আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_৩৩

0
36

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৩৩
(শব্দসংখ্যা ১২৫০+)

রাত প্রায় শেষের দিকে, মেঘলা এখনো আরশাদের সাথে বারান্দায় বসে জোৎস্না বিলাস করছে। আরশাদ আলতো হাতে মেঘলার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

“আচ্ছা, আরশাদ। আপনি আমাকে কেনো ভালোবেসেছিলেন? ”

“ভালোবাসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট কারণের প্রয়োজন হয় না। কারণ ছাড়াই আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি। ”

“ধ্যাত, কারণ ছাড়া কাউকে ভালোবাসা যায় নাকি ? সারাজীবন এভাবে ভালোবাসতে পারবেন তো? ”

“কেনো পারবোনা?”

“আমাকে ভালোবাসতে গেলে যে আপনাকে অনেক কিছুর বিরুদ্ধে যেতে হবে। এই সমাজের সব নিয়মের বাহিরে গিয়ে যে আমাকে ভালোবাসতে হবে। কারণ আমার জীবন তো বাকি দশটা সাধারণ মেয়ের মত না। আমার উপরে আমার পুরো পরিবারের দায়িত্ব রয়েছে।”

” তো কি হয়েছে? আমি তোমাকে ভালোবেসেছি মেঘলা। তোমার দায়িত্ব মানে আমার দায়িত্ব।আজ থেকে তোমার প্রতিটা দায়িত্ব আমি নিজের উপরে নিয়ে নিলাম।”

“ভালোই হলো। ফাইনালি এখন থেকে আমি কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবো।”

মেঘলা আস্তে করে নিজের মাথাটা আরশাদের বুকে রাখলো। আরশাদ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,

“একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো। অনেক ধকল গিয়েছে তোমার উপর আজ।”

—————–

“তোমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে মানে? তুমি সত্যি বলছো তো না তোমার মাকে বৃদ্ধাশ্রম পাঠিয়েছে দেখে সেই শোকে ভুলভাল বকছো।”

“তোমার সাথে মিথ্যা বলে আমার কি লাভ তানিয়া? ”

নাবিল বেশ অসহায় সুরে বললো। তানিয়া এবার আরো রেগে গেলো।

“তোমার চাকরি না থাকলে কিভাবে কি হবে? আমার আত্মীয় স্বজনদের সামনে আমি মুখ কিভাবে দেখাবো? তোমার জন্য আমার মানসম্মান নষ্ট হয়ে যাবে।”

“তানিয়া এখানে আমার কি করার আছে?ঠিকাদার এর ভুলের জন্য প্রজেক্টে সমস্যা হয়েছে। যেহেতু প্রজেক্টের দায়িত্বে আমি ছিলাম তাই সব দোষ আমার ঘাড়ে পড়েছে।”

“তুমি নির্দোষ সেটা তুমি জানো। কিন্তু সমাজের সবাই তো আর সেটা বিশ্বাস করবে না। আমার বাবা কত উচ্চপদস্ত মানুষের সাথে উঠাবসা করে। তারা যদি জানে যে তোমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছে আমার বাবার প্রেস্টিজের কি হবে তখন?

“তানিয়া তুমি তো আমার ওয়াইফ। নিজের মানসম্মান বাদে কি তোমার চোখে আর কিছু পড়ছে না? তোমার কথায় আমি আমার বোনের সাথে সব সম্পর্ক শেষ করলাম। আমার মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এলাম। কত কিছু করলাম তোমার জন্য । তুমি কি শুধুমাত্র আমার বিসিএস ক্যাডার ট্যাগটার জন্যই আমাকে বিয়ে করেছিলে?”

” বিসিএস ক্যাডার ট্যাগটা বাদে তোমার কি আর কোনো যোগ্যতা আছে? আমাদের থেকে তুমি কত নিচু বংশের। তোমাদের তেমন কোনো পারিবারিক সম্পত্তি ও নেই। তোমার মা সারাজীবন গার্মেন্টসে চাকরি করে তোমাদের বড় করেছে। দেখতেও তুমি এভারেজ। তাহলে তুমিই বলো এই বিসিএস ক্যাডার ট্যাগটা বাদে তোমার কি আদৌ আর কোনো যোগ্যতা আছে যার জন্য আমি তোমাকে বিয়ে করতাম। দেখো এভাবে তোমার সাথে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব নয়। তুমি আবার চাকরিতে জয়েন করলে জানিয়ো তাহলে আমি আবার তোমার সংসারে ফিরে আসবো।”

তানিয়ার কথা শুনে নাবিলের নিজেকে জাস্ট একটা বস্তু মনে হতে লাগলো। অবশ্য পরমুহূর্তে তাঁর মনে হলো এইগুলো সব তাঁরই কর্মফল। নিজের সুসময়ে সে মেঘলাকে ছুড়ে ফেলেছিলো। তাঁর সাথেও সেইম ঘটনা ঘটেছে। এখন তাঁর দুঃসময় চলছে তাই তাঁর স্ত্রী ও তাকে ছুড়ে ফেলেছে।

————–

সাদাত আর অনন্যা সিনথিয়া জামানের কল লিস্ট চেক করছিলো। পুরো কল লিস্ট খুঁজেও সন্দেহজনক কিছু না পেয়ে সাদাত হতাশ হয়ে বললো,

“এর কল লিস্ট খুঁজে আর লাভ নেই। কোনো নাম্বারই সন্দেহজনক না।”

“স্যার আমার মনে হয় উনি যে নাম্বার দিয়ে ওনার সহযোগীর সাথে যোগাযোগ করতো হয়তো সেটা অন্য কোনো সিম দিয়ে করতো। যে এতো প্ল্যান করে মার্ডার করতে পেরেছে অবশ্যই সে নিজের পার্সোনাল সিম দিয়ে সহযোগীর সাথে যোগাযোগ করার মত বোকামি করবে না।”

“আসলেই তো। এটা তো আমি আগে ভেবে দেখিনি। হয়তো উনি অন্য কারো নামে কোনো সিম উঠিয়েছে। সেটা দিয়েই ওনার সহযোগীর সাথে যোগাযোগ করতো। এক কাজ করো আইটি অফিসে গিয়ে ওদের হেল্প নাও। ওনার কোনো সেকেন্ড সিম আছে কিনা সেটা ইমিডিয়েটলি বের করার ট্রাই করো। ”

“জি স্যার।”

———————

মেঘলার যখন ঘুম ভাঙলো তখন সকাল প্রায় ১০ টা বাজে। ঘড়ির টাইম দেখে মেঘলা বেশ অবাক হলো এতক্ষন ঘুমিয়েছে সে। ইশ বাড়ির সবাই কিনা কি ভাবছে? এই লোকটাও না। নিজে তো মনে হয় সেই সকালে উঠে গেছে কিন্তু তাকে একবার ও ডাকলো না। নিজের গায়ে পড়া টিশার্ট এর উপর দিয়ে একটা পাতলা চাদর পেঁচিয়ে সে বারান্দায় গেলো। এই বাড়ির পিছনে রয়েছে বিশাল ফলের বাগান। বাড়ির প্ৰত্যেকটা রুমের বারান্দা থেকে বাগানটা স্পষ্ট দেখা যায়। বারান্দায় গিয়ে সে আরেকদফা অবাক হলো। বাড়ির সেকেন্ড জেনারেশনের প্রায় সবাই বাগানে। আদিব আর রওনক গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ডাব খাচ্ছে। পিকু আর মিকু ও তাঁদের সাথে রয়েছে। আর আরশাদ একদম ডাবগাছের মাথায় উঠে বসে রয়েছে। মেঘলাকে বারান্দায় দেখে আরশাদ প্রায় চিৎকার করে তাকে ডাক দিয়ে বললো,

“ডাব খাবে? এই গাছের ডাবের পানি খুব মিষ্টি হয়।”

এর মধ্যে গাছের নিচ থেকে ইরিনার কণ্ঠ ও শোনা গেলো,

“হ্যা, আপু। পানিগুলো খুব মিষ্টি। বেশ ভালোই লাগছে। ডাবের শাসগুলো ও বেশ পুরু।

তাঁর পাশে থেকেই আদিব বললো,

“ভাবী তাড়াতাড়ি আসেন। দেরি করলে শেষ হয়ে যাবে।”

তাঁদের সবার ডাকাডাকিতে মেঘলা অগত্যা উত্তর দিলো,

“আসছি।”

ফ্রেশ হয়ে রুম থেকে বের হতেই তাঁর সাথে মিতা ফরাজীর দেখা হলো। মিতা ফরাজী আলুর পাঁপড় ছাদে শুকাতে দিতে যাচ্ছিলেন।

“তুমি ঘুম থেকে উঠে গিয়েছো?”

“হ্যা, মা। আসলে একটু বেশি ঘুমিয়ে ফেলেছি আজ।”

“দেখো তো কি বলে? ঘুমের কম বেশি আছে নাকি। কোনো সময় ঘুম নিয়ে কম্প্রোমাইজ করবে না।বাগানের দিকে যাচ্ছো তো? যাও তাহলে। আমি ওখানেই নাস্তা দিয়ে দিচ্ছি।”

“ঠিক আছে, মা।”

————–

অনন্যা একগাদা ফাইল নিয়ে এসে সাদাতের সামনে রাখলো। একটা ফাইল সাদাতের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,

“স্যার, এখানে টোটাল চারটা সিম কোম্পানির ডিটেলস রয়েছে। এই সিম কোম্পানিগুলোর মহিলা মালিক। আর সিনথিয়া জামানের বাসার এরিয়ার নেটওয়ার্ক ট্রেস করে আমরা কিছু সন্দেহজনক নাম্বার পেয়েছি। ওই নাম্বার গুলো যখন আমরা ক্রস চেক করেছি তখন এই নাম্বারটা পেয়েছি। এই নাম্বারটা হচ্ছে সিনথিয়া জামানে ড্রাইভারের নামে রেজিস্টার্ড করা। এই নাম্বারটা লাস্ট অন ছিল যেদিন লাস্ট ভিক্টিমকে মার্ডার করা হয়েছে। আমরা ধারণা করেছিলাম হয়তো এই নাম্বারটা দিয়েই উনি ওনার সহযোগীর সাথে যোগাযোগ করত। যখন আমরা এটার কল লিস্ট চেক করলাম তখন আমাদের ধারণাই ঠিক হলো। এই নাম্বার দিয়ে শুধু একটা মানুষের সাথে যোগাযোগ করা হতো।”

” তা মানুষটা কে? ”

“ডিসিএল সিম কোম্পানির চেয়ারম্যান তুবা হক। আমাদের ধারণার সাথে একদম মিলে গেছে। হয়তো খুনগুলো ওনার সহযোগিতায় করা হয়েছে।”

” তুবা হককে এরেস্ট করার ওয়ারেন্ট রেডি করো। আমি আরশাদ স্যারকে সবটা জানাচ্ছি। ”

“ওকে।”

—————

সিরিয়াল মার্ডার কেসে তুবা হকের নামটা শুনে আরশাদ বেশ অবাক হল। তুবা হক তার মায়ের বেশ ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। বাট কখনোই মহিলাকে দেখে মনে হয়নি যে উনি খুন করতে পারে। আরশাদকে কিছুটা চিন্তিত দেখে মেঘলা তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,

“সব ঠিক আছে তো? আপনি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত?”

“সিরিয়াল মার্ডার কেসে ওই ফরেন্সিক ডাক্তারের সহযোগী হিসেবে আম্মুর বান্ধবী তুবা হককে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। ওই যে সেদিন রিসিপশন দেখা হয়েছিলো। উনি ডিসিএল সিম কোম্পানির চেয়ারম্যান।”

“ঐ যে নুহা নামক মেয়েটার মা। এক মিনিট কোম্পানির নামটা কি বললেন?”

“ডিসিএল কোম্পানি।”

“আমাদের চিলেকোঠার ফ্ল্যাটে যে মেয়েটা থাকতো। ওই লিলি তো ওই কোম্পানির চেয়ারম্যানের আসিস্ট্যান্ট ছিলো। আর ওর মৃত্যুটাও আমার কাছে সুইসাইড মনে হয়নি।”

” ইন্টারেস্টিং তো? তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে হয়তো লিলি নামক মেয়েটার মৃত্যুর সাথেও তুবা হকের কোনো কানেকশন রয়েছে। আমি লিলির ফ্ল্যাটে আবার ফরেন্সিক টিম পাঠাচ্ছি। ”

সিরিয়াল মার্ডার কেসে তুবা হকের নাম এসেছে শুনে বাড়ির সবাই বেশ অবাক হলো। মিতা ফরাজী কোনোমতে বিশ্বাসই করতে পারছেন না যে তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী কাউকে খুন করতে সহযোগিতা করতে পারে। সাথে লিলির বিষয়টা শুনে সে আরেক দফা অবাক হলো। সে কিছুটা ইতস্তত করে আরশাদকে বললো,

“একটা কথা জানানোর ছিলো তোকে, বিষয়টা আমি ঘটনাক্রমে জানতে পেরেছিলাম। তাই মনে হলো তোকে জানালে হয়তো তোর কোনো উপকার হতে পারে।”

“কি কথা মা?”

“লিলি তুবার বায়োলজিক্যাল মেয়ে। ”

“কিহ? কিন্তু মা ওনার স্বামী তো প্রায় ২০ বছর আগে মারা গিয়েছে। আর লিলির বয়স তো মাত্র ১৮ বছর ছিলো।”

” তুবার স্বামী মারা যাওয়ার ১ বছর পর ওর স্বামীর বিজনেস পার্টনারের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে । ওই লোক বিবাহিত ছিলো তাই সেও লিলির দায়িত্ব নিতে চায়নি। তাই নিজের সম্মানের ভয়ে তুবা লিলিকে জন্মের পরেই একটা অনাথ আশ্রমে দিয়ে দেয়। কিছুদিন আগেই লিলির ব্যাপারে ও জানতে পেরে ওকে নিজের আসিস্ট্যান্ট হিসেবে নিয়োগ দেয়।লাস্ট কিছুদিনের ব্যাস্ততায় আমি তুবার সাথে কোনো যোগাযোগ করিনি। তাই লিলির মৃত্যুর ব্যাপারে ও আমি জানতাম না। ”

“থ্যাংকস মা, এখন ওনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা আমাদের জন্য আরো অনেক সহজ হবে।”

আরশাদ সাদাতকে ফোন করে লিলি আর তুবা হকের সম্পর্কের ব্যাপারে সবটা জানালো। সাদাত ও বিষয়টা জেনে সেভাবেই তুবা হককে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি নিলো।

চলবে……..

শরীরটা বেশি ভালো না। তাই বেশি বড় পর্ব দিতে পারলাম না। আশা করি আপনারা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। কালকে অবশ্যই বড় পর্ব দেয়ার চেষ্টা করবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here