভ আবার অনলিও?”
“পুরুষ মানুষ হিসেবে অনেক কমই।”
ফারিন কেমন করে যেন হেসে উঠলো। “কালরাতে দেখেছিলাম একটা দুটো চুলে পাঁক ধরেছে। বয়স লুকিয়ে লাভ নেই।”
“বেশি কথা বলছো তুমি।”
“আমার মোবাইলের ক্যামেরা ভালো না। তোমার সেটটা আমাকে দিয়ে দাও। তুমি আরেকটা কিনো।”
“তোমাকে আরেকটা কিনে দেই? আমারটা কেনো নিতে হবে?”
“কেনো তোমারটায় কি আছে যে নেওয়া যাবে না?”
“আমার কত কাজের জিনিস আছে এখানে।”
ওরা ততক্ষণে হাঁটতে হাঁটতে দোলনার কাছে চলে এসেছে। ফারিন দোলনায় বসে বলে,
“কি এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আছে যার জন্য আমাকে মোবাইল দেওয়া যাবে না?”
“আছে কিছু পার্সোনাল জিনিসপত্র।” ফারিন পাশে বসে বলে।
ফারিন এক ভ্রু উঠিয়ে তাকায়। আহসান সেই চাহনি দেখে বলে, “পাসওয়ার্ড জানোই। ইফ ইউ ওয়ান্ট চেক করতে পারো। আই হেভ নো প্রবলেম। গুগল ডকসে কিছু কাগজপত্রের স্যাম্পল আছে এই যা।”
“ঢাকা গিয়ে নিজে আরেকটা নতুন সেট কিনবে। আমাকে এটা দিয়ে দিবে। বুঝেছো?”
“ইয়েস ম্যাডাম।”
“তোমাকে আমি একসময় যা যা বলেছিলাম, তুমি একটাও মাথায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাবোধ করোনি।”
“আবার কি?”
ফারিন আহসানের চোখে চোখ রেখে বলে, “বিরক্ত হচ্ছো আমার উপর?”
আহসান মুখ ঘুরিয়ে নিলো। “না।”
“তাই তো মনে হচ্ছে।”
ফারিন চুলে আঙুল প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলে, “আমাকে কেমন লাগছে?”
“যেমন লাগে।”
ফারিন দাঁতে দাঁত চেপে আহসানের দিকে তাকালো। “আমি সেজেছি, তুমি কমপ্লিমেন্ট দিচ্ছো না কেনো?”
“আমার জন্য সেজেছো নাকি যে কমপ্লিমেন্ট দিবো?”
“বিয়ের আগে আমি অনেক বাংলা গালি দিতে পারতাম। দেওয়া শুরু করবো?”
আহসান পায়ের জুতার দিকে তাকিয়ে হাসলো। ঘাড় ঘুরিয়ে ফারিনের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি হেসে বলে,
“সো বিউটিফুল, সো এলিগেন্ট, জাস্ট লুকিং লাইক এ ওয়াও।”
ফারিনের এত রাগ উঠলো! ও দাঁত কিড়মিড় করে বলে, “তোমার সাথে কথা না বলা অবস্থায়ও আমার এত রাগ উঠতো না, এখন যেমন রাগ ওঠে।”
“আমি তো এটাই চাইছি।”
ফারিন মাথা দুলিয়ে বলে, “বাদ দাও, বাদ দাও। তোমাকে দিয়ে আসলেই কিছু হবে না।”
“তুমি আমাকে কি হতে দেখতে চাও? একটা কমন ডায়লগ তোমার–তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”
আহিয়ান নড়েচড়ে উঠলো। ফারিন আহিয়ানকে কোলে নিয়ে নেয়। “আসলেই হবে না। ছেলেটাকেও শান্তি দিচ্ছো না।”
ফারিন গায়ের চাদর দিয়ে আহিয়ানকে ঢেকে ফেলে। আহসান আড়মোড়া ভেঙে বলে, “জীবন যুদ্ধে পিছিয়ে গেলে ফৌজিয়া ফারিন। ফাইয়াজ সিদ্দিক সাফওয়ান সিদ্দিকের চেহারা পেয়েছে।”
ফারিন কয়েক পলক আহসানের দিকে তাকিয়ে হুট করে হেসে ওঠে। আহসান কপাল কুঁচকালো, অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে? এমন পাগলের মতো হাসছো কেনো?”
“আই ওয়াজ অ্যা লিটেল বিট কনফিউসড আউট হু ইজ ফাইয়াজ? আহিয়ান শুনতে শুনতে ফাইয়াজ মাথা থেকেই বের হয়ে গিয়েছিল।”
“আবার বলো তোমার ব্রেন আমার থেকে ভালো?”
“নিঃসন্দেহে।”
আহসান হামি দিয়ে বলে, “মেয়ে হলে নাম রাখবো আনহা।”
“না, ফিজা বা ফিহা রাখবো।”
“ফিফাও রাখো?”
“এ্যাঁ?”
“আরেহ ফিফা! ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ।”
ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আহিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আহসান এসে ফারিনের কাঁধ জড়িয়ে ধরলো। ফারিন আহসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“রঙ্গন ফুল এনে দাও।”
“আমার নাগালে না।”
“যে ধান্দা মনে এসেছে তা ঝেড়ে ফেলো।”
আহসান হেসে উঠলো। চোখ থেকে চশমা খুলে চোখ কচলায়। “আহিয়ানের ঘুম দেখে ঘুম পাচ্ছে।”
“ঘুমাও গিয়ে।”
“রুমে চলো।”
“চলো।”
“রঙ্গন ফুল?”
“কালকে দেবো।”
“ওকে।”
ওরা রুমে চলে আসে। ফারিন আহিয়ানকে শুইয়ে দিয়ে শাড়ি পাল্টে নেয়। বিছানায় আরাম করে বসতেই আহসান ওয়াশরুম থেকে বের হয়। চশমা ছাড়া আহসানকে ফারিনের বরাবরই ভালো লাগে। আহসান ফারিনের পাশে শুয়ে বলে,
“ছবিগুলো দেখবে?”
“হুহ।”
আহসান মোবাইল নিয়ে ছবিগুলো বের করে। আহসান শুয়ে একটার পর একটা ছবি স্লাইড করছে, ফারিন আধশোয়া হয়ে বসে তা দেখছে। আহসান শেষ ছবি দেখিয়ে বলে,
“তোমার পুত্র না কাঁদলেই আরো ছবি তুলতে পারতাম।”
“ওকে মোবাইল দেখিয়ে অভ্যস্ত করিনি তাই কাঁদে।”
“একদিক থেকে ভালো হ্যাবিট।”
“আমি ওকে সব ভালো ভালো হ্যাবিটে অভ্যস্ত করবো।”
আহসান ফারিনের পেটে মাথা রাখলো। “মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।”
ফারিন হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। আহসান বলে, “সেলাই আবার ফেঁটে যাবে নাকি?”
“কিসের সেলাই?”
“মাথা যে পেটে রাখলাম, সিজারের সেলাই খুলে যাবে?”
“আরেহ না।”
আহসান ফারিনকে জড়িয়ে ধরে আহিয়ানের বুকে হাত রাখে। ফারিন আহসানের চুলে হাত গলিয়ে বলে, “আসলেই ঘুমাবে?”
“হুহ।”
“তোমাকে কিছু জিনিস দেখাই।”
“কি?”
ফারিন হাত বাড়িয়ে নিজের ফোন নিলো। আহিয়ানের অনেকগুলো ছবি দেখায়। আহসান মুখ লটকে বলে, “তুমি আমার ছেলেকে মেয়েদের জামা পড়িয়েছো কেনো?”
“মেয়েদের জামার কালেকশন অনেক সুন্দর।”
“তাই বলে ছেলেকে মেয়ে সাজাবে?”
“বাচ্চাদেরকে সাজালে কিছু হয় না।”
“তাও!”
ফারিন ধমক দিয়ে বলে, “আমি মা না তুমি? আমি যা করবো সব ঠিক।”
“স্বৈরাচারী মহিলা।”
ফারিন একটা ভিডিও দেখালো। আহিয়ানকে বাংলা গান শোনালেই কেঁদে দেয় সেি ভিডিও। আহসান দেখে হাসলো কিছুক্ষণ। হেসে বলে,
“আমার পোলায় মনে হয় বড় হলে ইংরেজিপ্রেমী হবে।”
“হিন্দিপ্রেমী বেশি হবে।”
“তাই তো দেখছি।”
ফারিন নিজেদের আরো অনেক ভিডিও দেখালো। ফারিন ব্লগ টাইপ ছোট ভিডিও বানাতো। তাও দেখালো। আহসান আফসোস করে বলে,
“আহিয়ান আমার ছেলে হয়ে এরকম কাঁদুনে কেনো?”
“আজেবাজে কথা বলতে না বলেছি না?”
“এটা বাস্তব কথা। আজেবাজে কথা না।”
“বাস্তব কথা হলে বাস্তব কথা। তাও বলবে না।”
“বাপরে!”
ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নিলো। আহসান ফারিনের হাত নিয়ে হাতের উল্টোপিঠে চুমু খায়। “আমাকে নিয়েও জেলাস হতে পারো।”
“আহিয়ানকে নিয়ে আমি জেলাস না।”
“তো কি?”
“জানি না।”
আহসান ফারিনের পেটে চুমু খেলো। “সুন্দর লাগছিলো তোমাকে।”
“আগের মতো?”
“না।”
“তাহলে?”
“আহিয়ানের মায়ের মতো সুন্দর লাগছিলো। প্রায় তিন বছর আগে এই পরিপক্বতাটা ছিল না। কেমন যেন একটা ছন্নছাড়া ভাব ছিল। এখন মা হওয়ায় একটা ভারিক্কি ভাব এসেছে। পেটে স্ট্রেচমার্ক আছে। দৈহিক, মানসিক সব দিক থেকে চেঞ্জ। আলাদা ব্যাপার স্যাপার।”
ফারিন হাসলো। “আমরা বোধহয় গতবার এই কটেজে উঠিনি না?”
“হুম। আমরা পাশেরটায় উঠেছিলাম।”
“হ্যাঁ, আগেরটা সুন্দর ছিল বেশি। একটা বড় খোলা বারান্দা ছিল তাই না?”
“আমরা বৃষ্টি বিলাস করেছিলাম।”
“হুম।”
“ওখানের একটা অসুবিধাও ছিল।”
“কি?”
“রুমে দুটো বেড ছিল।”
“বদমাশ।”
আহসান দুষ্ট হেসে বলে, “ডোন্ট ফরগেট এখানে কিন্তু আমাদের বাসর হয়েছিল।”
ফারিন আহসানের চুল টেনে বলে, “লাগামহীন কথা বলতে নিষেধ করেছি না?”
“ছেলে তো ঘুমায়।”
“তাতে কি?”
“সুন্দরী মনে হয় লজ্জা পাচ্ছে।”
ফারিন চোখ সরিয়ে নিলো। আহসান ফারিনের হাত উল্টেপাল্টে দেখে বলে, “এখানের বেলকনিতে শীত বিলাস করা যায়। রাতে কি চরম ঠান্ডা পড়ে দেখেছো?”
“হুহ।”
“করবে?”
“না। ঠান্ডা লেগে যাবে।”
“তুমি ঠান্ডা লাগাকে ভয় পাও?”
“হুহ। আহিয়ানেরও ঠান্ডা লেগে গেলে?”
“তাও ঠিক।”
দুজনে চুপ করে গেল। আহসান কথা পেলো না আর। আহিয়ানের বুকে আঙুল দিয়ে আঁকা উকি করতে থাকে। ফারিন একটু পর আহসানের হাত সরিয়ে দেয়। আহসান জামা উঠিয়ে ফারিনের স্ট্রেচ মার্ক দেখে। ফারিন বলে, “কি দেখো এগুলো দুইদিন পর পর।”
আহসান ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, “মাতৃত্ব অনেক কঠিন না?”
“পার্টনারকে সাথে পেলে সহজ।”
“একা একা অনেক ফাইট করেছো তাই না?”
“কিভাবে যেন সময় চলে গিয়েছে। তখন কষ্ট হয়েছিল, এখন মনে হয় দিনগুলো কি করে চোখের পলকে চলে গেল।”
“আমি রাতে রাতে তোমাকে আর তোমার পেটে হাত বুলিয়ে দিতাম জানো?”
ফারিন অবাক হয়ে তাকালো। পরক্ষণেই মুখ স্বাভাবিক করে বলে, “তোমাকে নায়কের মতো অভিনয় করতে কে বলেছিল?”
“কে জানে। শয়তান ভর করেছিলো মনে হয়।”
“সেটা তুমিই ভালো করে জানো।”
“লাভ ইউ।”
“আই নো।”
“তোমার ছেলেকেও লাভ ইউ।”
“ও ও জানে।”
“তোমরা ভালোবাসো আমাকে?”
“জিজ্ঞাসা করার মতো প্রশ্ন?”
আহসান উত্তর দিলো না। ফারিন খ্যাঁকিয়ে উঠে বলে,
“এখন দুঃখের সাগরে ডুবে যেও না আবার।”
আহসান হেসে বলে, “আই অলসো লাভ ইয়োর খ্যাঁকখ্যাঁকানি।”
চলমান………..
(হ্যাপি রিডিং….)

