#আমার_বোবাফুল(৫৫•১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
মায়রা তখন অন্ধকার আকাশ পানে মুখ বাড়িয়ে ছাদের কিনারে, রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে। চোখের কৌটা অশ্রুতে পূর্ণ। বিশেষ কোন কারণ নেই, আগাম বার্তা ছাড়াই একাকী থাকলে এভাবে অশ্রুরা এসে ভিড় জমায় চোখে।জোরে ধমক দিয়েও তাদের আটকে রাখা যায় না।
” কাঁদছেন?”
মায়রা চমকে উঠে । অশ্রু দেখাতে চায়না সে। অন্যত্র মুখ ঘুরিয়ে চোখ মুছে পাশে ঘাট বাঁকিয়ে তাকালো। ভ্রু সংকুচিত করে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করে–
” তুমি এখানে?”
” আপনাকে নিচে কোথাও না পেয়ে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে চলে এলাম!”— মৃদু হাসল জেসি। খানিক সময় নীরবে কেটে গেল। এরপর আবার বলল,
” উনার মতো আপনিও কী আমায় অপছন্দ করেন?”
সরল সোজা প্রশ্ন।মায়রা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে শান্ত চোখে তাকাল। জিসান অনুরোধ করেছিল বিয়ের দিন- জেসিকে যেনো না জানানো হয়, মেহরাবের সাথে জেসির নয় বরং সুখের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল।মায়রা অবিশ্বাস্য চোখে চেয়েছিল সেদিন। একেতো ঠকিয়েছে তাদের। উপরন্তু, অনুরোধ করছে যেনো…
যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো,-” যাদের ঠকিয়েছেন, তাদের কাছেই আবার অনুরোধ পেশ?মনে হচ্ছে না এর প্রতিশোধ চাইলে আমরা জেসি মেয়েটার উপর নিতে পারি?একা ছেড়ে দিচ্ছেন আমাদের সাথে, একবারও মনে হচ্ছে না আমরা ওর উপর নির্যাতন করতে পারি?”
বর্ণ’ হেসেছিল ঠোঁট এলিয়ে।বলে,-” এমন কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেই তো জেসির জীবনসঙ্গী হিসেবে ডক্টর’কেই সিলেক্ট করা হয়েছে। এছাড়া ভরসা আছে আপনার উপর। মিসেস মায়রা.. মাত্র যা বললেন,এমন কিছুই জেসির সাথে হবে না তার গ্যারান্টি দিয়ে দিলাম এখনই!”
মায়রা ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ে।আজব ব্যাপার তো। সত্যিই জেসির উপর রাগ ক্ষোভ কাজ করছে না কেনো যেনো। অবশ্য প্রথম থেকেই তার সামনে মায়রা যথেষ্ট গম্ভীর এবং কঠোর। কিন্তু মেয়েটার ফর্সা কোমল মুখশ্রীর বাঁকানো দু ঠোঁটের হাসি ফুটিয়ে তাকাতেই কেনো যেনো খুব কঠিন থাকতে পারছে না।জানতে চাইলো–
” মেহরাবের সাথে তোমার বিয়ের কথা কখন আর কীভাবে হলো?”
জেসি খানিক নিকট ঘেঁষে এলো।চোখ পাকিয়ে ফিসফিস করে,
” এ্যাকচ্যুয়ালি ভাইয়া ফোনে কারো সাথে কথা বলছিল তখন।হাতে আপনার ভাইয়ের ফটো ছিল।বিয়ে সম্পর্কে কিছু বলছিল।আমি ভাইয়ার রুমে কফি নিয়ে গেলে ফটোটা দেখতে পায়।আর প্রথম দেখাতেই…”—লজ্জায় চোখ ঢেকে নিল ওড়নায়।মায়রা হতভম্ব গলায় বলল,
” ভাইয়াকে সরাসরি বলেছো মেহরাবকে তোমার পছন্দ হয়েছে।অন্য কোথাও পাত্রী দেখার কী প্রয়োজন, তুমি তো আছোই।এমন কিছু?”
উপর নিচ মাথা ঝাঁকায় জেসি।মায়রার কপালে হাত। প্রলম্বিত দম ছেড়ে বিড়বিড় করে,” ডেঞ্জারাস!” —এরপর স্বভাবতই গম্ভীর গলায় বলল,
”’ তোমার ভাইয়াও মেনে নিল?ধমকায়নি?নিষেধ,শাসন কিচ্ছু করেনি?”
হঠাৎ জেসির মুখাভঙ্গি পাল্টে এলো। কোমল চোখে মৃদু হাসল। আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে তারাদের লক্ষ্য করে বলল,
” আমি যদি কখনো ভাইয়ারকে ব্যাস এমনিতেই কথার কথায় মুখ ফস্কে বলি ওই তারাটা আমার ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। নিঃসন্দেহে এটা অসম্ভব জেনেও আমার ভাইয়া শেষ চেষ্টাটা করে দেখবে.! সেখানে এটা তো বিয়ে।”
” কতোটা জানতে মেহরাব সম্পর্কে?সে যদি বখাটে, চরিত্রহীন হয়?”
” আমার ভাইয়া এমন খারাপ মানুষের সান্নিধ্যে কখনোই যাবেই না।”
” ভাইয়ের প্রতি এতোটা বিশ্বাস?”
তৎক্ষণাৎ জবাব দেয়না জেসি।একটু সময় নিয়ে ঠোঁটে হাসির রেখা টেনে বলল,
” আমাদের বাবা মা নেই জানেন?”
মায়রা ভ্রু তুলে চায়,-” হুঁ, শুনেছিলাম!”
” আমার মা-বাবার কিন্তু স্বাভাবিক মৃ!ত্যু ঘটেনি!নির্মম মৃ!ত্যু দেওয়া হয়েছিল তাদের!মহলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল কেউ বা কারা।”
চমকে তাকাল মায়রা।মুখ থেকে ছিটকে আসে,-” মৃ!ত্যু দেওয়া হয়েছিল? অপরাধ?”
জেসির দৃষ্টি অদৃশ্যে। রাতের আকাশ নিকষ কালো।ছাদের রেলিংয়ে হাত চেপে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে বলল,
” জানি না কী ছিল তাদের অপরাধ। ভাইয়া বেশি কিছু বলেনি।”—একটু সময় নিয়ে থেমে বলল,” ওটা গ্রামের বাড়ি। দাদুর আমলের জমিদার মহল ছিল নাকি। আমার বয়স তখন পাঁচ মাস। একদিন রাতে সবাই গভীর ঘুমে।রাতের আঁধারে চারপাশ থেকে হঠাৎ দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো আগুন।দাদু-দিদা, বাবা-মা , কাকী-কাকু আরও অনেকের চিৎকার,একটু বাঁচার।বাড়ির প্রতিটি দরজা,জানালা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়।যাতে ভেতরের কেউ চাইলেও বাহিরে বের হতে না পারে। মায়ের শাড়িতে নাকি আগুন ধরে গিয়েছিল প্রায়, ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট ,হাতে গায়ে জলন্ত আগুনের ফোস্কা নিয়ে বাড়ির পেছনের একটা কাঁচের ছোট্ট জানালা ভেঙ্গে ভাইয়াকে বের করে দিয়ে তার হাতে আমায় তুলে দিয়েছিল।বলেছিল— পালা খোকা।এই গ্রাম থেকে বহুদূরে।বোনকে দেখে রাখিস।খুব আদরে জড়িয়ে রাখিস বুকে…”
চোখের কৌটর ভরে এলো জেসির। কন্ঠ ধরে আসে। টুপটাপ অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।মায়রা স্তব্ধ। কৌতুহল জাগে,-” তারপর? তারপর কী হলো?”
” মায়ের আদেশ মতো ভাইয়া শহরে চলে এলো, প্রাণপণে ছুটে, দৌড়ে।ভাইয়ার তখন পনেরো কী ষোল বছরের। পরিবার,আত্মীয়-স্বজন কেউ নেই পাশে। পেটে ক্ষুধা,দূর্বল শরীর নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াল তিন দিনের বেশি।”
একটু জিরিয়ে নেয় জেসি। এরপর আবার বলে,-” পৃথিবীর মানুষগুলো বড্ড নিষ্ঠুর।হাত পেতেও দু মুঠো খাবার পায়নি ভাইয়া। ক্ষিদের জ্বালায় আমি বেশি কাঁদছিলাম দেখে মুখের কাপড় গুঁজে দিয়েছিল –যেনো শব্দ বেশি না আসে।পানি খেয়েই কেটে গেল আরও দুদিন। এরপর ভূবনে রাত নেমে এলো রীতিমতো। থাকার জায়গা নেই। ফুটপাথেই আমায় বুকে জড়িয়ে বসে রইল ভাইয়া। হঠাৎ কুকুরের ডাকে ভয় পেয়ে ছুটতে শুরু করে সেদিকে দু চোখ যায়।ছুটতে ছুটতে ভাইয়ার সাথে ধাক্কা লেগে গেল তারই বয়সী একজনের সাথে। জানেন কে ছিল সে?”
এই পর্যায়ে জেসি অশ্রুসিক্ত চোখে হাসে।মায়রা জানতে চায়,-” কে?”
” আমার হিরো!”
” হিরো?উনি কে?”
” আসফিয়ান বর্ণ!”
” রকস্টার?”
” হুঁম!হিরো’ সেদিন ভয়ে জড়সড় আমাদের শহরে আসার গল্প শুনল।এই প্রথম কেউ আগ্রহ ভরে শুনল আমাদের গল্প। এরপর দুজনকে একটা বস্তিতে নিয়ে গেল।ওই বস্তিতে তার পরিচিত একজন বুড়িমা একা একা থাকত,উনার কাছে! এরপর নিজের টিফিনের জমানো টাকা থেকে আমাদের পেট ভরে খাওয়াল।মাথা গুঁজার ঠাঁই হয়ে গেল কোনরকম।”
চুপ হয়ে গেল সে।হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে হাসে। মায়ারার দিকে তাকায়। গম্ভীর মুখটা ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। পাপড়ি ভেজা।তার সাথে সাথে নিজেও অশ্রু বিসর্জন দিয়েছে হয়তো।এখন মুছে ফেলেছে। কিন্তু গল্পও এখনো শেষ হয়নি।মায়রা প্রশ্ন করল–
” তারপর কী হলো?”
” তারপর? তারপর… দু মুঠো খেয়ে জীবন তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে।ভাইয়া দিন মজুরের কাজ শুরু করে।ইট ভাঙচুর, সিমেন্ট কাঁধে তুলা, লাকড়ির গাছা মাথায় নেওয়া আরো কঠিন কঠিন কাজ।নাজুক হাত দুটোর কী নাজেহাল অবস্থা হতো তখন।এক গ্লাস পানি ঢেলে না খাওয়া ছেলেটাও…”–জেসি প্রলম্বিত দম ছেড়ে বলে,” কাজ করার সময় আমায় একা ছাড়েনি কখনো।মায়ের আদেশ ছিল তো, বনুকে দেখে রাখতে?আমায় পাশে শুইয়ে রেখে ভাইয়া কাজগুলো করত।হোক রোদ, হোক বা বৃষ্টি।”
” মাঝে মাঝে হিরো এসে দেখে যেতো আমাদের। একদিন ভাইয়াকে স্কুলে ভর্তি হতে বলল। এমনিতেই পেটে খাবার জুটে না। তারউপর পড়ালেখা? এর কিছু দিন পর হিরো তার বাবার পকেট থেকে টাকা এনে ভাইয়াকে নিজের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিল, সেবার কোন অযুহাত শুনল না। প্রাইভেট পড়ার টাকা ছিল না তাই হিরো যা পড়ত,সেটা এসে আবার ভাইয়াকে পড়াতো! অপরিচিত, অজানা, অচেনা কোন মানুষের জন্য এতটুকু ত্যাগ কে করবে এই শহরে? আমার হিরো করেছিল সেদিন! এরপর বড় হতে লাগলাম ভাই-বোন দুজন।ভাইয়া আমাকে চোখের আড়াল হতে দিত না খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া।ভাই কলেজের উঠার পর টিউশনি শুরু করে।বস্তি থেকে একটা ছোট খাটো অল্প দামের বাড়িতে উঠলাম দুজন। ততোদিনে বস্তির ওই বুড়িমাও দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিল।দিন চলতে চলতে ভাইয়া ভার্সিটিতে উত্তীর্ণ হলো। হঠাৎ একদিন…”
থেমে যায় জেসি। অনেককিছুই ঘটে গেল এরপর হঠাৎ। অনেক কিছু।জেসি ব্যাখ্যা করল না।মায়রার কৌতুহলী চোখ প্রত্যক্ষ করে শুধু বলল–
” ভাগ্যের পাশা পাল্টে গেল।এই শহরের অলিগলি ঘুরে সেদিন যেই ভাইয়া একমুঠো ভাত পায়নি।আজ সে প্রতিদিন এমন হাজারো জনকে খাওয়ানোর সামর্থ্য রাখে।”
কিছুক্ষণ নিরবতা।জেসি ফের বলে-” যেই ভাইয়া আমাকে সেই ছোট্ট শিশুটি থেকে নিজের হাতে,আদরে যত্নে এই আমিকে তৈরি করেছে।তার উপর বিশ্বাস রাখবো না? জানেন… এই পৃথিবীতে আমার কেবল দুটো চাহিদা!”
মায়রা শুনেছিল নিঃশব্দে।মুখ খুলল,” ব্যাস দুটো?”
” হুঁ!একটা.. আমার ভাইয়াকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী দেখা।অন্যটা… ভালোবাসা কুঁড়াতে! আমি চাই আমার আশেপাশে যারা থাকবে তাদের হাসিখুশি রাখতে, বিনিময়ে তাদের ঝুলি থেকে অল্পবিস্তর আদর-ভালোবাসা কুড়িয়ে নিতে। দিবেন আমাকে একটুখানি ভালোবাসা?আমি না বড্ড ভালোবাসার কাঙাল!” –প্রচন্ড কাতর শুনাল তার স্বর।চোখ চকচক করে উঠল।মায়রার কী হলো কে জানে!হাত তুলে জেসির গাল ছুঁয়ে দেয়,” হুটহাট যেমন হাসতে পারো। তেমনি কাঁদতেও পারো দেখছি?”
” কাঁদাতেও পারি!”
” ভাই? কখন এলি?”
মায়রার দৃষ্টি অনুসরণ করে জেসিও সিঁড়ির দিকে তাকায়।দুহাতে কফির মগ চেপে মেহরাব দাঁড়িয়ে। এগিয়ে এলো হাস্যহীন মুখে। ফাঁকে জবাবটা দিয়ে দিল–
” এলাম খানিক আগে!”
” না বলে কয়ে কান পেতে অন্যের কথা শুনছিলেন?”—প্রশ্নটি করতে জিভ খানা সুরসুরি দিচ্ছিল জেসিকে।তবে, দমিয়ে নিল নিজেকে। মেহরাব দু’জনের কাছাকাছি এসে মগ হাতে স্থির দাঁড়িয়ে রইল।একটা নিজের জন্য, অপরটা বোনের জন্য এনেছিল। কিন্তু এখানে তো তিনজন উপস্থিত। ভাইয়ের অস্বস্তি বুঝতে পেরে মায়রা তড়িঘড়ি করে উঠে–
” আমি যাই.. মীরাভ ঘুম থেকে উঠে আমাকে না পেয়ে কান্না জুড়ে দেবে!”
সে চলে গেল। এদের দু’জনকে একা ছাড়া দরকার। বোঝাপড়া নাহয় নিজেরাই করে নিক।
নীরবতায় চলছে ক্ষণ। নিঃশ্বাসের শব্দটিও শুনা দুষ্কর।জেসি আড়চোখে তাকায়। মেহরাবের দৃষ্টি অন্যত্র ছিল।গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেই মুখ খুলল,
” মেবি কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।একা-ই দু’টো খাবেন?”
মেহরাব রাগল না বরং শীতল দৃষ্টিপাত করে।চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নজর অন্যদিকে রেখে একটা কাপ বাড়িয়ে দেয়।এতেও মেয়েটার আপত্তি!বলল ফটাফট–
” যদি আমাকে দেওয়ারই হয়,তো এদিকে ফিরে দিন। এখন দেখে মনে হচ্ছে মনের বিরুদ্ধে গিয়েই দিচ্ছেন!”
•
বর্ণ’কে স্টেজে উঠতে দেখে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়ায় সুখ। পুরুষটি এদিকে আসছে কেন?তাও চেহারা উন্মুক্ত রেখে। দর্শকের মাঝে হৈ হৈ লেগে গেল রকস্টার আসফিয়ান বর্ণকে আকম্মাৎ উপস্থিত দেখে।এটা স্বপ্ন অথবা ঘোর নয়তো?অতিথিদের সাথে চোখের ইশারায় কুশল বিনিময় করে হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে সুখের পাশে এসে থামল বর্ণ। উৎসুক জনতার উদ্দেশ্যে বলল ঠোঁটে বরাবরের মতো প্রাণবন্ত হাসির রেখা টেনে–
” গাইজ দেয়ার’জ নাথিং টু প্যানিক এবাউট।”–সুখের হাত মুঠোয় পুরে,” সি ইজ মাই সাইলেন্ট কুইন।নাউ,আই উইল বি হার ভয়েজ।ডাজ এ্যানিওয়ান হ্যাভ এ্যানি ওবজেকশন্স?”
স্বয়ং আসফিয়ান বর্ণ কারো কন্ঠ হবে!এতে কারো কোন আপত্তি থাকতে পারে? প্রশ্নই উঠে না। অডিয়েন্স একযোগে জবাব করে,-” নো নো!কোন আপত্তি নেই!”
সুখকে নিজের নিকটে টেনে আনে বর্ণ। চোখে চোখ রাখে।দৃঢ় গলায় জানায়,-” সুইটহার্ট,বল কী বলতে চাস?”
সুখ তখনো স্তব্ধ। দর্শকের করতালি হৈ হৈ তে ঘোর কাটল।বর্ণ চাতক পাখির মতো তার ঠোঁটের দিকে চেয়ে ঢোক গিলে। এরপর চোখে চোখ রেখে ভ্রু নাচায়। অর্থাৎ, যা বলতে চায় তা নিশ্চিন্তে বলার ভরসা দিচ্ছে মানুষটি।
” আমার আব্বু আমার প্রথম অনুপ্রেরণার প্রাণকেন্দ্র।আমি বলতে পারি না।এই নিয়ে অগোচরে অথবা মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কতো জনে কতো কী বলে দেয় অবলীলায়।এসবের মুখাবেলা করে যতোবার আমি ভেঙে পড়েছি, ঠিক ততোবারই কাঁধে ভরসার হাত রেখেছে আমার আব্বু।মাথায় হাত বুলিয়ে এই দূর্বলতাকে পিষ্ট করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস যুগিয়েছে। কপালে চুমু এঁকে যারা আমাকে ভালোবাসে, তাদের জন্য বাঁচতে শেখার অনুপ্রেরণা দৃঢ় করেছে আমার আম্মু। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দু’জন মানুষ।”
সুখ ঠোঁটে বলছে,আর শব্দগুলো কন্ঠ ফুঁড়ে উচ্চারণ হচ্ছে বর্ণ’র। রুবাইয়্যাতের চোখে অশ্রু,ঠোঁটে হাসি।তামিজ শিকদারের হাতে হাত রাখলেন প্রফুল্ল চিত্তে। চারপাশে গুঞ্জন উঠে বর্ণ’র কন্ঠ থেকে পরবর্তীতে ছিটকে আসা বাক্য কর্ণকৌহর হতেই–
” আমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় যেজন আমার স্বামী আসফিয়ান বর্ণ। আমার প্রিয়দের শীর্ষে যার অবস্থান, আমার শখের পুরুষ…”
দর্শকের সাথে সাথে সুখ নিজেও স্তম্ভিত। ঠোঁটে হাত রাখে আনমনেই।সেতো এসব কিছুই বলেনি।লোকটা নিজের নামে সাফাই গেয়েই চলছে। ধোঁকাবাজ, মিথ্যেবাদী!হাত বাড়িয়ে মুখটা চেপে ধরতে গিয়েও অবস্থানের কথা ভেবে দমে গেল।
” সুখ সত্যিই এসব বলছে নাকি গো?”
তামিজ সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে কপালে হাত ঘঁষে গম্ভীর গলায় বললেন,” কী জানি!পাশে পাজিটাকে দেখছো না?”
”পেইন্টিং নিয়ে এক বছর আগে থেকেই কাজ শুরু হয়েছিল সুখের।আব্বুর সাথে মিলে, গোপনে। হঠাৎ একদিন হুটহাট সকলকে সারপ্রাইজ দিয়ে তাক লাগিয়ে দিতে চেয়েছিল সে।আজ তা পূর্ণ হলো”—এসব সহ আরো অনেক কিছুই সুখের হয়ে মঞ্চে বলেছে বর্ণ। অনেক ধৈর্য্য সহকারে।
যাওয়ার সময় সুখকে বর্ণ’র গাড়িতে চড়তে হলো।লোকটাই বাধ্য করেছে।মনের কথাগুলো সবার সামনে কথার মাধ্যমে উপস্থাপন করার জন্য একটা ধন্যবাদ গলা অবধি এসেছিল, কিন্তু মাঝখানে নিজের নামে নিজে নিজেই যে সাফাই দিল?তাই কোন ধন্যবাদ পাওনা নেই আসফিয়ান বর্ণ’র।
•
দু’চোখ খিচে রেলিং শক্ত করে ধরল সুখ।কানের কাছে এখনো বাজছে বর্ণ’র কথাগুলো–
” আমি তোর শব্দ হবো; ব্যাস তুই আমার কন্ঠস্বর হয়ে যা!সুইটহার্ট,কথা দিচ্ছি দ্বিতীয় বার কখনো দুঃখ দেবো না।অন্য কাউকেও আঘাত করার দুঃসাহস দেখাতে দেবো না।এই দ্যাখ কান ধরেছি। প্রথম আর শেষ বারের মতো মাফ করে দে ফুল।আমি ভালোবাসতে শিখে গেছি।”
ঘামছে সুখ, থরথর করে। বারংবার কথাগুলো কানের গোড়ায় কেউ যেন চিৎকার করে বলে চলেছে। অতিষ্ঠ করে তুলছে তাকে।চোখ চিকচিক করে উঠে। দুহাতে কান চেপে ধরে সুখ চোখ খিচল পুনর্বার।অসহ্যকর এক যন্ত্রনা বয়ে যাচ্ছে হৃদয়ে।তখনই পিছু থেকে ডাক ছুটে আসে–
#চলবে🥀

