#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#সমাপ্তি_পর্ব
(শব্দসংখ্যা ১৩০০)
জীবনের দীর্ঘ ২৭ বছর পরে অবশেষে মেঘলার জীবনে বসন্ত এলো। হ্যা আজ মেঘলার বিয়ে। তবে এবার বিয়েটা কিন্তু মেঘলাদের বাসায় হচ্ছে। নাজমা বেগম নিজের বাসা থেকে মেয়ে বিদায় দিতে চান। তাই ফরাজী পরিবারের সদস্যরা ও তার ইচ্ছে পূরণে এবার ঢাকায়ই বিয়ের অনুষ্ঠান করতে সম্মতি দিয়েছে।
মেঘলাদের বাসায় সকাল থেকেই হুলুস্থূল অবস্থা। পুরো বাসা মেহমান দিয়ে গিজগিজ করছে। এতো কোলাহলের মাঝে ও মেঘলার ঘুম ভাঙতে ভাঙতে প্রায় সকাল ১১ টা বাজলো। যদিও তার ঘুম ভাঙলো মাহিরার আলমারি খোলার আওয়াজে। মেঘলা ঘুম ঘুম চোখে বেশ বিরক্তি নিয়ে বললো,
“সকাল সকাল এতো শব্দ করছিস কেনো?”
“এই যে উডবি নতুন বউ আপনার হয়তো ধারণা নেই যে এখন সকাল গড়িয়ে দুপুর হতে চলেছে। আর আমি আলমারি আপনার প্রয়োজনেই খুলেছি। তোমার ভাই মিহিরকে ফুল আনতে পাঠিয়েছিলাম। সে উল্টাপাল্টা কালার নিয়ে এসেছে। ”
মিহিরের উল্টাপাল্টা ফুল আনার কথাটা শোনামাত্রই মেঘলা লাফিয়ে উঠে বললো,
“আমার লেহেঙ্গার সাথে পড়ার জন্য যে ফুল লাগবে?”
“হ্যা, হোয়াইট রোজের জায়গায় পিঙ্ক রোজ নিয়ে এসেছে। ”
“ওকে পাঠানোই ভুল হয়েছে। পিঙ্ক রোজ কি মানাবে?”
“ডোন্ট ওরি আপু। আমি এখন বের হয়ে হোয়াইট রোজ নিয়ে আসবো আর সাথে এই লেহেঙ্গার ব্লাউজ টাও একটু চাপিয়ে নিয়ে আসবো ট্রেইলার কাছ থেকে।”
“ঠিক আছে যা, দেরি করিস না।”
“রিলাক্স,এতো অস্থির হওয়া লাগবে না। সেই সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। আমি দুপুরেই মধ্যেই ফিরে আসবো।”
—————
রাস্তায় বের হয়ে মাহিরার মেজাজ বেশ গরম হয়ে গেল। রাস্তায় একটা রিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না। হুট করেই নজরে বেশ পরিচিত একটা গাড়ি পড়লো। তাই সে হাতের ইশারা দিয়ে গাড়িটাকে থামালো। গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসা রওনক বেশ হাসিমুখে তাকে জিজ্ঞেস করল,
” আরেহ মিস মাহিরা আপনি? ওহ সরি এখন তো সম্পর্কে আপনি আমার বেয়াইন হন। কিন্তু এভাবে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? ”
“একটু শাহবাগে যাওয়া লাগবে। আপনি কি আমাকে লিফট দিতে পারবেন শাহবাগ পর্যন্ত?”
” অবশ্যই দিতে পারব,উঠে আসেন। ”
মাহিরা গাড়ির দরজা খুলে রওনকের পাশে সিটে বসলো। হুট করে রওনক মাহিরাকে বলে বসলো,
” একটা বিষয় দেখেছেন, আপনার যখনই লিফটের দরকার হয় কিভাবে যেনো হুট্ করে আমি আপনার সামনে এসে পরি। ”
” সেটা তো ঠিক। মনে হয় আগের জন্মে আপনি আমার ড্রাইভার ছিলেন। ”
মাহিরার কথা শুনে রওনক বোকা বনে গেল। এই মেয়ে শেষমেষ তাকে ড্রাইভার বানিয়ে দিল।
” শেষমেষ আমাকে ড্রাইভার বানিয়ে দিলেন আপনি? তবে আপনি চাইলে আপনার পার্সোনাল ড্রাইভার কিন্তু হতেই পারি। ”
কথাটা শোনা মাত্র মাহিরার কান থেকে যেন গরম ধোয়া বের হলো। সে তোতলাতে তোতলাতে রওনককে বললো,
” এসব কি..কি বলছেন আপনি? ”
” ঠিক আছে সোজা ভাষায় বলি। আসলে সেলেব্রেটি হওয়ার পর আপনি প্রথম মানুষ যে আমাকে একজন সাধারণ মানুষের মতো ট্রিট করেছে। সো টেকনিক্যালি আপনার প্রতি আমার লাভ এট ফার্স্ট সাইট টাইপের কিছু হয়ে গেছে। তবে লাস্ট কয়েকদিন আপনাকে ক্যারেক্টার বিশ্লেষণ করে যা বুঝলাম আপনি সেলিব্রেটিদের একদমই পছন্দ করেন না। কারণ আপনার ধারণা সেলিব্রেটিরা সবাই এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ারে জড়িয়ে যায়। ”
রওনকের কথা শুনে মাহীরা তার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো। এই লোক তার ব্যাপারে এত কিছু জানলো কিভাবে। রওনক আবার বলতে শুরু করলো,
” বাট ডোন্ট ওরি। আমি খুব শীঘ্রই এই গানের জগত ছাড়তে যাচ্ছি। কারণ আমার অলরেডি কিছু ব্যবসা আছে। সেগুলো আমি সম্পূর্ণ সেটাপ করে ফেলেছি। তাই ফিউচারে গান না গাইলে ও বউয়ের ভরনপোষণ নিয়ে সমস্যা হবে না। ”
” বাবাহ আপনি দেখছি পুরো ফিউচার নিয়ে ভেবে রেখেছেন। ”
” হ্যাঁ, দেখেন আমি আপনাকে নিয়ে সম্পূর্ণ সিরিয়াস। এখন বাকি সব সিদ্ধান্ত আপনার উপর। ”
ইতিমধ্যে গাড়ি শাহবাগে এসে পৌছালো।গাড়ি থেকে নামার আগে মাহিরা রওনককে বলল,
“আমার ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার অভ্যাস আছে। কানে তুলো দিয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিন।”
রওনক প্রথমে মাহিরার কথার মানে না বুঝতে পারলেও পর মুহূর্তেই সবটা বুঝে গেল। এ বেশ হাসি মাখা মুখে মাহিরাকে বলল,
” আরশাদ ভাইয়ের বিয়ের ঝামেলাটা শেষ হলেই মিতা মাকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তোমাদের বাসায় পাঠাবো। মিসেস রওনক হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে যাও।”
মাহিরার তার কথার মানে বুঝতে বেশি দেরি হলো না।
তাই তো সে রওনকের দিকে তাকিয়ে হালকা মুচকি হেসে ফুলের দোকানের দিকে চলে গেল।
———————
প্রেগনেন্সি কীটে দুইটা লাল দাগ ভেসে উঠতেই ইরিনা মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলো । সে প্রেগনেন্সি কীটটা হাতে নিয়ে আদিবের পিছনে এসে দাঁড়ালো। আদিব ল্যাপটপে বসে কাজ করছিলো। হুট্ করেই ইরিনা তার সামনে প্রেগনেন্সি কীটটা তুলে ধরলো। হুট্ করে আদিব যেনো কিছুক্ষনের জন্য একদম চুপ হয়ে গেলো। ইরিনা আদিবের ভাব ভঙ্গি বুঝতে পারলো না। লোকটা এমন চুপ করে আছে কেনো? লোকটা কি খুশি না? ইরিনা আদিবকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,
“আপনি কি খুশি হননি? ”
আদিব হুট্ বেশ জোরেই ইরিনাকে জড়িয়ে ধরলো।
“ধ্যাত, কি বলছো? আজকের মত খুশি আমি আমার পুরো লাইফে হইনি। আমি বাবা হচ্ছি এর চাইতে ভালো নিউজ আর কি হতে পারে? আমি অনেক হ্যাপি। লাভ ইউ ওয়াইফি।”
“লাভ ইউ টু।”
“শোনো আজকে কিন্তু বিয়েতে গিয়ে একদম লাফালাফি করবে না। ইশ কালকে হলুদের অনুষ্ঠানে তো তোমার উপর অনেক ধকল গিয়েছে। চলো চলো এখনি ডাক্তারের কাছে যাই। ”
“আপনি কি পাগল হয়ে গিয়েছেন? আজকে বাসায় বিয়ের অনুষ্ঠান। কাল যাবো।এখন আপনি আমাকে একটু জোড়ে জড়িয়ে ধরুন, আমার অনেক কান্না পাচ্ছে।”
“কেনো কান্না পাচ্ছে তোমার?”
“আদিব এতো সুখ আল্লাহ আমার কপালে লিখেছে তা আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। আপনার মত ভালো স্বামী। এখন আবার আমি মা হবো। সব মিলিয়ে আমার খুশির কান্না পাচ্ছে।”
“একদম কান্না করবে না। আমার বেবির কষ্ট হবো। কেবল তো সবকিছুর শুরু।তুমি এখন শুধু রিলাক্সে থাকবে। আর আমি এই পৃথিবীর সমস্ত সুখ আমি তোমার কাছে এনে দেবো।”
——————-
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে ফরাজী পরিবারের সদস্যদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১ বাজলো। মেঘলা বেডরুমে ঢুকেই নিজের মাথার লম্বা ওড়নাটা খুলে বেডে ছুড়ে মারলো। আরশাদ তার কান্ড দেখে হেসে বললো,
“বাহ্, ম্যাডামের দেখছি বেশ কষ্ট হয়ে গেছে।”
“তো কষ্ট হবে না। বিশ কেজি ওজনের লেহেঙ্গা সেই বিকাল থেকে পরে আছি।আর কারো বউ হওয়ার শখ নেই।”
আরশাদ এবার মুখ গোমড়া করে বললো,
“তুমি কি আরো কারো বউ হতে চাও?”
“একদমই না। আমি সারাজীবনই আরশাদ ফরাজীর বউ হয়ে থাকতে চাই।”
মেঘলার কথা বলা শেষ হতেই আরশাদ তার কপালে টুপ্ করে একটা চুমু খেলো।
” বাহিরে যাবে? ”
“এতো রাতে?”
“তো কি হয়েছে? তোমার এএসপি হাসব্যান্ড তোমাকে প্রটেকশন দেয়ার জন্য ২৪/৭ রেডি আছে।”
———————–
গাড়িটা ধীরে ধীরে হাইওয়ের ফাঁকা রাস্তায় এগিয়ে যাচ্ছে। চারপাশে পিনপিন নিস্তব্ধতা। চারপাশে শুধু স্ট্রিটলাইটের হলুদ আলো আর মাঝে মাঝে দূরের কোনো গাড়ির ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে । ড্রাইভিং সিটে আরশাদ, আর পাশে বসে মেঘলা বসে আছে। মেঘলা ইতিমধ্যে তার গায়ের ভারী গয়না খুলে ফেলেছে।
মেঘলা জানালার কাঁচে মাথা ঠেকিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। হালকা বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। আরশাদ তার দিকে এক নজর তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
“কি দেখছো এভাবে?”
আরশাদ বেশ নরম গলায় মেঘলাকে জিজ্ঞেস করলো।মেঘলা বেশ মৃদু স্বরে বললো,
“জানি না। আজকে সবকিছু একটু অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে, এই শহরটাও যেন নতুন।”
আরশাদ গাড়ির গতি একটু কমিয়ে দিয়ে বললো,
“নতুন তো হবেই।আজ থেকে আমাদের লাইফের নতুন অধ্যায় শুরু।”
মেঘলা হালকা হেসে তার দিকে তাকালো।
“আপনার সাথে থাকলে সবকিছুই নতুন নতুন লাগে।”
হঠাৎ আরশাদ এক হাত দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে রেখে অন্য হাতটা মেঘলার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,
“এইদিকে আসো।”
মেঘলা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“ড্রাইভ করতে করতে রোমান্স করার চেষ্টা করবেন না, প্লিজ!”
আরশাদ হেসে ফেললো।
“আরে, শুধু হাতটা ধরবো।এটাও কি অপরাধ?”
মেঘলা কিছু না বলে নিজের হাতটা আরশাদের দিকে এগিয়ে দিল। মেঘলার হাতটা নিজের হাতে জড়িয়ে নিয়ে আরশাদ বললো,
“জানো, আজকে তোমাকে বিয়ের সাজে দেখে আমার সত্যি ভয় লাগছিল।”
“ভয়?”
আরশাদের কথা শুনে মেঘলা অবাক হয়ে তাকালো।
“হ্যা। মনে হচ্ছিলো, এত সুন্দর একটা মেয়েকে আমি ডিজার্ভ করি তো?”
“এত রোমান্টিক ডায়লগ শিখলেন কোথা থেকে?”
“সত্যি বলছি।”
আরশাদ এবার সিরিয়াস গলায় বললো,
“তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্ত।”
আরশাদের কথা শুনে এবার মেঘলার চোখ একটু ভিজে উঠলো। সে ধীরে ধীরে মাথাটা আরশাদের কাঁধে রেখে দিল। কিছুক্ষণ পর মেঘলা ফিসফিস করে বললো,
“এই মুহূর্তটা থেমে গেলে ভালো হতো।”
আরশাদ মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“থামবে না।তবে আমি তোমার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত এমনই সুন্দর করে রাখবো, প্রমিস।”
এবার মেঘলা আবার লজ্জা মাখা হাসি হেসে আরশাদের কাঁধে মাথা রাখলো। নিস্তব্ধ রাস্তায় গাড়ি সামনের দিকে এগিয়ে চললো। আর গাড়ির ভেতরে থাকা দুটি মানুষ হাতে হাত রেখে এগিয়ে চলল নতুন জীবনের দিকে।যাদের কিনা শুরু থেকেই বিধাতা একে অপরের নিয়তিতে লিখে রেখেছিলো।
সমাপ্ত❤️
একদম মন খারাপ করবেন না। মাঝে মাঝে আপনাদের জন্য সারপ্রাইজ পর্ব নিয়ে আসবো। আরশাদ আর মেঘলা আমার হৃদয়ের খুব কাছের দুটি চরিত্র। হয়তো নতুন কোনো গল্পে আরশাদ আর মেঘলাকে নিয়ে আমি আবার আপনাদের কাছে ফিরবো। আশা করি আমার সামনের গল্পের চরিত্র গুলোকে ও আপনারা ওদের মত সেইমভাবে ভালোবাসা দিবেন।

