আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_১৩

0
41

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_১৩
(শব্দসংখ্যা ১৪০০+)

বেলা গড়াতেই ফরাজী বাড়ির আঙিনায় অদ্ভুত এক অস্থিরতা নেমে এলো। সকালটা শুরু হয়েছিলো উৎসবের রঙ দিয়ে , কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই পরিবেশ যেনো ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। দুপুরে আদিব আর ইরিনার বিয়ের সব আয়োজন যখন প্রায় চূড়ান্ত ঠিক তখনি কোলাহলের মাঝে হঠাৎ এক শূন্যতার খবর ছড়িয়ে পড়লো।মেঘলাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রথমে কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিলো হয়তো নিজের ঘরে আছে, কিংবা ছাদে গিয়েছে। কিন্তু মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টা হতে না হতেই উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়লো সবার মুখে। ঘরের দরজা খোলা, আলমারিতে কাপড় ঠিকঠাক, বিছানার পাশে ওর প্রিয় বইটা যেমন ছিলো তেমনই আছে। ড্রেসিং টেবিলে চিরুনি, চুড়ি, এমনকি ফোনের চার্জারটাও পড়ে আছে। মনে হচ্ছে যেনো সে হঠাৎ করে বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

নাজমা বেগম এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে বেড়াতে লাগলেন।বারবার মেয়ের নাম ধরে ডাকলেন। কিন্তু কোথাও কোনো সাড়া না পেয়ে তাঁর কণ্ঠ ভেঙে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দু’দুবার জ্ঞান হারালেন । বাড়ির মহিলারা তাঁকে সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ।

আরশাদ মুখ গম্ভীর করে একে একে সব জায়গায় লোক পাঠানো শুরু করলো। ড্রাইভারকে পাঠানো হলো বাসস্ট্যান্ডে, আর একজনকে রেলস্টেশনে, আরেকজনকে আশেপাশের এলাকায় । আদনান সাহেবও গাড়ির চাবি হাতে নিলেন। তাঁর চোখেমুখে উদ্বেগ ছাপ স্পষ্ট দেখা গেলো । গত রাতের ঘটনাগুলো সবার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়েটা কি অতো বেশি অপমান সহ্য না করতে পেরে কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেললো?

বিয়ের বাড়ি মুহূর্তে যেনো শোকের আবহে ঢেকে গেলো। ইরিনা নিজের ঘরে বসে নীরবে কাঁদছিলো। তাঁর নিজেকে খুব অপয়া মনে হচ্ছিলো। আনন্দের দিন যে এমন অস্থিরতায় রূপ নেবে, বাড়ির কেউ সেটা কল্পনাও করেনি।

মিহির নিচের ড্রয়িংরুমে সোফায় মাথা নিচু করে বসে ছিলো। হঠাৎ তাঁর ফোনে অপরিচিত নাম্বারের কল দেখে সে কিছুটা চমকে উঠলো। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মেঘলার বেস্টফ্রেন্ড নীরার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“হ্যালো, মিহির বলছো?”

“জি আপু…”

“মেঘলা আজ সকালের ফ্লাইটে ঢাকায় এসেছে। ও এখন আমার বাসায় আছে। তোমরা দুশ্চিন্তা করো না।”

কথাগুলো শুনে যেনো মিহিরের বুকের ওপর থেকে বিশাল এক পাথর সরে গেলো। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বললো,

“আপু, এখানে একটু ঝামেলা হয়ে গেছে…”

“ ওর কাছ থেকে সব শুনেছি। ও এখন ঘুমাচ্ছে । তোমরা বিয়ের কাজ শেষ করে ধীরে সুস্থে ঢাকায় এসো। সেই পর্যন্ত ও আমার কাছেই থাকবে।”

ফোন কেটে দেওয়ার পর কয়েক সেকেন্ড মিহির স্থির হয়ে বসে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে খবরটা জানালো। মেঘলা নিরাপদে আছে জেনে তখন বাড়ির ভেতর চাপা স্বস্তির ঢেউ বয়ে গেলো।

দুপুরের বিয়ে একদম ছোট পরিসরে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই ইতিমধ্যে চলে এসেছিলেন, তাই অনুষ্ঠান বাতিল করা গেলো না। কিন্তু জাঁকজমকতা অনেকটাই কমিয়ে আনা হলো। কাজি সাহেব এসে নিরবে আকদ সম্পন্ন করলেন।একদম সীমিত আনুষ্ঠানিকতার সীমায় বিয়েটা শেষ হলো। অতিথিরাও পরিস্থিতি বুঝে সংযত রইলেন। বিকেলের দিকে সবাই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলো।গোধূলি লগ্নে গাড়িগুলো একে একে বেরিয়ে পড়লো ফরাজী বাড়ির ফটক পেরিয়ে। আকাশ তখন নিজের রঙ বদলাচ্ছে। দিনের আলো নিভে গিয়ে সন্ধ্যার ছায়া নামছে ধীরে ধীরে। এই বাড়িতে গত কয়েক দিনের হাসি, কান্না, অপমান, ভালোবাসা সবকিছু মিলেমিশে আরশাদের জন্য এক অদ্ভুত স্মৃতি হয়ে রইলো।আরশাদ গাড়িতে ওঠার আগে একবার ঘুরে তাকালো বাড়িটার দিকে। মেঘলার সাথে ঘটা কিছু ভালো খারাপ স্মৃতি তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠলো। এই গোধূলি বেলায় সে নিজেই নিজের সাথে ওয়াদা করলো যেভাবেই হোক সম্পূর্ণ সম্মানের সাথে সে মেঘলাকে আবার এই বাড়িতে নিয়ে আসবে।

——————

রাত প্রায় দশটা ছুঁইছুঁই যখন মেঘলার ঘুম ভাঙলো। ঘুম ভাঙার পরও মাথার ভেতর অগোছালো চিন্তাগুলো যেনো কুয়াশার মতো ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিছানায় কিছুক্ষণ স্থির বসে থেকে সে ধীরে ধীরে উঠে বাথরুমে ঢুকলো। লম্বা সময় ধরে গরম পানির নিচে দাঁড়িয়ে রইলো। যেনো শরীরের সাথে সাথে ভেতরের অস্থিরতাগুলোও ধুয়ে ফেলতে চাইছে। তবু কিছু ভাবনা এমনভাবে আঁকড়ে থাকে, যা পানি দিয়েও আলগা করা যায় না। গোসল করে বের হতেই দেখলো নীরা কফি নিয়ে সোফায় বসে আছে। সে ও নীরার সামনের সোফায় কফি নিয়ে আয়েশ করে বসলো। সে আরাম করে প্রথম চুমুক বসাতেই নীরা তাকে জিজ্ঞেস করে উঠলো,

“তা এই এক্সিডেন্টলি হওয়া বিয়েটা নিয়ে তোর ফিউচার প্ল্যান কি?”

“এটাকে আদৌ তোর বিয়ে বলে মনে হয়?আপাতত তো ডিভোর্স নেয়া যাবে না। ৬ মাস পর আমি মিউচুয়াল ডিভোর্স এর জন্য এপ্লাই করবো।”

“কিরে ভাই তুই কি পাগল নাকি?”

“কেনো?”

“এতো ভালো সুযোগ পেয়েছিস তোর তো কাজে লাগানো উচিত? ছেলের কোন দিক থেকে কমতি আছে? এএসপি আরশাদ ফরাজী তাঁর ক্যারিয়ারে ঠিক কতটা সফল সেই ধারণাই তোর নেই। ওই নাবিল ব্যাটা যদি জানতে পারে না যে তো আরশাদ ফরাজীর সাথে বিয়ে হয়েছে তাহলে শালা লুচির মতো ফুলবে।”

“ভাই ধরে বেঁধে বিয়ে দিয়েছে। এটা কোনো বিয়ের মধ্যে পড়ে না । আর সেদিন রাতের ঘটনার সত্যতা আমি এখনো জানি না। আমার মনে হয় উনিই এমন করেছে।”

“তোকে আমাদের সার্কেলে সবচেয়ে ম্যাচিউর ভাবতাম। কিন্তু এখন তো দেখি ছেলেমানুষি তোর মধ্যেই বেশি। উনি যদি আসলেও গিল্টি হতো তাহলে উনি তো আর সব দোষ নিজের উপর নিয়ে নিতো না?”

“তাও ঠিক। যাই হোক আসলে এই বিয়েটাই আমি মানতে পারছি না। আমি জাস্ট এই সম্পর্কটা থেকে মুক্তি চাই।”

“ধ্যাত, বোকা মেয়ে। এতো ভালো অপশন লাইফে সবাই পায়না। আর ১ মাস পর ওই চিটার নাবিলের বিয়ে। জাস্ট চিন্তা কর দুলাভাইকে নিয়ে যদি ওর বিয়েতে চলে যাস তখন ওর রিয়েকশনটা কেমন হবে। ও বিয়ের দিন নতুন বউ দেখার বদলে চোখে সর্ষে ফুল দেখা শুরু করবে।”

নীরার দেয়া আইডিয়ার বিপক্ষে মেঘলা যেই না কিছু বলতে যাবে এর মধ্যেই বাসার নিচে গাড়ির শব্দ পাওয়া গেলো। মেঘলার পরিবারের সদস্যদের আরশাদ এয়ারপোর্ট থেকে ড্রাইভ করে নিয়ে এসেছে। আরশাদ গাড়ির দরজা খুলে নাজমা বেগমকে বললো,

“আন্টি এখানেই নামবেন। একবারে বাসার সামনেই নামতেন?”

“আরেহ বাবা ২ বিল্ডিং পরেই তো বাসা । তুমিও বাসায় চলো আমাদের সাথে।”

“না আন্টি অন্য একদিন যাবো।”

এবার নাজমা বেগম কিছুটা ইতস্তত করে বললেন,

“বাবা বুঝতেই তো পারছো বিয়েটা কিভাবে হয়েছে। তারপর ও আমি ওকে বোঝানোর চেষ্টা করবো। তুমি একটু আমাকে কিছুদিন সময় দেও।”

“আহা, আন্টি। আপনাকে এসব নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। ও অনেক ম্যাচিউর একটা মেয়ে। আসা করি রাগটা কমলে ও নিজে নিজেই বুঝতে পারবে।”

কথাগুলো শুনে নাজমা বেগম কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। বয়স তিরিশ ছুঁইছুঁই এই ছেলেটার কিন্তু ভেতরের পরিপক্বতা চোখে পড়ার মতো।বিয়েটা যেভাবেই হোক আরশাদ পাত্র হিসেবে যে দশে দশ তাঁতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন তাঁর মেয়েটা বুঝলেই হলো। ইদানিং তার শরীরটাও বেশি ভালো যাচ্ছে না।বাপহারা এই মেয়েটার একটা সুখের সংসার দেখে যেতে পারলে সে মরেও শান্তি পাবে।

—————

পরদিন ঢাকার আকাশে হালকা ধোঁয়াটে রোদ উঠেছে,রাস্তার মোড়ে মোড়ে অফিসগামী মানুষের ভিড় যেনো উপচে পড়ছে । শহর নিজের গতিতে ছুটছে, কারও ব্যক্তিগত অস্থিরতার জন্য সে এক মুহূর্তও থেমে নেই।মেঘলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলটা গুছিয়ে নিলো। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ থাকলেও সেটাকে কনসিলার দিয়ে দক্ষ হাতে আড়াল করলো। আজ অনেক কাজ তার,রেস্টুরেন্টে নতুন মেনু টেস্টিং হবে।ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা সে কাজের টেবিলে নিয়ে যেতে চায় না। তাই নিজের ব্যাগ কাঁধে তুলে রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লো।অন্যদিকে আরশাদও প্রস্তুত হচ্ছিল অফিসের জন্য। আজকে একটা পুলিশ কোয়ার্টারের কনস্ট্রাকশন সাইটে তদন্তের জন্য যেতে হবে তাকে।কিন্তু গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে কিছু দূর যেতেই ট্রাফিকের চাপে থেমে যেতে হলো। তদন্ত শুরু হবে সকাল ১০ টায়। কনস্ট্রাকশন সাইটে দ্রুত পৌঁছাতে মেট্রোরেলই তার কাছে তখন বেস্ট অপশন মনে হলো।

স্টেশনে পৌঁছে টোকেন নিয়ে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতেই তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। কয়েক গজ দূরে মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। সাদা কুর্তির সাথে নীল দুপাট্টা পড়েছে মেয়েটা, খোলা চুলগুলো পুরো পিঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে। হঠাৎ দু’জনের দৃষ্টি কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক হলো , কিন্তু তারপরই দু’জনেই যেনো অচেনা ভঙ্গিতে একে অপরের থেকে চোখ সরিয়ে নিলো।

ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকতেই সবার হুড়োহুড়ি শুরু হলো। অফিস টাইম তাই মানুষের বিশাল ঢল । সবাই ভেতরে ঢোকার পর দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও ঠিকমতো নেই । মেঘলা দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে উপরের রড ধরার চেষ্টা করছিলো। ভিড়ের চাপে তার শরীর দুলে উঠছিলো বারবার।ঠিক তখনই আরশাদ এগিয়ে এলো। কোনো কথা না বলে সে এমনভাবে দাঁড়ালো যাতে মেঘলা তার সামনে থাকে, আর চারপাশের ভিড় সব তার নিজের উপর থেকে যায় । এক হাতে রড ধরলো, আর অন্য হাত সামান্য প্রসারিত করে মেঘলার দুই পাশ থেকে আসা ভিড় ঠেকাতে লাগলো।
ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ এক লোক অস্বাভাবিকভাবে মেঘলার কাছাকাছি সরে এলো। আরশাদের চোখ সেটা এড়িয়ে গেলো না। সে এক সেকেন্ডও নষ্ট করলো না। কাঁধ ঘুরিয়ে নিজের অবস্থান বদলে এমনভাবে দাঁড়ালো যাতে লোকটা সরাসরি তার মুখোমুখি পড়ে। আরশাদকে এমন মুখোমুখি দাঁড়াতে দেখে লোকটা ও অস্বস্তিতে সরে গেলো।মেঘলা সব বুঝতে পারছিলো। তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছিলো।অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছিলো তার মধ্যে।এই মানুষটাকে সে মানতে চায় না, সম্পর্কটাকে ও সে অস্বীকার করতে চায়। অথচ এই মানুষটাই ভিড়ের মধ্যে তার জন্য এক অদৃশ্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ট্রেন হঠাৎ ব্রেক কষতেই কয়েকজন সামনের দিকে হেলে পড়লো। মেঘলাও ভারসাম্য হারাতে যাচ্ছিলো। ঠিক তখনই আরশাদ তাকে সামলে নিলো।আর তার হাত ছেড়ে নিচু স্বরে বললো,

“সাবধানে দাঁড়াও,”

মেঘলা তার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিলো।

“আমি দাঁড়াতে জানি, আপনার শেখানো লাগবে না।”

আরশাদ বুঝতে পারলো এ মেয়ে সহজে লাইনে আসবে না। তাই আরশাদ কিছু বললো না। পরের স্টেশনে ভিড় আরও বাড়লো। এবার এক কিশোরী মেয়েকে ভিড়ের চাপে অস্বস্তিতে পড়তে দেখে আরশাদ তাকে একটু জায়গা করে দিলো। মেঘলার চোখে ও সেই দৃশ্য ধরা পড়লো।কয়েক স্টেশন পর মেঘলার নামার পালা এলো।কিন্তু লোকজনের ভিড়ে দরজার দিকে এগোনোই কঠিন হয়ে গিয়েছে। তারপর ও আরশাদ ভীর ঠেলে তাকে নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলো।যদিও মেঘলা যাওয়ার সময় তাকে নূন্যতম একটা ধন্যবাদ ও দিলো না।

চলবে…..

গল্প রিলেটেড কোনো পোস্ট করতে চাইলে লামিয়া’র গল্পকথা গ্রুপে পোস্ট করতে পারেন :
গ্রুপ লিংক:
https://facebook.com/groups/3532259070436906/

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here