#আমার_বোবাফুল(৬৯•১)
#তৃপ্তি_এহসান_নাওরাহ্
নতুন এক স্নিগ্ধ, কোমল ভোরের সূচনা। পূর্বাভাস ছাড়াই ভোররাতে হঠাৎ শহর ঝাঁপিয়ে ঝুম বৃষ্টি নেমেছে। যদিও এখন তার মাত্রা কমে রূপ নিয়েছে ঝিরিঝিরিতে।হাওয়ায় মৃদু সোঁদা গন্ধ।বাহিরে যে বৃষ্টি হচ্ছে তার শব্দ কানে না পৌঁছালেও, ঝাপসা গ্লাস বেয়ে জলের স্রোত বয়ে যাওয়া দেখে অজ্ঞাত হওয়ার কথা নয়।বেডে দু’টো আত্মা, দু’টো দেহ পরষ্পরের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। সুখ তখন সম্পূর্ণ চেতনায়। একদৃষ্টে চেয়ে আছে ঘুমে কাবু বর্ণ’র মুখশ্রীতে। ঠোঁটে অদ্ভুত তৃপ্তময় হাসিটা লেপ্টে। মানুষটা কতো শান্তির ঘুমে আছে। আজকাল বর্ণ’কে আগের মতো স্লিপিং পিল নিতে কিংবা নিজের অনিয়ন্ত্রিত মস্তিষ্ককে সংযত করতে ঘনঘন ইনজেকশন পুশ করতে হয়না।ধীরে হাতটা বর্ণ’র চুলে গলিয়ে দেয় সুখ। ইচ্ছে মতো এলোমেলো করে দিতে লাগল চুলগুলো।এতে বর্ণ সজাগ হলো না বরং নড়চড়ে মুখ গুঁজে দিল বউফুলের গলায়। খোঁচা খোঁচা দাড়ির স্পর্শে সৃষ্ট শিরশিরে অনূভুতিটা দাঁতে দাঁত চেপে হজম করে নেয় সে।ঘাড় কাত করে কাঁচের জানালার দিকে শূণ্যে দৃষ্টি ছুঁড়ল কোথায় যেন।তুহফার বিয়েতে বয়োজ্যেষ্ঠা’রা কেউ কেউ বলাবলি করছিল,
“ বর’কে কাছে আসতে দিবি, সে যখন চায়। বেশিদিন পালাই পালাই করে থাকিস নারে।বউদের কাছে পুরুষের কী চাহিদা থাকে, বুঝতে পারছিস নিশ্চয়ই? অবুঝ তো নস!সময় থাকতে আঁচলে বেঁধে রাখিস, নয়তো অন্য কোথাও নজর দিয়ে বসবে রে। তখন আফসোস ছাড়া গতি থাকবে না।”
তখন থেকেই মস্তিষ্ক জুড়ে কথাগুলো আলোড়ন তুলেছে সুখের।কতো মাস যে পেরিয়ে গেল বিয়ের।বর্ণ তাকে কখনো সেসবের প্রস্তাব রাখেনি, অবশ্য হেঁয়ালি করে প্রায়শই বলে,
“ কবুল পড়লাম সেই কখন। কিন্তু বাসর রাত এখনো এলো না, বউ।আর কতো যুগ সাধু সেজে থাকতে হবে, সুইটহার্ট লিখে দে ,প্রহর গুনা শুরু করি!”
অথচ কাল রাত তাদের মাঝে যা ভালোবাসা-বাসি হলো! কঠিন মূহুর্তেও বর্ণ সরে যেতে চাইছিল, “ হেই আসফিয়ান বর্ণর ঘুমন্ত হৃদয়ের ফুটন্ত ফুল! অবশেষে আপনাকে জিতে তো নিয়েছি, না? হাহ্!থেকেছি তো নারী সঙ্গ ছাড়া এক যুগ,দুই যুগেরও বেশী সময় নিজের হিংস্র রূপটা কন্ট্রোলে রেখে।আরও কয়েক দিন না হয় রাখলাম।সময় নিন।আই ডোন্ট মাইন্ড।”
সুখ সরতে দেয়নি তখন। নিজের সাথে জড়িয়ে রেখেছে আষ্টেপৃষ্ঠে, যেনো কোথাও হারিয়ে না যেতে পারে।ভুল করল কী? কিন্তু… একদিন না একদিন এটা হওয়ারই ছিল।এই পুরুষ তার একান্ত, ব্যক্তিগত, হালাল। সম্পূর্ণ অধিকার আছে সুখের কাছাকাছি আসার। বরং অধিকার থেকে আরও কিছুদিন বঞ্চিত রাখলে তারই পাপের বোঝা ভারি হতো। বুকের ভেতর থেকে চাপা শ্বাস বেরিয়ে এলো সুখের।
ভোর রাতে গোসল সেরে পুণরায় শুয়েছিল দুজন। যদিওবা সুখ কঠিন লজ্জা নিয়ে রুম ত্যাগ করতে চেয়েছিল কিন্তু দানবটা এমন শক্ত হাতের থাবা বসিয়ে তাকে চেপে ধরে রাখল।পালাতে তো পারল না, উল্টে শক্তি অপচয়।এমনিতেই খানা’র ক্ষেত্রে বাঁচি বাঁচি করতে করতে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি।
বর্ণ’র ট্রিটমেন্ট করার নমুনা দেখে সুখ গলায়,ঘাড়ে হাত বুলিয়ে হতবুদ্ধির মতোন চাইল। শরীরের জায়গায় জায়গায় নীলচে ক্ষত চিহ্ন। ঘাড়ে আলতো হাত মালিশ করে মুখ কুঁচকে শ্রীতে অসন্তুষ্টি ফুটিয়ে তুলল সুখ। বর্ণ’র ঘুম ভেঙ্গেছে। সুখের প্রতিভাস দেখে অয়েনমেন্ট হাতে নিল।ওই সময় লোকটা ঠোঁট কামড়ে হাসল না?সুখ দেখেছে।
“ কাছে আসুন বউ!অয়েনমেন্ট লাগিয়ে দিই।”
দূরে… সরে গেল সে।বুঝাল সাফ সাফ ,“ একদম ছুঁবেন না।”
সুখের ধারনা অয়েনমেন্ট লাগিয়ে দেওয়ার বাহানায় নির্লজ্জটা আবার তার সাথে…!বর্ণ ভ্রু তুলে দৃষ্টি ছোট ছোট করে আরও একধাপ এগোল।সুখের মনের ভাব পড়ে নিতে খুব বেশি সময় লাগল না তার,“ এখন আর সেরকম টাচ-টুচ করবো না।বাই ডুয়িং দিস,লেট মি ফিল ব্লেসড সুইটহার্ট।”
অবাক হওয়ার কথা ছিল সুখের। কিন্তু সে হলো না। অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে। রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ’র এই কথা বলার ধরনে এখন সে অনেকটাই অভ্যস্ত। বুঝাল ইশারায়,“ থ্যাঙ্কিউ ভেরি মাচ। কিন্তু আমার সেবা করে রকস্টার আসফিয়ান বর্ণ নিজেকে ধন্য মনে করুক।এমন অন্যায় ব্যাপারটা ঘটুক আমি চাই না, প্লীজ।ওটা আমার হাতে দিন।নিজেই লাগিয়ে নিতে পারবো।”
“ নোপ জানেমান।কাম ক্লোজার।ক্ষত যখন আমিই করেছি,মলমটাও আমাকেই লাগাতে দিন?”
বর্ণ আরও কিছুটা এগিয়ে গেল। সুখের দৃষ্টি,ধ্যান ধারণা কেবল বর্ণ’র সুশান্ত চোখ জোড়ায়। যার গভীরে ধূর্তামি, দুষ্টুমির ছড়াছড়ি। পিছু না তাকিয়ে সে আরেকটু পেছাতেই চলে গেল বেডের কিনারে।মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে আসে, “ আঃ”
পুরোপুরি ফ্লোরে ছিটকে পড়ে কোমর ভাঙার আগেই বর্ণ’র শক্তপোক্ত হাত এগিয়ে ধরে ফেলল তাকে। বাঁকা হেসে বলল,“ ছেড়ে দেই বউ?দেই?”
ভয়ার্ত মুখে কোণা দৃষ্টিতে ফ্লোর দেখে সুখ। গভীরতা অল্প অথচ আসফিয়ান বর্ণ এমন ভাবে ভয় দেখাচ্ছে যেন দশ তলা উঁচু থেকে হাত ছেড়ে দেবে। ভাবনার ফাঁকেই সে হুমড়ি খেয়ে পড়ল পুরুষটির প্রসস্থ বুকের বাঁ পাশে।বর্ণ নিজের কাছে চেপে ধরল তাকে। প্রতিটি ক্ষততে ঠোঁট ছুঁইয়ে অয়েনমেন্ট লাগিয়ে দেয়। আবেশে চোখ বুজে নিল সুখ।আজ নিজেকে পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে। আচ্ছা পরিপূর্ণতার এই শহরে কখনো অপূর্ণতা কিংবা দীর্ঘশ্বাসের ছায়া এসে নামবে না তো হুটহাট। সময়ের পরিক্রমায় এই মানুষটি পাল্টে যাবে না-তো?চোখে চোখ রেখে তাচ্ছিল্য হেসে বলবে নাতো ফের‘ তোর সাথে আসফিয়ান বর্ণ’র কোন দিক দিয়ে যায়?’! একবার সে নিজেকে সামলে নিয়েছিল কিন্তু দ্বিতীয়বার কাছে টেনে পরে ছুঁড়ে ফেলল সেদিন হয়তো সে ভেঙে চূর্ণ চূর্ণ হয়ে যাবে।সে তো খুব করে চেয়েছিল মানুষটা থেকে পালিয়ে বাঁচতে।
•
পেটের উপর ভারী কিছুর উপস্থিতি পেয়ে চোখ মেলল মেহরাব।ঘুমু ঘুমু চোখে বিরক্তি স্পষ্ট।জেসি পেটের উপর কুশন রেখে তার উপর বসে আছে,সে এটা নয় সাথে মীরাভও।মনে মনে তাকে পিচ ঢালা রাস্তা ভেবে দুজন দুদিকে শূণ্যে মুঠোবদ্ধ হাত তুলে গাড়ি চালানোর মতো করছে। মেহরাবকে চোখ খুলতে দেখে মীরাভ উচ্ছাস মুখে বলে উঠে,“ মাম…মানি দিখো!মাম..মা চোত খুলেচে।”
জেসি দাঁতের নিচে জিভ ঠেলে ধীরে পেট থেকে নেমে ঠোঁট টেনেটুনে হেসে বলল,“ প্রিন্সেস গাড়িতে চড়তে চেয়েছিল দেখে…”
“ সাধে কী ইডিয়ট বলি!”–মেহরাব দাঁতে দাঁত পিষে,“ তাই দুটো মিলে আমার পেটে চড়ে বসলে?ও নাহয় বাচ্চা,তুমি একটা ছোট হাতি হয়ে…!”
কথা অর্ধসমাপ্ত। উঠে বসে মীরাভকে কোলে তুলে নিল।জেসি বিষ্ময়ে হতবাক।তার পাতলা-ওতলা শরীরটা ছোট হাতির সাথে তুলনা?এটা মেহরার শাহরিয়ারের থেকে মোটেও কাম্য ছিল না জেসির। দমিয়ে রাখা স্বরে বলল,“ আমি ছোট হাতি? ম্যানার্সলেস,ইউসলেস লোক!শব্দের সঠিক ব্যবহার জানেন না অথচ বিয়ে করে বসে আছেন। চুমুও খেয়েছেন একাধিক’বার। তারউপর আরো ক…”
মেহরাব তড়িৎ মুখ চেপে ধরে তার। দরজার দিকে চেয়ে বলল, “ আপু ভেতরে এসো।”
বলার ফাঁকে চোখ রাঙাল জেসিকে। মেয়েটা লজ্জায় গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে।আপু কখন এলো!
মীরাভের খাওয়ার সময় হয়েছে।তাকে নিতে এসেছিল মায়রা।নক করার আগেই দোর খোলো যায়। ফলস্বরূপ ভেতরের দৃশ্যপট প্রত্যক্ষ করে জড়বস্তুর মতো দাঁড়িয়ে পড়েছে। মেহরাবের ডাকে মাথা ঝাঁকিয়ে মুখটা গম্ভীর করল।কাছে এসে মীরাভকে নিয়ে চলে যেতে ধরলে জেসি অন্যত্র নজর রেখেই মিনমিনিয়ে বলে,“ আপু বসুন না।”
“ উমঃ পরে।মীরাভকে খাওয়াতে হবে।”
সে পরক্ষণে প্রস্থান করে। মেহরাবের দৃষ্টি কঠিন। পারলে এখনি জেসিকে পুড়িয়ে ভষ্ম করে দেয়, দৃষ্টি দিয়েই।মাথা চুলকে অপ্রস্তুত হাসল জেসি। ডক্টরকে সে ভয়-ডর পায়না যদিও।তবে আজ একটু আধটু লজ্জা ঘিরে ধরেছে,এই যা।পিঠ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে বেড থেকে নামার আগেই খপ করে হাত টেনে ধরে মেহরাব।পরপর জেসিকে হেঁচকা টানে পাশে শুইয়ে,নিজেও বালিশে মাথা এলিয়ে বলল,“ অল্পস্বল্প স্বামী সোহাগ পেয়ে অনুভূতি কেমন বললে নাতো বিবিজান?”
তড়িৎ লজ্জা পাওয়ার ভান ধরে ওড়নায় মুখ ঢেকে জেসি বলল,“ ইশশ্ সোয়ামি! আমার লজ্জা করে।”
মেহরাব তাকে আরো নিকটে নিয়ে এলো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখে চোখ রেখে মোহিত কন্ঠে বলল,“ তুমি নামক ইডিয়ট মেয়েটার প্রতি যদিও ভালোবাসা নেই, ভালো লাগাও নেই, তবে এমন কিছু আছে- যা আমাকে বারবার টেনে আনে তোমার কাছে। ইয়্যু নো সেটা কী?
জেসি বিজ্ঞের মতো জবাব করে,“ ভালোবাসা নেই, ভালো লাগা নেই। এরপরও আমার প্রতি আপনার আকর্ষণ কাজ করে।এর অর্থ দাঁড়ায়- আমি চম্বুক আর আপনি লোহা, নিকেল,কোবাল্ট।”
মেহরাব ভ্রু বেঁকে চেয়ে থাকে। খানিক পর ঠোঁট কুঁচকে বিড়বিড় করে,“ ইডিয়টস্!”
জেসি কানেই তুলল না। ভেংচি কাটলো। ভালোবাসে না, এসেছে রোমান্টিকতা দেখাতে। এমন রোমান্স তার চাই না!
•
আর্ট গ্যালারীতে আজ পেইন্টিং নিয়ে যাওয়ার কথা সুখের। প্রস্তুতি চলছে।শাড়ির উপর থেকে বর্ণ’র এঁকে দেওয়া ভালোবাসার কিছু কিছু চিহ্ন স্পষ্ট। এইজন্য একবারও রুম ছেড়ে বের হয়নি সুখ, নেহাত এটা জরুরী বলে যেতে হচ্ছে।বর্ণ বেরিয়েছিল তাকে রুমে রেখে।ফিরেও এলো খানিক পর।বউকে ভ্রু বাঁকিয়ে পরখ করল আপাদমস্তক।হিজাব করে গলা,ঘাড় ঢেকে রেখেছে, ফুলহাতা ব্লাউজ।বর্ণ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করল না বরং তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুলি গোল করে ‘ওকে হ্যান্ড সাইন’ দেখিয়ে বলল,“ পারফেক্ট।”
সুখ ঠোঁট ভেঙায় মনে মনে।
ক্যানভাসের ওপাশে পেইন্টার সাইন-এ লেখা হয়েছে আসফিয়ান বর্ণ’স ওয়াইফি। মানুষটা জোর করে এটা লেখিয়েছে তাকে দিয়ে।এ-ও বলেছে-
“ পেইন্টিংয়ের প্রেমে পড়ে আদার-ল্যান্ড থেকে প্রেমের টানে বহু ইয়াং পিপলস্ পেইন্টার এর খোঁজে আসে বা যায়।ইভেন ইফ বাই মিস্টেক দূর থেকে কেউ আমার বাগানের ফুলের প্রেমে পড়ুক, এমন রিস্ক আসফিয়ান বর্ণ নেয়না।যেটা তার, সেটা শুধু তারই।”
যাহ্ গলে গেল তো সুখ,মোমের মতোন।জানতে চায়,“ এতোটা ভালোবাসার কারণ?বাসেন তো ভালো?”
বর্ণ’র ঠোঁটের হাসিতে বেপোরোয়া পনা,“ বিশেষ কোনো কারণ নেই। হঠাৎ হৃদয় একদিন আবদার করল- বহুদিন তো অনূভুতি শূন্যতায় ভুগিয়েছিস, এবার নাহয় একটু ভালোবাসা আহরণ করে দ্যাখ!মায়া হলো খুব, হৃদয়ের প্রতি। ছেড়ে দিলাম হৃদয় ভ্রমর। এরপর ভ্রমর মুক্তি পেয়ে চৌকাঠ পেরোতেই খোঁজ পেলো ফুলের দেখা। তারপর আর কী!একটু ভেসে দেখলাম ভালো। এমনিতে তাকে ভালোবাসার বিশেষ কোনো কারণ নেই তবে…”–কথার ফাঁকে ঘাড়ে দাঁত চেপে সজোরে কামড় বসাল। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল সুখ। চোখে জল চলে আসে ।বর্ণ সেই কাজল চোখ দুটোতে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল,“ তবে তার অশ্রুসিক্ত আঁখি জোড়া ভীষণ বাজে রকমের তৃপ্তি দেয়।”
“ তার মানে আপনার তৃপ্তির জন্য আরও হাজার বার কাঁদতে হবে আমায়?”
“ কান্না?” -বর্ণ কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল কিছু। অ*শালীন শব্দচয়ন।চোখ খিচ বুকে ধাক্কা দিয়ে সুখ দূরে সরিয়ে দিলো তাকে।বুঝাল,“ আমি বের হচ্ছি না আপনার সাথে।”
“ বিগ আফসোস ফর ইওর ব্যাড লাক, সুইটহার্ট।!বের তো আমার সাথেই হতে হবে আপনাকে।”
মহা বিপাকে পড়েছে সুখ। সেই যে তুই সম্বোধন করতে নিষেধ করেছিল, তখন থেকেই বর্ণ আপনি-আজ্ঞা করে যাচ্ছে।তার কী লজ্জা লাগছে না? বড়দের সামনে তা বহাল রাখলে নির্ঘাত বড় মা বলবেন,“ শেষে তুমিও বউকে বস মানা শুরু করে দিয়েছো খোকা। অবাক না হয়ে সত্যিই পারলাম না!”
•
গ্যালারি থেকে ফেরার পথে রাস্তার কিনারে হাওয়াই মিঠাই দেখে খাওয়ার মিষ্টি আবদার রাখতে ভুল করল না সুখ। বর্ণ’র কঠিন দৃষ্টি সমূহে আজকাল আতঙ্কিত হয়না সে। অবশ্য এর পেছনের মূল কারিগর আসফিয়ান বর্ণ নিজেই।
হায় দাম্ভিক পুরুষ আসফিয়ান বর্ণ।বউফুলের জন্য কতো কী করতে ইচ্ছে তাকে।মিঠাই কিনে দু’হাতে ধরিয়ে সুখকে গাড়িতে চড়ে বসার আদেশ দিল বর্ণ।কানে ইয়ারপিস ছিল তার।সেটায় হাত চেপে আরও একবার সুখকে গাড়িতে বসতে বলে কোথাও চলে গেল।
রাস্তায় ওপাশে বাচ্চাদের ছোটাছুটি দেখে থেমে গিয়ে অপলক চেয়ে রইল সুখ।বলার অপেক্ষা রাখে না,ছোট বাচ্চাদের প্রতি তার আকর্ষণ প্রবল। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাঁধে কারো স্পর্শ পেয়ে সুখ চমকে উঠল। পরক্ষণে চোখ দুটো চকচক করে উঠে। সায়মা বুয়া, না এখন তো সে শিক্ষিকা। চোখে ফ্রেমের চশমা,কাধের একপাশে ছড়ানো চাদরটা সেই পরিচয় বহন করে।কতো দিন পর সাক্ষাৎ। আপ্লুত হয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরে সুখ।
“ কেমন আছে আমার সুখ পাখিটা?”
উচ্ছাস মিশ্রিত হেসে সে ইশারায় জবাব দিল,“ এতোক্ষণ ভালোই ছিলাম, তোমার দেখা পেয়ে ভালো লাগা এবার দ্বিগুণ হলো।”
সায়মা হেসে সুখের মুখে হাত বুলিয়ে দিল।আগের চেয়ে খানিকটা শরীর এসেছে সুখের। ভীষণ মিষ্টি দেখতে লাগছে।সুখ ঠোঁট উল্টে অভিযোগ করল,“ আপি’র বিয়েতে এলেনা যে?”
ঠোঁটের হাসি বাড়ল বৈ কমল না সায়মার।খুব যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার কিন্তু সব চাওয়া কী পূর্ণ হয়! ব্রেস্ট টিউমার ধরা পড়েছে রিপোর্টে। সেদিন সারাবেলা হসপিটালে কেটেছিল। অপসারণের জন্য আগামী দু’দিন পর সার্জারি করাতে হবে।বলল,“ অসুস্থ ছিলাম একটু।”
“ এখন সুস্থ?”–সুখ জানতে চায় এরপর,“ তাহলে আজই চলো ও বাড়ি।আজ আপি আসবে শশুর বাড়ি থেকে।”
“ যাবো।তবে এখন নয়। স্কুলে যেতে হবে একটু। বর্ণ’র সাথে এসেছো?”
সুখের হাতে হাত রেখে কোমল গলায় বলল সায়মা।প্রত্যুত্তরে মুচকি হেসে উপর নিচ মাথা ঝাঁকায় সুখ। সায়মা জানতে চাইলো,“ বর্ণ ভালোবাসে তো আমাদের সুখকে?”
সুখ খানিক লজ্জা পায় । এভাবে আরও কিছু সময় পর কথা আদান-প্রদান করে সাময়া বিদায় নিল। স্কুল থেকে আজ ছুটি নিতে যাচ্ছে সপ্তাহ দুয়েকের জন্য।মাঝ রাস্তায় গিয়ে একবার পিছু ঘুরে সুখকে দেখে সায়মা। আচানক মাথা চক্কর দিয়ে উঠে। দু’পাশে গাড়ি আসছে-যাচ্ছে।হর্ণের শব্দ কান বিষিয়ে তুলছে।মাথা দুলানো বন্ধ হলো না; কোন রকম রাস্তা পার হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পা চালায় সাময়া।তার আকাঙ্ক্ষা ছিল রাস্তার ওপাশে গিয়ে, সেখান থেকে টেক্সি ধরে সোজা স্কুলের সামনে গিয়ে নামবে। অথচ ভাগ্য দেখাল অন্য খেল।কদম এক বাড়াতেই পায়ে পা বিঁধে চলন্ত গাড়ির সামনে গিয়ে ছিটকে পড়লো নিমেষেই। এখানে উপস্থিত কারো কল্পনাতেই ছিল না তা। সেকেন্ড কয়েক আগের সুস্থ সায়মা মূহুর্তের ব্যবধানেই র-ক্তা-ক্ত শরীরে লুটিয়ে পড়ে পিচ ঢালা রাস্তায়।অদূর থেকে স্তব্ধ সুখের হাত ফষ্কে মিঠাই পড়ে গেল রাস্তায়। অস্পষ্ট শব্দের ঠোঁট ভেঙে বেরিয়ে আসে,“ মাঃ!”
#চলবে🌺

