আমার_বোবাফুল(৩২) #তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

0
76

#আমার_বোবাফুল(৩২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

“ যারা ফুলের এই অবস্থার জন্য দায়ী;তারা ইক্সাক্ট কেমন শাস্তি ডিজার্ব করে?ইউ্যু নৌ হোয়াট?”

সাত তলা ভবনের বিশাল বড় হসপিটাল। লোকজনের চাপা গুঞ্জনে বিরক্তিতে মুখ ভেঙে ‘চ’ সূচক শব্দ ছুঁড়ে মাথা চুলকানোর ন্যায় গমগমে আওয়াজে মুখরিত চারপাশ।চার তলার প্রকাণ্ড করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে তারা। এদিকটায় লোকের আনাগোনা তেমন একটা নেই।তামিজ শিকদার হাত মুঠো বদ্ধ করে চেষ্টা করেন নিজেকে সামলে নেয়ার।চোখ মুখে শক্ত করে অধৈর্য হুঙ্কার ছাড়েন,

“ আমি ওই শু!য়ো!র গুলোকে নিজ হাতে খুন করবো!”

“ কন্ট্রোল ইউর্সেল্ফ চাচ্চু!”
গম্ভীর থমথমে মুখে আচমকা ঠোঁট এলিয়ে হাসে বর্ণ; তাচ্ছিল্য মিশ্রিত মৃদু হাসি।উভয় হাতের আঙ্গুলে আঙ্গুল চালিয়ে কড় ভেঙে ফিসফিস করার মতো বললো নাক সিঁটকে, -“আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার কথা ভাবনাতেও এনো না প্লিজ।এটা অন্যায়, নীতি পরিপন্থী!ধর্মেও সইবে না!”

ভদ্রলোক চমকানোর মতো চাইলেন।কঠোর গলায় শুধালেন,
“ ছেড়ে দেবো? আমার মেয়ে অনিশ্চিত জীবন নিয়ে হসপিটালের বেডে শুয়ে থাকবে আর ওরা মুক্ত বাতাসে শ্বাস টানবে!”

“ কেনো তোমাদের বিশ্বস্ত আইন আছে না? তাদের উপর ছেড়ে দাও!”

“ ওরা আসল অপরাধী শনাক্ত করতে পারলেও শাস্তি হিসেবে মৃ!ত্যুদণ্ড দেবে না।আর আমার কলিজায় আঘাত করার একমাত্র শাস্তি মৃ!ত্যু ছাড়া অন্যকোন পুরষ্কার আমি দেখছি না এই মূহুর্তে!”

বর্ণ অবচেতন মনে সজোরে উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়।ঠোঁটে ঠোঁট গুঁজে ডান ভ্রুতে তর্জনী ঘঁষে বললো অন্যত্র চেয়ে,
“ বিদ্যায় আছে –ক্ষমা মহত্ত্বের লক্ষণ!”

বাক্যটি তার মুখে শুনতে বেশ বিশ্রী রকমের সুন্দর লাগল।তামিজ শিকদার বিষ্ফোরিত চোখে তাকায়। মস্তিষ্কের সমস্ত রাগ, ক্ষোভ যেনো এখনি বর্ণ’র উপর গিয়ে বর্তাবে। সূচালো চোখে তাকিয়ে বর্ণ বললো,

“ ধরো তুমি ওদের তিনজন এবং এদের পেছনে যে কলকাঠি নেড়েছে তাদের পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিলে। ফলস্বরূপ তোমার কী শাস্তি হবে…

“ বাই এ্যানি চান্স.. মজা করছিস আমার সাথে?”
“ নো, আ’ম সিরিয়াস!”

ক্ষিপ্র মেজাজে তাকিয়ে থাকলেন তামিজ শিকদার। বর্ণ কপাল কুঁচকে ডান হাত পেছনে ঠেলে মাথা চুলকায়। অতঃপর গা ঝেড়ে গম্ভীর গলায় জানাল,

“ শিঘ্রই রংপুর ফিরছি আমি!”

.
ডক্টর মেহরাব এসে পর্যবেক্ষণ করে গেলো সুখকে। পেশেন্টের পাশে বসে সশব্দে কাঁদতে, উত্যক্ত করতে নিষেধ করে দিয়েছেন।এখনো ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। তবু রুবাইয়্যাত মেয়ের পাশে বসে খুব কেঁদেছেন নিঃশব্দে আঁচলে মুখ চেপে। সুখকে দেখার জন্য পাঁচ মিনিট সময় পেয়েছিলেন।উপরে যতই শক্ত হওয়ার কথা বলুক,মেয়ের এমন নিদারুণ পরিণতি দেখে দমিয়ে রাখতে পারেননি চোখদুটোকে। পুণরায় ঝরঝর কেঁদে ফেললেন।

সুখের লম্বা, কাঁধ ছাড়িয়ে কোমরের উপরিভাগ অব্দি নেমে আসা সিল্কি চুল আর নেই। কেটে ফেলা হয়েছে। মাথায় বড়জোর এক ইঞ্চির মতোন অবশিষ্ট আছে। কেটে নেয়া র-ক্ত মিশ্রিত চুলগুলো প্রায় অনেক্ষণ বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন তিনি। এগুলো সুখের বড্ড শখের ছিল।চুলের যত্নে সে কভু অবহেলা করে না।

ছোটবেলায় একবার চুলের আগা ছেঁটে দিয়েছিলেন রুবাইয়্যাত।নিচ থেকে চুল ছাঁটলে নাকি আরো সুন্দর হয়ে বেড়ে উঠে।তার অনুমতির চেয়ে খানিক বেশি লম্বা কেটে ফেলেছিল বলে সেদিন অভিমানে কতো যে চোখের পানি ঝরালো মেয়েটা।ভাতও খায়নি একদিন।সুখ যদি এখন চোখ মেলে দেখে তার চুল নেই। তখন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে? নিশ্চয়ই খুব খুব কাঁদবে, কেঁদে বুক ভাসাবে?নাক টেনে অভিমানী চোখে আম্মুকে বলবে,

“ অন্তত তুমি তো জানতে আমি চুলগুলোকে কতো ভালোবাসি।তাও ওদের কেটে ফেলতে দিলে আম্মু?”

.
মাথার এক-তৃতীয়াংশে ধবধবে সাদা ব্যান্ডেজ। ব্যান্ডেজের একাংশে র/ক্ত ভেসে উঠে র-ক্তিম হয়ে আছে। স্যালাইন চলছে।মুখে অক্সিজেন মাস্ক,হাতে ক্যানেল।ফোর্থ ফ্লোরের একটা নির্জন কক্ষে হসপিটালের বেডে নিশ্চুপ ঘুমিয়ে আছে সুখ। শ্বাস প্রশ্বাস চলছে।কপালে বাঁ-ভ্রু’র উপরাংশে একটা কালচে সরু রেখা। ঠোঁটের কোনে মেডিট্যাপ। থুতনির তলদেশে,ডান কানের গোড়ায় আঁচড়ের দাগের মতো ক্ষত চিহ্ন।
বর্ণ নিরলস তাকিয়ে রইলো।পড়নে হসপিটালের সবুজ পোশাক।নিথর মন, সেখানে ভাবনারা এক মূহুর্তের জন্য কোথাও যেন ফেরার।কক্ষ ফাঁকা প্রায়। কেবল মাত্র দুজনকেই চোখে পড়ছে –বেডে ঘুমন্ত সুখ আর তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকা বর্ণ।

সুখের মাথার পাশে বাঁ হাত ঠেস দিয়ে খানিকটা ঝুকে গেলো।অপর হাতটা তুলে ধীরে সুখের চোখের কাছাকাছি টেনে নিয়ে গেলো। চোখের কার্নিশ বেয়ে এক বিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সন্তর্পণে বর্ণ সেটা তর্জনীতে তুলে নিয়ে পুণরায় হাত গুটিয়ে নিলো আস্তে করে।

“ গত দুদিন ধরে কতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছিস, ক্লান্ত হচ্ছিস না? এবার চোখটা তো খুলে থাকা! তোকে ঘুমন্ত অবস্থায় একদম বাজে দেখায়।উঠে পড় আর আমার আদেশের বিরোধ কর দেখি? কয়েকদিন ধরে দেখলাম কাজটা ভালোই পারিস!”

সুখের কানে পৌঁছালো কী তার কথাগুলো?বর্ণ কী বুঝতে পারলো তার অজান্তেই সুখ আবারো তার বিরোধ করলো!এই যে বর্ণ তাকে জাগতে বললো অথচ সুখ নিরবে চোখ বুজে আছে প্রত্যুত্তর না করে –এটা কী বর্ণ’র কথার বিরোধ না?

বর্ণ অন্যমনস্ক হয়ে সুখের চোখের দিকে অপলক চেয়ে রয়। দৃষ্টি প্রখর হয় হঠাৎ। ছোটবেলায় খেলায় ছলে একদিন কোথাও একটা কপালে চোট লেগেছিল সুখের।বয়স আর কতো হবে? আনুমানিক তিন। প্রকৃতিতে তখন শীত শীত আবহ। ঠান্ডা জিনিস খাওয়া পুরোপুরি নিষেধ।আইজা আইসক্রিম ফ্রীজে রেখে তালা মেরে দিয়েছে।বর্ণ কৌশলে চাবিটা হাতিয়ে ফ্রিজের কাছে চলে গেলো। সঙ্গী নিলো ফুলকেও!পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট ফুল তা তার খেয়ালেই ছিল না। টেনে খুলার সময় ফ্রিজের কোণ লেগে সুখের কপালের মেডিটেপ লাগানো চোটে বারি খেলো। মূহুর্তেই যন্ত্রণায় দুঃখে কাতর মুখে বাচ্চাটা কেঁদে উঠলো।জোরে শব্দ যোগে কাঁদতে পারত না সে। ফুঁপিয়ে উঠে।বর্ণ কী করবে খুঁজে পায়না তৎক্ষণাৎ। ছোট্ট সুখের মুখ খানা হাতের আঁজলায় করে আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায় ঠোঁট দাবিয়ে চুমু এঁকে দিয়ে বলল, “ কাঁদে না ফুল।আদর দিয়েছি না,এখনি ভালো হয়ে যাবে!”
সুখের কান্নারা থেমে গিয়েছিল পরপর। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকেছিল –হয়তো আব্বু আম্মুর পর তৃতীয় কেউ এভাবে চুমু দেওয়ায়।

বর্ণ’র কপাল সংকুচিত হয়। দৃশ্যটি বহু বছর পর হানা দিয়েছে মনে। যেভাবে সেদিন কান্না থেমেছিল সেভাবে আজ কী ফুল চোখ খুলবে?যদি কপালের কাটা রেখায় একটা কোমল চুমু আঁকে!সুখের কানের কাছে মুখ বাড়িয়ে দেয় বর্ণ,

“ তোকে কষ্ট দিয়েছি, নিশ্চয়ই আমার উপস্থিতি এখন আর তোর হৃদয় প্রফুল্ল করে না। ইটস্ নরমাল!

ঢোক গিলল একটা,ফট করে বললো,-“একটা কিস্ করি?ছোট বেলায় যেমন কান্না থামিয়ে দিয়েছিলি তেমনি এই এই কোমা টোমা ছেড়ে উঠে যা, হ্যাঁ? আমার কথা ছাড় তুই তো তোর বাবা মাকে ভীষণ ভালোবাসিস,না?দেখে আয় তারা কাঁদছে তোর শোকে।হারি আপ!”

সুখ নিশ্চুপ,অনড়।বর্ণ জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়।তার কী হলো কে জানে!কপালের কাটা রেখায় তাকিয়ে থাকে সুখের।একটা চুমু দেওয়া-ই যায়।সুখ যদি নাও উঠে,এই বদ্ধ কক্ষের এই কথাটি সে ছাড়া কেউ জানতেও পারবে না কখনো। স্বয়ং ফুলও না।

পূর্বের মতো ঈষৎ ঝুঁকে বর্ণ ঠোঁট এগিয়ে নিয়ে যায়। উষ্ণ শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে সুখের মুখে চোখে। ঠোঁট যখন কপাল ছুঁই ছুঁই বর্ণ থমকে গেলো আচমকা। সুখের শ্বাস প্রশ্বাস অস্বাভাবিক হচ্ছে ক্রমশ। জোরে জোরে শ্বাস টানছে। চোখ পাকিয়ে হার্টবিট পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের দিকে তাকিয়ে দেখে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো সুখের হার্টের বিটিং ঊর্ধ্বগতিতে উঠছে তো আবার নামছে। তড়িৎ দু কদম পিছু সরে আসে বর্ণ। শরীর ঘামছে তার।ঘাড়ে,গলায় হাত মালিশ করে বুকে হাত রাখে চেপে ধরলো। হৃদযন্ত্রের ছটফট বাড়ছে। আচমকা সম্বিত ফিরলো যেন। খানিক আগে কী করতে যাচ্ছিল ভেবেই গলা খাঁকারি মাথার চুল টেনে ধরলো।মনে হলো খানিক আগে সে তার নিজের নিয়ন্ত্রণেই ছিল না।বর্ণ ঢোক গিলে চাইলো সুখের দিকে। শ্বাস প্রশ্বাস পুণরায় স্বাভাবিক হচ্ছে তার। বর্ণ ঠোঁট কামড়ে সরু চোখে আবার এগিয়ে গেলো সুখের দিকে, বললো অদ্ভুত সুরে,

“ অচেতনেও আমার উপস্থিতি তোর হার্ট বিট করে?ট্রু লাভ?আজো ভালো টালো বাসিস আমায়?কেনো?”

.
বর্ণ রংপুর ফিরবে আজ। এদিকটায় তাকে আর তেমন একটা প্রয়োজন হবে না।শুট শেষ করে পুণরায় আসবে। রুবাইয়্যাত সুখের সঙ্গ ছাড়া ঘরমুখী হবে বলে মনে হয় না।বাকি রইল তুহফা,অভ্র আর সাইমা বুয়া।তাদের ব্যাপারে মাহির জানে না।তুহফার সাথে তার ঘটা করে কখনো কথা হয়নি। হসপিটালে দুয়েক বাক্য আদান-প্রদানে তিন বারের মতো কথা হয়েছে কেবল। মেয়েটাও আজকাল আগের মতো কল করে “মাহির ভাই!ভাইয়া কোথায়, আপনাদের প্ল্যান কী।শুট কোথায়।এটা ওটা ” আর জিজ্ঞেস করে না।হয়তো সেদিন হুটহাট কল করতে নিষেধ করেছে বলে।এটা কী অভিমান ? অবশ্য একদিকে ভালোই হয়েছে। এখন সাময়িক কষ্ট পেলেও একসময় তাকে স্বপ্নেও মনে পড়বে না তুহফার। ইশশ্ মাহির যদি জানতো –তুহফা নামের মেয়েটির পুরো স্বপ্ন রাজ্যই মাহিরের নামে লিখে দেয়া? বোধহয় সে জানে না! অথবা জেনেও না জানার ভান ধরে আছে।

পার্কিং লটে এসে বর্ণ’র ফোনে ডায়াল করলো মাহির।পারলে যে এখনি এই মুহূর্তে রংপুর যাওয়ার তাড়া দিয়ে তাকে গাড়ির নিকট পাঠালো, ভদ্রলোকের আভাস মাত্র নেই অথচ। বহুরূপী ভদ্রলোক!

মুখে মাস্ক চেপে দুহাত পকেটে পুরে বুক সিধে করে দাম্ভিকতার সাথে এগিয়ে চললো বর্ণ।এই মিডিয়া জগতে নাম কামানোর এই একটাই সুবিধা –যেখানে যাও মুখ ঢাকো; নয়তো জনগনের সাথে সেলফি বিলাশ করো।

মাহির প্রায়শই বলে,
“ স্যার আপনি বডিগার্ড কেনো রাখছেন না? আপনি আগে আগে হাঁটবেন আর পিছু বডিগার্ড। তখনই তো সেলিব্রিটি সেলিব্রিটি ভাবটা গভীর লাগবে!”

“ আমি একাই একশো!”
বর্ণ’র এই কথা খানার কাছে মাহিরের ওইসব যুক্তি খন্ডন হয়ে যায় অতঃপর।মাহির হতাশ এই ঘাড় ত্যাড়া বসকে নিয়ে।

লিফট একটু পরেই।বর্ণ কাছাকাছি পৌঁছানোর আগেই লিফট থেকে বেরিয়ে এলো ডঃ মেহরাব। পরষ্পরকে দেখে দুজন থামলো নিজ ধ্যানে। ডঃ মেহরাব তীক্ষ্ণ খেয়ালে তাকাতেই বর্ণ’র চক্ষু হাসলো যেনো। আলগোছে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো ভ্রু উঁচিয়ে,

“ আসফিয়ান বর্ণ!”

#চলবে🥀

[কী বুঝলেন রিডার্স?এরা চিনতো বা চেনে একে-অপরকে?বড়ো করে সুন্দর করে কমেন্ট করুন, রিপ্লাই দেই❤️

সাইলেন্ট রিডার্সদের একটু রেসপন্স করার অনুরোধ। ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন 🦋]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here