আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_১০

0
34

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১০

(শব্দসংখ্যা ১০৫০+)
(কপি পোস্ট করা একদম নিষিদ্ধ)

আজ আকাশটা সত্যিই অদ্ভুত রকমের সুন্দর। ভোরের আলো যখন ধীরে ধীরে গাঢ় হলুদে রঙ নিতে শুরু করলো , মনে হলো যেন সূর্য নিজেই আজ হলুদের অনুষ্ঠানের অতিথি। মেঘের ফাঁক গলে নরম আলো নেমে এসে ফরাজী বাড়ির সাদা দেয়ালে লেগে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিলো । দূর থেকে দেখলে মনে হয় পুরো বাড়িটাই যেন হলুদের গায়ে রাঙানো।
বড় হলঘরটা সকাল থেকেই ব্যস্ত। দরজার মাথায় গাঁদা আর রজনীগন্ধার মালা ঝুলছে, মাঝেমধ্যে হালকা বাতাসে দুলে দুলে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে। মেঝের মাঝখানে আলপনা আঁকা।সাদা রঙের নকশায় ঘিরে রাখা একটি গোল জায়গা, যেখানে বসবে আদিব আর ইরিনা। পাশে পিতলের থালায় সাজানো হলুদ বাটা, তার উপর লাল সুতো জড়িয়ে রাখা। থালার কিনারায় ছোট ছোট প্রদীপ, যদিও দিন, তবু আচার রক্ষার জন্য জ্বালানো হয়েছে। ঘিয়ের গন্ধ, হলুদের কাঁচা গন্ধ, আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা পিঠার মিষ্টি সুবাস মিলেমিশে এক ধরনের উৎসবের মাতাল বাতাস তৈরি করেছে।

আত্মীয়স্বজনেরা একে একে এসে ভরিয়ে তুলেছে হলঘর। কেউ শাড়ির আঁচল সামলাতে ব্যস্ত, কেউ গয়না ঠিক করছে, কেউ আবার মোবাইল হাতে ছবি তুলছে। হাসির শব্দ উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। ছোট বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে, তাদের গায়ে গাঁদা ফুলের পাপড়ি লেগে আছে। সব মিলিয়ে বাইরে থেকে দেখলে নিখুঁত এক আনন্দের ছবি।

কিন্তু আনন্দের এই রঙের ভেতরেই ইরিনার মনটা কেমন যেনো খচখচ করছে।ইরিনা নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। সাদা -হলুদের মিশেলে জামদানি শাড়িটা তাকে যেন আলাদা করে তুলেছে। মাথার খোঁপায় সাদা ফুল, কপালে ছোট্ট গোল টিপ সবকিছু মিলিয়ে তার সাজে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য ফুটে উঠেছে । আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির থাকে। হঠাৎ করে তার মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলো।সেই নামটা আজ আর কেউ উচ্চারণ করে না,তাঁর সাথের স্মৃতিগুলো সে বুকের ভেতর চাপা দিয়ে রেখেছে।কিন্তু আদৌ এই সমাজ তাকে সবকিছু ভুলতে দিবে তো?‘বিধবা’—শব্দটা কতবার যে তার কানে আঘাত করেছে! সবাই এমন ভাব করে গেছে যেন সে কোনো মানুষ নয়, বরং বিধবা নামের এক কুৎসিত প্রাণী । আজ তাঁর নতুন কিছু শুরু করার দিন, তবু সে জানে, সমাজ এত সহজে তাঁর পুরোনো পরিচয় তাকে ভুলতে দেবে না। তাই সে কিছুটা মানুষিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়েই হলরুমের দিকে এগোলো। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই আদিব ও তাঁর সঙ্গ দিলো।

যখন একসঙ্গে তারা হলরুমে ঢোকে, তখন সবাই তাকিয়ে থাকে। কারও চোখে প্রশংসা, কারও চোখে কৌতূহল, আবার কারও চোখে অদৃশ্য হিসাব।

রহিমা খালা পাশের চেয়ারে বসে থাকা এক মহিলার দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলেন,

“জানো , মেয়েটা তো আগে একটা সংসার করেছে। আদিবের মতো ছেলের জন্য এমন বিধবা … আর কোনো মেয়ে পাইলো না ?”

পাশের চাচি ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেন,

“এই বয়সে বিধবা! ভাগ্যটাই খারাপ । এখন না আবার এই স্বামীরেও খায়।আহারে পোলাডার কমবয়সে যদি কিছু হইয়া যায় ।”

কথাগুলো খুব নিচু স্বরে বলা হলেও, কাছাকাছি বসার কারণে কথাগুলো আদিবের কানে এসে লাগে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সে চারপাশে তাকায়, বুঝতে পারে কারা বলছে। সে ইরিনার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। তার হাতটা একটু শক্ত করে ধরে।ইরিনা নিচু স্বরে বলে,

“শুনেছো ?”

আদিব ধীর গলায় উত্তর দেয়,

“সব শুনেছি। কিন্তু সব কথার গুরুত্ব দিতে হয় না । অনুষ্ঠানটা শেষ হোক তারপর এদের মুখ বন্ধ করছি।”

ইরিনা একটু তাকায় তার দিকে। সে ইরিনার ছোটোখাটো মুখে অসহায়তা দেখতে পায়।এদিকে আদনান সাহেব দূর থেকে সব দেখছিলেন। তার মুখেও কঠোরতা ফুটে ওঠে। তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান। হলঘরের গুঞ্জন তখনও চলছে। তিনি গলা পরিষ্কার করেন।

“একটু শুনুন সবাই।”

গুঞ্জন থেমে যায়। সবাই তাকায় তার দিকে।
তিনি স্থির কণ্ঠে বলেন,

“আজ আমাদের বাড়ির আনন্দের দিন। এই আনন্দের ভেতরে কেউ যদি বিষ মেশাতে চায়, সেটা আমরা মেনে নেব না। ইরিনার অতীত নিয়ে কারও কোনো কথা বলার অধিকার নেই।”

হলরুমে থাকা কিছু মুখ নিচু হয়ে যায়। রহিমা খালা অস্বস্তিতে আঁচল নেড়ে বসেন।

আদনান সাহেব আবার বলেন, “এই বাড়িতে আজ থেকে ইরিনা আমাদের মেয়ে। তার সম্মান মানে আমাদের সম্মান। যে কেউ এ বিষয়ে কটু কথা বলবে, তাকে আমি নিজে এই অনুষ্ঠান থেকে বের করে দেবো ।”

তারপর তিনি এগিয়ে এসে ইরিনার কাঁধে হাত রাখেন।

“মা, আজ থেকে তুমি হাসবে। তোমার চোখে জল মানায় না।”

কৃতজ্ঞতায় ইরিনার চোখ ভিজে ওঠে। সে দ্রুত পলক ফেলে জল সামলায়। তারপর সত্যিকারের একটা হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে। নাজমা বেগম ও তাঁর মুখে হাসি দেখে দূর থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

হলরুমের সবাই আবার আনন্দে মেতে ওঠে। শুরু হয় হলুদ পর্ব।প্রথমে মা, তারপর খালা-চাচিরা বর কনেকে একে একে হলুদ মাখাতে শুরু করে। হলুদের হলুদে তাদের গাল রাঙা হয়ে ওঠে। হলুদের রঙে, হাসির শব্দে আর বিকেলের সোনালি আলোয় যেনো দু’টি জীবনের নতুন অধ্যায়ের প্রথম পাতা নীরবে খুলে গেলো ।

————–

হলুদের পর্ব শেষ হতে প্রায় রাত ৮ টা বাজলো।ঠিক তখনই মাইক্রোফোন হাতে হাজির হলো আদিব।

“এই যে, এত নাচানাচি হচ্ছে, কিন্তু একটা সমস্যা আছে!”

পেছন থেকে পিকু চিৎকার দিলো,
“ভাইয়া আজ আবার বক্তৃতা দেবে নাকি?”

মিকু সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলো ,
“মাইক্রোফোনটা কেউ কাড়ো, না হলে আজকেই বিয়ের বদলে সভা হবে!”

হাসির রোল পড়ে গেলো । আদিব ভ্রু কুঁচকে নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো,
“সমস্যা হলো…তোমরা কেউ নাচছো না কেনো? যদিও আমি একবার নাচ শুরু করলে এখানে কেউ আমাকে হারাতে পারবে না!”

পিকু হাত কোমরে দিয়ে বললো ,

“তুমি আগে নাচো তো দেখি! রিহার্সালের সময় দুই স্টেপ দিয়েই হাঁপিয়ে গিয়েছিলে !

মিকু আবার বলে উঠলো ,
“আর আজকে তো শেরওয়ানি পরে আছো । বেশি লাফালাফি করলে সেলাই ছিঁড়ে যাবে কিন্তু!”

“তোরা দু’জন চুপ কর! আমি আজকে প্রমাণ করব আমি শুধু বর না, আমি ডান্সিং কিং!”

ডিজে গান বাড়িয়ে দিলো । আদিব শুরু করলো এমন এক নাচ, যেটা দেখে বোঝা যায় সে খুব সিরিয়াস… কিন্তু স্টেপগুলো এমন আজব যে সবাই হেসে কুঁকড়ে যাচ্ছে। কখনো ঢোলের তালে অতিরিক্ত জোরে পা ফেলছে, কখনো হাত এমনভাবে ঘুরাচ্ছে যেনো ট্রাফিক পুলিশ।

পিকু পাশে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোন নিয়ে লাইভ কমেন্ট্রি শুরু করলো ,

“দর্শকবৃন্দ, এখন আপনারা যে স্টেপটা দেখছেন, এর নাম ‘হলুদ ঝাড়া স্টাইল’!”

মিকু যোগ করলো ,
“এবং এখন বর সাহেব চেষ্টা করছেন ‘বাঁচাও শেরওয়ানি’ মুভ!”

হলরুমের সবাই হাসিতে ফেটে পড়লো।আদিব এবার নাটকীয় ভঙ্গিতে বললো ,

“ঠিক আছে! পিকু, মিকু—তোরা আয়। দেখি কে বেশি পারে!”

পিকু বললো ,
“আমরা তো রেডি! কিন্তু তুমি হারলে আজকে তুমি সবার সামনে বলবে “আমি ডান্সিং কিং না, ডান্সিং চিকেন!”

পিকু আর মিকু একসাথে এমন এনার্জি নিয়ে নাচ শুরু করলো যে মেঝে কেঁপে উঠলো । দু’জনের কোরিওগ্রাফি একদম মিল কখনো একসাথে ঘুরছে, কখনো হাই-ফাইভ দিয়ে আবার তাল ধরছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে আজব মুখভঙ্গি করছে, যাতে আদিবের মনোযোগ নষ্ট হয়।আদিবও ছাড়ার পাত্র না। সে মাঝখানে ঢুকে নিজের স্টেপ চালু করলো । কিন্তু একবার ঘুরতে গিয়ে প্রায় পিছলে যাচ্ছিলো।সঙ্গে সঙ্গে পিকু চিৎকার দিলো

“ওহ! ‘স্লিপ অ্যান্ড স্লাইড’ এক্সক্লুসিভ পারফরম্যান্স!”

মিকু দ্রুত তার কাঁধ ধরে বললো ,
“কেউ বরকে বাঁচাও! বিয়ে এখনো বাকি!”

আদিবের এ অবস্থা দেখে ইরিনাও হেসে কুটিকুটি হচ্ছে।গান থামতেই তিনজন হাঁপাতে হাঁপাতে থামলো । পিকু মাইক্রোফোন তুলে ঘোষণা দিল,

“জাজমেন্ট অনুযায়ী… বর সাহেব সম্মানসূচক তৃতীয়!”

মিকু গম্ভীর মুখে বললো,

“কারণ প্রতিযোগী ছিল তিনজনই।”

এই কথা শুনে সবাই আবার অট্টহাসি হেসে উঠলো। বেচারা আদিব লজ্জায় দ্রুত স্টেজ থেকে নেমে পড়লো।

চলবে………

আগামী পর্বে আপনাদের জন্য ধামাকা রয়েছে। সবাই কমেন্ট করবেন কিন্তু ❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here