#আফরিন_আখ্যান
#পর্ব_১৯
#সমৃদ্ধি_রিধী
ফারিন, আহসানের সুখের সংসারের একবছরের মতো সময় কেটে গিয়েছে। গতকাল আহিয়ানের জন্মদিন ছিল। ওর দুইবছর পূর্ণ হয়েছে। আহসান, ফারিন খুব বড় করে ওর জন্মদিন পালন করেনি। যে টাকা দিয়ে জন্মদিনের পার্টি করতো, হাবিজাবি করতো সেই টাকা দিয়ে ওরা গরীব-দুঃখীদের মাঝে কম্বল বিতরণ করেছে। আহসান তো যা করার করেছেই, মা হিসেবে ফারিন নিজের জামানো টাকা থেকে এতিমখানায় মোটা অংকের টাকা দিয়েছে, নিজে তেহারি রান্না করে এতিমখানার বাচ্চাদেরকে খাইয়েছে। আহসান, ফারিন বড় করে জন্মদিন করতে চায়নি তাতে কি? গতকাল আদৃতও একটা কেক কিনে এনেছে, অনিও একটা কেক এনেছে। আহিয়ান একটা কেক কেটেছে, আরেকটা কেকের মাঝ বরাবর থাবা বসিয়ে ভর্তা করে ফেলেছে।
আহসান কম্বলমুড়ি দিয়ে উপুড় হয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলো। গতকাল অনেক ধকল গিয়েছে ওর উপর দিয়ে। গা থেকে কম্বল সরে গিয়ে পিঠে সর্বশক্তি দিয়ে একটা থাবা পড়তেই আহসান ঘুমের মধ্যেই চমকে ওঠে। তড়িৎ বেগে উঠে বসে। পিঠে হাত ঘষে অবাক হয়ে ফারিনের দিকে তাকায়। ঘুম পুরোপুরি চোখ থেকে উড়ে গিয়েছে। চোখ বড় বড় করে ফারিনের দিকে তাকিয়ে আছে। ফারিন চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে আছে।
আহসান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার ফারিনের দিকে তাকায়। বলে, “কি? এই ভোরবেলা আবার ক্যারা উঠেছে কেনো?”
ফারিন ফুঁসে উঠে বলে, “তোমার বেহায়াপনা না করলে চলতো না তাই না?”
এ কেমন পাগলের প্রলাপ? আহসান চোখ কচলে বলে, “মানে?”
ফারিন প্রেগন্যান্সি কিট আহসানের গায়ে ছুঁড়ে মারে। আহসান অবাক হলো। কিটের দুটো লাল দাগ দেখে আপনাআপনিই বলে ফেললো, “ইন্না-লিল্লাহ।”
ফারিন চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বলে, “তোমার মতো বোধনাশা বেডা আমি আমার জীবনে একটাও দেখিনি।”
“হোয়াট? কি নাশা?”
“নির্বোধ একটা।”
আহসান কপাল চুলকায়। কিট উল্টেপাল্টে দেখে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন ওর চাহনি দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। খেঁকিয়ে উঠে বলে,
“এভাবে বলদের মতো তাকিয়ে আছো কেনো?”
“তুমি চেতে আছো কেনো? এটার জন্য?”
“না আমার মনে রং লেগেছে সেই জন্য।”
“এটা কি চেতে যাওয়ার মতো খবর?”
“এটা খুশি হওয়ার মতো খবর?”
“আলবাত।”
“তুমি জানো না আমি এখনই সেকেন্ড বেবি চাইনি? অন্তত আহিয়ানের পাঁচ-ছয় বছর না হওয়া অব্দি? জানতে কিনা?”
আহসান ঘাড় ঘুরিয়ে আহিয়ানের দিকে তাকালো। হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। আহিয়ানের বুকে হাত বুলিয়ে দেয়। আহিয়ানের হাত হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে,
“কিটে অনেক সময় ভুল ওঠে। আমরা টেস্ট না করে তো….আসলে অনেক সময় বোঝা যায় না। ভুল উঠতেই পারে।”
“একটু কেয়ারফুল থাকতে পারোনি?”
আহসান মুখ লটকে তাকিয়ে থাকে। কিছু বলার আগেই ফারিন আঙ্গুল তাক করে বলে, “রিপোর্ট যদি নেগেটিভ আসে তাহলে তো আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু নেগেটিভ আসার সুযোগ নেই। আহিয়ানের সময় যেসব সিমটমস ছিল এবারও তাই আছে বলেই আমি টেস্ট করেছি। যদি পজিটিভ আসে তাহলে তো কিছু করার নেই। তবে একটা কথা মাথায় ভালো করে ঢুকিয়ে রাখো আহসান যদি নেগেটিভ আসে তাহলে তো তুমি আমার থেকে দূরে থাকবেই আর যদি পজিটিভ আসে তাহলে বাচ্চা হওয়ার পর তুমি আমাকে একশো হাত তুলে থাকবে।”
“সব দোষ মনে হয় আমার?”
ফারিনের গলার স্বর উঁচু হলো। নিজের দিকে আঙুল তাক করে বলে, “তাহলে আমার?”
“আচ্ছা আমরা টেস্ট করাবো আজকেই। তুমি তো জানো কিভাবে কি টেস্ট করতে হয়। কোন সমস্যা নেই।”
“কিসের সমস্যা নেই? সমস্যা আছে বলেই আমি রেগে যাচ্ছি। আমার আহিয়ানের বয়স হচ্ছে মাত্র দুই। এর মধ্যে আরেকটা বাচ্চা। তোমার তো কিছু না। তুমি তা তুমিই। আহিয়ানকে কয়বেলা সামলাও তুমি যে তোমার সমস্যা হবে? সামলাতে তো হবে আমাকে।”
আহসান ঠোঁট কামড়ে ধরে। “আচ্ছা আগে আমরা টেস্ট করি না? তারপরই তো বোঝা যাবে।”
“আমি মা। কনসিভ করলে শারীরিক যত পরিবর্তন আসে সব আমার মধ্যে আছে। রেজাল্ট পজিটিভ আসবে সেটা শতভাগ শিওর। সো যা আলোচনা করারা তা আমাদের এখনই করতে হবে।”
“আচ্ছা আমরা ভাগাভাগি করে করে ফেলবো। তুমি নতুনটাকে সামলাবে আর আমি আহিয়ানকে সামলাবো।”
ফারিন দাঁতে দাঁত চেপে আহসানের দিকে তাকিয়ে আছে। আহসান ব্যস্ত গলায় বলে ওঠে, “সরি সরি। তুমি আহিয়ারদের সামলিও, আমি নতুন জনকে সামলাবো।”
“আজাইরা কথা বলোনা। তোমার অফিস আছে, তুমি একটা কোম্পানির এমডি। তোমার কাজের প্রেশার সম্পর্কে যথেষ্ট ভালো ধারণা আছে আমার। তোমাকে আমি বাচ্চা সামলানোর জন্য অফিস থেকে ডেকে আনবো? বলবো এসো নতুন বাচ্চার ডায়পার চেঞ্জ করে দিয়ে যাও? বলবো আহিয়ান খাচ্ছে না, ছোটটারও জ্বর। এসো, মিটিং করা লাগবে না। কাজ করা লাগবে না, ঘর সামলাও? আমি তোমার মতো গর্দভ নই। পুরুষ মানুষের ব্যস্ততা সম্পর্কে ধারণা আছে। তোমার কাজ নিয়েও যথেষ্ট ধারণা আছে আমার। আমাকেই সবটা একা করতে হবে।”
“জয়তুন খালা আছে না?”
“জয়তুন খালা বাবুকে দুধ খাওয়াবে? আহিয়ানকে ইদানীং ছাড়িয়েছি অনেক কষ্টে। তাও নেশার মতো উঠে দুইদিন পর পর। মাথা নষ্ট করে ফেলে আমার। এইসব পেইন জয়তুন খালা সামলাচ্ছে নাকি তুমি সামলাচ্ছো? তারপর ছোট একটা আসবে এখন। আহিয়ানকে এখনও ডায়পার ছাড়ানোর সময় আসেনি এরমধ্যে আরেকজন। বাচ্চা সামলানো কত কষ্ট জানো? বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় কেমন লাগে জানো? সারাদিন ঘুম ঘুম পায়, ক্লান্তি লাগে এই টাইমটায়।
আহিয়ানের সময় ক্লান্তি লাগলে আমিও ওর সাথে ঘুমাতাম। এখন হবে এমন? আহিয়ানের তো চঞ্চলতা বাড়ছেই দিনকে দিন। আমি ছোটটাকে নিয়ে ঘুমাবো, দেখা যাবে ও আকাম করছে আরেক জায়গায় গিয়ে। তুমি ভেবেছো একবারও আমি কি করে কি সামলাবো? মিসক্যারেজ একটা হয়েছে, আহিয়ান সিজারে হয়েছে। এখন এটা। আমার তো শরীর নাকি? আমি এত ফিট না ভাই যে বছর বছর বাচ্চা হওয়াবো। আমারও শরীর খারাপ লাগে। পারি না আমি।”
“এখন অ্যার্বোশান করে ফেলবে?”
“কমনসেন্সের অভাব তোমার? মাথায় ডিস্টার্ব আছে কোনো?”
আহসান এবার ক্ষেপে গেলো। “তো আমি কি করবো? আমি মনে হয় তোমার পিঠপিছে ষড়যন্ত্র করে ইচ্ছে করে কিছু করেছি? তুমি এখন বেবি নিতে চাওনি, আমিও তোমার সিদ্ধান্তকে রেসপেক্ট করেছি। এখন সব আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছো কেনো? ভুল হয়ে গিয়েছে। কি করবো এখন? সমাধান আছে কোনো?”
ফারিন নিজের চুল খামচে ধরে। “আচ্ছা তোমার দোষ না, আমাদের দোষ। কিন্তু এর একটা ক্ষতিকর প্রভাব আহিয়ানের উপর পড়বে। পড়বেই পড়বে। আহিয়ানের চাইল্ডহুডে খারাপ প্রভাব পড়বে আমি জানি। আমরা যতই বলি না কেন ওকে প্রোপার টাইম দিবো, ওর ছোটবেলাকে নষ্ট হতে দিবো না। কিন্তু এটা সম্ভব না। কোনো না কোনো ভাবে যে আসছে তার জন্য ওর ক্ষতি হবে। ছোট বাচ্চাটাকে সামলাবো নাকি আহিয়ানকে সামলাবো? আহিয়ানও তো খুব বড় না।”
আহসান চুপচাপ শুনে গেল। ফারিন আরো কিছুক্ষণ নিজেদেরকে কব্জি ডুবিয়ে ঝাড়লো। শেষমেশ ক্লান্ত হয়ে বলে,
“বাদ দাও, বাদ দাও। তোমার মতো নির্বোধকে এগুলো বলে কোনো লাভ নেই। তুমি যে কদু, সেই লাউ হয়েই থাকবে আমি জানি। আমিও ওই একই ঘাটের গরু। শুধু তোমাকে দোষ দিয়ে কি হবে! সো বাদ দাও।”
আহসানের কান ঝালাপালা করে দিয়ে বলে বাদ দাও। আহসান কপাল গুনে একটা খাশা বউ পেয়েছে বটে। ফারিন ক্লান্ত হয়ে কম্বলের নিচে ঢুকে আহিয়ানকে জড়িয়ে ধরে। আহসানকে বলে, “শুয়ে পড়ো। নয়টা দশটার দিকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাবো। টেস্ট করাবো। তুমি পারলে একবার সুমাইয়া আপুর সাথে কথা বলো।”
“আম্মুকে জানাবো?”
“শিওর হয়ে জানাবো।”
“ওকে।”
ফারিন আহিয়ানের হাতে চুমু খায়। আহসান নিজেও শুয়ে ফারিনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ফারিনের পেটে হাত রাখলে ফারিন আহসানের হাত আহিয়ানের হাতের উপর রাখে। ফারিন চোখ বন্ধ করে বলে,
“ফার্স্ট চাইল্ডকে প্রায়োরিটি দিতে শিখো।”
আহসান ফারিনকে অতিক্রম করে আহিয়ানের হাতে চুমু খেয়ে আবারও শুয়ে পড়ে। মা, ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলে, “আমার সাথে চিল্লিয়ে মাথা ঠান্ডা হয়েছে?”
“হুম।”
“তাহলে বলি শোনো।”
“হুম।”
“আল্লাহ আবারও আমাদেরকে বাবা, মা বানানোর জন্য এই সময়টাকে উপযুক্ত সময় বলে মনে করেছেন। তাই আমরা এইসময় আনএক্সপেক্টলি বাবা, মা হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। বুঝেছো?”
“হুম।”
“ঘুমাও।”
“হুম।”
আহসানের খটকা লাগে। “কাঁদছো?”
ফারিন জবাব দিলো না। আহসান ফারিনকে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলে, “কি হলো? কাঁদছো কেনো?”
ফারিন আহসানের গলা জড়িয়ে ধরে। “আহিয়ানকে আগের মতো সময় দিতে পারবো না আহসান। তুমি বুঝতে পারছো না ওর ক্ষতি হবে।”
“হবে না।”
“হবে। আমার থেকে বেশি বুঝো না তুমি। আমি জানি ক্ষতি হবে ওর।”
আহসান ফারিনের মাথা হাত বুলিয়ে দেয়। ফারিন ডুকরে কেঁদে ওঠে। “আমি মা, আমি জানি আমার ছেলে আদর পাগল। আরেকজন আসলে ওর আদরে ভাগ বসবে। ওর সবার আদর চাই।”
“আদৃত, ইশার হলে ভাগ বসতো না?”
“আদৃত, ইশার বাচ্চা হলে আমাকে ভাগ করা লাগতো ওর? তোমাকে ভাগ করা লাগতো? তোমার মাথায় কি একটুও বুদ্ধি নেই? বাদ দাও, তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না। আমার ছেলেটা আরেকটু বড় হলে ও বুঝতো সবটা। এখন অবুঝ মনে কিছুই বুঝবে না।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে। ওরা একসাথে বড় হয়ে যাবে। পরে দেখবে আর কোনো সমস্যাই হবে না।”
“সব ঠিক হয়ে যাবে কথাটা শুনতে যতটা সহজ, কঠিন সময়টা পার করা ততটাই যন্ত্রণাদায়ক। একটা ভীষণ হার্ড টাইম আসছে সামনে।”
“ব্যাপার না। তুমি সামলে নিবে আমি জানি।”
ফারিন ধাতস্থ হয়ে আহসানকে ছেড়ে দিলো। আহিয়ানকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। আহসান ফারিনকে জড়িয়ে ধরলে ও আহসানের হাতে সর্বশক্তি দিয়ে চাপড় মারে। আহসান হাত ঘষে বলে,
“আমি এমন একটা দিলে নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে দিতে।”
“সাহস থাকলে দাও।”
“না থাক।”
আহসান ফারিনের উপর দিয়ে হাত নিয়ে আহিয়ানের পিঠে হাত রাখে। ছেলেকে বুকে নিয়ে ফারিনও চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো। মাথায় কত শত চিন্তা যে ঘুরপাক খাচ্ছে! আহিয়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফারিন একসময় নিজেও ঘুমিয়ে পড়ে।
________________
রেজাল্ট তো পজিটিভ এসেছেই মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে ফারিনের টুইন বেবি হবে। রাত এগারোটার মতো বাজে। আহসান, ফারিনের মধ্যে একটু আগে বিস্তর আলাপ আলোচনা চলেছে। ফারিন, আহিয়ান ধানমন্ডিতেই থাকবে এই সময়টায়। যেহেতু টুইন এবং আহিয়ানও ছোট, তাই আহসান চাচ্ছে না ফারিনের একার উপর সবটা চাপিয়ে দিতে। এখানে থাকলে তো অন্তত আহিয়ানকে রাখার মতো মানুষ থাকবে। তাছাড়া আহসানেরও প্ল্যান ছিল ধানমন্ডিতে চলে আসার। কিন্তু কোম্পানির কাজের জন্য তা সম্ভব নয়। আহসান প্রতি বৃহস্পতিবার আসবে, শুক্র-শনি থেকে রবিবার চলে যাবে৷ মাঝেমধ্যে সময়, সুযোগ পেলে তো আদৃতের উপর সবটা চাপিয়ে দিয়ে চলে আসবেই।
ফারিন আহিয়ানকে বুকে জড়িয়ে পিঠে আলতো করে চাপড় মেরে ওকে ঘুম পাড়াচ্ছে। আহসান বুকে হাত গুঁজে কার্ডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসা। ঠোঁট কামড়ে ধরে হিসেব করে চলছে ও। চাপা শ্বাস ফেলে আহসান ঠোঁটের কাছে আঙুল ঠেকিয়ে ফারিনের মুখের দিকে তাকায়। ফারিন চোখ বন্ধ করে আছে কিন্তু ক্রমাগত আহিয়ানের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
আহসান গলা খাঁকারি দিয়ে ডাক দেয়, “আহিয়ানের আম্মু?”
ফারিন চোখ বন্ধ রেখেই বলে, “লাইগেশন কি হারাম? ডেলিভারির সময় করে ফেলা যাবে না?”
“হ্যাঁ।”
“কিভাবে কি করবে? আপুর কাছে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ভেবেছি একহাতে আহিয়ানকে সামলাবো, আরেক হাতে ছোটটাকে সামলাবো। এখন দুই দুইজন। তুমি বুঝতে পারছো আমার অবস্থা?”
আহসান বালিশ ঠিক করে শুয়ে পড়লো। আহিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে ফারিনের বাহুতে হাত রেখে বলে,
“আমি বলি কি এত নেগেটিভ চিন্তা করো না। দেখবে সবটা সামলে উঠতে পারবে। এখন যত ভাববে নেগেটিভ চিন্তা ততই আসবে। আল্লাহ যা করে ভালোর জন্যই করে।”
ফারিন চোখ খুলে তাকায়। আহসান ফারিনের বাহুতে চাপড় মেরে বলে, “আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে, তাই না?”
“কি হবে মনে হয় তোমার?”
“মানে?”
“ছেলে বাবু না মেয়ে?”
“একটা ছেলে, একটা মেয়ে হলে পারফেক্ট হবে।”
“যদি দুটোই ছেলে হয় তাহলে আমি কাঁদবো।”
“কেনো?”
“শপিংমলে গিয়ে বাচ্চাদের সেকশনে ঢুকার পর মনোযোগ দিয়ে দেখবে ছেলেদের কালেকশন কেমন আর মেয়েদের কালেকশন কেমন। তাহলেই বুঝবে কেনো কাঁদবো। তার উপর ছেলেরা ভীষণ দুষ্টু হয়, আহিয়ান দিনে দিনে আরো দুষ্টুমি করবে, আবার নতুন দুটো। তিনটা ছেলে মানুষ করতে হলে পরে আমার লাশও খুঁজে পাবে না তুমি।”
“তাহলে দুটোই মেয়ে হলে?”
“অনেক খুশি হবো আমি।”
“আমিও।”
ফারিন ভেংচি কেটে বলে, “তুমি তো কিছু একটা পেলেই খুশি হও। তোমাকে দিয়ে এরচেয়ে বেশি কিছু হবে না।”
আহসান চশমা খুলে পাশে রাখে। বুকে হাত গুঁজে বলে, “আম্মু কিছু বলেছে?”
“বকা দিয়েছে।”
অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, “সত্যিই?”
“তোমাদের ভাইদের মধ্যে এইজ গ্যাপ কেমন?”
“বড় ভাইয়া আর আদৃত আট বছরের ছোট বড়। আমি আর অনি এগারো বছরের ছোট বড়।”
“ওইহন্য আম্মা বলছিলো আরো কয়েক বছর পর নিলে নাকি ভালো হতো। আম্মু বলছিলো আমার না হয়ে ইশার হলে বেশি ভালো হতো।”
“ওরা নেয় না কেন?”
“তোমার ভাই চাচ্ছে না এখনই।”
“হোয়াটএভার।”
“তোমার, আমার পরিকল্পনা কি ছিল?”
“কি ব্যাপারে?”
“আমার আর আহিয়ানের থাকার ব্যাপারে।”
“তোমরা এখানে থাকবে এটাই।”
“আমি যা বলবো মনোযোগ দিয়ে শুনবে। মাঝখানে একটা কথাও বলবে না। ওকে?”
“ওকে।”
“ওকে তোমার সাথে চলো উত্তরা চলে যাই। যদি আমি না পারি তখন ধানমন্ডি চলে আসবো।”
“পাগল নাকি? আহিয়ানকে নিয়ে তুমি একাই বাসায় থাকতে পারবে না। রিস্ক নেব না আমি।”
“আমি কি একেবারে থাকার জন্য প্রিপারেশন নিয়ে এসেছিলাম? আমার একটা গোছগাছের ব্যাপার আছে না?”
“আমাকে বলো কি কি আনতে হবে। আমি গুছিয়ে আনবো।”
“তোমার মতো মানুষকে দিয়ে আমি কাজ করাবো? পাগলা কুত্তা কামড়েছে আমাকে?”
“এক্সকিউজ মি! ডোন্ট ফরগেট বিয়ের পর পর তুমি কিছুই করতে পারতে না। তোমার জামাকাপড় পর্যন্ত আমি ধুয়েছি।”
“হ্যাঁ তো? এখন তো তোমারটা আমি ধুই না?”
“কত বড় ধান্দাবাজ তুমি ভাবা যায়! আল্লাহ! সুন্দরীদের মনে এত প্যাঁচ?”
ফারিন আলগোছে হাসলো। আহিয়ানকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে উঠে বসে। বেডসাইড টেবিল থেকে পানি নিয়ে খায়। লাইট অফ করে শুয়ে পড়ে। একটু পর আহসান টপকে এসে ফারিনকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। ফারিন খেঁকিয়ে উঠে,
“কেমন অপদার্থের অপদার্থ! এভাবে টপকালে কেনো? আহিয়ান ব্যথা পেতো কিনা?”
“আমি কেয়ারফুল ছিলাম।”
ফারিন দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “কেয়ারফুল থাকার কথা তুমি বলো না। তুমি তো সবসময়ই কেয়ারফুল থাকো। ওই সেবারও তো কেয়ারফুল ছিলে। আমি বারবার নিষেধ করেছিলাম। না উনি কেয়ারফুল ছিল। তোমার কেয়ারফুল থাকার নমুনা এখন..”
আহসান ফারিনের মুখ চেপে ধরে। “চুপ, চুপ। এত ডিপ কথা বলতে হয় না।”
ফারিন আহসানের হাত মুখের উপর থেকে সরিয়ে বলে, “শোনো তোমার সাথে কালকে চলে যাবো। প্রয়োজন মনে হলে, সমস্যা হলে আমি বলবো তোমাকে। তখন নাহয় চলে আসবো। একসময় না একসময় আসতেই হবে। টুইন বেবি হলে পেট আগের চেয়ে একটু বড় হবেই, আহিয়ানকে নিয়ে ওভাবে আমি সব সামলাতে পারবো না। তাছাড়া এবার আসার সময় আহিয়ানের জামাকাপড়ও তেমন আনিনি। ওর আরো কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস আছে। আমারও আছে৷ সব গুছিয়ে নিয়ে আসবো আমি। বুঝেছো?”
“কালকে ফজরের পর রওনা হবো তো।”
“সমস্যা নেই। আম্মাকে ম্যানেজ করার দায়িত্ব তোমার। ওকে?”
“লাভ ইউ।”
“মি টু।”
আহসান ফারিনের পেটে চুমু খেলো। “এবার পুরো প্রেগন্যান্সি জার্নি আমি এনজয় করবো। এটা ঠিক কাজের জন্য তোমার সাথে থাকা হবে না, কিন্তু প্রতি বৃহস্পতিবার তো ঠিকই আসবো না?”
ফারিন মনে মনে আওড়ালো, “করাচ্ছি তোমাকে এনজয়।”
ফারিন মনে প্রাণে পরিকল্পনা করেছিল আহসানকে পুরোটা সময় নাকানিচুবানি খাওয়াবে। কিন্তু ফারিনের সব পরিকল্পনাতে পানি ঢেলে আহসান তো পুরো পারফেক্ট হাসবেন্ড মেটেরিয়াল হয়ে গিয়েছিল। ওর এতাই উন্নতি হয়েছে যে ফারিন আহসানের উপর চিল্লানোর জন্যও কোনো কারণ খুঁজেও পেতো না। নাকানিচুবানি খাওয়ানো তো দূর, আহসানের ক্লান্ত চেহারা দেখলে ফারিনের উল্টো মায়া লাগতো।
রান্নাবান্না জয়তুন খালাই করতো। আহিয়ানেরটা শুধু ফারিন করতো। আহসান প্রতিদিন রাতে ওয়াশিং মেশিনে জামাকাপড় ধুতো, বারান্দায় মেলে দিতো। আহিয়ানের ডায়পার চেঞ্জ করা, গোসল করানো থেকে আহিয়ানের ছোট ছোট অনেক কাজই আহসান বাসায় থাকলে করতো। বাসা থাকলে ফারিনকে তেমন একটা জ্বালায়নি–বাপও না, ছেলেও না। কিন্তু আহসানকে কাজ করতে দেখলে ফারিনের ভালো লাগতো না। অফিস সামলে এসে রেস্ট নিবে তা না! কাজবাজ করতো। ফারিনের মুড সুইং সামলানোর গুরুভারটাও আহসানের উপর ছিল। ফারিন অযথা চোটপাট করলেও আহসান কিছু বলতো না। চুপচাপ মুখ বুজে সহ্য করে গিয়েছে।
এমন করেই দিন যেতে যেতে ফারিনের তিনমাস চলাকালীন আদৃত, ইশা নতুন ফ্ল্যাটে ওঠে। তখন ফারিনও ধানমন্ডি চলে আসে। কেননা ফ্ল্যাটে ওঠার আগে ইশা পুরোদমে গৃহিণী ছিল, কলেজেও জয়েন করেনি। তখন আদৃত অফিসে গেলে ইশা ফারিনের সাথেই সময় কাটাতো, ফারিন ঘুমিয়ে থাকলে মাঝেমাঝে আহিয়ানকে খাইয়েও দিতো। ফারিনের তেমন অসুবিধা হতো না। কিন্তু ওরা শিফট করার পর আহসানই জোর করে ওকে ধানমন্ডি রেখে যায়।
সময় চোখের পলকে ডানা ঝাপ্টে চলে যায়। মা, ছেলে ধানমন্ডিতে থাকছে চার মাসের মতো হবে। সন্ধ্যার পরের সময়টায় এখন ফারিন আহিয়ানকে পশু-পাখির ছবি দেখাচ্ছে আর প্রাণীগুলোর নাম বলে দিচ্ছে। আহিয়ানকে সময় নিয়ে শিখিয়ে তারপর নাম প্রাণীগুলোর নাম জিজ্ঞাসা করছে। ফারিন হাতির ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
“আব্বা এটা কি?”
আহিয়ান হাসি হাসি মুখে ফারিনের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আতি।”
ফারিন হাসে। গাল টেনে বলে, “গুড বয়।”
কুকুরের ছবি দেখিয়ে বলে, “এটা কি?”
“বিয়াল।”
“এটা কুকুর। ডগি।”
আহিয়ান চোখ গোলগোল করে বলে, “ডকি?”
“হুম ডগি।”
আহিয়ান বইয়ের পাতা উল্টায়। ফারিন পেটে হাত চেপে বালিশ রেখে কার্ডবোর্ডে হেলান দিয়ে আহিয়ানের দিকে তাকায়। আহিয়ান বইটা নিয়ে পাতা উল্টেপাল্টে বইটা ফ্লোরে ফেলে দেয়। ফারিন শান্ত গলায় ডাক দেয়,
“ফাইয়াজ?”
আহিয়ান ফারিনের দিকে তাকিয়ে খ্যাকখ্যাক করে হাসে। ফারিন বইয়ের দিকে আঙুল তাক করে বলে,
“বই ফ্লোরে ফেলেছো কেনো? এটা ব্যাড জব না?”
আহিয়ান মুখ কালো করে ফেলে। ফারিন আঙুল তাক করে বলে, “যাও বইটা উঠাও।”
আহিয়ান বিছানা থেকে নেমে বইটা উঠালো। ফারিন শান্ত চোখে তাকিয়েই রইলো। আহিয়ান বিছানায় উঠে মায়ের গা ঘেঁষে শোয়। ফারিনের বুকে মুখ গুঁজে ফারিনের জামা চেপে ধরে। ফারিনকে হাত প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরে। ফারিনের হাসি পেলো। আহিয়ান মুখ তুলে ফারিনের দিকে তাকায়। ফারিন হাসি থামিয়ে দেয়। আহিয়ান ফারিনের গলায় মুখ গুঁজে বলে,
“লাগ?”
“বই ফেলছো কেনো? রাগ করবো না?”
“আল পেলবো না।”
“সত্যি তো?”
আহিয়ান মাথা নাড়ে। ফারিন আহিয়ানের গাল চুমু খায়। “মা আর রেগে নেই বাবা।”
আহিয়ান হাসে। “বাবা কই?”
ফারিনের হাসি থেমে যায়। মীরজাফরের বাচ্চাটা আজ সারাদিন কল রিসিভ করেনি। ফারিন এই শরীরেও ছাগলের বাচ্চাটার জন্য কত টেনশন করে, অথচ গর্দভের বাচ্চাটা একা একা এখন স্বাধীনভাবে থাকছে। শান্তি খুঁজে পেয়েছে, যা ইচ্ছে করছে। ফারিন জানে তো ওই নিমকহারাম ইচ্ছে মতো উড়ছে, শুধু প্রমাণের অভাবে ফারিন কিছু বলতে পারছে না।
ফারিনকে সারাদিন চিন্তায় রেখে আহসানের ফোনে যাওয়া কল বিকালে যাও রিসিভ হলো কিন্তু অপরপ্রান্তে শোনা গেল এক মহিলা কণ্ঠস্বর। ফারিন আহসানকে চাইলেও মেয়েটি “স্যার মিটিংয়ে আছে। দেওয়া যাবে না।” বলে মুখের উপর কল কেটে দেয়। হারামির বাচ্চাটার আজ হচ্ছে। যেহেতু আজ বৃহস্পতিবার, সেহেতু আল্লাহর বান্দা তো একটু পরই আসবে। ফারিন যদি ওই রামপাঠাকে আজ নাকানি চুবানি না খাইয়েছে তাহলে ফারিন নিজের নাম বদলে ফেলবে৷
“ওওহ মা?”
ফারিনের ঘোর কাটে। “হ্যাঁ আব্বা?”
“বাবা কই?”
ফারিন আহিয়ানের চুল ঠিকঠাক করে দিয়ে বলে,
“আসবে আব্বা। বাবা একটু পরেই আসবে। তোমার জন্য কিছু আনতে বলবো?”
“চক্কেট।”
“কালকে না ছোট চাচ্চু দিলো? আর কত?”
“ইট্টু কাবো। বেশি কাবো না।”
“বাবা এলে বাবাকে বলো।”
“আচ্চা।”
ফারিন আহিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। আহিয়ান শরীর মোচড়ামুচড়ি করে বলে, “যাই গা?”
“কোথায়?”
“দাদুমুনির কাচে?”
ফারিন উঠে দাঁড়ালো। আহিয়ানের পিঠে পাউডার মেখে দিয়ে ওকে একটা সেন্টু গেঞ্জি পড়িয়ে জেসমিনের কাছে দিয়ে এলো৷ ঘরের দরজা লাগিয়ে এসির পাওয়ার কমিয়ে ওড়না খুলে রাখে। ওই গরু ছাগলকে নিয়ে একটু চিন্তা করলেই শরীর খারাপ লাগে। আহিয়ানের সময়ও শান্তি দেয়নি, এখনও দিচ্ছে না। ফারিন কিছুক্ষণ শুয়ে রইলো। মাত্র সাতমাসে পড়লো। তাতেই হাঁটা চলা করতে এখন অনেক সমস্যা হয়ে যায়।
এরমধ্যে আহিয়ান ছোট। আহিয়ানের মোটামুটি সব কাজ ফারিনই করে। আহিয়ানের কিছু ফারিন ঝুমা বা ঝুমার মাকে করতে দেয় না। জেসমিন মাঝেমাঝেই ওকে গোসল করিয়ে দেয়। কিন্তু আহিয়ান তো এখন চাচার দীক্ষায় দীক্ষিত হচ্ছে। জেসমিনকে তখন নাকানিচুবানি খাইয়ে তবেই ছাড়ে। জেসমিন আহিয়ানকে খাওয়াতে নিলে আহিয়ান জেসমিনকে ঘন্টা দুয়েকও বসিয়ে রেখেছে এমনও রেকর্ড আছে। তাই ফারিনই করে এইসব। জেসমিন তাও আহিয়ানকে রাতে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ফারিনই দেয় না। এরমধ্যেও কাহিনি আছে। জেসমিন জোর করে একদিন নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন আহিয়ান এনামুল সিদ্দিককে পাগল করে দিয়েছিল। নতুন নতুন কথা শেখার পর তো এখম পকরপকর করতেই থাকে। জান বাচ্চাটা মা ছাড়া সবাইকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে।
ফারিনের ঘুমে চোখ লেগে এলো এমন সময় দরজায় ঠকঠক শব্দ হয়। ফারিন গায়ে ওড়না মেলে দরজা খুলে দেয়। আহসান একগাল হাসে। দরজার খুলেই আহসানকে দেখে ফারিনের রাগে গা জ্বলে উঠলো। বত্রিশ পাটির হাসি দেখে তো মন চাইলো এক ঘুষি মেরে দাঁত সব ফেলে দিতে। ফারিন চুপচাপ বিছানার উপর এসে বসে। আহসান ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। হাতে আহিয়ানের জন্য কেনা নতুন ডায়পার, ব্যাগপত্র। ওগুলো বিছানার পাশে রেখে শার্টের বোতামে হাত দিয়ে বলে,
“হেই কি অবস্থা?”
ফারিন চুপচাপ ওড়না পাশে রেখে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। ফারিন মনে মনে বিড়বিড় করে,
“ওহ আল্লাহ! আহিয়ান হওয়ার সময় যেমন রাগ উঠতো, এখনও এমন রাগ উঠছে কেনো?”
আহসান কপাল কুচকে তাকায়৷ শার্টের বোতাম খুলে ফারিনের পাশে এসে বসে। উঁকি দিয়ে বলে,
“কিছু হয়েছে? শরীর খারাপ?”
ফারিন উত্তর দিলো না। আহসান ফারিনের বাহুতে হাত রেখে বলে, “বলছো না কেনো?”
ফারিন হাত ঝাড়া মেরে সরিয়ে দেয়। তেজ নিয়ে বলে, “ডোন্ট ডেয়ার টু টাচ মি।”
“কি হয়েছে?”
ফারিন আহসানের দিকে তাকায়। আহসান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, “আমি তো কিছু করিনি। তাও রেগে আছো কেনো?”
ফারিন আহিয়ানের হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে বসতে চায়। আহসান ধরে বসিয়ে দেয়। “কি হয়েছে রেগে আছো কেনো?”
“আমার বিয়ে লেগেছে ওইজন্য রেগে আছি।”
পেটের দিকে ইশারা দিয়ে বলে, “তোমাকে আর কেউ বিয়ে করবে না। ডোন্ট ওরি। রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছি।”
ফারিন রাগে ফেটে পড়ে যেন। “বদমাশ একটা।”
আহসান আড়মোড়া ভেঙে বলে, “আচ্ছা কি হয়েছে তা বলো।”
তীক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে বলে, “খুব সুখে শান্তিতে আছে মনে হয়?”
“না তো।”
“চেহারা দেখে তো তাই মনে হচ্ছে। খুবই সুখে আছো বোঝাই যাচ্ছে। ইয়াং মনে হয় নিজেকে না এখন?”
“না তো! আমার তো নিজেকে বুড়ো মনে হয়।”
“বুড়োদের শরীরেই তো রং বেশি থাকে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে রং থাকে। দুটো তিনটা সঙ্গী রাখতে মন চায় আশেপাশে।”
আহসান চোখ বড় বড় করে তাকায়। একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলে, “কিসের সঙ্গী? কিসের রং? আস্তাগফিরুল্লাহ! আমি আজীবন এক নারীতে আসক্ত।”
“আজীবন? ছোট থাকতে কার পিছনে ঘুরতে?”
“আম্মুর। এটা আবার জিজ্ঞাসা করার মতো প্রশ্ন?”
ফারিন আহসানের বোতাম খোলা শার্টের কলার খামচে ধরে। “আমি তোমার কি হই?”
আহসান কলার খামচে ধরে রাখা ফারিনের হাতের দিকে তাকায়। ফারিন কলার ঝাঁকিয়ে বলে, “এভাবে তাকাচ্ছো কেন? তোমাকে ভয় পাই আমি? আমাকে নাদান পেয়েছো তুমি? ভদ্র মানুষের মতো প্রশ্নের উত্তর দাও।”
“বউ হও।”
“আমার কল রিসিভ করার দায়িত্ব কার?”
“আমার।”
আহসানের বুকে সর্বশক্তি দিয়ে ঘুষি মেরে বলে,
“তাহলে সারাদিন যে কল করেছি তা রিসিভ করা হলো না কেনো?”
আহসান বুকে হাত ঘষে কপাল চুলকে বলে, “একটা অনেক ইম্পর্টেন্ট আর্জেন্ট মিটিং ছিল তাই। আমি আসলে কাজের প্রেশারে….”
“মিটিং ছিল নাকি অন্য কিছু ছিল?”
আহসান মুখ বিকৃত করে তাকায়। “হোয়াট ডু ইউ মিন বাই অন্য কিছু ছিল?”
“তোমার চোখ মুখের এই অবস্থা কেন? আমি তো কিছু বলিই নি। কিন্তু তোমার মনে কি এসেছে? চোরের মনে পুলিশ পুলিশ না?”
“তুমি মুখে না বললে কি হবে? তোমার চোখ তো অন্য কথা বলছে।”
“মেয়েটা কে?”
“কোন মেয়ে?”
দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “জানো না কোন মেয়ে? নাটক করা হচ্ছে আমার সাথে?”
“ও তুমি তো সোহিনীর কথা বলছো?”
“ও তাই মেয়েটার নাম সোহিনীইইইইই?”
“আরে ও আমার পিএ।”
“তোমার পিএর নাম না জাহিদ ছিল?”
“জাহিদ বদলি হয়ে ধানমন্ডি ব্রাঞ্চে এসেছে। ওই জন্য আমি আমার আন্ডারে আদৃতের পিএকে নিয়েছি। মেয়েটা খুব ভালো, কাজেও ভালো। কাজকর্মে পারদর্শী ভীষণ।”
“মেয়েটা খুব ভালোওওওও? তাহলে তো ফারিন খুব খারাপ তাই না?”
“বেশি না অল্প একটু।”
ফারিনের আহসানের বুকে থাবা মেরে ওকে সরিয়ে দেয়। আহসান এড়িয়ে আসে। ফারিনের মাথা বুকে চেপে ধরে বলে, “রাগ করে না। এত রাগ ভালো না। আম জাস্ট কিডিং।”
ফারিন আহসানের বুকে দাঁত বসিয়ে দেয়। আহসান দূরে সরে বসে। বুকে হাত ঘষতে ঘষতে বলে, “জংলী নাকি?”
“ওই মেয়ে আমার মুখের উপর কল কাটার সাহস পায় কি করে?”
“আমিই বলেছিলাম।”
ফারিন ভ্রু উঁচু করে ঠোঁট গোল করে তাকায়। “তুমি আমার কল ইগনোর করেছো? আবার ইচ্ছে করেএএএ? ওকে বলেছো আমার কল কাটতে? আমার? ওহ আচ্ছা। খুব ভালো।”
“আমি তখন প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলাম। কিভাবে কথা বলতাম?”
“বাদ দাও, বাদ দাও। আমার সামনে থেকে যাও তুমি।”
“আমি ক্লায়েন্টদের সামনে কি করে কথা বলতাম বলো আমাকে।”
“চোখের সামনে থেকে দূর হও তুমি।”
“আরেহ শোনো না?”
“ওর সাহস কিভাবে হয় আমার মুখের উপর কল কাটার আমাকে সেই জবাব দাও। এখন তুমি যদি বলো তুমিই বলেছিলে বলে কেটেছে তাহলে খবর হয়ে যাবে।”
আহসান ফারিনকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে। “লাভ ইউ না? এত রাগ করো কেনো?”
ফারিন আহসানকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চাইলো। আহসান মুখ নামিয়ে ফারিনের গলায় চুমু খেয়ে বলে, “কাজ ছিল না? তুমি তো এত অবুঝ না বলো? বেশি কাজের প্রেশার না থাকলে তোমাকে ইগনোর করতাম?”
“গতকাল রাত থেকে কথাবার্তা নেই। কল করলে রিসিভ করো না। আদৃত ভাই, ইশাকেও এখন তেমন একটা কল করিনা৷ ওদেরই মন টন খারাপ। আমার টেনশন হয় নাকি তোমাকে নিয়ে?”
“আচ্ছা সরি। ভুল হয়েছে। হুট করে একদিনের মধ্যে এত কাজের প্রেশার চলে এসেছিল বলে বোঝাতে পারবো না।”
“বাদ দাও, বাদ দাও। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”
আহসান শার্ট খুলে ফেলে। মুখ নামিয়ে পেটে চুমু খায়। ফারিন আহসানের চুলে হাত গলিয়ে বলে,
“যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। আহিয়ানের কাছে যাও। সকাল থেকে বাবা কই, বাবা কই বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছে।”
আহসান ফারিনের গালে চুমু খেয়ে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ফারিন গালে হাত ঘষে। এই লোককে না দেখলে ভালো লাগে না, দেখলে গা জ্বলে এ কেমন কথা? ফারিনের ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ও তাও উঠে আহিয়ানের জন্য আনা বইগুলো গুছিয়ে রাখলো। ডায়পারগুলো খুলে চেক করে। আহসান বের হয় তখন।
ফারিনের পিছনে এসে দাঁড়িয়ে বলে, “তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।”
“কি?”
আহসান ব্যাগের ভিতর থেকে শাড়ি বের করে ফারিনকে দেয়। হালকা গোলাপি কালারের শাড়ি, এমব্রয়ডারি ওয়ার্ক করা। ফারিনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। আহসান ফারিনের কাঁধ জড়িয়ে ধরে বলে,
“কেমন?”
ফারিন হাসি থামিয়ে বলে, “পছন্দ হয়নি।”
“সুন্দরীদের ঢং! হাসি দেখেই বুঝে গিয়েছি আমি।”
ফারিন ভাব দেখিয়ে বলে, “এত পাতলা শাড়ি পড়ি নাকি আমি?”
“আলমারি ঘেঁটে বের করবো তুমি কি পড়ে আমার সামনে রংঢং করো?”
“না থাক। বাদ দাও।”
আহসান এগিয়ে আসে। ফারিনের কাঁধে হাত রেখে বলে, “সুন্দরী রাতে পড়বে নাকি এটা?”
“আক্কেল দেখে অবাক হই।”
“পড়লে কি হবে? এত শখ করে এনেছি আমি।”
“দেখা যাক। আহিয়ান দশটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লে তবেই।”
“আহিয়ানকে ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব তাহলে আমার।”
“তারপর আর কি? সাজতেও হবে?”
“না এতকিছু করতে হবে না। খালি শাড়িটা পড়লেই হবে।”
“ঠিক আছে।”
দরজায় ঠকঠক করে শব্দ হলো। ফারিন গায়ে ওড়না জড়িয়ে নেয়। আহসান ব্যাগপত্র, শাড়িটা আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখে চশমা পড়ে দরজা খুলে দেয়। ইনায়া, ইশা দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়া আহসানকে ফরফর করে বলে,
“আসসালামু ওয়ালাইকুম ভাইয়া। কেমন আছেন ভাইয়া? আপনাকে আব্বা ডাকে।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছি। তোমার কি অবস্থা?”
“আলহামদুলিল্লাহ।”
আহসান হেসে পাশ কাটিয়ে নিচে চলে গেল। ইশা, ইনায়া ঘরে ঢোকে। ইশা বিছানায় বসে বলে,
“কেমন আছেন?”
“এইতো ভালো। তোমার?”
“আমিও ভালো আছি।”
ইনায়া মুখ কালো করে বলে, “আমার খোঁজ কেউ নেয় না।”
ইশা এই কথা পাত্তা না দিয়ে ফারিনকে জিজ্ঞাসা করে, “কিছু খেতে ইচ্ছা করছে আপনার?”
সাত মাসের পেটে হাত রেখে ফারিন বলে, “জার্নি করে এসেছো, কষ্ট করে কিছু করতে হবে না এখন।”
“কষ্ট হবে না। আপনার কিছু হতে ইচ্ছা করলে বলুন। আমি বানিয়ে দিবো।”
“এখন কিছু খাবো না।”
“আরেহ বলুন না, কি হবে? আপনাকে খাওয়াবো না। বাবুদেরকে খাওয়াবো।”
ফারিন হেসে বলে, “তুমি এত ভালো কেনো ইশা?”
ইশাও হাসলো। “ঝগড়া করবো নাকি?”
“করে তো। জায়ে জায়ে কত ঝগড়া হয়! তোমার আর আমারও তো হয়।” ইনায়া বলে।
“তোর সাথে তোর বলদামির জন্য হয়। তাছাড়া আমি ভালো মানুষ। তাই ঝগড়া করিনা। কি খাবেন তাই বলুন।”
“কালকে মাছ রান্না করো। তুমি মজা করে মাছ রান্না করতে পারো।”
“আচ্ছা।”
ইনায়া পাশ থেকে বলে, “সেজো ভাবি আমাকে চিকেন তেহারি খাওয়ান না?”
ইশা ধমকে ওঠে। “যা ভাগ। তোকে খাওয়ানোর ইচ্ছে নেই আমার।”
ইনায়া বলে, “ফারিন ভাবির সাথে কি মিষ্টি সুরে কথা আর আমার সাথে খ্যাকখ্যাক করা?”
“যা এখান থেকে। দূর হো। তুই মিষ্টি সুরে কথা শোনার মানুষ?”
“ফারিন ভাবি তো বড় জা। আপনার আরো একটা বড় জা আছে। কিন্তু আমি একমাত্র ছোট জা। আমার সাথে এমন করেন কেনো? একটু তেহারিই তো খেতে চেয়েছি।”
“উরি বাবারে! আমার ছোট জা এসেছে রে!”
“খাওয়াবেন না?”
“কচু খাওয়াবো তোকে।”
“আপন বোন বলে কি দাম দিবেন না?”
“না।”
ইনায়া বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। “সেজো জা’টা একদম মার্কা মারা খারাপ।”
ইনায়া বেরিয়ে যেতেই ফারিন ইশাকে জিজ্ঞাসা করে,
“সোহিনী কে?”
“আপনার দেবরের পিএ ছিল।”
“এখন তোমার ভাসুরের পিএ।”
“হুম।”
“মেয়েটা কেমন?”
“ওভারঅল ভালোই। আগে ড্রেসআপে একটু সমস্যা ছিল, বিয়ের পর ঠিক হয়ে গিয়েছে।”
“ক্যারেক্টার?”
“ভালোই। কাজবাজেও পারফেক্ট।”
“আচ্ছা। কি খবর তোমার?”
“কি ব্যাপারে?”
“ডাক্তার দেখিয়েছো? কি বলেছে?”
ইশা মেঝের দিকে তাকিয়ে নখ খুঁটতে বলে,
“ডাক্তার তো দেখিয়েছিই তো। বলেছে সমস্যা নেই। তারপরও কেনো জানি হচ্ছে না।”
“তোমাকে লাস্ট মান্থে কিছু টিপস দিয়েছিলাম না?”
“সব এপ্লাই করা শেষ। ডেট মিস হয়, কিট এনে টেস্ট করলে রেজাল্ট নেগেটিভ আসে। কিছুদিন পর আবার পিরিয়ড হয়ে যায়। এভাবেই দিন যাচ্ছে। ভালো লাগছে না।”
“স্ট্রেস নিও না। ওই সময় স্ট্রেস ফ্রি থাকবে। বুঝোই তো।”
“আপনার দেবরকে দেখলে তো আর স্ট্রেস ফ্রি থাকি না। দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। দুনিয়ার সব স্ট্রেস একসাথে মাথায় চলে আসে।”
ফারিন ইশার এমন রিয়েকশন দেখে হেসে উঠলো। সবগুলোকেই কি বউয়েরা দেখতে পারে না? কিন্তু একথা আবার ইনায়া মানবে না। ও রুদ্ধকে ভালোবাসে সেই বুলি আওড়ানো শুরু করবে।
ইশা রেগে বলে, “আমি আপনার দেবরকে আজকে থেকে বলছি বাচ্চা নেওয়ার কথা? আমার কথাকে দামই দেয়নি। কতবার বলেছি আমি মেয়ে মানুষ, বয়স হচ্ছে, পরে সমস্যা হবে। এমনিতেই আমার পিরিয়ড রেগুলার না। একটা কথা যদি কানে তুলে৷ এখন ঢং মরায়। দেখলেই রাগ উঠে।”
ফারিন হেসে বলে, “বেশি রাগ উঠলে বাবার বাড়ি চলে যাও।”
ইশা সিরিয়াস গলায় বলে, “মজা করছি না ভাবি। সত্যিই বলছি। লাস্ট সাতমাসের বেশি সময় ধরে ট্রাই করছি। ডাক্তার দেখাচ্ছি লাস্ট চারমাস যাবৎ। আমার আম্মুর খোঁচা মারা কথা তো আছেই। বিশ্বাস করুন ভালো লাগছে না একদম।”
“আল্লাহ ভরসা। চেষ্টা করতে থাকো। আল্লাহ নিরাস করবেন না।”
“ওই আশায়ই আছি।”
আদৃতের ডাক শোনা গেল। “ইশা? ইশা?”
ইশা চরম বিরক্ত হয়ে বলে, “শুরু হয়ে গিয়েছে চিল্লানো। অসহ্যকর একটা।”
“বিরক্তবোধ করলে যেও না।”
ইশা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। “না থাক যাই। কিছু লাগবে হয়তো, সেইজন্যই ডাকছে।”
“তুমি তো বিরক্তবোধ করছো দেখতে পাচ্ছি।”
“বিরক্তবোধ করলেও কি? এই লোকের ছাগলামো তো আমারই সহ্য করা লাগবে।”
ফারিন মৃদু হাসলো। ইশা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফারিন উঠে দাঁড়ায়। ওয়াশরুমে যাবে। ফারিন মনে মনে আওড়ায়,
“এরা প্রত্যেকে এমনই ভালো মানুষ যে আমরা চরম পর্যায়ের বিরক্ত হই কিন্তু মুখ ফেরাতে পারি না।”
________________
আহসান এসেছে ওর থেকে ছেলেকে সাথে রেখেছে। দুজনে মিলে বাইরে থেকে ঘুরে এসেছে, আহিয়ান আজ বাবার হাতে ভাত খেয়েছে, বাবার কাছে শান্ত বাচ্চার মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। আহসান ছেলেকে দশটার আগেই ঘুম পাড়িয়ে বিশ্বজয়ের হাসি দেয়। ফারিন তো তা দেখে অবাক। কিন্তু আহসানের সামনে তো নিজের বিস্ময় প্রকাশ করবে না। কণ্ঠে কৃত্রিম তেজ নিয়ে বলে,
“আমাকে জীবনে দেখেছো ওকে পায়ে নিয়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে ঘুম পাড়াতে? অভ্যাস খারাপ করে ফেলবে তুমি ওর।”
“একদিনই তো।”
“তোমাকে দিয়ে আসলেই কিছু হবে না।”
আহসান আহিয়ানকে ঠিক মতো শুইয়ে দিয়ে ওর খালি গায়ে পাউডার মেখে দেয়। ফারিনকে বলে,
“শাড়ি পড়বে কখন?”
“পড়তেই হবে?”
“ইচ্ছে হলে পড়ো। জোর করবো না।”
ফারিন দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “নিবোধা একটা।”
আহসান হাসলো। “হোয়াট বোধা?”
“ফাউল।”
“যাও পড়ে আসো।”
“তুমি বারান্দায় যাও।”
আহসান মোবাইল নিয়ে বারান্দায় চলে আসে। ফারিন ঘরেই শাড়িটা পড়ে। আটপৌড়ে শাড়ি পড়ে। চুল আঁচড়ে আহসানকে ডাক দেয়। আহসান এসে নিজের কোমরে একহাত রেখে আরেক হাতে ঠোঁট চেপে ধরে। ফারিন আহসানের রিয়েকশন দেখে ভ্রু নাচায়। আহসান ঠোঁটের কাছে হাত রেখে ফারিনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ হাসে। তারপর ফারিনের দিকে এগিয়ে এসে একগাল হেসে বলে,
“লুকিং ড্যাম বিউটিফুল।”
ফারিন আঙুলে চুল প্যাঁচায়। “আই নো, আই নো।”
আহসান সাবধানে ফারিনের কোমরে হাত রাখে।
“পুরোই নায়িকা নায়িকা লাগছে।”
“আমি নায়িকা হলেও তুমি নায়ক না।”
আহসান ফারিনের হাতে চুমু খেলো। গালে, কপালে, চোখে, নাকে, ঠোঁটে চুমু খেলো।
“শাড়িটা কেমন লেগেছে? তোমাকে তো এই শাড়িতে চমৎকার লাগছে।”
“তোমার সব পছন্দই সুন্দর। যেমন আমি।”
আহসান ঠোঁট কামড়ে হাসে। ফারিন মুখ ঘুরিয়ে নেয়৷
“বাজে হাসি।”
আহসান ফারিনের দুই কাঁধে হাত রাখে। ফারিন আহসানের হাত ঝাড়া মেরে বলে, “অনি প্রতিদিন ইনায়ার জন্য ফুল আনে। তুমি তো বাপের জন্মেও আমার জন্য একটা আনলে না।”
“ফুলের বৃষ্টিতে ভেজালাম। তাও হয় নি?”
“না।”
“একটা ফুল ঘুমায়, বাকি দুইটা ফুল পেটে। কত সুন্দর, সুন্দর ফুল দিলাম। তারপরও ফুল চাও? এগুলোর চেয়ে সুন্দর ফুল হয় নাকি?”
“ফ্লার্টার একটা।”
আহসান ফারিনের ঠোঁটে চুমু খেলো চট করে। ফারিন কিছুক্ষণ হাসলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দুজনে মিলে ছবি তুললো। ফারিন আয়নায় মোবাইল তাক করে রেখেছে, আহসান ওর পেটে হাত দিয়ে গালে ঠোঁট ছোঁয়ায় এমন ছবি। আহসান প্রতিমাসে ওকে একটা শাড়ি এনে দেয়। ফারিন ওটা পড়ে একমাস, দুইমাস, তিনমাস এমন করে করে আজ সাতমাসের ছবি তুলে রাখলো। ফারিন মোবাইল রেখে বলে,
“আমার ছেলের সময় এইসব করোনি। ভুলিনি আমি।”
আহসান ফারিনের দুহাতে চুমু খেলো। “সরি। তোমাকে আর তোমার জান বাচ্চাকে।”
“ইটস ওকে।”
আহসান ফারিনকে বিছানায় বসিয়ে পেটে চুমু খেলো কিছুক্ষণ। ফারিন হেলান দিয়ে বসা, আহসান ওর উরুতে মাথা রেখে সারা সপ্তাহের গল্প শোনাচ্ছে। আহসানের একেক কথা শুনে হাসতে হাসতে ফারিনের অবস্থা নাজেহাল হয়ে উঠলো। হুট করে শ্বাসকষ্ট উঠে গেল ওর। আহসান চটজলদি ওকে ইনহেলার এনে দেয়।
ফারিন ধাতস্থ হয়ে শাড়ি টান মেরে খুলে ফেলে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “জালিম একটা।”
“কি করলাম আমি? একটু মজার কথা বলে হাসিয়েছি শুধু।”
“জানো না বেশিক্ষণ হাসতে পারি না? এই অবস্থায় সমস্যাটা আরো বেড়েছে জানো না?”
আহসান এসির পাওয়ার কমিয়ে দেয়। উঠে ফারিনের জামা নিয়ে এলো। আহিয়ানের গা কাঁথা দিয়ে ঢেকে দেয়। ফারিন জামা পড়ে পানি খায়। আহসান ফারিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
“আমার গায়ে হাত দিবে না। তুমি আসলেই একটা নির্বোধ।”
“হ্যাঁ ভালো কাজ করলেও দোষ, খারাপ কাজ করলেও দোষ।”
ফারিন আহসানের বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়ে। “আমার কল কেটে দিতে বলেছো না তুমি? উত্তরা গিয়ে আমাকে কল করলে আমিও রিসিভ করবো না।”
“বাদ দাও, বাদ দাও। তোমাকে দিয়ে কিছু হবে না।”
“কিছু হবে না করতে করতেও তোমাকে তিন বাচ্চার মা বানিয়ে দিলাম ফৌজিয়া ফারিন।”
“বুদ্ধু একটা।” ফারিন হেসে ফেলে। আহসান ফারিনের মাথায় বিলি কেটে দিতে থাকে।
চলমান….
(হ্যাপি রিডিং…..)

