#আমার_বোবাফুল(৩৭/১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
(৩৭— প্রথমার্ধ)
.
“ একা বের হতে বারণ করেছিলাম নূর।”
বর্ণ’র গম্ভীর স্বর।চোখ মুখে কাঠিন্যতা বিরাজমান।নূরা ঠোঁট ফোলায়। সাফাই গাওয়ার মতো বললো কোমল কন্ঠে,
“ একা বেরোইনি তো।ওই যে মেহ…
থেমে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, “ ওনাকে নাম ধরে ডাকলে কী পাপ হবে?”
“ নাহ,এটা অত্যন্ত পূণ্যের কাজ! যেহেতু দেশ বিদেশের প্রতিটি যুবক যুবতী আপনার ছোট।নাম ধরে ডাকার হক আছে আপনার!”
বর্ণ’র হাত চেপে তার পিছু মুখ ঝুলিয়ে নূরা উঁকি দিলো।মাহির বলেছে উপরোক্ত কথা খানা।মুখটা তার হাসি হাসি। অথচ কন্ঠে ভেসে উঠেছিল উপহাসের ছিটেফোঁটা।হঠাৎ নূরাও ঠোঁট এলিয়ে হেসে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সায় জানিয়ে বললো,
“ কার্রেক্ট! ফ্রেন্ডস্ হয়েছি তো আমরা।নাম ধরেই ডাকা যায়।”
মেহরাব ততোক্ষণে এগিয়ে আসে।গায়ে জড়ানো সাদা এপ্রোন।স্টেথো. নেই গলেতে, বোধহয় চেম্বারে রেখে এসেছে। ফোর্থ ফ্লোরে নূরাকে তার পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া বাদেও মেহরাবের অন্য একটি উদ্দেশ্য –এখানের কিছু পেশেন্টকে পর্যবেক্ষণ করা।
বর্ণ হাত বাড়িয়ে দেয়,
“ হোয়াটস্-আপ!সী ইউ্যু আফটার অ্যা লং টাইম!”
কথাটি এমন ভাবে বললো যে, মনে হয় বহুদিনের পরিচিত দুজনের আজ হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো পথে প্রান্তরে। মেহরাব হ্যান্ডশেক করে মৃদু হাসলো,
“ গুড! আপনার ছোট বোন?বেশ মিষ্টি একটা বাচ্চা।”
বলার ফাঁকে নূরার গাল টেনে দেয়।নূরা প্রতিবাদী রূপ নেয় নিমেষেই,
‘‘ আমাকে বাচ্চা বলে ভুল করোনা হে বৎস।আমি চাইলে তোমার চেয়েও…
গালে তর্জনী ঠেকিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে পরবর্তী বাক্য সম্পন্ন করতে শব্দ খুঁজতে লাগল সে। মেহরাব উৎসুক চোখে চেয়ে রয়।সেও শুনতে চায় পুরো কথা। বেখেয়ালে তার দৃষ্টিতে নজরে আসতেই নূরা নাক ফুলিয়ে মুখ ভেংচে টমি’কে কোলে তুলে নেয়।
আজ সকালের কথা। রুবাইয়্যাত গিয়েছে হসপিটালের কাছাকাছি ভাড়া নেওয়া বাসায়।উনি গোসল করবেন।সুখকে দেখে রাখার জন্য আইজা থাকলেন এখানে।সাইয়া বুয়াও আছেন সাথে।এক দেড় ঘন্টার চেয়ে বেশি নূরার হাতে ফোন দেননা আইজা। অতিরিক্ত ফোন স্ক্রিনে চেয়ে থাকার ফলে এতে বাচ্চাদের চোখে সমস্যা দেখা দিতে পারে, ব্রেইনে ইফেক্ট পড়ে মেধা শক্তি হ্রাস পায়, আরো কত কী!এক তো গমগম পরিবেশ,বাইরে বেরিয়ে খেলার উপায় নেই।তারউপর ফোনটাও ছোঁয়া নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে। কেবিনে একা একা বোর লাগছিল নূরার।সাইমা বুয়া অবশ্য প্রকাণ্ড বিস্তৃত ফোর্থ ফ্লোর ঘুরিয়ে দেখিয়েছে একবার। এখানে তার বয়সী কিংবা মনের মতো কাউকে খুঁজে না পেয়ে হতাশায় চুপসে বসেছিল টমি’কে কোলে নিয়ে।
↓
গেল বছর জন্ম দিনে টমিকে গিফট দিয়েছিলেন তামিজ শিকদার। তবে তার উপর নূরার চেয়ে সুখের হস্তক্ষেপ বেশি চলে। সুখকে ভীষণ ভালোবাসে নূরা, অতএব টমির উপর তার হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য।মাস চারেক আগে নূরার খালামনির মেয়ে রুশ্মিতা –বয়সে সুখের সমপরিমাণ। বান্দরবান ঘুরতে যাওয়ার সময় ছবি তুলার বাহানায় টমিকে নিয়ে গিয়েছিল।ফেরত দেয়ার নাম গন্ধই নেই। সেদিন সুখের দূর্ঘটনার খবরে তারা এসেছিল শিকদার নিবাসে।টমিকে সাথে এনে ফেরার কালে পুণরায় নিয়ে যেতে মনোভাব দেখিয়েছিল রুশ্মিতা ঢংগি-টা।নূরা ছিনিয়ে নিয়েছে।
আম্মুর কাছে নূরা শুনেছে –সুখ ঘুমিয়ে আছে।কারো ডাকে সাড়া দিচ্ছে না।তাই টমিকে এখানে নিয়ে এসেছে সে।যদি টমির ‘খিচ খিচ’ বাচক আদুরে ডাকে সুখ অভিমান ভুলে জেগে উঠে!কিন্তু এমন হয়নি।সুখ তখনো ঘুমিয়েছিল যখন নূরা টমিকে কোলে রেখে সুখকে বহুবার ডেকেছে।তবু সাড়া পায়নি।
মনক্ষুণ্ণ হয়ে টমিকে নিয়ে কেবিনে এসে নিশ্চুপ বসে থাকার মাঝে আযাদ শিকদার এলেন পছন্দের স্ট্রবেরি ফ্লেভার আইসক্রিম, চকলেট সহ নানা রকমের ফ্রুটস্ নিয়ে। আইসক্রিম পেয়ে মন কিছুটা ফুরফুরে হয় নূরার।তার খানিক পর সুখের কান্ডিশন নিয়ে কথা বলতে দুজন ডক্টর, একজন নার্স এলো। তাদের মাঝে মেহরাবও ছিল।
মিনিট দুয়েকের মধ্যে কথার জালে ছোটদের মন জয় করার প্রসংশনীয় গুণ আছে মেহরাবের। সুখের ব্যাপারে কথা শেষে ফিরে যাওয়ার আগে চুপটি করে বসে থাকা নূরার সাথেও খানিক সময়েরও ভেতর সখ্য গড়ে উঠে। বন্ধুত্ব করে দুজনে।সেই খাতিরে আব্বু আম্মুকে বলে মেহরাবের পিছু ধরে তার চেম্বার পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। ডক্টরের পিছু ঘুরে পুরো হসপিটাল দেখাও হয়ে গেলো এতে।
.
রাত তখন গভীর।কটা বাজে খেয়ালে নেই। হসপিটাল জুড়ে ভয়ানক নিরবতা মিশ্রিত নিঃশব্দতা। রাস্তা থেকে ক্ষণে ক্ষণে গুটি কয়েক গাড়ির হর্ণ ভেসে আসছে।
পাশাপাশি দুটো রুমের একটাতে রুবাইয়্যাত, এবং সাইমা।আইজাকে বলে কয়ে আযাদ শিকদারের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছেন রুবাইয়্যাত।ছোট আকৃতির কেবিনে এতোজন থাকতে কষ্ট হবে, উপরন্তু নূরা এখনো বাচ্চা।ঘুমের ঘোরে বিছানার অর্ধেকাংশে তারই রাজত্ব চলে।
রুবাইয়্যাত জায়নামাজ থেকে উঠে সদ্য মাথা রেখেছেন ছোট বিছানাতে। সাইমা বুয়া ফ্লোরে বেডশিট বিছিয়ে ঘুমায়। যদিও ভদ্রতার খাতিরে বারকয়েক তাকেও পাশে শুতে বলেছিলন রুবাইয়্যাত। কিন্তু সে ওটুকুতেই কৃতজ্ঞ।তামিজ শিকদার আশেপাশেই থাকবেন।রাতে ঘুমান না তিনি।
হঠাৎ চোখ খুলে যায় রুবাইয়্যাতের।মনে কেমন যেন খটকা লাগলো আচমকাই। অল্পক্ষণ স্থির থেকে ফোনের ফ্লাস অন করে মেঝেতে চেয়ে দেখে সাইমা বুয়ার বিছানা খালি।সে নেই এখানে। বাথরুমের দরজাও বাইরে থেকেই বন্ধ।থম মেরে বাকশূণ্য হয়ে বসে রইলেন রুবাইয়্যাত। কোথায় গেলো সে?এতো রাতে বাইরে তার কোন কাজ থাকতে পারে বলে মনে হয়না। রুবাইয়্যাতের মন আনচান আনচান করে উঠলো কেনো যেনো।উনার আগেও মনে হতো তিনি যখন ঘুমাতেন সাইমা উঠে কোথাও একটা চলে যেতো। কিন্তু খুব গভীর রাতে ঘুমের ডাকে সাড়া দেন বিধায় চোখ মেলে কখনো সত্যতা যাচাই করা হয়নি।আজ হঠাৎ বিধাতার চাওয়ায় হয়তো ঘুমটা ভেঙেছে। ফোনের লাইট বন্ধ করে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন তিনি। কেবিনের মুখোমুখি রুমেই সুখ চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুয়ে আছে। দরজা হালকা ফাঁক করা দেখেই গলা শুকিয়ে এলো।বুক কেঁপে উঠে।দুকদম বাড়িয়ে উত্তরে দীর্ঘ করিডোরে চোখ পড়তেই দেখলো বর্ণ এগিয়ে আসছে প্রশ্নাতীত মুখে। রুবাইয়্যাত ইশারায় তাকে কথা বলতে নিষেধ করে। কপালের ভাঁজ দ্বিগুণ বাড়ে বর্ণর। চুপচাপ কাছে এসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে জানতে চাইল গম্ভীর অথচ স্বাভাবিক গলায়,
“ কাম্মা, এতো রাতে উঠে এসেছো কেনো? ভেতরে সবকিছুর ব্যবস্থা আছে মে-বি,এতো রাতে বাহিরে তোমার প্রয়োজন তো দেখেছি না!ওয়েট অ্যা মিনিট..”
বর্ণ শেষোক্ত কথাটি আওড়ে কান পাতার মতো করলো সজাগ মস্তিষ্কে। গুনগুন আওয়াজ কানে এসে লাগছে।সুখের ক্যাবিন থেকেই।
“ ফুলের কাছে কে ওখানে?”
“ আমি জানি না।”
রুবাইয়্যাতের কন্ঠস্বর শঙ্কায় জড়িয়ে আসে।বর্ণ সতর্ক পায়ে দরজার নিকটে গিয়ে ধীরে ঠেলে দেয় কাঁচের দ্বোর খানা। কক্ষে আলো বলতে নীলচে রঙা ক্ষীণ ড্রিম লাইট-ই জ্বলছে। উত্তর-দক্ষিণ হয়ে বেডে নিস্তেজ পড়ে থাকা সুখের পায়ের কাছে কেউ একজন বসে আছে। বিড়বিড় করে কীসব বলে গুনগুন করে কাঁদছে। কান্নার শব্দ বলে দিচ্ছে এটা কোন মহিলা।
“ কে তুমি? আমার মেয়ের কাছে কী করছো?”
আকম্মাৎ কন্ঠে মহিলা থমকে গেলো যেনো। ধড়ফড়িয়ে উঠে মাথায় কাপড় টানলো।নীলচে আলোয় চেহারা স্পষ্ট দৃশ্যমান হওয়ার নয়।বর্ণ আলো জ্বালানোর আগেই মহিলা পালিয়ে আসতে নেয় ছুটে। ততোক্ষণে সাদাটে আলো জ্বলে উঠলো কক্ষজুড়ে।মহিলার বাহু বর্ণ’র শক্তপোক্ত হাতের বাঁধনে বন্দী। ছুটোছুটি করেও ছাড় না পেয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো রমণী। রুবাইয়্যাত ধীর এগিয়ে গেলো তার দিকে।শাড়িটা কেমন চেনা চেনা ঠেকছে। কিন্তু মেয়ের চিন্তায় মাথায় আসছে না সেসব।
“ ঘোমটা তুলো!”
বলার ফাঁকে নিজেই মুখ থেকে মহিলার ঘোমটা ছুটে পেলে দিলেন পিছু। রুবাইয়্যাত বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে বললো পরপরই,
“ সাইমা তুই?
আমার মেয়ের কাছে এই মধ্যে রাতে কোন উদ্দেশ্যে এসেছিস?ওর ক্ষতি করতে নয় তো?কী হলো চুপ করে আছিস কেনো?”
বুক ভাঙা ক্রন্দনে নেতিয়ে পড়ে সাইমা।ধফ করে মেঝেতে বসে পড়ে।নজর রাখে অদূরে সুখের মুখশ্রীতে।বর্ণ ভ্রু গুটিয়ে চেয়ে থাকে। অতঃপর প্রলম্বিত এক শ্বাস ছেড়ে ঘাড়ে হাত ম্যাসাজ করে অন্যত্র নজর সরিয়ে নেয় নির্বিকার।হয়তো কিছু আন্দাজ করে নিয়েছে। রুবাইয়্যাত ফের ক্ষ্যাপাটে গলায় মৃদু চেঁচিয়ে উঠেন,
“ আমার চোখ লেগে এলে তুই প্রায়ই আমার মেয়ের কাছে আসতি তাই না?কী করেছিস ওর সাথে? নিশ্চয়ই তুই কোন ক্ষতি করে দিয়েছিস বলে ও_ও চোখ মেলছে না!”
সাইমার চোখে অঝোরে বৃষ্টি ঝড়ে পড়ে।ঢোক গিলে বুক ভাঙা স্বরে বললো হঠাৎ করেই,
“ জন্মদাত্রী মা হয়ে নিজের মেয়ের ক্ষতি কীভাবে করতে পারি আমি?”
কক্ষে স্তব্ধতার বিষ্ফোরণ ঘটলো এক মূহুর্তের জন্য।নির্বাক কক্ষে নানা যন্ত্রপাতির ভিড়ে উপস্থিত মানুষগুলোও নির্বাক রইলো; এরপর অবিশ্বাস্য কন্ঠে ফেটে পড়ে চারিধার,
“ কী’হ!কী বললি তুই?বর্ণ তুই শুনেছিস ও কী বললো? পাগল নাকি? আজেবাজে বকছে?”
বর্ণ একহাতে জড়িয়ে নিলো তাকে।
“ রিল্যাক্স কাম্মা!”
কিন্তু আজ শুনলেন না রুবাইয়্যাত,নিজেও ডুকরে উঠলেন প্রায়,
“ ওর এতো বড় সাহস কী করে হয় আমার বুকের মানিক,আ্ _আমার সাত রাজার ধন, আমার মেয়ের ম্_মা দাবি করছে নিজেকে।ও_ও যদি মা হয় তাহলে আমি কে?”
সাইমা নিরবে কেঁদে চলেছে ঠোঁট কামড়ে। চোখের কৌটর ঝাপসা।মনে দুঃসাহসিক দ্বন্দ্ব চলছে। রুবাইয়্যাতকে একহাতে ঝাঁপ্টে রেখেছে বর্ণ। কিছু বলার আগে ভদ্রমহিলা সাইমার উপর চড়াও হয়ে হাত তুলার মতো ইঙ্গিত করে পুণরায় ভাঙা স্বরে বলে উঠেন,
“ বুয়া মিথ্যে বলছে, না?সুখ আমার একমাত্র মেয়ে।আমিই ওর মা। আমাদের সংসারের সুখপাখি ও!”
#চলবে🥀
|ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। রেসপন্স করার অনুরোধ|

