#আমার_বোবাফুল(৩৯)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
মিশ্মি ঢোক গিলল শুষ্ক। অদূরের দেয়াল থেকে চারের অধিক চোখ একত্রে হুট করে পলক মেলে তাকালো যেনো। হ্যাঁ, চোখ-ই কিন্তু কোন মানব দেহে লাগোয়া নয়।দেয়ালে বিশাল বিশাল স্ক্রিনে ধূসর কালো মণির কী ভয়ানক শীতল চাহনি।রেটিনায় ইংরেজি লেটারে কিছু একটা লেখা। দূর থেকে খেয়াল করা দুঃসাধ্য।সেকেন্ড কয়েক নজর স্থির রাখলে মাথা চক্কর দিয়ে উঠে।মিশ্মি দ্রুত চোখ নামিয়ে চতুর্দিকে ক্ষীণ দৃষ্টি বুলায়। স্ক্রিনের মৃদু আলোতে অপর পাশের দেয়ালে সেঁটে থাকা তলোয়ার, স্নাইপার রাইফেল চোখে পড়ে।
মিশ্মির মনে হলো স্ক্রিনের ভাসা চোখটি সে আগেও বহুবার দেখেছে। তড়িৎ সামনে তাকাতেই কাঙ্ক্ষিত চোখের দেখা মেলে।
“ বর্ণ তুমি!”
“ হাউ ইজ দ্যা সাপ্রাইজ?”
ধূর্ত চক্ষুদ্বয় হাসে পুরুষটির।হাতের কালো গ্লাভস খুলে পুণরায় হাতে পড়ছে।তার সম্পূর্ণ নজর সেখানেই।চোখ তুলে তাকালো না অব্দি।
দূর্বল শরীর। কপালের ডান কোণ কেটে গেছে অল্প। র’ক্ত শুকিয়ে জমাটবদ্ধ।মিশ্মির গলা শুকিয়ে আসে,পানির তেষ্টা পায়। নড়াচড়া করতেই বুঝতে পারে তার হাত-পা চলছে না; কোথাও আটকে। নিজের অবস্থান নিশ্চিত করে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলো রমণী,
“ এসব কী হচ্ছে বর্ণ?মজা করছো আমার সাথে!”
মিশ্মি সর্বশক্তি প্রয়োগে চেঁচালেও বর্ণ’র কর্ণকৌঠরে সফট টিউনের মতো পৌঁছালো।তবু কপাল কুঁচকে কানে হাত রেখে মেকি গলায় বলে হেঁয়ালি সুরে,
“ লোয়্যার ইউ্যুর ভয়েস। আই কান্ট্ ট্যলারেট সো মাচ নয়েস!”
বলার ফাঁকে মুখোশ সরিয়ে টেবিলে রেখে দিলো ছুঁড়ে ফেলার মতো।মিশ্মির হাতের কাছেই। টেবিলটা দেখতে অদ্ভুত।গাছের নয়, কাঁচেরও নয়।গ্রাম্য বাড়িতে লোহার বঁটি ধারালো করতে যেই ভারী কষকষে বস্তু ব্যাবহার করা হয় অনেকটা তেমনই দেখতে।কেমন যেনো ইলেক্ট্রিক। শুধু টেবিল নয় পুরো কক্ষের যা কিছু দেখা যায় সবকিছুই মনে হয় ইলেকট্রিক ছোঁয়া আছে।যদিও কক্ষটা তেমন আলোকিত নয়।
মিশ্মি যেখানে বসা –তার মাথার উপর বরাবর বড়সড় একটা নিয়ন লাইট।ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাচ্ছে।খানিক আগে নীলচে রঙে মেতেছিল; এখন সাদা।রশ্মি এতোই ক্ষীণ যে কেবল সামনের বর্ণকেই চোখে পড়ছে।খানিক দূরত্বে দণ্ডায়মান চার রোবট সম মানুষগুলিকে দেখা যায় না। দেয়ালের স্ক্রিন থেকে ভেসে আসা আলোর ঝলকে একটু আধটু অনুমান করা যায়।
“ আমায় এভাবে আটকে রাখার মানে কী?চাইছোটা কী তুমি?”
“ নাথিং স্প্যাশাল।ব্যাস, তোমার প্রাণটাই!”
“ হোয়াট?”
আচমকা ঝুঁকে এলো বর্ণ।ঠোঁট কামড়ে মিশ্মির হাতের দিকে চাইলো। টেবিলের সাথে যুক্ত চুড়ির মতো হ্যান্ডকাফে মেয়েটার হাত বন্দী।ডান হাতের চুড়ির উপরিভাগে ছোট্ট এক সবুজ বাটন।বাঁ হাতেরটা লাল।
“ চলো একটা খেলা খেলি!”
মিশ্মির সম্মতি ছাড়াই একতরফা খেলা শুরু করে দিলো বর্ণ।লাল ব্যাটনটায় আলতো চাপ দিয়ে দু কদম পিছু হটে এলো।
বিদ্যুৎ শখ পেলে যেমন পা হতে মাথার তালু অব্দি ঝটকা লেগে থরথর কেঁপে উঠে তেমনি কম্পিত হয় মিশ্মির শরীর।এ যেনো মৃত্যু যন্ত্রনা।মুখ ফুটে স্বর ভেঙে কোন শব্দ বের হয়না।চোখ উল্টে আসে।
বর্ণ পকেটে হাত পুরে নিশ্চুপ, অকুতোভয় দাঁড়িয়ে রয়। চোখে একটা তৃপ্তি।একটু আনন্দ।
পেছনে বুকে হাত ভাঁজ করে স্থির দাঁড়িয়ে চারজনের মধ্যে ঠিক ডান পাশের জন।মুখোশ উন্মোচন করলে আড়াল থেকে একটি মুখশ্রী দৃশ্যমান হবে। তার নাম –সিয়াম। সেদিন ফকির বেশে মিশ্মির সাথে মিছে মিছি বিয়ে হয়েছিল যার। তখনকার সিয়াম ছিল খানিক রসিক।তবে এই সিয়াম স্তব্ধ, নিষ্প্রভ, অনুভূতি শূন্য।ঠিক যেনো কাঠ পুতুল।চীফ যা আদেশ করবে তাই তাই-ই করবে।
সবুজ বাটনে চাপ দিলে মিশ্মির শরীর শান্ত হয়। তেজ হারিয়ে ঝরে পড়া ফুলের মতো নেতিয়ে টেবিলে জীর্ণ মাথা এলিয়ে দিতেই চুলগুলো আগুনের ছেঁকা লাগার মতো কিছু গোড়া থেকে, কিছু মধ্যভাগ থেকে খসে পড়তে নেয়।সে দ্রুত মাথা উঁচিয়ে পেলে।যা টেবিলে খসে পড়েছিল –সব মূহুর্তেই ছাই হয়ে নিমেষেই ফেরার হয়ে গেলো বর্ণ টেবিলের কোণের কিছু একটা করতেই।মাথা এলিয়ে দিতে ইচ্ছে হলেও ভয়ে এমনটা করলো না মিশ্মি। ধীরস্থির চোখে বর্ণ’র দিকে তাকায়। ঠোঁট টেনে ছেড়ে বলে ক্লান্ত হার মানা গলায়,
“ পানি..!”
খানি খাওয়ানো হলো। জন্মের তৃষ্ণার্তের মতন ঢকঢক করে গিলছিল সে।মুখের উপর কে বোতল থেকে পানি ছুড়েছে দেখার সময় হয়নি। থুতনি ছুঁইয়ে কিছুটা গলাও ভিজে গেছে।একটু আরাম পেলো দেহে।
“ শর্তের কথা বলছিলে তখন,রাইট? ইউ্যু ক্যান টেল নাউ!”
“ শর্ত?ক্_কোন শর্ত টর্ত নেই আমার। প্লিজ বাঁধন খুলে দাও!”
“ স্ট্রেইঞ্জ!”
অবাক হওয়ার ভান করে চোখ পাকিয়ে বয়ে’স দের দিকে চেয়ে পুণরায় মিশ্মির দিকে ঘুরে গেলো অধর বাঁকানো হাসি হেসে,
“ এই সুন্দর ভুবনে তোমায় শ্বাস নেওয়ার জন্য সাতটি দিন ছেড়ে দিয়েছিলাম।তুমি আমায় নয় বরং আমিই তোমায় শর্তটা সগর্বে বলার হিম্মত যোগাতে সাত সাতটা দিন অপেক্ষা করিয়েছি অথচ আজকের দিনে এসে বলছো কোন শর্ত টর্ত নেই?একটু ট্রেইলার উপভোগ করেই এমন অবস্থা.. পিকচার তো আভি বাকি হ্যাঁয় সুইটি!”
“ বর্ণ..
“ ফুলকে কেনো টার্গেট করা হয়েছে?এ্যাজ আই থিংক..তোমার শত্রুতা বলো বা ক্ষোভ সব আমার সাথে!”
দাঁতে দাঁত চিপে মিশ্মি,
“ তোমার উপরেও এ্যাটাক হয়েছিল দুবার কিন্তু..
“ হ্যাঁ?”
মেয়েটা বিষ্ময়ে বাকহারা হয়ে চোখ তুলে পরপর। মস্তিষ্কে কিছু একটা হানা দিলো যেনো।চাপা স্বরে হঠাৎ বলে উঠে,
“ যারা তোমায় এ্যাটাক করতে নামতো তারাই আবার ফিরে গিয়ে নিজেদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে নিজেই নাকি নিজেকে শুট করে সুইসাইড করতো।ক _কী করতে তুমি তাদের সাথে?কে তুমি?”
বর্ণ এক লাফে টেবিলে বসে ভাবুক মুখে গালে হাত দেয়,
“ এ্যাটাক?আমার উপর? অথচ আমিই জানি না!”
ঘাড় ঘুরিয়ে চাইলো সে। চারজনের সমস্বর ভেসে আসে তখন,“ চীফ!”
তাদের স্বরে অব্যক্ত একটা ইঙ্গিত বহন করে।উত্তর পেয়ে যায় বর্ণ। তপ্ত শ্বাস ছেড়ে তীক্ষ্ণ চোখে মিশ্মির দিকে তাকায়। দৃষ্টি শীতল অথচ একরোখা,যার গহীনে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ উতলে পড়ছে যেমন। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো হাতে চাকু নিয়ে।মিশ্মি ঢোক গিলে।
“ ওয়াহ,মিমিহ বড্ড নাজুক তোমার হাতের আঙ্গুল ।লুক লাইক…
উপমা দিতে পারলো না।বেশ কোতুহলী গলায় বললো ফিসফিসিয়ে,
“ আমার আরেকটা খেলার কথা মনে পড়েছে।চলো শুরু করা যাক!”
হাতের পাতা থরথরিয়ে কাঁপতে থাকে; মিশ্মি চেয়েও গুটিয়ে নিতে পারে না।বর্ণ আঙুলের প্রতিটি ফাঁকে ফাঁকে চাকু একবার উপরে তুলছে তো একবার রাখছে টেবিলে।একটু টের-বেটের হলেই আঙুল কেটে দুভাগ যাওয়ার অধিক সম্ভাবনা।মিশ্মি একনাগাড়ে বলে যায় আতঙ্কিত গলায়,
“ ট্_ট্রাস্ট মি বর্ণ.. আমি কিছু করিনি।কেউ একজন এর পেছনে আছে আমি কেবল তাকে হেল্প করেছি!স_সে তোমায় দু-দুবার এ্যাটাক করে বিফলে গিয়ে আমার সাথে কন্টাক্ট করেছিল।রাগ ছিল তোমার প্রতি আমার।সেই ফকির ফকির বিয়েতে তুমি চাল উল্টে দিয়ে আমায় নিজের দিকটা পরিষ্কার করতে দাওনি মিডিয়ার কাছে।আজো লোকে আমায় নিয়ে মজা করে।আমি এর শোধ তুলতে চেয়েছিলাম।ওই লোকের জানার ছিল ভাই বোনের মধ্যে তোমার সবচেয়ে আপন কে।আ্_আমি তোমার সাথে মিশে যতটুকু বুঝতে পেরেছি ফুলকে.. আহ..!”
শ্বাস রোধ করে চোখ খিচে নেয় মিশ্মি।চোয়াল কাঁপতে থাকে শীতা-ক্রান্তের মতোন।মধ্যমা আঙ্গুলের মাঝ বরাবর চাকু লেগেছে। হাত থেকে আঙুল আলাদা হতে আর একটুখানি বাকি। চামড়াটা কোনরকম লেগে আছে।গলগলিয়ে র/ক্ত বেরিয়ে টেবিলে লেপ্টে যায়। আশ্চর্য জনক ব্যাপার হলো –মিনিট দুয়েক পর রক্তগুলো স্বেচ্ছায় খসখসে টেবিলটা সেদ্ধ হওয়ার মতো ঝিনঝিন আওয়াজে চুষে নেয়। কিন্তু মিশ্মির কাটা আঙ্গুল থেকে র/ক্ত ক্ষরণ থামে না।চোখ ছাপিয়ে ঝরঝর অশ্রু গড়ায়। হুঁ হুঁ কেঁদে ফুঁপিয়ে উঠে সে।
“ দয়া করে আমায় যেতে দাও !”
কপাল গুটিয়ে বর্ণ বিরক্তিতে মাথা তুলে ,
“ ভিডিওতে দেখোনি ফুলও এভাবে হাত জোড় করে বলতে চেয়েছিল ‘প্লিজ আমায় যেতে দিন ’! তোমার ওই গুন্ডা পান্ডারা শুনেছিল বলে মনে হচ্ছিল না এনজয়েবল সিনটা দেখে। তোমার কী মনে হয় –ওরা ছেড়ে দিয়েছিল?”
মনে পড়ার মতো বলে,
“ ওহ হ্যাঁ, দিয়েছিল তো..মাই ফল্ট।যখন ব্রেভ গার্ল ফুল ছাদ থেকে জাম্প করে তখন নিশ্চয়ই মা!রা গেছে ভেবে পালিয়েছিল!ঠিক বলিনি?”
কান্নার দাপটে সর্বাঙ্গ কাঁপে তার, প্রত্যুত্তরে বললো ক্রন্দনরত গলায়,
“ ওরা আমার লোক ছিল না বর্ণ।আমি শুধু ওই লোকটার সঙ্গ দিয়েছি।আর.. ভ্_ভিডিও টা করিয়েছি। বিশ্বাস করো…
“ লোকটা কে ছিল?”
“ আমি জানি না।গলার স্বর শুনেছি কয়েকবার।নামটাও বলেনি কখনো!”
“ হ্যাক.”
নামটা নেওয়ার সাথে সাথেই পেছনের একজন কক্ষের অন্যপ্রান্তে গেল। আবার ফিরে এসে বর্ণ দের সামনে এলো হাতে হেডফোন এবং ল্যাপটপ নিয়ে।
মিশ্মির কানে হেডফোন পড়িয়ে দেয়া হয়। ‘হ্যাক.’ সম্বোধিত ব্যাক্তি ল্যাপটপে একের পর এক সাউন্ড প্লে করে।কারো কন্ঠের সাথে মিলছে না।একসময় ফট করে চোখ মেলে ঘনঘন মাথা ঝাঁকিয়ে অশ্রুসিক্ত দৃষ্টিতে খুশি খুশি বলে উঠলো মিশ্মি,
“ ইয়েস.. এমন স্বারই ছিল লোকটার।”
বর্ণ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাকিয়ে আচমকা হেসে ফেলে ঠোঁট বাঁকিয়ে।পাশের জনের দিকে বুড়ো আঙুল তাক করে বললো,
“ কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে তোমায় শনাক্ত করেছে–ও! ক্রেডিট দিও তাকে।আর.. তোমার পাঠানো ভিডিওতে যেই ভদ্রমহিলার আওয়াজ ছিল তোমার কমরেড, তার খবর নিয়েছো তো একবার? সুস্থ আছে তো বেচারি মেয়েটা?”
“ আনিকা!কী হয়েছে ওর?”
বর্ণ যাকে ‘হ্যাক.’ সম্বোধন করলো তার আসল নাম জিসান!জিসান নিজের দিক থেকে ঘুরিয়ে ল্যাপটপ স্ক্রিন মিশ্মির দিকে ফিরিয়ে দেয়।দেখা যায় –আনিকা হসপিটালের বেডে।হাতে পায়ে , মুখে ব্যান্ডেজে মুড়ানো।
সাহসে ধরে না মিশ্মির। ভয়ার্ত গলায় জানতে চায় তবু,
“ কী হয়েছে ওর?”
“ ডক্টর তো বলছে সিঁড়িতে স্লিপ খেয়েছে। কিন্তু সিক্রেট অন্যকিছু।যেটা আমি আর তোমার কমরেড এর মাঝে সীমাবদ্ধ। তোমার নামটাও সে-ই বলেছে, জানো? মেয়েটা নিজে হসপিটালের বেডে শুয়ার সাথে সাথে তোমায়ও ফাঁসিয়ে দিলো। ভাবতে পারো কী বিশ্বস্ত তোমার…
জিসানের দিকে ইঙ্গিত পূর্ণ চাহনি দিলো বোধহয়।সে লম্বা কদমে দেয়ালের স্ক্রিনে ভাসা একটি চোখের সামনে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারা করতেই পর্দা থেকে চোখ সরে গিয়ে আলাদা আলাদা ভাবে চারটি ভিডিও চলতে শুরু করে।
বর্ণ মিশ্মিকে বলে,
“মেইক এ্যাঁ চয়েস!”
ভিডিও-গুলো-তে কারো বুকে চড়ে খুবই নৃ!শংস ভাবে কলিজা কেড়ে নিচ্ছে ছুরিকাঘাতে,কারো চোখ উপড়ে ফেলা হচ্ছে,কারো হাত পা খন্ড বি-খণ্ড করা হচ্ছে কসাইয়ের মতো।গা গুলিয়ে বমি আসতে চাইলো মিশ্মির।
“ প্_প্লিজ প্লিজ স্টপ!”
বর্ণ’র চোখে নিষ্ঠুরতার স্ফুরণ উতলে পড়লেও ঠোঁট উল্টায় বাচ্চাদের মতো।মন খারাপি ভঙ্গিতে ফিসফিসিয়ে বললো,
“ ওঔ.. পছন্দ হয়নি।ইউনিক কিছু ট্রাই করবে?কোন ব্যাপার না। আমি আছি তো!”
মিশ্মির ফ্যাকাশে মুখশ্রী।কী করে বের হবে এখান থেকে? কোথায় আছে সে?
“ ওয়ার্ন করা হয়েছিল আমার ফ্যামিলির দিকে চোখ তুলে তাকানোর প্রতিদানে তোমায় এই সস্তার শরীর জ্বালিয়ে দেয়া হবে।
হুঙ্কার দিয়ে উঠে বর্ণ,“ বলা হয়েছিল? হ্যাঁ কী না?”
মিশ্মি ঝেঁকে উঠে ভয়ে। চোখের পানি ছেড়ে উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়। হ্যাঁ,বলা হয়েছে।তিন বার সাবধান করেছিল বর্ণ’।সে আমলে নেয়নি। ভেবেছিল বর্ণ কখনো তাকে আঁচ ও করতে পারবে না। অনুমানও করতে পারবে না সুখের এই অবস্থার পেছনে তার সম্মতি,তার হাত ছিল।
নাহ, কোনমতে এই গারদ থেকে বের হতে হবে তাকে। তারপর শক্তপোক্ত ভাবে বর্ণকে ধরবে –যা কিছু হয়ে যাকনা কেনো বর্ণকে দ্বিগুণ কিছু ফিরিয়ে দিতে হবে। ছলনার আশ্রয় নিলো এই পর্যায়ে।ঠিক ছলনা নয়,এই মূহুর্তে কথাটি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকেই বেরিয়ে এলো,
“ আর কোনদিন তোমার আগেপিছে আসবো না বর্ণ।এই দেশ ছেড়ে বহু দূরে চলে যাবো।এবারের মতো ছেড়ে করে দাও প্লিজ।”
“ অথচ এখানে যে একবার চলে আসে দ্বিতীয় বার সে ফিরে যেতে পারে না।”
বলার ফাঁকে কোপ বসাতেই কাঁটা আঙুল হাত ছেড়ে আলাদা হয়ে যায়।মিশ্মি চেঁচায়, চিৎকার করে, ক্ষমা চায় কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।
•
জঙ্গল থেকে পাঁচটি বাইক একসাথে শহরের রাস্তা ধরে বের হয়। দু’পাশে দুজন দুজন করে,মাঝে বর্ণ’র বাইক। রোবটিক খোলস রেখে বের হয় সিয়াম। বাঁ পায়ে বর্ণ’র দিকে ইঙ্গিত করে বললো মিছে ক্ষিপ্র গলায়,
“ ওকে কেউ প্লাস মাইনাস করে ডোবায় ছুঁড়ে মেরে আমার দিলটা ঠান্ডা কর রে!”
“ তোর পাকা ধানে মই-টা এবারেও কী ও-ই চালিয়েছে?”
জিসান বলল মজার ছলে। বর্ণ’র কাছে পাত্তা পায় না সিয়ামের বুকভরা দুঃখ কষ্ট।তার ক্ষুরধার দৃষ্টি সামনে। দ্রুতলয়ে এঁকেবেঁকে চলছে বাইক। কথাবার্তা বলতে হচ্ছে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে,
“ তা নয়তো কী! আমার ক্রাশ ছিল বেচারি!”
ভীষণ আফসোসের কন্ঠ তার।তামিম প্রশ্ন করে,
“ কে? রকস্টার সাহেবের মিমিহ?”
“ ইয়েস ব্রো.. কিন্তু দুঃখটা ম্লান হচ্ছে ধীরে ধীরে– সে আমার আরেক ক্রাশকে বিধ্বস্ত করার পেছনে ছিল তাই!”
আচমকা থেমে যায় বর্ণ।থামলো বাকিরাও।সিয়াম বাইক সহ থুবড়ে পড়তে গিয়েও বেঁচে গেলো।ফট করে বর্ণ ঘাড় বাঁকিয়ে চাইতেই ঘাবড়ে গিয়ে বলে,
“ তুই কিন্তু এখন ‘চীফ’ ক্যারেক্টারে নেই দোস্ত। হুটহাট এভাবে দেখবি না।ভয় লাগে..!”
“ আরেক ক্রাশকে বিধ্বস্ত?”
“ ওও.. শুনে ফেলেছো?তোমার ফুলকে ইঙ্গিত করা হয়নি!
কন্ঠ মণিতে হাত রেখে,“ ওকে তো আমি বোনের চোখে দেখি!”
মিথ্যে কথাটি বলেই ফেললো সিয়াম।বর্ণ নিশ্চুপ চেয়ে রয় পাঁচ সেকেন্ড,দশ সেকেন্ড, ত্রিশ সেকেন্ড,আরো বেশি সেকেন্ড।একসময় বাইক স্টার্ট করে সামনে এগুতেই আটকে রাখা শ্বাস টুকু সিয়াম নির্বিঘ্নে ছাড়ে। আরিয়ান পিঠ চাপড়াতেই সেও ছুটে তাল মিলিয়ে।
•
বর্ণ বাড়ি গেলো না । ফ্লাটেই উঠলো।সময় চারটে বেজে দুই মিনিট। ভোরের সূচনা হতে আর কিছুটা বাকি। সারাদিন ফোন ছিল সুইচ অফ। বেডে উপুড় হয়ে শুয়ে ফোন অন করতেই নোটিফিকেশনের হিড়িক পড়ে গেলো প্রথম দুই মিনিট।এই তার পার্সোনাল ফোন।আইজা, মাহির,তামিজ শিকদার,আযাদ শিকদার সহ আরো অনেকের প্রায় দেড় শতাধিক কলস্।
ইনজেকশন পুশ করেছে।তাতে ঘুমের মেডিসিন মেশানো। উপরন্তু, এক্সট্রা স্লিপিং পিল নিয়েছে অতএব চোখ ছাপিয়ে ঘুম আসবে এখুনি।বর্ণ কল ব্যাক করলো না কাউকে। এতো গুলো কল সংখ্যা দেখে ঈষৎ অবাক হয়েছিল বোধকরি।
.
আইজা ঢাকা ছেড়ে যাবার কথা ভাবলেও সুখের জ্ঞান ফিরতে দেখে মত পাল্টে নিলেন।তুহফার সাথে কথা হয়েছে। মেয়েটা সেদিকে সামলে নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।
কেবিনে দু’টো বেড।একটাতে সাইমা আর আইজা বসে।অপরটাতে সুখকে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছেন রুবাইয়্যাত। ঠোঁটের কোণে লেগে গেলে সময় সময় আঁচল দিয়ে মুছে দিচ্ছেন মেয়ের গাল।সুখ চেয়ে রয় নিষ্প্রাণ। দৃষ্টিতে কোণ চঞ্চলতা নেই,কোন প্রফুল্লতা নেই।সব যেনো থমকে গেছে।বেডের পাশে ডক্টর মেহরাব এবং আঁচল দাঁড়িয়ে।সুখকে অবজার্ভ করতে এসেছেন।
ধুপধাপ শব্দের সাথে দরজা মেলে কেউ প্রবেশ করলো হঠাৎ। অবচেতনেই কৌতুহল বশত সকলের চোখ যায় সেদিকে। বর্ণ এসেছে। পথিমধ্যেই থেমে গেলো হঠাৎ। চোখ র/ক্তিম।সারা রাস্তা ঘুমে বিভোর ছিল –মাহিরকে জ্বালা দিয়ে।ভোর রাতেই দুজন রওনা হয়েছিল। একপ্রকার মাহিরকে ধমকে ধামকে ঘুম থেকে তুলে এনেছে বর্ণ।
“ ইয়েয়ে.. বর্ণ এসে গেছে! বর্ণ দ্যাখো দ্যাখো কে উঠেছে ঘুম থেকে!”
“ আসার সময় হলো তোর?ফোন রেখে কোথায় যাস বলতো?কাল থেকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না..”
আম্মুর কথা,নূরার আনন্দ মাখা বার্তা বর্ণ’র কর্ণকৌঠরে পৌঁছালো কী না কে জানে।সে একদৃষ্টে সুখের দিকে চেয়েই এক পা দু’পা এগিয়ে আসে। হৃদযন্ত্রটা বুঝি একটুর জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়ে পরপরই ধুকপুক করছে অনিয়ন্ত্রিত হারে। বর্ণ’র সূচালো দৃষ্টি লক্ষ্য করছে –সে যতো এগুচ্ছে ততোই সুখের দূর্বল শরীর সেঁটে যাচ্ছে রুবাইয়্যাতের সাথে।
“ ফুল”
খানিক ঝুঁকে মাথার হাত বাড়াতে নিলেই রুবাইয়্যাতকে ঝাপ্টে ধরে সুখ।থরথর কেঁপে অস্ফুট স্বরে নিজস্ব ভাষায়। আঁচলের আড়ালে মুখ ঢেকে হাতের ইশারায় সরে যেতে তাড়া দেয়।বর্ণ বোধহয় বাক হারালো।স্থির চেয়ে পুণরায় মৃদু হেসে ফুলকে ছুঁতে চাইলে আরো ঝাপ্টে ধরে রুবাইয়্যাতকে। কেঁদে দেয় নিরবে।
“ মিস্টার বর্ণ.. আপনি একটু সরে দাঁড়াবেন প্লিজ!”
বর্ণ শুনলো মেহরাবের বাণী।মানলো ও। স্বেচ্ছায় গুনে গুনে তিন কদম দূরে সরে গেলো।
“ রিল্যাক্স ব্রেভ গার্ল!কেউ কিচ্ছু করবে না তোমায়। শান্ত হও।দেখো সবাই আছে এখানে।কেউ দুঃখ দেবে না আর।তাকাও আমার দিকে।”
সুখের মাথায় হাত বুলিয়ে একনাগাড়ে বলে গেলো মেহরাব।বর্ণ তাকিয়ে চোখ স্থির রেখে মণিদ্বয় ঘুরিয়ে একবার সুখের দিকে, আরেকবার মেহরাব কে দেখছে। অতঃপর আরেকবার পরখ করছে মেহরাবের হাতকে।
কিছু সময় পর সুখ শান্ত হয়ে আসে।চোখ তুলে মেহরাবকে দেখে। আড়চোখে বর্ণকেও দেখে নেয় ভয়ার্ত।
“ গুড গার্ল!”
মেহরাব আরো দুচার কথা বলে সুখকে হাসাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে পুণরায় বলল হাত বাড়িয়ে,
“ উইল ইউ্যু বি মাই ফ্রেন্ড,ফুল?”
দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে হাত মুঠোবন্দী করে নেয় বর্ণ। দৃষ্টির হেরফের না করে মেহরাবের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে রয়।ফুল নামে সম্বোধন করলো ডক্টর?যা আজ পর্যন্ত কাউকে সম্বোধনের অনুমতি সে দেয়নি।বর্ণ সুখকে দেখে ‘ মেয়েটা কী এক্স্যাপ্ট করবে?’!বর্ণ হয়তো মনে মনে হেসেছিল এটা ভেবে যে –ফুল স্বেচ্ছায় কখনো ছেলেদের সাথে কথোপকথন করা তো দূর, চোখ তুলে তাকানোর ইচ্ছেও পোষণ করেনি। সেখান ফ্রেন্ডশিপ গ্রহণ করা দুঃস্বপ্ন অথচ.. সুখ বিহ্বল চোখে ফ্যালফ্যাল চেয়ে একবার বর্ণকে দেখে খানিক পর ধীরে ধীরে ডান হাতটা তুলে মেহরাবের সাথে হ্যান্ডশেক করে ফ্রেন্ডশিপ গ্রহণ করে নিলো।নূরা খুশিতে লাফিয়ে উঠে তার আর সুখের ফ্রেন্ডশিপ একই জনের সাথে হয়েছে বিধায়।
বর্ণ শক্ত চোয়ালে দেখে গেছে দুজনের মেলানো হাতের দিকে। বুকের বাঁ পাশে কিছু একটা পুড়ছিল সেসময়।সুখ কী সেই পোড়া গন্ধটা উপলব্ধি করতে পেরেছিল?
#চলবে🍂
|#নোটঃ-বর্ণ মাফিয়া(অপরাধ চক্র, হ!ত্যা,মাদক প্রচারক…) নয়। মাফিয়া যা গ্যাংস্টার ও তাই। তাদের সাথে বর্ণ’র গ্যাং-য়ের একটাই মিল
–হ!ত্যা!তবে ওই ঘরটায় তাদেরই আপ্যায়ন করা হয় যারা দূর্বল (নিরপরাধ) দের উপর পীড়ন করে,বুক উঁচিয়ে গর্বের সাথে খারাপ কাজ করে যায়। আইনের আগে তাদের ওই ঘরে শাস্তি দেয়া হয়।এর যথেষ্ট কারণও আছে। এবং ওর মঞ্জিল ছুঁতে এসবের প্রয়োজনীয়তা আছে। থ্যাঙ্কস সব্বাইকে এবং ভালোবাসা 🤍🦋
ভুল ক্রুটি ক্ষমা করবেন।|

