#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৩৪
(শব্দসংখ্যা ১২৫০+)
বেশ অনেকদিন পরে আরশাদ পুলিশ হেডকোয়ার্টারে এলো। অসুস্থ শরীর নিয়ে এ অবস্থায় ও তাঁর এখানে আসার কারণ হচ্ছে সিনথিয়া জামান আর তাঁর সহযোগী তুবা হক। যেহেতু আরশাদ প্রথম দিন থেকেই এই কেসের ইনভেস্টিগেশন করেছে তাই একমাত্র সেই ঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে।
যদিও আইনে দুই আসামীকে এক জায়গায় বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার নিয়ম নেই কিন্তু এই কেসটা এতটাই জটিল যে সিনথিয়া জামান আর তুবা হককে এক জায়গায় বসে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। প্রায় আধঘন্টা যাবত সিনথিয়া জামান আর তুবা হককে এক রুমে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ইন্সপেক্টর সাদাত আর অনন্যা মিলে তাঁদের আচরণের উপর সর্বক্ষণ নজর রাখছে।ইনভেস্টিগেশন রুমে আরশাদ প্রবেশ করতেই তারা দুজনেই নড়েচড়ে বসলো। আরশাদ চেয়ারে বসে এই কেসের ফাইলটা তাঁদের দুজনের সামনে খুলে রেখে বললো,
“মিস তুবা হক আর মিস সিনথিয়া জামান। একজন নামকরা বিজনেস ওমেন অপরজন স্টাব্লিশড ডাক্তার। এই সতেরো জন আসলে এমন কি ভুল করেছিলো যার জন্য আপনারা এভাবে নির্মমভাবে তাঁদের হত্যা করলেন?”
আরশাদের কথা শুনে তারা দুজনেই মাথা নিচু করে রইলো।
“মাথা নিচু করে রেখে কোনো লাভ নেই। কারণ আপনাদের ক্রাইম করার এভিডেন্স এখন আমাদের হাতে আছে। সিনথিয়া জামানের তো একদম লাইভ মার্ডারের ভিডিও আছে। আর তুবা হক আপনি যদি এই মার্ডারের দায় না ও স্বীকার করেন তারপর ও কিন্তু আপনার নামে নিরাপত্তা লঙ্ঘনের কেস হবে। কারণ আপনি আপনার কোম্পানির কনফিডেন্সিয়াল ডাটা একজন ক্রিমিনালকে দিয়েছেন।”
সিনথিয়া জামান এবার মুখ খুললো। বেশ ক্ষোভ ভরা কণ্ঠ নিয়ে বললো,
“আমি একা মার্ডার করেছি। জেল দিবেন না ফাঁসি দিবেন? যেটা ইচ্ছা করেন।আমি কিছুই বলবো না।”
এবার আরশাদ কিছুটা মুচকি হেসে তুবা হকের দিকে তাকালো।
“আই থিংক মিস সিনথিয়ার কোনো ফ্যামিলি নেই তাই উনি এতো রিলাক্সে জেলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারছেন। বাট মিস তুবা আপনার কিন্তু তিনজন ছেলেমেয়ে রয়েছে। আপনার ফাঁসি হয়ে গেলে তাঁদের কি হবে? তাই ভালোয় ভালোয় বলছি সবটা বলে দিন। আমার যতদূর মনে হয় ডিরেক্ট খুনের সাথে আপনার তেমন যোগসূত্র ছিলো না। সব সত্যিটা বললে হয়তো আপনি মৃত্যুদন্ড থেকে মাফ পেয়ে যেতে পারেন।”
ফাঁসির কথা শুনে এবার তুবা হক মানসিকভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়লো। সে কান্না কান্না কণ্ঠে বলতে শুরু করলো।
“খুন হওয়া সতেরোজন সহ বাকি ২ জন। টোটাল ১৯ জন একসাথে চট্টগ্রামের একটা শিপ কোম্পানিতে জব করতো। সিনথিয়ার বাবা ওয়াহিদ জামান ছিলেন ওই কোম্পানির ম্যানেজার। মালিক বিদেশে থাকাটা কারণে পুরো কোম্পানির দায়িত্ব ওনার উপরেই ছিলো। যেদিন ছাটাইকৃত কর্মীদের লাস্ট ডিউটি ছিলো সেদিন ওয়াহিদ জামান কোম্পানির প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে আনে।পরের দিন কর্মীদের বেতন দেয়ার কথা ছিলো তাই ওইদিন রাতে টাকা ওনার বাসায় রাখে। ওই ১৯ জন কর্মী ওনাকে টাকার ব্যাগসহ গাড়ি থেকে নামতে দেখেছিলো। ১৯ জন কর্মীই ছিলো খুবই দরিদ্র পরিবারের। তাই তারা তখন ওই টাকা লুট করার প্ল্যান করে। ওরা সেদিন রাত ২ টার দিকে ওনার বাসায় ঢুকে প্রথমে ছুরি চালিয়ে সিনথিয়ার বাবা আর দাদিকে খুন করে। তারপরে সিনথিয়ার ৬ মাস বয়সী দুই জমজ ভাইকে মাটিতে আছাড় মেরে খুন করে। সিনথিয়ার মা মানে আমার বোন রুবা হক অনেক সুন্দরী ছিলো। ওই মানুষরূপী শয়তানগুলো আমার বোনটাকে নিজের মৃত স্বামীর পাশে বসে গণধর্ষণ করে। সবশেষে আমার বোনটাকে ও ওরা নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করে।”
কথাগুলো বলে তুবা হক থামলেন। তিনি আবার কিছু বলার আগেই সিনথিয়া জামান বললেন,
“আমি বলবো এবার। অফিসার জানেন এই নির্মম ঘটনা আমার চোখের সামনে ঘটেছিলো। তখন আমার বয়স মাত্র ১২ বছর। বাবার সাথে লুকোচরি খেলতে খেলতে বাসার পিছনের জানালার ঝোপের পিছে লুকিয়ে ছিলাম। আর সেখানে থেকেই আমি সব দেখেছিলাম। ওরা এসব করা শেষে আমার পুরো পরিবারকে বাড়ির পিছনের বাগানে গর্ত খুঁড়ে মাটিচাপা দিয়ে দেয়। আর পুরো বাসা এমনভাবে ক্লিন করে ফেলে যেনো কেউ বুঝতেই না পারে যে এখানে এতগুলো খুন হয়েছিলো। সবশেষে টাকাগুলো নিয়ে ওরা পালিয়ে যায়। ”
আরশাদ এবার সিনথিয়া জামানের দিকে তাকিয়ে বললো,
“আপনি কি আসলেই সত্যি বলছেন? কারণ এই টপিকটা নিয়ে আমরাও কিছুটা রিসার্চ করেছি। রেকর্ডে ওয়াহীদ জামান তার ফুল ফ্যামিলি নিয়ে পালিয়েছে সেটা বলা হয়েছে। কিন্তু কোথাও যে তার মেয়েকে পাওয়া গিয়েছে এমন কোনো কথা উল্লেখ নেই। ”
” হয়তো সেদিন আমার ভাগ্য ভালো ছিলো তাই আমার খালা ওরা চলে যাওয়ার পরই আমাদের বাড়িতে আসে। আর উনিই তৎক্ষণাৎ আমাকে ঐখান থেকে নিয়ে যান। ”
“হ্যা, সেদিন আমি আমার বোনের সাথে দেখা করার জন্য রাতে ড্রাইভ করে একাই চট্টগ্রামে এসেছিলাম। এসেই সিনথিয়ার কাছ থেকে সবটা জানতে পারি। আমি জানতাম যদি খুনিরা কেউ জেনে যায় যে ও বেঁচে আছে তাহলে ওর জীবন নিয়েও সংকট হবে। তাই আমি ওকে ইমিডিয়েটলি আমার সাথে ঢাকা নিয়ে আসি। এতো বছর ধরে ওকে আমার থেকে ও দূরে রেখেছি শুধুমাত্র ওই খুনিদের থেকে ওকে বাঁচাতে।”
” খুনিরা কি কেউ জানতো না ওয়াহীদ জামানের যে একটা মেয়ে ও ছিলো? ”
“না। কারণ সিনথিয়ার পায়ে ছোট থেকে কিছুটা সমস্যা ছিলো। ও একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাটত। তাই ওর বাবা ওকে হোম স্কুলিং করিয়েছে। আর সিনথিয়া ও বাসা থেকে বের হতো না বেশি। তাই খুনিরা এটা ভালোভাবে জানতো না যে ওনার কয় ছেলে মেয়ে।”
“এতোগুলো মানুষের লাশ তো এতো বছরে খুঁজে পাওয়ার কথা। এখনো লাশ মাটিচাপা দেয়ার বিষয়টা কেনো কারো কাছে রিভিল হলো না কেনো?”
” কারণ কোম্পানির নিলামে ওই জায়গাটা খুনিদের মধ্যে একজন কিনে নিয়েছিলো। কারণ ওদের ও ভয় ছিলো যে ওই লাশগুলো পাওয়া গেলে হয়তো ওরা ফেঁসে যাবে। ”
এবার আরশাদ তুবা হকের দিকে তাকিয়ে বললো,
“সব তো বুঝলাম কিন্তু আপানি আপনার নিজের মেয়ে লিলিকে কেনো মার্ডার করলেন?”
“আমি ওকে ইচ্ছে করে মার্ডার করিনি। ওর মৃত্যুটা এক্সিডেন্টলি ছিলো। আমি দুইটা খাবারের বক্স রেডি করি সেদিন। একটা অফিসে নিয়ে যাবো আমি আরেকটা লিলির বাসায় পাঠানোর জন্য রেডি করেছিলাম। আমার বক্সে বিষ মেশানো ছিলো। আমি এতোগুলো খুনের ভার নিতে পারছিলাম না তাই নিজেকে শেষ করে দিতে এই কাজটা করেছি। আমার বাড়িতে সচরাচর কেউ থাকে না। আমি চাইনি আমার লাশটা বাসায় বসে পচুক। তাই অফিসে সুইসাইড করতে চেয়েছিলাম। ড্রাইভার ভুল করে আমার খাবারের বক্সটা লিলির বাসায় দিয়ে আসে। সেদিন আমি বিকালের দিকে আমার খাবারের বক্সটা খুলেই বুঝতে পারি বিষ মেশানো বক্সটা লিলির বাসায় চলে গিয়েছে। অনেকবার ফোন করেও যখন ওর কোনো রেসপন্স পাইনি আমি বুঝতে পেরে গিয়েছিলাম যে ও আর নেই।”
“আর রাবেয়া? ওকে আঘাত কে করেছিলো?”
“আমাদের দুইজনকে বাঁচাতে ও নিজেই নিজেকে আঘাত করে। প্রথম ১৬ জনকে আমরা ওর মাধ্যমেই আমাদের জায়গায় নিয়ে আসতাম। ওই উনিশ জন পুরুষ ছিলো নারীলোভী। রাবেয়া বেশ সুন্দরী ছিলো। তাই ওকে দিয়েই আমরা ওই শয়তানগুলোকে আমাদের কাছে নিয়ে আসতাম।”
সবটা শুনে আরশাদ সহ উপস্থিত থাকা বাকি সবাই আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলো না। আরশাদ সাদাতকে বললো,
“এদের লকআপে নিয়ে যাও। আর এদের কোর্টে পেশ করার জন্য পেপারর্স রেডি করো।”
“ওকে স্যার। ”
“ওহ আর শোনো একজন অফিসারকে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে লাশগুলো উঠানোর ব্যবস্থা করো।”
“জি স্যার।”
——————–
ইনভেস্টিগেশন রুম থেকে বের হয়ে আরশাদ ডিএমপির যুগ্ন কমিশনার মাজহারুল হককে সবটা জানালো।
“সিরিয়াসলি, এতো ডেঞ্জারাস ক্রাইম করেও এরা পার পেয়ে গিয়েছে? উনিশ জন আসামি আমাদের সমাজে গত কয়েকবছর যাবত ঘুরে বেরিয়েছে।”
“স্যার তখন যদি এই উনিশ জনকে শাস্তি দেয়া যেতো। তাহলে আজকে হয়তো এই নতুন দুইজন আসামি জন্ম নিতো না।”
“সেটা ঠিকই বলেছো। থ্যাংকস তুমি না থাকলে এই কেসের হয়তো আমরা কোনোদিন শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারতাম না। ”
“ইটস ওকে স্যার। এটা আমার দায়িত্ব। ”
—————-
আরশাদ বাসায় ফিরে একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলো। মেঘলা তার এই অবস্থা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলো,
“সব ঠিক আছে তো? তোমাকে এরকম মনমরা লাগছে কেনো?”
“না তেমন কিছু না। সকালে মা তোমার সাথে কোনো বিষয় নিয়ে হয়তো কথা বলছিলো। কিন্তু তুমি বার বার না করছিলে।”
“আসলে মা চাচ্ছেন আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে। আসলে আমাদের বিয়েতে তো কোনো অনুষ্ঠান হয়নি তাই।”
“তুমি না কেনো করছিলে?”
“লজ্জা লাগে আমার। এই যে এতো বয়সে বিয়ে করলাম তার উপর আবার র ধুমধাম করে অনুষ্ঠান করলে বিষয়টা কেমন না? সবাই এটা নিয়ে গসিপ করবে।”
“ধ্যাত, তুমিও না? সমাজের মানুষ সারাজীবন বলবে।তোমার কি ইচ্ছে হচ্ছে সেটা বলো?
“প্রতিটা বাঙালি মেয়েরই ইচ্ছে থাকে জীবনে একবার লাল টুকটুকে বউ সাজার। আর আমি তো সেই বাঙালি মেয়েদের মধ্যেই পরি।”
“ডোন্ট ওরি বউ। আম্মু আব্বুর সাথে কথা বলে তোমাকে লাল টুকটুকে বউ সাজানোর ব্যবস্থা করছি।”
কথাটা বলেই আরশাদ মেঘলার চিবুক আলতো হাতে তুলে ধরলো। মেঘলাও বেশ লজ্জা পেয়ে নিজের মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে নিলো।
চলবে……….
কেমন লাগছে গল্প? পরবর্তী পর্ব লিখতেছি। লেখা শেষ করতে পারলে রাতে পোস্ট করে দেবো।

