আমার_বোবাফুল(৩৮

0
68

#আমার_বোবাফুল(৩৮.১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

|৩৮–প্রথমার্ধ|
সুখের মাথায় ব্যান্ডেজ জড়ানো।জখম শুকিয়ে এসেছিল প্রায়।বেড থেকে পড়ে যাওয়ার ফলে তাতে এখন আবার র-ক্ত ভেসে উঠেছে। অস্বাভাবিক কম্পিত হচ্ছে শরীর। রুবাইয়্যাত মেয়েকে বুকে ভেতরে আগলে রাখে। গালে ঠোঁট দাবিয়ে মমতায় চুমু আঁকে। ডক্টর এখনো এসে পৌঁছায়নি।সাইমা আর আইজা ছুটে গেছে।দুটো নার্স এবং ডক্টর আঁচল এলো কিছুক্ষণ পর।সুখ তখন আম্মুর বুক থেকে ক্ষীণ প্রদীপের মতো পিটপিট চোখ মেলে। নিঃশ্বাসের শব্দ দ্বারের বাহিরে পর্যন্ত ভেসে বেড়াচ্ছে। শ্বাসকষ্ট রুগীর ন্যায় অবস্থা। সুখের অবশ-প্রায় ডান হাত স্বল্প শক্তিতে খামচে ধরে রুবাইয়্যাতের পিঠের শাড়ি।নার্স দুজন অবিলম্বে ধরাধরি করে বেডে শুইয়ে দেয় তাকে।আরো দুজন ডঃ এলো। প্রত্যেকে ছুটোছুটি লাগিয়ে দেয়। কেবিন থেকে স্ট্রেচারে করে সুখকে কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হয়।পুণরায় জ্ঞান হারিয়েছে সে।

রুবাইয়্যাত একহাতে মুখ চেপে স্তব্ধ হয়ে চোখের পানি ছাড়ে। তারই ভুল।যদি সুখকে রেখে কেবিন ছেড়ে না বের হতো –নিশ্চয়ই তার মেয়েটা পুণরায় আঘাত পেতো না।তবে আনন্দও হচ্ছে।সুখ চোখ মেলে চেয়েছে।নিভু নিভু চোখে তাকে দেখেছে।তামিজ শিকদার হসপিটালের নিচেই ছিলেন।তিনিও মেয়ের সংবাদ পেয়ে চলে এসেছেন।

ও.টি’র সামনে তামিজ শিকদার,আইজা আছেন।আযাদ সাহেব গিয়েছেন রংপুর।তামিজ শিকদারের অবর্তমানে তিনিই সেখানের অফিস সামলাবেন।সাইমা ও.টির সামনে থেকে ধীর পায়ে কেবিনে এলেন। রুবাইয়্যাত তখনো থম মেরে ফ্লোরে বসে আছে। এখান থেকেই তার মেয়েকে তার কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ডক্টররা কোথাও নিয়ে গেছে সুখকে।কী করা উচিত,কী অনুচিত বুঝে কুল পাচ্ছে না রুবাইয়্যাত।চোখের তারায় কেবল উঠে আসছে সুখ চোখ মেলেছিল নিভু দৃষ্টিতে।মাতৃ হৃদয় ধ্বক ধ্বক করে উঠে তার। মনে হয়,কতো বছর পর মেয়েটি চোখ খুলে দেখলো তাকে।এমন সুখানুভূতি সেদিনও হয়েছিল.. যেদিন ছোট্ট সুখকে কোলে তুলে নিয়েছিল রুবাইয়্যাত। সেদিনও স্বচ্ছ নিষ্পাপ আঁখি পল্লবে সুখ ফ্যালফ্যাল করে তাকে চোখে চোখ রেখে ভুবন ভোলানো হাসি হেসেছিল।
কাঁধে হাতের ছোঁয়া পেতেই চকিতে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালেন ভদ্রমহিলা।সাইমা দাঁড়িয়ে আছে শুকনো মুখে।চোখের ইশারায় হয়তো আশ্বাস দিচ্ছে –সুখের কিচ্ছু হবে না। রুবাইয়্যাত আড়চোখে একবার কাঁধে রাখা সাইমার হাতের দিকে চাইলো। ইতোপূর্বে এতোটা অধিকার কাটিয়ে তাকে স্পর্শ করার সাহস দেখায়নি সে।তবে আজ কেনো দেখালো?

সাইমা হাত গুটিয়ে মাথা নিচু করে নেয় হঠাৎ। সেদিন ঝোঁকের বশে চরম সত্যিগুলো বলার পর প্রতি মূহুর্তে অনুশোচনা হচ্ছে –হয়তো সে ভুল করে ফেলেছে। এতো গুলো বছর গোপনে মনের ভেতরে পুষে রাখা সত্যিটা এভাবে বলে দেওয়া উচিৎ হয়নি।

রুবাইয়্যাত চাপা শ্বাস ছেড়ে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়ায়।
.
ডক্টর মেহরাবের কাজ ছিল অন্য এক হসপিটালে।এখান থেকে তিন কি.মি দূরে । আঁচলের তাগাদা পেয়ে পুণরায় এখানে আসে। যেহেতু শুরু থেকে সুখের ট্রিটমেন্ট তিনিই করেছেন।সুখ তারই পেশেন্ট। আঁচল কেবলমাত্র মেহরাবের সহযোগী।

মেহরাব নিশ্চিত করে সুখ কোমা ছেড়ে উঠেছে। ধারণা করা যায়, মস্তিষ্ক সক্রিয় হওয়ার পরপরই –সজ্ঞানে থাকতে তার সাথে ঘটে যাওয়া শেষ ঘটনা স্মৃতিতে এসেছিল।অতিরিক্ত ভয় কিংবা চাপ থেকে এতো কিছু হয়ে গেলো।এই যেমন –ছটফট করতে করতে বেড থেকে পড়ে যাওয়া, মাথার আঘাতে পুণরায় রক্ত/ক্ষরণ, চোখ মেলে ফের জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।

ঘন্টা কয়েকের মাঝে সুখের জ্ঞান ফিরবে বলা হয়েছে।ঘড়ির কাঁটা যেনো আজ থমকে গেছে। রুবাইয়্যাত উশখুশ মনে উদগ্রীব মুখে ফোন পাশে রেখে হঠাৎ কিছু মনে পড়ার মতো সাইমার দিকে চাইলো।ওই যে.. খানিক দূরে গুটিয়ে বসে থাকা মহিলাটিও তার মেয়ের মা –ভাবতে গেলেই একটা চাপা হিংসে হানা দেয় মানসিকতায়। রুবাইয়্যাত খুব করে মনকে বুঝাতে চায় –ওই মহিলাটি সুখকে বিধাতার কাছ থেকে পৃথিবীতে এনেছিল বলেই সুখ আজ তার বুকে,তার কোলে। মস্তিষ্ক এমন বললেও কিন্তু মন এসব যুক্তি শুনতে অপ্রস্তুত। সন্তানের ভাগ কাউকে দেয়া যায়?যদি সেই সন্তান হয় দুচোখের মণি,মায়ের অন্তপ্রাণ!!

যদিও সাইমা তেমনি আচরণ করছে, যেমনটা পূর্বে করে এসেছে। নিশ্চুপ মনিবের সেবা করছে, ফ্লাটে গিয়ে রান্না-বান্না করছে,সুখের প্রতি কোন অধিকার বোধও দেখাচ্ছে না।তবু রুবাইয়্যাতের মন আনচান আনচান করে, যেনো বুকের উপর শক্ত পাথর চেপে আছে। অযথা ভয় জেঁকে বসে–সুখকে যদি সত্যিটা বলে দেয়?যদি সুখ তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়?মা বলে ডাকতে অস্বীকার করে?

রুবাইয়্যাতের গা ঘেঁষে আছে নূরা।টমি’কে আদর করতে করতে বলে মুখ তুলে বলে,

“ আমার ফ্রেন্ড বলেছে সুখ খুব শীঘ্রই জেগে উঠবে।তুমি আর কেঁদো না কাম্মা।”

দুটো কেবিনের অন্য একটাই সুখকে শিফ্’ট করা হয়েছে খানিক আগে।জ্ঞান ফেরার আগ অবধি কারো প্রবেশ নিষেধ।ডক্টর ইতোমধ্যে দুবার চেক করে গেছে। মূলত,ঘুমের ইনজেকশন পুশ করা হয়েছে তাকে।
.
সুখ চোখ খুলে দুপুর আড়াইটার দিকে। নিঃশ্বাসের শব্দ এবার স্বাভাবিক থাকলেও ভয়ার্ত চোখে গুটিসুটি মেরে থেকেছিল। ডক্টরের অনুমতি পেয়ে রুবাইয়্যাত কাছে যেতেই ঝাপ্টে ধরে বুকে মুখ লুকায় সুখ।হাতে স্যালাইন চলছিল, টান লেগে ব্যাথা পায়। অথচ সেই ব্যাথা তাকে ছুঁতে পারলো না আজ। আম্মুকে দুহাতে জাপটে রেখে ঠোঁট কামড়ে অঝোরে চোখের পানি ঝরিয়েছে। রুবাইয়্যাত কান্না দমিয়ে রাখে।মেয়েকে বুকের খাঁচায় ছোট্ট শিশুটিকে চুপিয়ে রাখার মতো আগলে রাখে,

“ এইতো আম্মু আছে।কোন ভয় নেই সোনা। কিচ্ছু হবে না।”

বর্ণ ঢাকায় নেই।সুখের জ্ঞান ফেরার কথা এখনো সে অবগত নয়।জানলে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাতো কে জানে!শিকদার নিবাসে হৈ হৈ লেগেছে।সকলের ঠোঁটে উপচে পড়া খুশির ঝিলিক।এমনকি হানিফা বেগমেরও। সুখকে দেখতে ঢাকা যেতে বাহানা ধরেন বৃদ্ধা।তামিজ শিকদার মানা করে দিলেন।এই বয়সে শহরের এতো কোলাহল, জমজমাট হাঁক ডাক আম্মা নিতে পারবেন না।দেখা গেলো উল্টো নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি আশ্বস্ত করেন খুব দ্রুতই সুখকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন ।
.
তখন রাত। শহরজুড়ে ধূসর কালো আঁধারের হাতছানি।চার দেয়ালে আবদ্ধ কক্ষে ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে পায়ে পা তুলে কাউচে বসে আছে মিশ্মি।কোলের উপর ল্যাপটপ।নজর সেখানেই স্থির।হাত ঘড়িতে আরো একবার সময় দেখে ঠোঁটে বাঁকিয়ে বললো আপনমনে,

“ আর মাত্র দু ঘন্টা। এরপর…’ —ঠোঁট কামড়ে হেসে বিদ্রুপ স্বরে বলে,-“ টাইম ইজ আপ!”

খানিক পর ব্যালকনির দরজায় ঢোকা পড়ে আলতো শব্দে। হতচকিতে তাকালো মিশ্মি। দরজা ভেতর থেকেই অফ।বাহির থেকে কে টোকা দেবে?কেউ তো ছিল না সেখানে।

সে ভাবলো এটা তার মনের ভুল।পুণরায় টোকা পড়ে।আরো একবার.. আবার..!বুকে ফুঁ দিয়ে মিশ্মি উঠে গেলো। ব্যালকনির কাঁচের দরজাটি খুলতেই সে বিষ্ময়ে স্তব্ধ চেয়ে রয় অযাচিত কিছু দেখার মতো। অস্ফুট স্বরে বললো বোধহয়,

“ বর্ণ!”

বর্ণ ঠোঁট এলিয়ে হাসলো, কাঁধ বরাবর হাত উঁচিয়ে আঙ্গুল নেড়েচেড়ে বলে,
“ হাই!”

মিশ্মির নাকে টোকা দিয়ে পরপরই পাশ কাটিয়ে রুমে প্রবেশ করে। বেপোরোয়া চোখে আশেপাশে নজর ছিটায়।অবাকতার শীর্ষে পৌঁছে গেলো মিশ্মি। আনমনেই নাকে হাত উঠে যায়।বর্ণ স্বেচ্ছায় তাকে ছুঁয়েছে। কিন্তু.. উদ্দেশ্য ছাড়া বর্ণ নিজের ব্যক্তিত্ব খুইয়ে এমন কিছু এমনি এমনি করবে না। একথাটি সেই মিথ্যে বিয়ের দিন মিশ্মি বেশ ভালো মতোই উপলব্ধি করেছিল ।স্তম্ভিত ফিরতেই পিছু ফিরে আশ্চর্যান্বিত গলায় প্রশ্নঃ করলো থেমে থেমে,

“ ত্_তুমি! আমার.. রুমে.. কীভাবে?”

চট করে বর্ণ তার মুখোমুখি ঘুরে গেলো ঘাড় বাঁকিয়ে।ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে ঠোঁট ঘঁষে বললো বাঁকা হেসে,

“ ফাইব চড়ে উঠে এসেছি ইয়ার।অনলি ফর ইউ্যু!” —শেষোক্ত করার সময় দু হাতের তর্জনী মিশ্মির দিকে তাক করে।মেয়েটি থমথম খায় ভেতরে ভেতরে।তা অ-প্রকাশিত রেখে জানতে চাইলো মৃদু হেসে বিষ্ময় ভরা চোখে,

“ বাট হোয়াই?”

“ নিজেই তো চ্যালেঞ্জ দিলে সাত দিনের ভেতরে যাতে তোমায় খুঁজে বার করি!পেরেছি না?”

মোমের শেষ আলোর মতো মিশ্মির হাসির ঝলকানি খানিক ম্লান হয়ে আসে।তবে, পুরোপুরি আদর ছড়ানো হাসি মিলিয়ে যায় না। বুকে দুহাত গুঁজে অল্পক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে থেকে ভনিতা ছাড়াই বলে উঠে,

“ নিজ থেকে যখন খুঁজে আমার কাছে, আমার বেডরুমেই এসে পড়েছো।দ্যাট মিন্স.. আমার শর্ত এক্স্যাপ্ট করতেও রাজি?”

#চলবে🥀
|কী শর্ত দেবে বলে মনে হয় রিডার্স?আর যে শর্ত দেয় তা কী বর্ণ মেনে নেবে?
ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। রেসপন্স করার অনুরোধ!|
#আমার_বোবাফুল(৩৮.২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা

|৩৮–শেষার্ধ|
সকালের রাঁধা-বাড়া তুহফা করলো আধ-পাকা হাতে।বড় মামি দায়িত্ব দিয়ে গেছে তার উপর, বাড়িতে যে কয়জন আছে সকলকে দেখে রাখতে। আশ্চর্য জনক ভাবে, কালেভদ্রে যেই তুহফা কিচেনে পা রাখতো –মামিদের অবর্তমানে এই কয়দিনে যেনো পাক্কা সাংসারিক মেয়ে বনে গেছে।গায়ে অ্যাপ্রন।প্যান থেকে খুন্তি তুলে তাতে লেগে থাকা ঝুলে এক আঙ্গুল ডুবিয়ে পরপর মুখে পুরে চুষে নিলো।চোখ পাকিয়ে যায় পরমূহুর্তেই।ভেতরের চিত্তটা যেন বেহায়ার মতো নিজের রান্নায় নিজেই প্রসংশা করে উঠেলো তুহফার।

‘ তুফ.. তুফ.. এটায় সামান্য কোন খাবার নয় রে,এটাতো অমৃত!তোর হাতের তৈরি!’

গত কয়েকদিন কিচেনে না ঢুকলে সেতো জানতেই পারতো না – রান্নার হাত তার এতো ভালো।বুক চিরে স্বস্তির শ্বাস বেরিয়ে আসে। কৌতুহলে আরেকটু ঝুল মুখে দিয়ে টেস্ট করলো। ঠোঁটে ফোঁটে উচ্ছ্বাস মিশ্রিত প্রসস্থ তৃপ্তময় হাসি।সরষে ইলিশ রান্না করেছে আজ।বড় মামা খেয়েদেয়ে প্রসংশা না করে যাবে কই?অভ্র,নানু প্রসংশায় পঞ্চমুখ না হলে যেচে পড়েই আদায় করে নেবে।

চাপা হাসির শব্দে পাশে ফিরে রামসাকে দেখতে পেলো তুহফা। রান্নায় হেল্প করছিল এতোক্ষণ।তার কার্যকলাপে হাসছে নির্ঘাত।রামসার হাসিতে তুহফা খানিক লজ্জাবোধ করে ।তা লুকিয়ে খুন্তিতে আরেকটু ঝুল নিয়ে এগিয়ে দিলো,

“ চেক করে দেখো.. লবন ঠিকঠাক হয়েছে কী না?”

অভ্র এলো কিচেনে। ইলিশের সুঘ্রাণ তাকে এতো দূর টেনে হিঁচড়ে এনেছে ড্রয়িং রুম থেকে। ঠোঁট চোকা করে হেলেদুলে এদিক ওদিক দেখে বলল,

“ আজ সকালে কী আইটেম থাকছে?”
“ পান্তা-ইলিশ !”

প্রগাঢ় ভ্রু কুঁচকায় অভ্র, “ রিয়্যালি?”

“ অফকোর্স।বাঙাল হয়েছো কিন্তু ঐতিহ্য ভুলে যাবে এমন তো হয় না ভাইয়া!”

সন্দিহান চোখে সেকেন্ড কয়েক ভ্রু-ট্রু গুটিয়ে চেয়ে থেকে অভ্র শেলফে হেলান দিয়ে অবজ্ঞার স্বরে বলল হুট করে,

“ গতরাতে নির্ঘাত দ্বিগুণ ভাত রয়ে গেছে।ফেলে দিতে বুক কাঁপছিলো দেখে এখন বেচারি ট্রেডিশনের উপর জোরজবরদস্তি চাপিয়ে দিয়ে আসল কাহিনী ধামাচাপা দিতে চাইছো।”

গলা খাঁকারি দিয়ে তুহফা ক্ষ্যাপাটে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে । সত্যিটা কীভাবে ধরে ফেলল ছেলেটা? জলন্ত কন্ঠে শুধায়,

“ ভুল ইনফরমেশন ছড়িয়ে মানুষকে বিব্রত করবি না অভ্র।মার খাবি বলে দিলাম!”

অভ্র থোড়াই গায়ে মাখালো না।ছোট ছোট চোখে ভ্রু নাচালো কেবল।তুহফা গম্ভীর গলায় বলে,

“ কেনো এসেছিস এখানে?”

গার্ডেনে হানিফা বেগম আর আযাদ সাহেব বসে।অভ্রকে কফি, এবং গার্ডেনে চা দিয়ে এলো তুহফা।মামিদের অবর্তমানে সকলের প্রয়োজনের দিকে দেখভাল রাখতে আলসেমি আসছে না কেনো যেনো। বরং ভালোই লাগে –রান্না করতে,ঘরের আসবাব স্তরে স্তরে সেটিং করে রাখতে।নরম কাপড়ের সাহায্যে ড্রয়িং রুমের কাঁচের একিউরিয়াম খানা সযত্নে মুছে দেয় সে।সুখের জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু কারো দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না অবধি।কথাও বলে না। সর্বক্ষণ নাকি ছোট মামিকে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজে রেখেছে।থেকে থেকে কেঁপে উঠে,নিরবে কেঁদে যায়। ট্রমা কাটিয়ে আগের মতো কবে স্বাভাবিক হবে কে জানে!
.
বারোটা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও মেয়ে দরজা খুলছে না।সামিয়ার চিন্তা সীমা ছাড়ালো।মিশ্মি কখনো এতোক্ষণ ঘুমে বিমগ্ন থাকে না।রোজ ভোরেই উঠে মুশফিক হায়দার সমেত জগিংয়ে যায়।সামিয়া ভেবে নিলো আজ হয়তো ঘুমের ঘোরে পড়ে গেছে মেয়েটা। দেরিতে উঠবে। তবে, এতোটাও দেরি করার মেয়ে মিশ্মি নয়। মুশফিক হায়দার অফিসে গিয়েছেন। সামিয়া মিশ্মির রুমের সামনে আসে হন্তদন্ত।

‘‘ মিশ্মি.. মামণি”

দরজায় টোকা দেয়,বার কয়েক ডাকে। ওপাশ থেকে তবু সাড়া আসে না। সামিয়া ফের চেষ্টা করে দ্বোর ধাক্কিয়ে,

“ মিশ্মি ভেতরে আছো?শুনতে পাচ্ছো আমাকে!”

এবারেও নিরুত্তর।জবাব এলো না কোন রকম।সামিয়া ঘামতে শুরু করে অস্থিরতায়।বুকটা যেনো আচমকাই মুচড়ে উঠে।তার স্পষ্ট মনে আছে কাল রাত মিশ্মি বাড়িতেই ছিল নিজের কক্ষে। ডাইনিংয়ে আসেনি, অনলাইন থেকে কীসব অর্ডার করে সেসব নিয়ে রুমের দ্বোর আটকেছিল সন্ধ্যা নামার পরেই।

নাম্বারে ডায়াল করে মিশ্মির।ফোন সুইচ অফ!সামিয়ার পা টলে উঠে। ডুপ্লিকেট চাবি এনে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে ধীর পায়ে।বেডে ফোন পড়ে আছে।চাদর হালকা কুঁকড়া।বাথ রুম থেকে পানি পড়ার আওয়াজ ভেসে আসে ঝরঝর।সামিয়া বুক ভরে শ্বাস ছাড়লো।এই মেয়েটাও না..! ভদ্রমহিলা হেঁটে গেলো।মিশ্মির নাম ধরে ডেকে দরজায় টোকা দিতেই মেলে হা হয়ে যায় সেটা।

টাইলস্ ফ্লোরে ঝরনার পানি নিরলস ঝড়ে পড়ে ঝরঝর।মিশ্মি ছিল না সেখানে।সামিয়া ঢোক গিলে রুম জুড়ে নজর হাঁটিয়ে নেয়। ড্রেসিং টেবিলের উপর একটা ফোল্ট করা কাগজ।

“ হাই মম ড্যাড!
আমাকে কোথাও না পেয়ে অস্থির হচ্ছো ?কোন প্রয়োজন নেই।আজ রাতের ফ্লাইটে আমি চলে যাচ্ছি এই কচুর দেশ ছেড়ে অনেক দূরে।মা,বাবা আত্মীয়-স্বজন নিয়ে আদিখ্যেতা করা লাইফটা আর ভালো লাগে না।জাস্ট বোরিং লাগে। এবার একটু একা একাই জীবনটা উপভোগ করতে চাই!ওহ,বলে রাখি –আমি একজনকে ভালোবাসি।তার সাথেই যাচ্ছি।যদি কখনো তোমাদের প্রতি মায়া টান অনুভব হয়।কোন একদিন ফিরবো।বাই..”

মুশফিক হায়দার ছুটে ছুটে এলেন স্ত্রীর তলবে।মিশ্মির রেখে যাওয়া চিঠি পড়ে দুজন থম মেরে রইলো খানিক্ষণ। কোথায় গেছে, কার সাথে গেছে, কিছুই উল্লেখ নেই!

থানায় ডায়রি করেন মুশফিক।পুরো শহর পুলিশ নিয়ে খুঁজে বেড়িয়েছেন। এয়ার পোর্টে গিয়ে ফিরে এলেন নিরাশ হয়ে।মিশ্মি কোন দেশে পাড়ি দিয়েছে তা না জানলে উনারা কোন সাহায্য করতে পারবেন না।
.
আরো একটি রাত নেমে এলো ভুবনে।খুব সূচালো তীর্যক দৃষ্টি মেলে লক্ষ্য করলে দেখা যায় পিচঢালা রাস্তায় একটি বাইক ছুটে চলেছে ঝড়ের বেগে। বাইকে অবস্থানরত লোকটির সুশ্রী দেখার সৌভাগ্য কারো নেই বোধহয়।কিলার লুকে সম্পূর্ণ কালো আবরণ আবরিত। হেলমেটের মধ্য থেকে অল্পবিস্তর দৃশ্যমান চোখ দুটোও রোদ চশমার আড়ালে।কী চমকপ্রদ দৃশ্য!রাতের বেলায় কেউ রোদ চশমা পড়ে?হয়তো!

বাইকটি শহরের বাইরে বেরোনোর নির্জন একটি রাস্তা ধরেছে এবার।

শহর থেকে কিছু দূর এক চোখের অফুরন্ত রাজ্যের মতো প্রকাণ্ড জঙ্গলের অবস্থান। মানুষের বসবাস সেখানে নেহায়েৎ নেই বললেই চলে।কখনো-সখনো বিশাল দেহি হাতি বেরিয়ে এসে মানুষকে আতকে দেয়,ফের যে পথে এসেছে নিরবে সেই পথ ধরে চলে যায়।আগে হাতির বসবাস ছিল কী না জানা নেই,তবে গত কয়েক বছর ধরে হাতি চোখে পড়ে। স্থানীয় মানুষ ভয়ে জঙ্গলের অভিমুখে হতেও ভয় পায়।

বাইকার জঙ্গলের সামনে এসে থেমে গেলো হঠাৎ। একটু সময় নিয়ে, স্থির বসে অতঃপর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নির্দ্বিধায়, নিসংকোচে।

চাঁদের স্নিগ্ধ আলো গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে মাটিতে পড়ে সরু চিকন এক অদ্ভুত ছায়া তৈরি করছে।হিরহির বাতাসে ভেসে আসছে পাতার শুকনো শব্দ। জঙ্গলের বুকে যেদিকে নজর ছিটাও অন্ধকার এবং অন্ধকার।একটা পেঁচা ডেকে উঠে আচমকা।অবরুদ্ধ রাত্রি জমানো নিঃসঙ্গ জঙ্গলে যেকোনো দূর্বল মনে ভীতি জাগানিয়া সেই ডাক।

জঙ্গলের গভীরে নতুন গজানো অথবা পুরানো গাছের সমাহার। প্রতিটি ডালপালা আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আপন আপন প্রার্থনায় মত্ত। ঠিক মধ্যভাগে চারটি উঁচু গাছ।তার নিচে দুটো প্রদীপের মতো আলো জ্বলছে।সরু আলো দুটো সম্মুখের অনেক দূর প্রখর ছড়িয়ে দেয়।সেই আলোর অনুসরণ করে এগিয়ে যায় বাইকার।

দু আলোর মধ্যভাগে বাইক থামতেই দু’পাশ হতে পুরুষালী সমন্বিত দৃঢ় গম্ভীর স্বর ভেসে আসে,

“ Chief ”

আরো দুটো বাইক।এতে অবস্থানরত অজ্ঞাত লোকদের মুখ ভেঙে ছুটে এলো শব্দটি।তাদের চীফ একবার ডানে পরপর বায়ে চেয়ে কী যেন সংকেত দিলো। এরপর তিনটি বাইক প্রদীপের মতো আলো নিয়ে ছুটে চললো আরো গভীরে।

শ্যাওলা ধরা পরিত্যক্ত দুতলা বিশিষ্ট একটি বাড়ি। গাছের ভীড়ে বসবাস করতে করতে নিজের গায়েও সেই কালচে সবুজ রঙ মেখে নিয়েছে। দোরগোড়ায় একটি ক্ষীণ হলদেটে বাল্ব জ্বলে।দোরে’র দু’পাশে দুটো শক্তপোক্ত গড়নের পুরুষ।কালো পোশাকধারী।মুখটাও দেখার সুযোগ নেই। শুধু চোখ-ই দেখা যায়।বাইকার তিনজন উপস্থিত হতেই তারা মধ্যজনকে সম্মান প্রদর্শন করে বুক ফুলিয়ে দুহাত পিছু মুড়ে এক যোগে বলে উঠে,

“ Chief”

চোখের ইশারায় চীফ তাদের বিসর্জিত সম্মানটুকু গ্রহন করে ভেতরে গেলো জুতোর গটগট আওয়াজ তুলে।বাইরে থেকে বাড়িটি যেমন পুরনো, ভাঙাচোরা আর ভয়ঙ্কর দেখতে লাগে –ভেতরে তার উল্টো। চারপাশের দেয়ালে সবুজ কাঁচ।তাতে সামনে দাঁড়ানো সকলের প্রতিবিম্ব ফোঁটে উঠে। ফ্লোরে টাইলস।সিলিংয়ে সবুজ কাঁচ।

বাড়িটির নকশা অদ্ভুত।নিচ তলায় চার দেয়ালে ঘেরা প্রকাণ্ড একটাই রুম।কোন জানালা নেই,নেই অন্য রুমের ব্যবস্থা।উপর তলার অবস্থা ঠাহর করা যায় না।

তারা মোট পাঁচজন। সবার ড্রেসআপ একই রকমের।’Chief’ গিয়ে কক্ষের ঠিক মধ্যস্থানে একটি চারকোনা টাইলসের উপর জুতো সমেত পা রেখে পুণরায় পিছিয়ে এলো নিঃশব্দে। বিষ্ময়কর একটি ঘটনা ঘটে গেলো তখনই। টাইলস সেকেন্ড দুয়েক পরেই খানিক নিচে দেবে গিয়ে সন্তর্পণে থাই গ্লাসের মতো সরে খুলে গেলো। নিচে গমনের সুড়ঙ্গ তৈরি করে দিলো যেনো।

পেছনে চারজনের মধ্যে একজন ছোট এক রিমোট প্রেস করতেই সিলিং থেকে ক্ষুদ্র একটি কাঁচের অংশ কাভার্ড খুলার মতো খুলে গিয়ে উপর থেকে রাবারের মতো অথচ রাবার নয় –এমন একটি জিনিস নেমে এলো।Chief সেটার আগা হাতের কব্জিতে বেঁধে হঠাৎ টাইলস সরে যাওয়া জায়গা ডুব দিলো যেনো। ভেতরে অন্ধকারে কোথাও হারিয়ে গেলো।বাকি চারজন অনূভুতি শূন্য পরষ্পরের দিকে চেয়ে একে একে তারাও সেই দড়ির মতো জিনিসটি আঁকড়ে নিচে নেমে খানিক পর।

রোবটের ন্যায় দুহাত পিছু মুড়ে চারজন দাঁড়িয়ে রয় স্থির, নির্ভীক। চোখে কোন আবেগ নেই, অনূভুতির বড্ড অভাব।’Chief’ দু ধাপ আগে বাড়িয়ে পকেটে হাত পুরে সামনে তাকায়।একটি মেয়ে বসে আছে চেয়ারে। ঘুমন্ত বলা যাবে না, বেহুঁশ বলা যেতে পারে।তার সামনে একটা টেবিলে। মেয়েটির দুহাতে টেবিলে স্থির এবং হাতের কব্জিতে টেবিলে লাগায়ো চুড়ির মতো জিনিসটায় আটকে।চাইলেও হাত নড়াচড়া করার উপায় নেই।Chief ডান হাতটা পাশে প্রসারিত করে ধরতেই পেছন থেকে কেউ হাতে পানির মগ তুলে দিলো।

কয়েকবার পানির ঝামটা মুখে থুবড়ে পড়ার পর মেয়েটি নিভু নিভু চোখ মেলে।সে জানে না নিজের অবস্থান। সামনে কী হবে,কী হতে চলেছে তাও অবগত নয়। অস্ফুট স্বরে বললো বিড়বিড়িয়ে,

“ আই উইল নট স্প্যার ইউ্যু আসফিয়ান বর্ণ!তোমায় ছাড়বো না।”

#চলবে🦋

| আপনারা একটু রেসপন্স করবেন রিডার্স।এতে লেখার আগ্রহ বাড়ে। ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। ভালোবাসা প্রত্যেককে ❤️|

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here