আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_১২

0
35

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১২
(শব্দসংখ্যা ২০০০+)

মধ্যরাতে ফরাজী বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুমটা যেনো মুহূর্তেই এক আদালতে পরিণত হলো। মাঝখানে ভারী সেগুন কাঠের টেবিল, তাঁর চারপাশে সোফা আর চেয়ারের সারিতে বাড়ির সবাই বসে আছে। কাজের মেয়েটা সবাইকে চা সার্ভ করছে। বাড়ির বয়োজ্যৈষ্ঠ সদস্য মনোয়ারা বেগমের কানে ও এই কেলেঙ্কারির খবর অলরেডি চলে গিয়েছে।

মেঘলাকে নিয়ে আসা হলো। নাজমা বেগম তাঁর কাঁধ জড়িয়ে ধরে তাঁর পাশে বসালেন।তাঁর চোখ লাল হয়ে আছে।শাড়ির আঁচল ধরে গুটিসুটি মেরে মায়ের পাশে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।

আরশাদও এসে তাঁর সামনের সোফায় বসলো । তাঁর চোখে মুখেও রাগের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সে কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছেনা। মেঘলার ওই নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকানোর সাহস ও তার হচ্ছে না।

হেনা খাতুন একটু দূরে বসে আছেন। তাঁর চোখে মুখেও চিন্তার ছাপ ভেসে উঠেছে। যদি তাঁর কীর্তিকলাপ ফাঁস হয়ে যায়।

আরশাদের বড়ো মামা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

“এইভাবে তো ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। রাতের বেলা অবিবাহিতা মেয়েকে পর পুরুষের ঘরে পাওয়া গেছে। এটা ফেলনা কোনো বিষয় না।মেয়েটা দেখতে ভদ্র । কিন্তু চরিত্র যে এরকম তা তো জানা ছিলো। অবশ্য এসব মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা এমনই হয়। বড়োলোক ছেলে দেখেই গলায় ঝুলে পড়ার প্ল্যান করে। ”

কথাগুলো পুরো ড্রয়িং রুমে বাতাসে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়লো। নিজের বোনকে নিয়ে এরকম নিচু কথা মাহিরা আর সহ্য করতে পারলো না। সে চিৎকার করে বললো,

“আমার আপু এমন না! আর আমি তো বললাম আপু নিজের রুমেই ছিলো।আমি দেখেছি!”

আরেক আত্মীয় ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
“সত্যিই দেখেছো। না নিজের বোনের দোষ ঢাকতে চাইছো ?”

নাজমা বেগম এবার গর্জে উঠলেন,

“আমার মেয়েকে নিয়ে কেউ একটা বাজে কথা বললে আমি সহ্য করবো না। আমার মেয়েকে আমি ভালো মতোই চিনি।”

কিন্তু ভিড়ের ভেতর ফিসফাস থামলো না। মেঘলাকে নিয়ে আরো কিছু নিচু কথা আরশাদের কানে ধীরে ধীরে ভেসে আসতে লাগলো।

“মেয়েরা এখন অনেক চালাক।”

“নিজে গিয়ে আবার নাটক করছে।”

“বড়োলোকের ছেলে তো তাই ফাঁসানোর চেষ্টা করছে ।”

এইসব কথাগুলো যেনো মেঘলার কানে ধাতব শব্দের মতো বাজতে লাগলো। সে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

“আমি জানি না আমি সেখানে কীভাবে গেলাম। মাঝরাতে ধোঁয়ার গন্ধ পাই, দরজা খুলে ঢুকতেই মাথা ঘুরে পড়ে যাই। এরপর কিছুই মনে নেই।”

এসব শুনে হেনা খাতুনের বুক ধকধক করতে লাগলো।সবাই এবার তাকে ধরবে নাতো?

আরশাদের বড়ো মামী তখন মুখ ভেংচি দিয়ে বলে উঠলেন,

“এখন নতুন নতুন নাটক সাজাচ্ছো। কই আমরা যখন গেলাম তখন তো কোনো ধোয়ার গন্ধ পেলাম না।”

মেঘলার আর কিছু বলার উপায় রইলো না। সত্যিই তো সে যা বলছে তাঁর কোনো প্রমান নেই। সবাই এটাই ভাবছে যে নিজে থেকেই আরশাদের বিছানায় গিয়েছে। আরশাদ নিজের মামীকে ধমক দিয়ে বললো,

“মামী একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? আমি নিজে সবার সামনে বলছি যা ঘটেছে তাঁতে মেঘলার কোনো দোষ নেই। সবকিছুর জন্য আমি দায়ী।”

আরশাদের মতো ছেলের মুখে এমন কথা শুনে সবাই যেনো হতভম্ব হয়ে গেলো। মেঘলা ও অবাক হয়ে আরশাদের দিকে তাকিয়ে রইলো।ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে সামনে এলেন মনোয়ারা বেগম। তাঁর উপস্থিতিতেই যেনো ড্রয়িং রুম একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।

“চুপ করো সবাই।”

তাঁর এক চিৎকারেই আর কেউ সাহস পেল না কথা বলার।তিনি ধীরে ধীরে বললেন,

“মেয়েটাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে। আর তোমরা তাকেই দোষী বানাতে ব্যস্ত? লজ্জা করে না? কেনো ছেলেটার কি দোষ থাকতে পারে না?”

তাঁর কথা শুনে কেউ কেউ মাথা নিচু করলো আবার কেউ চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলো ।মনোয়ারা বেগম এবার আরশাদের দিকে তাকালেন।

“তুই কি এই মেয়েকে অসম্মান করেছিস?”
আরশাদ সোজা হয়ে বসলো।

“না দাদি। কিন্তু যদি এই ঘটনার জন্য কারো সম্মান নষ্ট হয়ে থাকে,তা হলে দায় আমার। ওকে আমার ঘরে পাওয়া গেছে। মানুষ যা দেখেছে তাই বিশ্বাস করবে।”

আরশাদ আবার শান্ত গলায় বললো,

“কারণ সমাজ প্রথমে মেয়েকেই দোষ দেয়। আমি চাই না ওর জীবনটা আজকের রাতের জন্য ধ্বংস হোক।”

আরশাদের এমন সোজাসাপ্টা কথা শুনে কেউ আর কিছু বলার সাহস পেলো না। আরশাদের কথা শুনে মনোয়ারা বেগম গভীর নিঃশ্বাস ফেললেন।

“মান-সম্মান শুধু কথা দিয়ে ফেরানো যায় না। সমাজের মুখ বন্ধ করতে হলে সম্পর্কের নাম দিতে হয়। আজই তোমাদের দুজনের বিয়ে হবে।”

সবাই একসাথে চমকে উঠলো। মিতু ফরাজী তাঁর শাশুড়িকে বললেন।

“এখন?মধ্যরাতে?”

“হ্যাঁ। এখনই। কাজী ডাকো।”
হেনা খাতুনের মুখ শুকিয়ে গেলো। তাঁর পরিকল্পনা পুরোই ভেস্তে গেলো। উল্টো কেয়ার বোকামির জন্য এই বুড়ি মেয়েটা এখন এই বাড়ির বড়ো বউ হয়ে যাবে।

এবার আদনান সাহেব ধীর গলায় নাজমা বেগমকে বললেন,

“আপা এমন একটা ঘটনা ঘটার জন্য আমরা সত্যিই দুঃখিত। আমি আপনার বড়ো মেয়েকে আমার ছেলের জন্য চাইছি। হয়তো আপনার মেয়ের যা ক্ষতি হয়েছে আমরা কখনো তাঁর ভরপাই করতে পারবো না। কিন্তু তারপর ও আপনাকে এই বিয়েতে সম্মতি দেয়ার জন্য অনুরোধ করছি। ৫০ লাখ ১ টাকা দেনমোহর দিয়ে আপনার মেয়েকে আমার ছেলে আরশাদের বউ করে নিতে চাই।”

নাজমা বেগমের সামনে আর কোনো পথ রইলো না। শুধুমাত্র এই বিয়েই তাঁর মেয়ের সম্মান বাঁচাতে পারে। তাঁর মেয়ের প্রতি তাঁর বিশ্বাস আছে। কিন্তু সমাজ তো আর তা বুঝবে না। তাই সে ও অগত্যা এই বিয়েতে রাজি হলো।

কট খাওয়া বিয়ের এতো বেশি দেনমোহর শুনে ড্রয়িং রুমে চাপা গুঞ্জন শুরু হলো ।হেনা খাতুনের চোখে হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। এত বড় অঙ্ক! তাঁর মেয়ের কেনো এমন রাজকপাল হলো না?

কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজী সাহেব এলেন। ড্রয়িংরুমের এক কোণে সাদা চাদর পেতে বর কনেকে বসানো হলো। দুই পক্ষের চার জনকে সাক্ষী হিসেবে নেয়া হলো।মেঘলার চোখে জল থামছে না। চোখে জল নিয়েই সে বললো,

“কবুল,কবুল,কবুল ”

আরশাদ ও স্পষ্ট স্বরে বললো,
“কবুল,কবুল,কবুল ”

তিনবার উচ্চারিত শব্দের সাথে সাথে তাদের জীবন নতুন পথে বাঁক নিলো। এক অজানা ষড়যন্ত্র তাঁদের দুইজনের জীবন পুরোপুরি বদলে দিলো।

বিয়ে শেষ হতেই হেনা খাতুন কেয়ার দিকে তেড়ে গেলেন। ফিসফিস করে বললেন,

“তুই কেনো গেলি না? সব নষ্ট করে দিলি!”

কেয়া এবার আর চুপ রইলো না।

“আমি পাপ করতে চাইনি। তোমার মতো এতো লোভী না আমি।তুমি যা করতে গেছো, তা আজ তোমার সামনেই উল্টো হয়ে গেছে।”

ড্রয়িংরুমে বসে থাকা নতুন দম্পতির দিকে তাকিয়ে কেয়া মনে মনে বললো,

“কিছু না করেও নিজেকে অপরাধী লাগছে।আমার জন্যই আজ ওদের এতো অপমান সহ্য করা লাগছে। এখন শুধু আল্লাহর কাছে আমার একটাই চাওয়া ওদের বিবাহিত জীবন যেনো সুখের হয়।”

বিয়ে শেষে আরশাদ আর মেঘলাকে পাশাপাশি সোফায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। আদিব আর ইরিনা সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে । আরশাদ চুপচাপ মেঘলার দিকে তাকালো। মেঘলার চোখে সে তাঁর জন্য একরাশ ঘৃণা দেখতে পেলো। সে মেঘলাকে নিজের করে চেয়েছিলো। কিন্তু এমন করে তো চায়নি যেখানে মেঘলার চোখে তাঁর জন্য শুধু ঘৃণা থাকবে।

——————-

রাত গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। পুরান ঢাকার ভেজা গলিগুলো তখনো আধো অন্ধকারে ঢাকা বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ, কোথাও কোথাও ড্রেনের পানি জমে আছে।সাদাত চারজন কনস্টেবল আর একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে। খবর এসেছে রাবেয়াকে নাকি গতকাল রাতে এখানে দেখা গেছে।বাড়িটার নিচতলায় তালা ঝুলছে, কিন্তু পাশের সরু সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার পথ খোলা। সাদাত ইশারা করতেই সবাই নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলো।দোতলার করিডোরে একটা দরজা ভেতর থেকে আধখোলা।সাদাত ধীরে ধীরে দরজাটা ঠেলে খুললো।ভেতরে ঢুকতেই সবাই থমকে দাঁড়ালো।

ঘরের মেঝেতে জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়েরয়েছে । একটা চেয়ার উল্টে পড়ে আছে। দেয়ালে রক্তাক্ত হাতের ছাপ। আর ঘরের মাঝখানে রাবেয়ার নিথর দেহ পড়ে আছে ।তাঁর মাথার পাশে জমে থাকা রক্তের স্রোত শুকাতে শুরু করেছে ।

এক কনস্টেবল ফিসফিস করে বললো,
“স্যার,মনে হয় মারা গেছে…”

সাদাত তাড়াতাড়ি হাঁটু গেড়ে বসে হাত রাবেয়ার নাকের কাছে ধরলো। তারপর সে তীক্ষ্ণ স্বরে বললো,

“না! বেঁচে আছে। খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নিছে। অ্যাম্বুলেন্স খবর দাও।”

সাব ইন্সপেক্টর অনন্যা দ্রুত ওয়্যারলেসে অ্যাম্বুলেন্স ডাকলো।সাদাত নিজের রুমাল দিয়ে রাবেয়ার মাথার মাথার ক্ষতস্থানে চাপ দিয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করলো।কিছুক্ষণের মধ্যে পুরান ঢাকার এই সরু গলিতে সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো। রাবেয়াকে স্ট্রেচারে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।

হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে সাদাত আর অনন্যা দাঁড়িয়ে আছে । ডাক্তাররা রাবেয়াকে ভেতরে নিয়ে গেছে ।

অনন্যা ধীরে ধীরে বললো,
“যদি ও কথা বলতে পারে,তাহলে পুরো কেসটার মোড় ঘুরে যাবে।”

সাদাত দাঁত চেপে বললো,
“সেটাই তো বিষয়। কিন্তু যেভাবে ব্লাড গিয়েছে বাঁচবে কিনা সন্দেহ আছে।”

প্রায় এক ঘণ্টা পর অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলে এক মধ্যবয়সী ডাক্তার বেরিয়ে এলেন।সাদাত তাঁর দিকে এগিয়ে গেলো।

“পেশেন্ট কেমন আছে?”

ডাক্তার ক্লান্ত গলায় বললেন,
“আপনারা ভাগ্যবান। রোগীকে সময়মতো এনেছেন। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। মাথায় ও বেশ আঘাত ছিল। আমরা আপাতত ওনার অবস্থা স্থিতিশীল করতে পেরেছি।”

অনন্যার চোখে ক্ষীণ স্বস্তির ছায়া ফুটলো।

“মানে,বেঁচে গেছে?”

ডাক্তার একটু থেমে বললেন,
“হ্যাঁ, প্রাণে বেঁচে গেছে। কিন্তু—”

“কিন্তু কী?”

“ও এখন গভীর কোমায় আছে। কখন জ্ঞান ফিরবে বলা যাচ্ছে না। কয়েকদিন, কয়েক সপ্তাহ এমনকি তার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।”

অনন্যা দেয়ালের সাথে হেলে দাঁড়ালো।হতাশ গলায় সাদাতকে বললো,

“মানে,আমরা এখনো কিছুই জানতে পারবো না।”

“যে এটা করেছে, সে ওর মুখ বন্ধ করতে এসব করেছে। হয়তো সেই আসল খুনি।”

হাসপাতালের কাঁচের দরজার ওপাশে লাইফ সাপোর্টে শুয়ে আছে রাবেয়া। মেশিনের ক্ষীণ শব্দ উঠছে—বিপ… বিপ… বিপ…। সে বেঁচে আছে,কিন্তু নীরবতার সাথে ।আর তাঁর এই নীরবতাই যেন এখন পুরো তদন্তকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দিল।

————

ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে এলো দূরের মসজিদ থেকে। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। জানালার কাঁচে জমে থাকা শিশিরের ফোঁটাগুলো ম্লান আলোয় চিকচিক করছে। রাতের সব কোলাহল যেন এক নিমিষে থেমে গেছে। অথচ সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই দু’জন মানুষের জীবন ওলটপালট হয়ে গেছে।

মেঘলাকে সবাই আরশাদের ঘরে রেখে গেছে । দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। ঘরের মাঝখানে বড়ো খাট, সাদা চাদর, পাশে বুকশেলফ, দেয়ালে কিছু ফ্রেম করা ছবি সবকিছু আগের মতোই আছে, শুধু তাঁদের সম্পর্কের নাম বদলে গেছে।

মেঘলা দরজার কাছে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তাঁর হাতের চুড়িগুলো ঝনঝন শব্দ করছে।এই শব্দটাই এখন যেনো তাঁর কাছে অসহ্য লাগছে।আরশাদ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলো । সে ধীরে ধীরে মেঘলাকে বললো,

“তুমি চাইলে খাটে বসো। আমি—”

“থামুন।”

মেঘলা ধীরে ধীরে ঘুরে তার দিকে তাকালো। সেই চোখে কোনো কোমলতা নেই। আছে জমে থাকা অপমান, রাগ আর অবিশ্বাস।

“আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করবেন না। দয়া করে দূরে থাকবেন।”

আরশাদ নিঃশব্দে মাথা নোয়ালো।

“আমি তোমাকে ছুঁতে যাচ্ছিলাম না।”

মেঘলা তীক্ষ্ণ স্বরে বললো,
“এই পুরো ব্যাপারটাই কি আপনার প্ল্যান ছিলো?”

আরশাদ চমকে তাকালো।
“কি বলছো তুমি?”

“মাঝরাতে আমি ধোয়ার গন্ধ পেলাম তারপর আপনার ঘরে আমাকে পাওয়া গেলো তারপর নায়ক সাজার মতো সবার সামনে দায় নিজের কাঁধে নিলেন।আর শেষে বিয়ে! খুব সুন্দর স্ক্রিপ্ট।”

আরশাদের বুকের ভেতরটা যেন ধসে পড়লো।

“তুমি সত্যিই ভাবছো আমি এমন কিছু করতে পারি?”

“আমি কী ভাববো?” মেঘলার গলা কেঁপে উঠলো। “আমি আমার রুমে ছিলাম। হঠাৎ ধোঁয়ার গন্ধ,তারপর মাথা ঘোরা, তারপর জ্ঞান ফিরলো আপনার বিছানায়! আর তারপর সবাই আমাকে চরিত্রহীন তকমা দিলো।!”

তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। কিন্তু সে হাত
দিয়ে মুছে ফেললো।

“আমার সম্মান নিয়ে খেলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বেশি সুবিধা হয়েছে আপনার।”

“আমার?” বিস্ময়ের সাথে আরশাদের গলা ভারী হয়ে গেলো । “তুমি কি জানো আজকের রাতটা আমার জীবন থেকেও কী কেড়ে নিয়েছে?”

মেঘলা বিদ্রুপমাখা হাসি হাসলো।
“আপনার কিছুই হয়নি । আপনি পুরুষ। সমাজ আপনাকে দোষ দেবে না। সবাই বলবে ছেলে তো সোনার আংটি তাই বাঁকা হলেও সমস্যা নেই।

এই কথাটা আরশাদকে যেন ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেললো।

“তাই তো সবার সমানে সব দোষ নিজের কাঁধে নয় নিয়েছি।সমাজ মেয়েকেই আগে দোষ দেয়। তাই আমি—”

“তাই আপনি বিয়ে করলেন?” আমার মতামতটা একবারও জিজ্ঞেস করলেন না কেউ। আমি কি বিয়ে করতে চেয়েছিলাম?”

“আমি তোমার জীবন নষ্ট হতে দিতে চাইনি।”

বাইরে আবার আজানের শেষ সুর ভেসে এলো। ভোরের আলো একটু একটু করে ঘরে ঢুকছে।

মেঘলা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,

“শুনে রাখুন। এই বিয়ে আমার কাছে কাগজের একটা চুক্তি ছাড়া কিছু না। ঢাকা গেলে আমি আমার মতো থাকবো। নিজের মতো চলবো । আপনার স্ত্রী হিসেবে কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারবো না।আপনার ঘর, আপনার পরিবার সব আপনার। আমি শুধু একটা নাম পেয়েছি। এর বেশি কিছু আশা করবেন না।”

আরশাদ ধীরে জিজ্ঞেস করলো,

“তাহলে আমার জায়গাটা কোথায়?”

“আপনি আমার জীবনের একটা দুর্ঘটনা।”

এই কথাটা শুনে আরশাদের প্রচন্ড রাগ হলো
তবু ও সে নিজেকে সামলে নিলো।

“আমি যদি বলি,আমি তোমাকে ভালোবাসি?”

“ভালোবাসা?”ভালোবাসা কি এভাবে শুরু হয়? অপমান দিয়ে? সন্দেহ দিয়ে? জোর করে বিয়ে দিয়ে?”

আরশাদ ভাঙা গলায় বললো,
“আমি কখনো চাইনি এমন হোক। আমি তোমাকে সম্মান করি।”

“সম্মান? আমাকে আপনার বিছানায় পাওয়া গেল। সবাই যা-তা বললো। আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর বিয়ে করলেন। এটাই সম্মান?”

“তুমি কি দেখোনি সবাই তোমাকে কীভাবে কথা শোনাচ্ছিলো ?বাদ দেও এসব।তুমি খাটে শুয়ে পড়ো। সারা রাত ঘুমাওনি।”

“আপনি?”

“আমি নিচে শুয়ে যাবো।”

মেঘলা অবাক হয়ে তাকালো।
“নাটক করার দরকার নেই।”

আরশাদ শান্ত গলায় বললো,
“নাটক না।তুমি নিরাপদ বোধ করো এটাই চাই।”

মেঘলা আর কিছু বললো না।সে খাটের একদম শেষ প্রান্তে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে পড়লো।
আরশাদ আলমারি থেকে একটা বালিশ আর চাদর বের করলো। মেঝেতে কার্পেটের ওপর বালিশ রেখে শুয়ে পড়লো।

ঘরের মাঝখানে এক অদৃশ্য দেয়াল দাঁড়িয়ে গেলো।
ভোরের আলো এখন পুরো ঘর ভরিয়ে দিয়েছে। দূরে রাস্তার ভ্যানে সবজি বিক্রেতার হাঁক শোনা যাচ্ছে। একটা নতুন সকাল শুরু হলো কিন্তু তাদের জীবনে কোনো উষ্ণতা নেই।মেঘলার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো। ক্লান্তি তাকে টেনে নিয়ে গেলো ঘুমের দিকে। চোখের কোণে তখনও শুকনো লবণাক্ত দাগ।
মেঝেতে শুয়ে থাকা আরশাদ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার বুকের ভেতর ভারী পাথর চাপা পড়ে আছে। সে নিজমনে ফিসফিস করে বললো,

“আমি তোমাকে পেয়ে ও হারিয়ে ফেললাম।আমি তোমাকে হারাতে চাইনি ।”

চলবে…..

রোজার জন্য বার বার রাইটিং ব্লকে চলে যাচ্ছি তারপর ও লেখার চেষ্টা করছি। বিশাল পর্ব দিলাম আজকে। যারাই পড়বেন একটু রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন। সেহরির মধ্যে ৫০০+রিয়েক্ট হলে কাল সকালেই আরেক পর্ব দিয়ে দিবো। আসলে গল্পে রিচ বেশি দেখলে লেখার জন্য বেশি উৎসাহ পাই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here