#আমার_বোবাফুল(৫২.২)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
৫২–শেষার্ধ·
অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে জেসির।হাতের উল্টো পিঠে মুছেও কুল কিনারা পাচ্ছে না। হাইওয়ে রাস্তায় ফুলে রঙিন গাড়িটি ছুটছে সাঁই সাঁই।ক্ষণে ক্ষণে থামছে, আবার ছুটছে,একদিক থেকে অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে।মেহরাবের মুখ অত্যন্ত গম্ভীর।আড়চোখে একবার পাশের মেয়েটাকে দেখল। মায়া হলো বোধকরি। পকেট থেকে সফেদ রুমালটা বের করে না তাকিয়েই আলগোছে বাড়িয়ে দেয়।জেসি চমকালো অল্প। একবার অশ্রুসিক্ত চোখে ড্যাবড্যাব মেহরাবের দিকে চেয়ে, এরপর রুমালটা হাতে নিয়ে চোখ মুছল।একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ হয়তো।তবে কান্নার দাপটে বের হয়না মুখ ফুড়ে।
ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটছে তারা।এই শহর ছেড়ে বহুদূরে। যেখানে আর ভাইয়াকে পাবে না জেসি। ভাবতেই হুঁ হুঁ কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকিয়ে শ্বাসরোধ হয়ে আসতে চাইছে।হাতের ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল।ভাইয়ার কল। ইতোপূর্বে দশের অধিকবার কল দিয়েছে,কথাও হয়েছে প্রতিবার। রিসিভ করে কানে তুলল–
‘ ভ_ভাইয়া!’
ঠোঁট বেঁকিয়ে আহ্লাদে কেঁদে ফেলল।আকাশের দিকে চেয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে জিসান।বুকটা পুড়ছে বোনের জন্য।এই একমাত্র আপনজন, বুকের কলিজা বোন তার।যার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে একা একা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর সাথে লড়তে শিখেছিল সে চৌদ্দ বছর বয়সেই।আজ তার সর্বস্ব আদর-যত্নে পোষা খাঁচার পাখিটা অন্য কারো হাতে তুলে দিয়েছে সারাজীবনের জন্য। জিসান জানে মেহরাবকে ঠকানো হয়েছে। কিন্তু আসফিয়ান বর্ণ’র ভূমিকাও যে তার জীবনে অপরিসীম।ওই সাইকো, উম্মাদ রকস্টার তার জানের একাংশ বললেও সই।এর পেছনেও আছে বিরাট এক ইতিহাস।
জিসান বর্ণকে চোখ বুজে বিশ্বাস করে।সে বলেছে জেসির জীবনসঙ্গী হিসেবে মেহরাব পারফেক্ট।তার কাছে জেসি নিরাপদ এবং যত্নে থাকবে। এককথায় মেনে নিয়েছে জিসান।সে এটাও জানত যে একমাত্র সুখের জন্য ‘ চীফ অব দ্য আই গ্যাং এ.বি!যার এক ইশারায় গ্যাংয়ের হাজার হাজার সদস্য বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিতে দ্বিধাবোধ টুকুও করবে না।সেই চীফ কিছু মূহুর্তের জন্য নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছিল সাধারণ এক ডক্টরকে!
জিসান দীর্ঘ শ্বাস ছাড়ে।ক্ষীণ গলায় বলে,-‘ কাঁদে না বনু।ফোনটা মেহরাবকে দে!’
গম্ভীর মুখো মানুষটির দিকে তাকায় জেসি। সংকোচ লাগছে,তবু কাঁপা হাতে ফোনটা বাড়িয়ে দেয়,
‘ ভাইয়া কথা বলবে আপনার সাথে!’
•
অতিথিরা সব কমিউনিটি সেন্টার থেকে নিজেদের ঘরে ফিরে গেছে। নিকটাত্মীয় বলতে খালা মণিরা এবং একঝাঁক কাজিন মহলই রয়ে গেছে নিবাসে।সুখকে ড্রয়িং স্প্যাসে পুতুলের মতো বসিয়ে রাখা হয় গত আধঘন্টা সময় ধরে।বর্ণ বেরিয়ে গেছে কোথাও।আইজা একদমি মন খারাপ দেখায়নি সুখকে। মিষ্টি মুখ করিয়ে বাড়ির চৌকাঠ থেকে বরণ করে নিয়েছেন। ভদ্রমহিলা সবকিছুর উর্ধ্বে সুখকে রুবাইয়্যাতের মতোই স্নেহ করেন, সেই ছোট্ট থেকেই।এটা অস্বীকার করার মতো নয়।
সুখ চুপচাপ বসে।যেনো মাটির শান্ত খন্ডটি।তাতে প্রাণ আছে কিন্তু নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই।মন খারাপি নিয়ে গুনগুন করছে কাজিনগুলো।রুশ্মিতা তো বিষন্ন মনে বলেই ফেলল–
‘ বর্ণ ভাইয়া বিয়ে করেছে!তাও সুখকে!আমি এটা কিছুতেই মানতে পারছিনা। আমার ক্রাশ ছিল। কাজিনই যেহেতু বিয়ে করবে।আমি কী দোষ করেছি? আমাকে চোখে পড়ল না ভাইয়ার।’
ইবরাত মেঝ খালা মণির মেয়ে।সে বলল নাক কুঁচকে,
‘ ভাইয়ার সামনে গিয়ে বল।দুটো চড় খেয়ে দাঁড়ের গোড়া নড়বড়ে করে আয়।যা যা!’
‘ কী সাসপেন্স সিন ছিল ইয়ার। ইশশ্ কেউ যদি এভাবে আমার জন্য ঘোড়ায় চড়ে আসতো!’–মিহিকা বলল।
সুখের কানে অল্পবিস্তর আসছে তাদের কথোপকথন। আড়চোখে দেখল প্রত্যেককে। একেকজনের মুখাভঙ্গি একেকরকম।
হানিফা বেগম উপস্থিত আছেন। বৃদ্ধা আপাতত স্তব্ধ।মুখে রা নেই। হয়না কিছু, অল্প শোকে কাতর অধিক শোকে পাথর! আদরের নাতির করা আজকের কার্যকলাপে তিনি ঘোরে রয়েছেন এখনো।
তুহফা এসে দাঁড়াল দৃশ্যপটে।
‘ চল পাখি বাসর ঘরে। ভাইয়া এসে পড়বে এখুনি!’
বাসর ঘর! শব্দটা কর্ণকৌঠরে পৌঁছাতেই ধ্বক-ব্বক করে উঠে অন্তঃকরণ। হুলুস্থুল চোখ তুলে চাইল সুখ।তুহফার ঠোঁট জুড়ে দুষ্টু হাসি।
‘ নিজ হাতে ক্রাশের বাসর ঘর সাজিয়েছি। এখন বউকে রেখেও আসতে হবে। দরজাও ধরতে হবে।’–বিড়ড়িব করে রুশ্মিতা।হতাশার শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো।
‘ চলো গাইজ.. আজ ভাইয়ার পকেট ফাঁকা করবো।’
সুখ একদমই চাইছিল না বর্ণ’র রুমে যেতে। জোরপূর্বক নয়জন কাজিন চেপে চুপে ফুলে সাজানো বেডে বসিয়ে দিয়ে দ্বার আটকে দিয়ে,নিজেরা দ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
তর্ক বিতর্কের মনোভাব প্রত্যেকের। ভেবেছিল,তারা একটা অ্যামাউন্ট বলবে বর্ণ’র পক্ষ তার চেয়ে কম দেয়ার দাবি জানাবে।শুরু হবে তর্ক বিতর্ক। এরপর বরের দল কনের দলের কাছে হার মেনে নেবে। কিন্তু বাস্তবতা যে বড্ড নিষ্ঠুর।ঘটার সময় ঘটনা ঘটে গেল উল্টোটা।বর্ণ ক্রেডিট কার্ড ধরিয়ে দিল চুপচাপ।ধমকায় নি তবে, দ্বার ছেড়ে সরে দাঁড়াতে এমন ভাবে আদেশ ছুঁড়ল –বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহস হয়নি কারো।রুশ্মিতা এবার বুক ভরে শাস্তির শ্বাস ছেড়ে বলল,
‘ উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট।যাক বাবা,ভাইয়া আমাকে পছন্দ করেনি তার জন্য শুকরিয়া।সুখের কপালটা নির্ঘাত পুড়ল এমন জল্লাদের নজরে পড়ে।মেয়েরা যারা ‘আই লাভ রকস্টার’ বলে মুখে ফেনা তুলে তারা যদি আমাদের সাথে করা ভাইয়ার জল্লাদি আচরণগুলো দেখতো। নিঃসন্দেহে সালাম ঠুকে গুড বাই জানিয়ে বিদায় নিতো। নির্বোধ মেয়েরা..!’
•
সাজানো বেডে নব বধু বেশে সুখ।পড়নে গাঢ় খয়েরী রঙের একখানা সুন্দর ডিজাইনের ভারী শাড়ি।পা তুলে দুহাতে হাঁটু জড়িয়ে বসে।দরজা খোলার আওয়াজটা কানের গভীরে তীরের মতো বিঁধল। অন্তঃস্থলে যতোই তাণ্ডব চলুক উপরে উপরে সে যথেষ্ঠ স্ট্রং। ঢোক গিলে শাড়ি খামচে রেখে চুপ করে বসে রইল।হাতের তালু ঘামছ। অস্থিরতায় শরীর কাঁপছে মৃদুমন্দ।চেয়েও কাঁপুনি থামাতে না পেরে নিজের উপর নিজেই মহা বিরক্ত সুখ।
বর্ণ ধীরে এগিয়ে আসে। শেরোয়ানি পাল্টে ফেলেছিল সেই প্রথমেই।এসে বেডের কিনারে থামে।ঘরটা রূপালী আলোয় আলোকিত।বেডের চারপাশে ঝিকুন বাতি মিটমিট করছে রূপালি রঙা। রিমোট কন্ট্রোলার দিয়ে কক্ষের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে সুখের দিকে তাকায় একঝলক।
সালাম দিতে শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল সুখকে। কিন্তু সে চুপচাপ।এর অবশ্য কারণ আছে।সেটা অনুল্লেখ্য। ঈষৎ মাথা নামিয়ে আড়চোখে চায়।বর্ণ নিঃশব্দে হাতের ঘড়ি খুলছে।সেটা আবার বেড সাইট বক্সে রাখছে। শার্টের কলার টেনে ঠিক করছে, হাতা গুটাচ্ছে। অস্বস্তি ঢাকছে নাকি? রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’র ও অস্বস্তি হয় বুঝি? ব্যাপারটা আশ্চর্যতম এবং হাস্যকর!
আচমকা ঝুঁকে আসতেই সুখ পিছিয়ে গেল তড়িৎ।হাত তুলে থেমে যেতে বাধ্য করল বর্ণকে।
‘ ফাইনালি তুই এই আশিকের। এক্সাইটমেন্টে একটা হাগ ই তো করতে চাইছি!অন্যকিছুর আবদার তো এখনো রাখিনি!’ —ভীষণ হতাশ মিশ্রিত অবাক শুনায় তার কন্ঠ।
সুখ যারপরনাই হতভম্ব। ঠোঁট নেড়ে এবং হাতের ইশারায় বলল,
‘ একদম ছোঁয়ার কল্পনাও করবেন না আমায়!’
বর্ণ’র মুখটা ছোট হয়ে এলো,-‘ স্যরি সুইটহার্ট! ইতোমধ্যে আমি না বাসেরের প্ল্যানও সাজিয়ে ফেলেছি স্বপ্নে!’
চোখ খিচে দুহাত কিড়মিড়িয়ে অন্যত্র ফিরে গেল সুখ। নির্লজ্জের বাচ্চা।মুখে কিছুই আটকায় না আজকাল। সুপার গ্লু দিয়ে ঠোঁট দুটো আ-জীবনের জন্য বন্ধ করে দিতে পারলে ভালো হতো। বর্ণ ঠোঁটে ঠোঁট টিপে হাসল । ঘাড়ে হাত মালিশ করে,গলা খাঁকারি দিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে ভাবুক গলায় বলল–
‘ কে যেনো আজ সারা পথ আমার গলাটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখে ঘাড় ব্যথা করে দিয়েছে।তাকে খুঁজছি সেই কখন থেকে কিন্তু দেখা পাচ্ছি না।তুই কোথাও দেখেছিস তাকে?’
দাঁতে দাঁত চেপে চট করে সুখ ফিরল।কেনো যে লোকের প্ররোচনায় ঘোড়ায় চড়তে গেল!আর কেনই বা লোকটার গলা জড়িয়ে ধরতে গেল! আফসোস..
সুখকে চোখ রাঙিয়ে তাকাতে দেখে মিছে মিছি ভয়ে বুকে হাত চাপে বর্ণ,-‘ ওহ্ তুই দেখিসনি ,না? কোন ব্যাপার না।আমিই খোঁজে নেবো।’
সুখ জবাব দেয় না। কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, এরপর নজর সরিয়ে আনে।বর্ণ হাসে মৃদু।একটু সময় গড়ায়। হঠাৎ সুখের পা টেনে বেডের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসিয়ে দেয়। নিজেও দু হাঁটু গেড়ে বসল ফ্লোরে।ঘটনার আকস্মিকতায় নিষেধ করার সুযোগটাও পেল না সুখ। হতভম্ব দৃষ্টিপাত।
অদ্ভুত শীতল আর কোমল হয়ে আসে বর্ণ’র চাহনি। আলগোছে দুহাতে কান ধরে হুটহাট। মিহি গলায় বলে গেল,
‘ অনেক যন্ত্রনা দিয়েছি না তোকে?খুব দুঃখ দিয়েছি অন্তরে?সব ফিরিয়ে নিলাম।কারো সামনে মাথা নত করার স্বভাব আসফিয়ান বর্ণ’র ক্যারেক্টারে নেই, ছিল না।আজ নিয়মের বিপরীতে হেঁটে তোর সামনে নত স্বীকার করছি ফুল।হার মেনে নিলাম সেদিন তোর বলা শেষ কথাগুলোর কাছে।একটু ভালোবাস আমায়।কথা দিচ্ছি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো স্বামীটা হয়ে দেখাব।খুব আদরে জড়িয়ে নেবো তোকে।’
নিরবতা নেমে এলো কক্ষজুড়ে। সবকিছু স্থির। বাতাসের ছিটেফোঁটাও নেই। দেহ অবশ হয়ে আসছে সুখের। দৃষ্টিরা থমকেছে পাথরের মতোন। বুকের ভেতর সমুদ্রের গর্জে উঠা ঢেউ খেলে যায়। আচমকা ক্ষেপে গেল সে। ক্ষিপ্র মেজাজে বুঝাল–
‘ যা করেছেন তাতে ভালোবাসা দেখিনা আমি।জেদ, স্বার্থপরতা, ছিনিয়ে নেওয়া।’ একটু দম ছেড়ে-,‘ চিট করেছেন আপনি।আই হেইট ইউ্যু।মানি না এই বিয়ে।আর না মানব আপনাকে স্বামী হিসেবে।আই ওয়ান্ট ডিভোর্স!’
বর্ণ শীতল চোখে চেয়ে রয় অনেক্ষণ। মৃদু হাসি ফুটে অধরে।যেনো সুখের কথাগুলোর বিপরীত বাক্যই শুনেছে সে। খানিকটা নিকটে ঘেঁষে গেল।বলল শান্ত গলায় ,
‘পনেরো দিন… আজ থেকে ঠিক পনেরো দিন পর।তুই সেদিনের মতো অশ্রু ঝরিয়ে আমার কাছে ছুটে যাবি। আমার একটু ছোঁয়া পেতে এই বুকে মাথা রেখে ছটফট করবি ফুল। ইটস্ অ্যা চ্যালেঞ্জ।এর মানে দাঁড়ায়, আমার উপর রাগ-ক্ষোভ উগড়ে দিতে তোর হাতে সের্ফ পনেরো দিন সময় বাকি।ইয়্যুর টাইম স্ট্যার্ট নাও।অল দ্যা বেস্ট সুইটহার্ট!’
উঠে দাঁড়ায় পরপর।সুখ চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ তুলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।সে তাকাতেই প্রশ্ন করল ,
‘ যদি ছুটে না যাই,তো?’
বর্ণ হুট করে ঝুঁকে এলো সুখের মুখোমুখি।সুখ মাথা পিছিয়ে নিয়ে গেলে সেও আরো কাছাকাছি চলে যায়। পরষ্পরের অধর পাপড়ি ছুঁই ছুঁই। চোখে চোখ রেখে ধীমি আওয়াজে বলল,
‘ যাবি..’
‘ হতে পারে সেটা আপনার ভুল ধারণা!’
‘ উঁহু.. পরিস্থিতি এমন ক্রিয়েট হবে যে তুই ছুটবি নিজের অবস্থান ভুলে।এই শুকনো চোখ তখন অশ্রুভেজা হবে।’ –পরপর থেমে থেমে বলল,-‘তোর …ভালোবাসার… শপথ!’
{দ্র- কসম শুধু রবের নামে কাটা হয়।স্থান,কাল,পাত্র যা হোক পৃথিবীর কোন কিছুর নামে কসম খাওয়া শিরকের অন্তর্ভুক্ত।তাই এখানে শপথ মানে দোহাই, আস্থা, বিশ্বাস এর তৎসমতুল্য যা কিছু ভেবে নিতে পারেন)
অচিরেই বুকটা ধ্বক করে উঠে।সুখ নির্বাক চেয়ে থাকে থমকে যাওয়া চোখে। বর্ণ’র এই শীতল কন্ঠ তাকে ঈষৎ ভয় জাগাতে বাধ্য করল। ইতোপূর্বে বর্ণ বলেছিল তাকে নিজের করে দেবে যেকোন মূল্যে।সুখ বিশ্বাস করেনি,হেও করেছে। অথচ আজ! সত্যিই তাকে নিজের করে দেখিয়েছে বর্ণ।পনেরো দিন পর কেমন পরিস্থিতি তৈরি করবে লোকটা?সুখ দুদিক মাথা নাড়ে।সে দ্বিতীয় বার ছুটে যাবে না কখনো। কখনোই না।
•
বাথরুমে গেছে বর্ণ।সুখ উঠে দাঁড়ায়।ফুলে ফুলে সাজানো রুমটা একবার পর্যবেক্ষণ করে। চোখে তাক লাগানোর মতো আকর্ষণীয় সুন্দর দেখতে লাগছে পুরো রুম।আজ তথাকথিত বাসর রাত।তুহফারা সবে মিলে কতো কী ইঙ্গিত দিল ভেবেই গলা শুকিয়ে আসে। লোকটার সাথে বেড শেয়ার অসম্ভব।
ডিভানে চলে এলো সুখ। প্রয়োজনে এখানে ঘুমাবে। আলগোছে বসার পরপরই চমকে উঠে দাঁড়ায়।হাত রেখে চেক করে ভেজা,পানিতে জবজবে। নিঃসন্দেহে এটা দ্য গ্রেট আসফিয়ান বর্ণ’র কারসাজি। একজন মানুষ কতোটা ইতর হলে এই কাজ করতে পারে! সজোরে ডিভানে একটা লাত্থি।
কোমরে হাত চেপে প্রায় অনেক্ষণ হতাশ হয়ে চেয়ে তাকে।বেড ছাড়া শোবার কোন গতি নেই।নাহ,ওই লোকের চাওয়া সে কিছুতেই পূরণ হতে দিবে না। দরকার পড়লে এই ঠান্ডায় কুপোকাত হয়ে ফ্লোরে রাতটা পার করবে।
ভেবেই বালিশের জন্য পুণরায় বেডে কাছে ফিরে গেল। বেখেয়ালি নজর ঠিক শুভ্র চাদরের মাঝখানে পড়তেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে সুখ। সাপের মতো দেখতে কিছু একটা।চোখ কচলে দেখে, হ্যাঁ সাপই। ফণা তুলে চুপচাপ করে বসে আছে।ছিটকে পিছু সরে আসতে গিয়ে সুখ বুঝল অত্যাধিক ভয়ে শরীর অবশ প্রায়। জায়গা থেকে এক চুলও নড়তে অক্ষম।
‘ কী ব্যাপার স্টেচ্যু হয়ে আছে কেনো মাই সুইটহার্ট?’
‘ আঃ আঃ..’ —অস্ফুট শব্দে চোখ উল্টে কাঁপা হাতে বেডের দিকে দেখিয়ে দেয়।
তোয়ালে ঘাড় মুছে বর্ণ নিকটে এগোয় সুখের।তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ভ্রু কুঁচকে একবার বেডে দেখল,এরপর দেখল ভয়ার্ত সুখের মুখশ্রী। আচমকা তোয়ালে ফেলে পিছন থেকে জাপটে ধরল তাকে।
‘ স_সাপ ফুল সা_প..’
এক মূহুর্তের জন্য সাপের ভয় উবে গেল সুখের।থমকানো চোখে ঢোক গিলে পেটে জড়িয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা বর্ণ’র পুরুষালী হাত দুটো দেখল।এই প্রথম এতো গভীর ছোঁয়া,এই প্রথম এতোটা দূরত্বহীন দুজন।হিতাহিত জ্ঞান শূণ্য হয়ে থরথর কেঁপে উঠল ভেতর বাহির।বর্ণ আড়চোখে সুখের প্রতিক্রিয়া দেখে তাকে আরো এলোমেলো করে দিতে ঘাড়ে চোয়াল ঠেকাল। কানে ঠোঁট ছুঁইয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে অস্থির হলো—
‘ ভয় লাগছে ফুল।প্লিজ আমায় একা ছেড়ে যাস না!’
হতবিহম্বল সুখ। আজ থেকে বছর তিনেক আগেও যেই মহান ব্যক্তি নির্দ্বিধায় একটা সাপকে হাতের মুঠোয় চেপে জ্যান্ত থেকে এক চাপেই মে:রে ফেলেছিল চোখের পলকে।তিনি আজ একটা ক্ষুদ্র সাপের ভয়ে সুখকে জড়িয়ে ধরেছে।আর সুখ কী তাকে উলে বাবু বলে আগলে নেবে!ছাড়া পাবার জন্য ছটফটিয়ে উঠে সুখ।
‘ এভাবে ছটফট করছিস কেনো?দেখছিস তো ভয় পাচ্ছি।’
‘ ড্রামা করছেন আমার সাথে?আপনি না সেই ব্যক্তি যিনি হাতের মুঠোয় চেপে একটা জলজ্যান্ত সাপকে মৃত বানিয়ে দিয়েছিলেন?’
‘ সেসব অতীত! মানুষ পরিবর্তনশীল!’
’ আপনি একটা…’— সুখ বুঝতে পারে না পৃথিবীর কোন প্রাণীর সাথে আসফিয়ান বর্ণ’র তুলনা দেয়া যায়।
দু’জনের তর্ক বিতর্ক চলাকালীন সাপ যেভাবে এসেছিল সেভাবেই চলে গেল কোথাও।সুখ বেডের আশেপাশে একবার পরখ করে দ্রুত বেডে উঠে বসল।আজ আর ফ্লোরে পাই রাখবে না ভোর অবধি।বর্ণ ড্রয়িং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নার অবলোকন করছে সুখের কার্যকলাপ, মিটিমিটি হাসছে।
•
করিডোর বেয়ে দ্রুতলয়ে ছুটছে তুহফা।খানিক আগেও ইবরাত,রুশ্মিতাসহ একঝাঁক এসে বাসর ঘরের দরজায় এসেছিল কান পাততে। সাউন্ড প্রুফ রুমের খাতিরে ভেতরের কিচ্ছুটি শুনতে পায়নি বেচারি গুলো।হতাশ মুখে ফিরে গেছে ঘুমাতে।
তুহফা হঠাৎ সামনে এসে পড়তেই তড়িৎ হাত পিছু নিয়ে গেল মাহির। জিনিসটি না দেখলেও কিছু তো লুকিয়েছে তা দেখল তুহফা।
‘ হাই!’— মাহির জোরপূর্বক হাসে।
‘ উঁ?’
‘ এতো রাতে এদিক ওদিক ছুটছো যে?ঘুমাবে কখন? দীর্ঘ রাত জাগা শরীরের জন্য ক্ষতিকর,জানো না?’
তুহফার চোখে সন্দেহ। নজর তখনো লুকায়িত জিনিসটা দেখার নিমিত্তে কিলবিল করছে।বলল–
‘ থ্যাঙ্কস.. যাচ্ছি ঘুমোতে।আব… আপনি এই ঘরের সামনে ’—বর্ণর রুমের দিকে ফিরল দুজন। মাহির হাসে ফের,
‘ তেমন কিছু না।বসকে একটা ইনফর্মেশন দেওয়ার ছিল!’
‘ ভাইয়ার সাথে দেখা হয়েছে!’
‘ উনাদের ফার্স নাইট আজ। একবার যেখানে ঢুকেছে আগামী দু’দিনেও সেখান থেকে বের হবে কী না সন্দেহ!’–শেষের বাক্যটি নিম্ন আওয়াজে বললেও তুহফার কর্ণকৌঠরে পৌঁছে গেল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে মুখ ফস্কে বলল–
‘ এ্যাঁহ?’কিছু বললেন?’
‘ নাতো, তুমি কিছু শুনলে?’
গলা খাঁকারি দেয় তুহফা।দুদিক মাথা ঝাঁকায়। অর্থাৎ, কিছু শুনেও শুনেনি। আচমকা পিঠ মুড়ে রাখা মাহিরের হাত গলে পিচ্ছিল জিনিসটা ধফ করে পড়ে যেতেই দু’জনের নজর ঘুরে গেল সেদিন।দুকদম দূরে সরে যায় তুহফা। আঁতকে মুখে হাত চেপে অস্ফুট স্বরে বলে উঠে,
‘ আঃ স_সাপ!’
#চলবে🥀
|||

