#আমার_বোবাফুল(৪৪)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরা
বাহু ভেদ করে গু”লি বেরিয়ে গেছে বর্ণ’র।হালকা পোচ লেগেছে; ফলস্বরূপ গলগলিয়ে র-ক্ত ছুটছে ক্ষতস্থান থেকে। রি ভ ল বার তাক করা লোকটা এখন গ্যাংয়ের দু লোকের হাতে ব ন্দী। সজ্ঞানে যারা ছিল খানিক আগে তারাও ঢলে পড়েছে রাস্তার কোলে।টেনে হিঁচড়ে কোথাও একটা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের।
সিয়ামের কপালে কালো রঙের একটা পট্টি বাঁধা থাকে সবসময়; অকারণেই।সেটা খুলে বর্ণ’র বাহুতে বেঁধে দিল। র/ক্ত/ক্ষরণ খানিকটা রোধ করা গেছে তাতে।তবু ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে পড়ছে টকটকে লালচে খয়েরী তরল।সাদাটে জ্যাকেটে তা স্পষ্ট দেখা যায়।
এই যে, বর্ণ’র বাহু কে’টে র/ক্ত বেরুচ্ছে। নিশ্চয়ই ক্ষততে চিনচিনে অথবা ধারালো ব্যথা অনুভূত হওয়ার কথা; অথচ পুরুষটি নির্বিকার।তবে ক্ষণে ক্ষণে চোখ কুঁচকে ‘চ’ বাচক শব্দ উচ্চারণ করছে ক্ষতস্থানে হাত ঢলে।
জিসান ল্যাপটপ খুলে এগিয়ে এলো।বলল রোবটিক গলায়,
‘ জুসেফ জোয়ার্দার!যে আড়ালে থেকে তোকে উপরে পাঠাতে একের পর এক প্ল্যান কষছে।মিশ্মির সিলেক্ট করা ভয়েজটাও –তার।এই নিয়ে তিন তিনবার হামলা –সব ওর-ই চক্র!’
আসফিয়ান বর্ণ অনিহা প্রকাশ করে স্ক্রিনে নজর রাখল।সবে মাত্র জিসানের বলা লোকটাকে দেখা যাচ্ছে,সেই সাথে তার পুরো জানকারী।নিঃসন্দেহে জুসেফ জোয়ার্দার একজন সুদর্শন ব্যাক্তি।সিক্স প্যাক বডি।নীল মণি যুক্ত তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি।আরো আছে চতুর মস্তিষ্ক।
ছদ্ম মনোভাবে মিছে-মিছি ভাবুক হয় বর্ণ।দু ভ্রু’র মধ্যভাগে তর্জনী ঘঁষে বলল,
‘ ওর সাথে আজো ফেইস টু ফেইস দেখা হয়নি একবারো।কলিজায় হাত দিলাম কখন?’
সিয়াম একনজর ভদ্রলোককে চোখ তুলে দেখে পুণরায় পিছু হাত মুড়ে দৃষ্টি অবনমিত রাখে। মনে মনে ‘ড্রামা কিং’ উপাধি দিয়ে মুখ ভেংচি দিল কী না বুঝা দায়।জিসান ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে জবাব দেয়,
‘ ফিউ মান্থ এগো, ফিফটি ফোর ক্রোর টাকার ব্যাঙ্ক একাউন্ট হ্যাক করেছিল আমাদের টিম।যার কিছু ভাগ দেশের বিভিন্ন এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রমে এবং বেসরকারি স্কুল, কলেজে সহ আরো কিছু প্রতিষ্ঠানে ডুনেট করা হয়েছে।
দেশের সীমান্ত থেকে দু’জাহাজে মোট নিরানব্বই জন নারী ভিনদেশে পাচার করার আগে ক্যাপ্টেনের টিম প্রটেক্ট করে তাদের আপনজনদের কাছে ফিরিয়ে দেয়।এতেও প্রায় কোটি কোটি টাকার লোকসান। এগুলোকে কী কলিজায় হাত দেয়া বলে না?’
বলা বাহুল্য, ক্যাপ্টেন শব্দটি জিসান আরিয়ানের উদ্দেশ্যে বলেছে। বাংলাদেশ আর্মিতে ক্যাপ্টেন পদে রয়েছে আরিয়ান।
রূপালী নিয়ন আলোয় বাইকে হেলান দিয়ে ভ্রু কুঁচকে বন্দী লোকটার আপাদমস্তক পর্যবেক্ষণ করল।বেচারা’র সঙ্গী বাকি এগারো জন বর্তমানে নিরুদ্দেশ বলা চলে।কে জানে কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের!
হুট করে সোজা দাঁড়িয়ে গেল বর্ণ।ধীর পায়ে এগিয়ে গেল লোকটার উদ্দেশ্য। ভয় পাচ্ছিল সে বর্ণ’কে এগুতে দেখে। এতোক্ষণে তার ধারনা নেওয়া শেষ –এই রকস্টার কোনো সাধারণ মানুষ নয়।এর পিছু আরো কঠিন এক পরিচয় লুকিয়ে আছে।যা আম পাবলিক এখনো অবগত নয়।
বর্ণ’র হাত বুকের দিকে এগুতে দেখে চোখ খিচে নিলো লোকটা। পরবর্তীতে শরীরে আঘাত অনুভব না হতেই আবার চোখ মেলল। তার পড়নের শার্ট দুদিকে ছিঁড়ে ফাঁক করে বোতামের মতো জিনিসটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে লাগে বর্ণ।এটাকে ‘স্পাই ক্যামেরা’ বলে।ওপারে একজন ব্যক্তি লাইভে আছে। মুন্না ভাই নাম তার!বর্ণ কীভাবে প্রতিবার বেঁচে যায় আজ সরাসরি দেখতে চেয়েছিল।তবে সে এই মুহূর্তে বোধহয় স্তব্ধ; বাকশূণ্য।বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে চোখের সামনে ক্যামেরা খানা তুলে ধরে বলল হেঁয়ালি গলায় মৃদু অভিমান মিশিয়ে,
‘ কোনো এক কালে কতো ভালো দোস্ত ছিলাম আমরা।সব ভুলে এভাবে এই অধমকে ফিল্ড থেকে আউট করে দিতে চাস?ছিহ্, শেইম অন ইউ!খুব অভিমান করেছি আমি।
একটু থেমে হিসহিসিয়ে বলে, ‘সি ইউ সুন!’
কথা শেষ হতেই পায়ের নিচে ক্যামেরা পিষ্ট করে পুণরায় বাইকে এসে বসে হাতের ইশারায় লোকটাকে নিয়ে যেতে ইঙ্গিত দেয়।
‘ এখন কোথায় আছে ও?’ –স্বর গম্ভীর হলো। জিসান ল্যাপটপ কিবোর্ড বার কয়েক প্রেস করে জবাব দেয়,
‘ মুন্না ভাই বর্তমানে ইতালিতে অবস্থান করছে!’
‘ একটা প্রশ্ন!’
সিয়াম বলল বাঁ হাতের তর্জনী তুলে।কেউ প্রত্যুত্তর করেনি। কেবল নজর তার পানে নিবদ্ধ করেছে ধীরস্থির।সে জানতে চায়,
‘ এসবের পেছনে যে চীফ ছিল তা মুন্না ভাই কীভাবে জানলো?এই ইনফর্মেশন তো আড়ালে থাকার কথা!’
জিসান জবাব দেয়,
‘ ব্যাংক একাউন্ট কে বা কারা হ্যাক করেছে এখনো জানে না ভদ্রলোক।তবে এটা জানতে পেরেছে যে –নারী পাচারে ব্যর্থ হওয়ায় পেছনে কার হাত রয়েছে!’
‘ আর এই ইনফর্মেশনটা ও কিভাবে পেলো?’
জিসান ঠোঁট এলিয়ে মৃদু হাসলো, ‘ স্বয়ং আসফিয়ান বর্ণ দিয়েছে!’
•
সুখ এখনো জেগে আছে।রাত বাজে ১টা।আজ সারাবেলা খোশমেজাজে কেটেছে তার। মিটিমিটি হাসিতে সবার সাথে প্রাণখোলে আলাপ জমিয়েছে খানিক পূর্বেও।যে যার শুবার ঘরে।ড্রয়িং স্পেসে এই মূহুর্তে সে ছাড়া দ্বিতীয় কেউ উপস্থিত নেই।আব্বুকে সার্প্রাইজ দেবে বলে এতোক্ষণ জেগে থাকা।তুহফা, অভ্র কারণটা জানতে চেয়েছে বার কয়েক। কিন্তু সুখ প্রথমে সার্প্রাইজটা আব্বুকেই দেবে।আম্মু ছিল পাশে। কিছু মনে পড়ায় রুমে গিয়েছে।
কলিং বেলের আওয়াজ কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই ছুটলো সুখ।আব্বু এসেছে নির্ঘাত।মিনিট দুয়েক আগেও এসএমএস-এ কথা হয়েছে।আব্বু বলেছে ‘বাড়ির নিকটেই এসে পৌঁছেছেন তিনি। ’ ব্যাস,আর কিছুক্ষণ।
ঠোঁটে হাসি টেনে মেইন ডোর খুলতেই সুখ স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রয়। হতভম্ব দৃষ্টিপাত। প্রদীপের শেষ আলো নিভে আসার মতো ধীরে ধীরে অধর থেকে হাসি মিলিয়ে যায়।
বর্ণ দাঁড়িয়ে আছে।ঠিক দাঁড়িয়ে নয়; একহাত ভাঁজ করে সেথায় কপাল ঠেকিয়ে দরজায় হেলে আছে।দোর মেলার আওয়াজে মাথা তুলল বহু কষ্টে।চোখজোড়া নিভু নিভু।ডান বাহুর জ্যাকেট ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে র/ক্ত গড়িয়ে শুকিয়ে গেছে। আপনাআপনি দুকদম পিছিয়ে গেল সুখ।বর্ণ হেলেদুলে ভেতরে প্রবেশ করে সুখের মুখোমুখি হয়।তবে শরীরের ভারসাম্য বেশিক্ষণ স্থির রাখতে পারল না।একসময় হুট করেই সুখের কাঁধে কপাল রেখে ঢলে পড়ল। এক মূহুর্তের জন্য সুখের সর্বাঙ্গ কাঁপে বোধহয়।বর্ণ চোখ বুজেই মৃদু হাসে। অস্ফুট স্বরে বলে,
‘ ফ্_ফুল কষ্ট.. কষ্ট হচ্ছে আমার ।ভীষণ দুঃখ…’
থম মেরে রইলো সুখ।এতো এতো র/ক্ত দেখে হাত মঠোবদ্ধ করে ঢোক গিলে চোখ বুজে নিল হুটহাট।দূর্ঘটনার পর থেকে হেমো-ফোবিয়া তৈরি হয়েছে তার।
কেউ কাউকে আঁকড়ে ধরেনি।বর্ণ মৃদুমন্দ গোঙিয়ে কাঁধ থেকে মাথা তুলে।হাত উঠিয়ে জড়িয়ে যাওয়া গলায় বলে,
‘ স্_স্যরি!’
পাশ কাটিয়ে কদম বাড়াতে গেলে পুণরায় ঢলে পড়ে সুখের উপর।
‘ এসব কী?কী হয়েছে বর্ণ?’
তামিজ শিকদার এসে পৌঁছেছেন। দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করে গায়ে র/ক্ত দেখে বর্ণ’কে সোজা করতে চাইলো।
‘ মাই গড! জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে!’
বর্ণ বিড়বিড় করে– ‘ এ্যাভরিথিং ইজ অল রাইট! কিচ্ছু হয়নি!’
দৃশ্যপটে রুবাইয়্যাত ছুটে এলেন তামিজ সাহেবের কন্ঠ পেয়ে। ধারণা করা যায়, বর্ণ’র জ্বর ১০৪° ছাড়াবে।এতো রাতে কাউকে জাগালেন না তামিজ সাহেব। রুবাইয়্যাত এবং তিনি দু’পাশ থেকে ধরে লিফটে চড়ে ফিফ্থ ফ্লোরে নিয়ে গেলেন।
সুখ তখনো মেইন ডোরের সামনে থমকে দাঁড়িয়ে। থরথর কাঁপছিল শরীর ।
দোর খোলা অবস্থায় যে-কেউ তার কক্ষে প্রবেশ করতে পারলেও বন্ধ অবস্থায় বর্ণ’র ফিঙ্গার প্রিন্ট আর পাসওয়ার্ড লাগে।রুবাইয়্যাত ভেবেছিলেন বর্ণ’ ফিঙ্গার প্রিন্ট, পাসওয়ার্ড প্রয়োগ করে দোর খুলার অবস্থাতে নেই। কিন্তু তিনি ভুল প্রমাণিত হলেন।
শুষ্ক হেসে বালিশে মাথা গুঁজার সময়ও বর্ণ বারবার বিড়বিড় করছিল,
‘ ছাড়ো না চাচ্চু। ডোন্ট ওয়ারি,আমি ঠিক আছি!
মেয়ের খুঁজে তামিজ সাহেব নিচে নেমে এলেও সুখকে পেলেন না। কিঞ্চিৎ অবাক হলেন ভদ্রলোক।
‘ মা’টার হঠাৎ কী হলো রুবি? এতোক্ষণ তো অপেক্ষায় ছিল?’
রুবাইয়্যাত ভাবুক হয়ে জবাব করেন,
‘ হয়তো বেশী ঘুম পেয়েছে! এমনিতেও ওর এতো-রাত অব্দি জাগা বারণ ’
‘ তাই বলে সার্প্রাইজ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে এখন…’
বড্ড হতাশ হলেন।এতে যেনো রুবাইয়্যাত পৈশাচিক আনন্দ পেলেন। খুঁচিয়ে বললেন,
‘ সার্প্রাইজটা কী জানতে –সেই বেলা দু’টা থেকে মেয়ের মুখের দিকে হা করে চেয়ে আছি!কিন্তু না.. সার্প্রাইজ সে প্রথমে আব্বুকেই দেবে।এখন বুঝো অপেক্ষা কেমন লাগে!’
সন্দিহান গলায় জানতে চান, -‘ আচ্ছা, আমার মানিককে কোন মন্ত্রবলে বশ করেছো বলোতো?ইদানিং আব্বুর কথা-ই বেশী বেশী ভাবছে!’
‘ হিংসে হচ্ছে?’
‘ তো হবে না?’
পুণরায় বললেন, -‘ডাকবো?’
‘ না, ঘুমাক। বরং সকালেই শুনে নেবো।
•
এমনিতে গু”লির আ ঘা তের জের ধরে গায়ে জ্বর জ্বর ভাব।উপরন্তু –জিসান, সিয়ামের বাঁধা উপেক্ষা করে দু-প্যাক নিয়েছে। ফলস্বরূপ, নেশা চড়ে গেছিল।কাল রাত কীভাবে কী ঘটেছে বর্ণ’র ধ্যান ধারণায় নেই। ভোরে ঘুম ভেঙ্গে নিজেকে শিকদার নিবাসের নিজ কক্ষে আবিষ্কার করেছে এই যা!
কপালে গুরুতর ভাঁজ পড়ে তার। তীক্ষ্ণ ধারালো ধূসর কালো মণি চোখ জোড়া ছোট ছোট হয়ে আসে।বাহুতে ব্যান্ডেজ করা। অথচ বর্ণ’র স্পষ্ট মনে পড়ে কাল রাত সে ব্যান্ডেজ করেনি।সিয়াম করে দিতে চাওয়ায় উল্টো এক ঝাড়ি দিয়েছিল।তবে..
এই ব্যান্ডেজ কে বাঁধাল? গায়ে জ্বরটাও নেই। ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল কেউ?কে সে? ভিড়িয়ে রাখা দরজার দিকে ভ্রু গুটিয়ে চেয়ে রয় বর্ণ। আড়মোড়া ভাঙতে গিয়ে বুঝলো – ডান হাত ব্যথায় কাবু। বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে গু”লি ছুঁড়া লোকটাকে ইংলিশ বাংলার মিশ্রণে দুটো গালি দিল।
•
রান্না ঘরে তোড়জোড় চলছে বাড়ির দু কর্ত্রী’র। সাহায্যে আছে রামসা। তুহফা ডাইনিং-য়ে সব সেটিংস করছে।
ধবধবে সাদা হাতা কাটা গেঞ্জি পড়নে ছিল বর্ণ’র গায়ে।ক্ষত শুকিয়ে উঠেছে অনেকটা। গেঞ্জির হাতা’র’ তল থেকে অল্প একটু ব্যান্ডেজ চোখে পড়ে।গলেতে বরাবরের মতো হ্যাড ফোন। সিঁড়ি বেয়ে গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে বসল।আযাদ সাহেবকে দেখে সেকেন্ড কয়েক নজর স্থির রেখছিল। ভদ্রলোক গতকাল ফিরলেও তার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি।
একে একে তুহফা, অভ্র, রুস্মিতা,রাজবীর, হানিফা বেগম আসন পেতে বসলেন।নূরা নেই। এখনো ঘুমে বুদ।আইজা দুবার তুলে বাথরুম পর্যন্ত ছেড়ে এসেছে।তিনি বেরিয়ে আসতেই দু বারই পিলপিল পায়ে পুণরায় লেপের নিচে চাপা পড়ে ঘুমের কোলে দৃষ্টি হারিয়েছে।এই শীত শীত সকালে বেড ছেড়ে উঠতে মন চায় কার?
তামিজ সাহেব আশেপাশে সুখকে খুঁজে না পেয়ে ডাক ছুঁড়লেন,
‘ আমার ঘরের সুখপখি কই রে? আম্মা?’
হানিফা বেগম আজকাল সুখের উপর অসন্তুষ্ট দেখান না।তিনিও এদিক ওদিক নজর ছিটালেন।তুহফা উঠে দাঁড়ায়,
‘ গার্ডেনে পানি দিচ্ছে হয়তো।আমি ডেকে আনছি!’ –যেতে হয়নি তাকে।এর আগেই সুখ হাজির হল।তার পাশে নূরাও আছে টমিকে কোলে রেখে।বিচ্চুটা ঘুম ছেড়ে কখন উঠলো?আর সুখের কাছেই বা কখন গেল কে জানে!
খাবার মুখে তুলে আযাদ সাহেব বললেন,
‘ কোথাও যাচ্ছো?’
মাথা তুলে বর্ণ সামনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে।আযাদ সাহেবের পাশে সুখ।সাহসা নজর তার মুখশ্রীতে গিয়েই ঠেকল। ঠোঁটের কোণে টকটকে লাল সস লেগে রয়েছে; মেয়েটা নিরুত্তাপ।নজর প্লেটে স্থির।বর্ণ স্বল্প আওয়াজে জবাব করে,
‘ হুঁ!’
‘ দেশের বাহিরে নাকি?’ –প্রশ্নটি তামিজ সাহেব করেছেন।
‘হুঁ!’
কোন দেশ জানতে চাইল না কেউ-ই।আইজা ছেলের পাশে এসে দাঁড়ালেন। প্লেটে আরেকটি রুটি তুলে দিতে চাইলে বর্ণ না করে দেয়।আযাদ সাহেব পুণরায় বললেন,
‘ ফ্লাইট কখন?’
‘ ১৯ মে!’
আজ ১৭ মে। অর্থাৎ, করো দুদিন পর।তামিজ সাহেব জানতে চান,
‘ রওনা কখন দিবি?’
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে এতো ডিটেইলস জানতে চাইছে দেখে বর্ণ মাথা তুলল।
‘ আজই! উমঃ.. কিছু বলতে চাও?’
আব্বু -চাচ্চু উভয়ের দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়ল।তামিজ সাহেব একনজরে পুরো ডাইনিং স্পেস পরখ করে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেন,
‘ ডক্টর মেহরাবকে মনে আছে তোর?’
•
ডক্টর মেহরাবের হসপিটাল ছেড়েছুড়ে চলে এলেও পিছু ছাড়ানো যায়নি।নূরা পাকনির সাথে ফ্রেন্ডশিপ পাতানোর খাতিরে রোজ তাদের ফোনালাপ চলেছে।সুখের সাথেও কথা হতো কালেভদ্রে। এমনকি বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠা থেকে শুরু করে তামিজ কিংবা আযাদ সাহেবের সাথেও।পুরো পরিবারের সাথেই মোটামুটি সখ্যতা গড়ে উঠেছে মেহরাবের।
শুধু তাই নয়। ইতোপূর্বে মেহরাব এক’বার শিকদার নিবাসেও এসে বেড়িয়ে গেছে। বর্ণ’র চোখের সামনে ঘটেছে সব। দাঁতে দাঁত পিষ্ট করে সব হজম করে নিয়েছিল আসফিয়ান বর্ণ।এই ডক্টরের নাম উঠে আসলে অযথাই মস্তিষ্কে আগ্নেয়গিরি লাভা উতলে উঠে তার।মনে হয় শিরায় শিরায় র/ক্ত সঞ্চালনে সংঘর্ষ উঠেছে।এটা হিংসা-ঈর্ষা; না অন্যকিছু তা জানা নেই।তবে, ফুলের কাছাকাছি এই নামটাকে সে অণু পরিমাণ ও বরদাস্ত করতে পারে না!পারছে না!
তবে আজ ঘটনা প্রবাহ অন্যদিকে টার্ন নিতে চলছে। মেহরাব আসবে এবাড়ি,সাথে তার বোন মায়রা।
অতিথি আসবে। এমন এক অতিথি –যার প্রচেষ্টায় বাড়ির সুখ বাড়ি ফিরেছে সুস্থ হয়ে।তার যত্নে খুঁত রাখলে হবে?
মেহরাবের প্রতি শিকদারদের মায়া জন্মানোর অন্যতম কারণ হলো –তার বাবা-মা বেঁচে নেই। এবং তাদের মাঝে সে বাবা-মার ছায়া অনুভব করে।
নিবাসের বড় ছেলে এবং ভাই বোন সকলের শীর-এ অবস্থান আসফিয়ান বর্ণ’র।এই প্রথম অতিথি আসার ক্ষেত্রে বর্ণকে উপস্থিত থাকতে আবদার করেছেন আযাদ সাহেব।
অবশ্য আব্বুর আবদার কানের বাহিরে রেখেছে বর্ণ। ‘ডক্টর আসছে’ বাক্যটি কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই নিজের সিদ্ধান্ত সে তৎক্ষণাৎ পাল্টে নিয়েছিল ।আজ সে বাড়িতেই থাকবে। দরকার হলে ফ্লাইট মিস যাক!
#চলবে🥀

