#আমার_বোবাফুল(৪০.১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
|৪০–প্রথমার্ধ|
পাথর অনুরূপ শক্ত চোয়ালে থমকে বসে ছিল বর্ণ।দুপাটি দাঁতে দাঁত খিল ধরেছে যেমন। কপালের নীলচে কালো রগ ফেঁপে উঠে সময় সময়। পরিচ্ছন্ন করিডোরে তখন গুটি কয়েক লোকের আনাগোনা। শ্বাস প্রশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ আশেপাশে ভেসে বেড়ায়।বস তার বেজায় ক্ষেপে আছে সেটা বুঝতে বাকি রইলো না মাহিরের। আড়চোখে দেখে চুপটি করে দুহাত ভাঁজ করে খানিক ঘেঁষে দাঁড়াল সে। কিছু বলতে নেবে মনস্থির করেও বলা হয় না।বর্ণ ফিসফিসিয়ে উঠে চটে যাওয়া মেজাজ দেখিয়ে,
“ তুই দেখেছিস মাহির.. ওই ডক্টর ফুলকে স্পর্শ করেছে? ফ্রেন্ডশিপ পেতেছ নাকী!আর ফুল.. বেয়াদব টা কীভাবে হাতে হাত মিলিয়েছে দেখেছিস তুই?”
ইতস্তত করছিল ছেলেটা।ঘাড়ে আলতো হাত বুলিয়ে মিনমিন করে,
“ নো বস!আমি তো তখন ওখানে উপস্থিত ছিলাম না।তাই জেলাস জেলাস সিনটা মিস করে গেছি।একটা স্যাড সং!”
শেষ বাক্যটি আফসোস মিশ্রিত নিম্ন আওয়াজে বললেও বর্ণ’র কানে সূচের মতো বিঁধে গেলো ঠিকই।সময় ব্যয় হয়না –বাজপাখি শিকার ধরার মতো খপ করে মাহিরের কলার টেনে মুখোমুখি নিয়ে এলো। অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বুক ধড়ফড়ায়; মাহির ঢোক গিলে বর্ণ’র চোখের দিকে তাকাতেই শ্বাসরোধ অনুভূত হয়।ভুল শব্দচয়ন করে রাগের বহর বাড়িয়ে দিয়েছে বুঝি বসের?
“ তুই বলতে চাস আ্_আমি জেলাস?”
মাহির মণিদ্বয় এধার ওধার ঘুরায়। কিছু কিছু জোড়া দৃষ্টি ঘুরেফিরে তাদের দিকে তাকাচ্ছে।মান সম্মান দফারফা।জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে মাথা নেড়ে একবার ‘হ্যাঁ’ একবার ‘না’ ইঙ্গিত করে বলল বিজ্ঞের মতো,
“ আপনি যে সেদিন বললেন সুখের প্রেমে পড়েছেন? চোখের সামনে প্রেমিকা’র সাথে পর-পুরুষের সখ্যতা গড়ে উঠলে বুকের ভেতর যেই অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ উতলে পড়া ফিলিংস হয় তাকে জেলাস-ই বলে,বস!”
ছুঁড়ে ফেলার মতন বর্ণ তার কলার ছেড়ে দেয়। কঠোর দৃষ্টি বজায় রেখে দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে বলে,
“ জেলাসের সংজ্ঞা জানতে চেয়েছি আমি? চোখের সামনে থেকে বহিষ্কার হ্ –গেট লস্ট!”
•
কেবিন নম্বর -৩০৮। এখানে সুখের অবস্থান। মেয়েটা নিষ্প্রভ অনুভূতিতে চুপচাপ বসে। একদৃষ্টে বন্ধ জানালার বাইরে তাকিয়ে।টমিকে তার কোলে তুলে দিল নূরা –তাও যদি একটু হাসে।তবে সুখ হাসে না। জোরপূর্বক তাদের মন রক্ষার্থেও নয়। উল্টো মেহরাবের দিকে ভয়ে ভয়ে চেয়ে যথাসম্ভব নিজেকে গুটিয়ে রাখায় ব্যস্ত। রুবাইয়্যাত সহ আইজা ও সাইমা অপর বেডে বসেছেন।মেহরাবের কেনো যেনো ইচ্ছে করছিল না যেতে। উপরন্তু,নূরার উদ্দীপনা।তবে তাকে যেতে হবেই।টুল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো সে। মৃদু হেসে নূরার চুল এলোমেলো করে চেয়ার চেষ্টা চালিয়ে বলে,
“ যাই তবে কিউটি পাই!”
অতঃপর সুখের দিকে কোমল দৃষ্টি ফেলে। চোখাচোখি হয় একঝলক।কী হিসেবে তখন মেহরাবের সাথে হাত মিলিয়েছিল সুখ জানে না। আপনাআপনি যেনো ঘটে গিয়েছে সব। পরবর্তীতে সে কিন্তু একটি বারও মেহরাবের ডাকে প্রত্যুত্তর করেনি। দুবার ঘাড় কাত করে শুষ্ক মুখে তার কথায় সায় জানিয়েছিল কেবল। মেহরাব মৃদু কন্ঠে বিদায় নেয়,
“ যাচ্ছি কিন্তু ফুল?”
নিরুত্তাপ সুখের মনে কেমন অনুভূতি হলো কে জানে তবে ছোট্ট নূরার ভালো লাগলো না।মনে হলো –ফুল ডাকটা শুধু বর্ণ’র মুখেই মানায়।বলল ঠোঁট উল্টেপাল্টে,
“ ফ্রেন্ড.. তুমি ওকে ফুল বলে ডাকবে না! সুখপাখি নামে নাহয় ডেকো!”
মেহরাব খানিক চোখ পাকিয়ে তাকায়।বোধকরি ‘সুখপাখি’ শব্দটিও বিড়বিড় করে সেসময়।
বিদায় নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে পড়ে হাত ঘড়িতে সময় দেখে নেয়। দুপুর ২টা বেজে ৪৫ মিনিট।বাড়ি ফিরতে হবে।আজ শুক্রবার।এই দিনের অর্ধেক সময় বোন এবং তার কলিজার একাংশ ছোট মিরাভের জন্য বরাদ্দ।এই দিনে তারা মামা-ভাগ্নি এবং ভাগ্নির শ্রদ্ধেয় মাম্মি মিলে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়।মিরাভের বাবা থেকেও নেই।এদেশ-ওদেশ পড়ে থাকে মাতৃভূমি ছেড়ে।দিন দুয়েক পর পর কল আসে ঘন্টা খানেকের জন্য।দেশের মাটিতে কবে পা রেখেছিল ইয়াত্তা নেই।
মেহরাব অন্যমনস্ক থাকায় দেখতে পেলো না একটি কলার খোসা সামনে থুবড়ে পড়েছে কোত্থেকে এসে।তার হাঁটার ফাঁকে নজর ছিল ঘড়িতে।স্টেথো. গলেতে ঝুলানো। হোয়াইট কোট ডান হাতের ভাঁজে।গুনে গুনে তিন কদম আগাতেই আচমকা কলার খোসায় পা পড়ে স্লিপ খেয়ে মুখ থুবড়ে অগ্রভাগে পড়ে যেতে ধরে; অথচ.. সৌভাগ্যবশত পড়ল না। একটা শক্তিশালী হাত তার পিঠের চেক শার্ট খামচে ধরে রেখেছে। পেছনে টান পড়ায় শার্টের দুটো বাটন ঠাস ঠাস ছিঁড়ে সিঁড়ি বেয়ে গড়াগড়ি খেয়ে কোথাও একটা চুপে গেলো।হাতের ফাইল,গলার স্টেথো সিঁড়ির মাঝখানে। মেহরাব ঝুঁকে আছে সিঁড়ির মুখোমুখি।পিঠ খামচে ধরা হাতটি সন্তর্পণে ছেড়ে দিলে নিঃসন্দেহে সিঁড়িতে গড়াগড়ি খেয়ে হাত,পা নাকসিড় ভেঙে…
“ আরে.. রে ডক্টর স্ট্যে সেইফ !না জানি কখন কী ঘটে যায়!”
সোজা করে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় তাকে। বুকে হাত চেপে প্রথমে জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস টানলো মেহরাব। বুকের স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে আতঙ্কে। নিজেকে সামলে পাশে চাইলো।পকেটে দুহাত পুরে ভ্রু গুটিয়ে আছে আসফিয়ান বর্ণ। দৃষ্টি কেমন যেনো। মাত্র যা ঘটে গেলো তা অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল।মেহরাব আশেপাশে চোখ হাঁটিয়ে উৎসুক দৃষ্টিদের দেখে নেয়।দুটো স্টাফ এগিয়ে আসে। হাতের ইশারায় তাদের কাছে আসতে নিষেধ করে বুঝিয়ে দেয় –সে ঠিক আছে!
“ একটা.. ছোট্ট থ্যাঙ্কস হবে না ডক্টর?এ্যাজ আই থিংক, আমার কাছে আপনার থ্যাঙ্কফুল হওয়া উচিত!”
একটুও লজ্জা বোধ করলো না বর্ণ কথাগুলো উচ্চারণ করতে। বরং সূচালো চক্ষুদ্বয়ে একটু তাচ্ছিল্য , খানিক অদৃশ্য খোঁচা প্রকাশ পাচ্ছিল। ঠোঁটে সূক্ষ্ম হাসির রেখা।
ডক্টর চকিতে তাকায়। আসলেই থ্যাঙ্কফুল হওয়া উচিত।নচেৎ, এতোক্ষণ শ্মশান ঘাট পরিদর্শন করে আসতে হতো। সৌজন্য হেসে মৃদু স্বরে কৃতজ্ঞ জানায়,
“ থ্যাঙ্কস অ্যা লট রকস্টার সাহেব। থ্যাঙ্কিউ ভেরি মাচ!”
•
গত দু’দিন যাবৎ সুখের সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে বর্ণ কিন্তু মেয়েটা নিশ্চুপ।তাকে দেখেই ভয়ে যে-কারো পিছু লুকিয়ে যাচ্ছে। এমনকি সব পুরুষদেরই সে ভয় পাচ্ছে।কথা বলছে না দেখেই হয়তো বর্ণ’র জেদ কিংবা আগ্রহ গগণচুম্বী হয়েছে ফুলের রেসপন্স পাওয়ার।আজ দুপুরে সুখকে ঘিরে রাখা তিন রমনীকে কৌশলে লাঞ্চ করতে অপর কেবিনে পাঠিয়ে সে একা কথা বলতে চেয়েছিল । অথচ.. অথচ মেয়েটা তার ছায়া দেখা মাত্রই ফুঁপিয়ে বেডের সাথে সেঁটে গিয়ে গুটিসুটি মেরে রইলো। বর্ণ এও লক্ষ্য করেছে সুখের শরীর অস্বাভাবিক কাঁপছিল তখন।বার বার হাত জোড় করে দূরে সরে যাওয়ার মিনতি করছিল।সেই মূহূর্তে থমকে গেলো বর্ণ। স্তব্ধ প্রায়।ফুল তাকে ভয় পাচ্ছে এই ভেবে যে –,সে হয়তো তাকে বাজে ভাবে ছুঁয়ে কলঙ্কিত করে দেবে। সেদিনের ওই জা/নোয়ার গুলোর সাথে তাকে গুলিয়ে ফেলছে নাতো ফুল?
বর্ণ তখনই বেরিয়ে আসে আইজাকে পাঠিয়ে দিয়ে। হসপিটাল থেকেও চলে এলো।তিন প্রয়োজনে আলাদা আলাদা তিনটি ফোন তার। তন্মধ্যে একটি গ্যাং পরিচালনা করার।ওই ফোনে কথা চলাকালীন সময়ে প্রতিটি সদস্য যেনো একেকটা রোবট। তাদের কথায় তখন ঘুনাক্ষরেও টের পাবার জো নেই –বাস্তব জীবনে এই পাঁচজনের অবিচ্ছিন্ন বন্ধুত্ব,বহুবছর ধরে। তাদের পরষ্পরের সাথে পরষ্পরের সম্বোধন ‘তুই’।
ল্যাবে ছিল জিসান। বর্তমানে ‘সিকিউরিটি কনসাল্টিং ফর্ম’ প্রতিষ্ঠানের ‘পেনিট্রেশন টেস্টার’ পদে আছে সে। কম্পিউটারে নজর ডুবিয়ে রাখার মাঝে ব্যাঘাত ঘটে হাঁটু ভাইব্রেশন করে উঠায়। চতুর মস্তিষ্ক চট করে বুঝে যায় ডাক এসেছে। ল্যাবে সে ছাড়া কারো উপস্থিতি নেই। জিসান দ্রুত তিন আঙুলে ফোন খানা বের না করেই ব্লুটুথ কানে গুঁজল।এক সংযোগের সাথে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে আরো তিনজন যুক্ত আছে। সকলের সমন্বিত স্বর বর্ণ’র কানে আসে,
“ চীফ”
রুঢ় স্বরে কিছু একটা আদেশ করতেই জিসান জবাব করে,
“ ইয়াহ চীফ!ইট উইল ব্যি কমপ্লিট ভেরি সুন!”
কথোপকথনের সমাপ্তি সেখানেই।বহু প্রচেষ্টায়ও রাগ কমছিল না বর্ণ’র। সময়ের সাথে সাথে বিক্ষিপ্ত হচ্ছিল উত্তপ্ত মস্তিষ্কের কণায় কণায়।হসপিটালের নিচে, রেস্টুরেন্টে গেলো।আজো ভয়ার্ত , আতঙ্কিত সুখকে শান্ত করতে মেহরাব উপস্থিত হয়েছিল।আসার পথে কানের গোড়ায় হিসহিসিয়ে তো বলেছে, ‘ ফুলকে যেনো টাচ না করা হয়’! তখন অবশ্য ডক্টরে জানতে চেয়েছিল ভীষণ অমায়িক স্বরে,-“ বোনকে খুব ভালোবাসেন বুঝি?”
ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে মস্তিষ্কে আগ্নেয়গিরি লাভা আঁচড়ে পড়ছে যেনো। রেস্টুরেন্টে চুপচাপ গো ধরে বসে রইলো সে। কিছু অর্ডার করলো না। মেজাজের দফারফা করতে হুট করে মেহরাব এসে হাজির হলো। অনুমতিও চাইলো সামনের চেয়ারে বসবে নাকি।বর্ণ জবাব দেয়নি। ভষ্ম করে দেয়ার মনোভাব নিয়ে চেয়ে থাকলো অনিমেষ।মেহরাব ততোক্ষণে নিরবতাকে সম্মতির লক্ষণ ভেবে আসন পেতে নিয়েছে।তবে বর্ণ’র চাহনি দেখে খানিক ভড়কালো।গলা খাঁকারি দিয়ে প্রশ্ন করে অল্পক্ষণ পরেও নজরের হেরফের না হওয়ায়,
“ রকস্টার সাহেব ,এ্যানি থিং রং? এভাবে তাকিয়ে আছেন যে?”
বর্ণ’র ভাবান্তর হলো কই?দৃঢ় চোয়ালে তাকিয়েই রইলো কঠোর দৃষ্টি ফেলে। টেবিলের কিনারা হাতের মুঠোয় এমনভাবে চেপে ধরলো যেনো গুঁড়িয়ে রেখে দিতে পারলেই তৃপ্তি মিটতো।দাঁতে দাঁত নিষ্পেষিত করে জবাব দিলো বর্ণ,
“ এক্সকিউস মি ডক্টর!এরা আমার চোখ। এদের মালিক আমি। যখন যেভাবে ইচ্ছে তাকাতে পারি! কৈফিয়ত দিতে হবে?”
#চলবে🍂
®তৃপ্তি এহসান নাওরা•
কৈফিয়ত দিতে হবে?
||ভুল ক্রুটি ক্ষমা দৃষ্টিতে দেখবেন। রেসপন্স করার অনুরোধ||

