আকাশ_জুড়ে_একা_আমি #লামিয়া_ইসলাম #পর্ব_৩২

0
38

#আকাশ_জুড়ে_একা_আমি
#লামিয়া_ইসলাম
#পর্ব_৩২
(শব্দসংখ্যা ২৫০০+)

গাজীপুরের ফার্মহাউসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সবার দুপুর ১২ টা বাজলো। মাহিরা আর মিহির ও ফরাজী পরিবারের সদস্যদের সাথে এই ফার্মহাউজে এসেছে। তবে সবচেয়ে যে ব্যাক্তিকে দেখে সবাই বেশি অবাক হলো সে হলো রওনক হাসান। সবাই গাড়ি থেকে নেমে দেখলো রওনক ফার্মহাউসের সামনের বাগানে বসে আছে । মেঘলা বেশ অবাক হয়ে রওনককে জিজ্ঞেস করলো,

“আরেহ রওনক সাহেব আপনি এখানে?”

রওনক কিছু বলার আগেই মিতা ফরাজী এগিয়ে এসে উত্তর দিলো,

“আসলে আমি আর আদনান কাল রওনকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। রওনক না থাকলে আরশাদের জন্য রক্ত যোগাড় করা খুব কঠিন হয়ে যেত। এক কথায় ও আরশাদকে নতুন জীবন দিয়েছে। কালকে ওর ব্যাপারে আমরা সবটা জানলাম। ছেলেটার জীবনে সব থাকলেও পরিবারের খুব অভাব। তাই তো আমি আর তোমার আংকেল ওকে আমাদের এডপ্টেড ছেলে হিসেবে নেয়ার প্ল্যান করেছি।এখন থেকে ও আমাদের ফরাজী পরিবারে অংশ।”

মিতা ফরাজীর কথার মাঝেই মাহিরা হুট্ করে বলে উঠলো,

“কিন্তু আন্টি আমি যতদূর জানি আইন অনুসারে এমন দামড়া সাইজের ছেলেকে তো এডপ্ট করা যায় না।”

মাহিরার রওনককে দামড়া বলেছে শুনে সবাই একসাথে হেসে উঠলো। এবার রওনক মাহিরার দিকে এগিয়ে এসে তার মাথায় টোকা মেরে বললো,

” মিস, এডপ্ট ছেলে শুধুমাত্র যে কাগজ কলমে গ্রহণ করা যায় তা কিন্তু না। কাগজ কলমের বাইরে চাইলেও মন থেকে ভালোবেসে সন্তান এডপ্ট নেয়া যায়।”

এবার আদনান ফরাজী নিজের দুই ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,

” আশা করি আমাদের এই ডিসিশনে তোমাদের কোনো আপত্তি নেই। ”

আরশাদ তার বাবার কথায় সায় দিয়ে বলে উঠলো,

“একদম না বাবা। মা এতদিন আমাদের দুই ভাইকে জ্বালিয়েছে বিয়ে বিয়ে করে । এখন তো আমাদের বিয়ে শেষ। এখন থেকে না হয় রওনককে জ্বালাবে।ওয়েলকাম টু আওয়ার ফ্যামিলি, রওনক। ”

এবার মিতা ফরাজী বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে উঠলেন,

“ধ্যাত আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম।রওনক তোমার কি পছন্দের কেউ আছে? না আমি দেখবো।”

এবার রওনককে তার মায়ের হাত থেকে বাঁচাতে আদিব এগিয়ে এসে বললো,

“আহা মা আমাদের ভাইটাকে প্রথমদিনই ভয় পাইয়ে দেবে নাকি। শোনো ভাই রওনক এক আজব ফ্যামিলির অংশ তুমি হয়ে গেছো এখন, এই ফ্যামিলিতে তুমি সব ধরণের কমিডি দেখতে পাবে।”

সবার কথার মাঝেই পিকু আর মিকু বেশ আনন্দ নিয়ে বললো,

“ইয়েহ,এখন থেকে আমরা স্কুলে গিয়ে আরো বেশি ফ্লেক্স নিতে পারবো। সবাইকে বলবো জাতির ক্রাশ রওনক হাসান আমাদের ভাই হয়।

এদের দুইজনের খুশি দেখে আদিব রওনককে সাবধান করে দিয়ে বললো,

“এরা দুইটা কিন্তু পাজির হাড্ডি। এদের থেকে একশ হাত দূরে থাকবে।দেখা যাবে তোমার সাথে সেলফি নেয়ার বদলে নিজের ফ্রেন্ডসদের কাছ থেকে টাকা চার্জ করবে।এদের মাথায় কয়দিন পর পর সব ডেঞ্জারাস বিজনেস আইডিয়া উদয় হয়।”

আদিবের কথা শুনে পিকু মিকু আদিবকে ধাওয়া করতে লাগলো। রওনক ঘুরে ঘুরে আশেপাশের সবাইকে দেখতে লাগলো। এরকম একটা ভরা পরিবারের অপেক্ষাই তো সে কত বছর যাবত করেছে। খুশিতে তার চোখে পানি এসে পড়লো।সত্যিই আল্লাহ মাঝে মাঝে আমাদের ছোট কিছু ভালো কাজের উছিলায় কত বড় রহমত উপহার দিয়ে দেয়।

———————–

মিতা ফরাজী এখানেও এসেও রান্না করতে লেগে পড়েছে। মেঘলা তাকে সাহায্য করতে রান্না ঘরে এলো। মিতা ফরাজী তাকে দেখেই বাধা দিয়ে বললেন,

” আরে তুমি আবার এলে কেন? আমি একাই সব সামলে নিতে পারব। অভ্যেস আছে আমার। ”

” আরে আন্টি সমস্যা নেই। ”

মিতা ফরাজী এবার কিছুটা অভিমানের সুরে বললেন,

” আমার ছেলেকে তো মেনে নিয়েছো, তাহলে আমাদের মা-বাবা বলতে সমস্যা কোথায় হচ্ছে? ”

” আরে না না এমন কিছু না মা। দুপুরের জন্য কি কি রান্না করছেন? ”

” একদম ঝরঝরে সাদা ভাত, তেল কই, রসুন ভর্তা, দেশি মুরগির ঝোল, আম দিয়ে ডাল। ”

” বাহ্ অনেক আইটেম। ”

” হ্যাঁ কিন্তু একদম সিম্পল। কারণ রাতে তোমার বাবার বন্ধুর বাসায় আমাদের দাওয়াত আছে। উনি এখানকার চেয়ারম্যান। আমরা এসেছি শুনে সপরিবারে আমাদের দাওয়াত করেছে। ”

” বাবার এখানে বন্ধু-বান্ধবও আছে? ”

” হ্যাঁ আসলে তোমার বাবার কিছু ফ্যাক্টরি তো এই এলাকায় আছে। তার জন্য বেশ বন্ধু বান্ধবও জোগাড় করে ফেলেছে উনি। আর শোনো রাতের দাওয়াতে আমরা কিন্তু মেয়েরা সবাই শাড়ি পড়ে যাব। আমি ইরিনা কে বলে দিয়েছি। তুমি শাড়ি এনেছো তো?

“জ্বি মা এনেছি। মা আমাকেও কিছু করতে দিন। আমি এভাবে কাজ ছাড়া বসে থেকে বিরক্ত হচ্ছি।”

“শোনো দেখি মেয়ের কথা। কাজ না করতে পেরে নাকি বিরক্ত হচ্ছে। আচ্ছা এই শশা আর টমেটো গুলো কেটে সালাদ বানিয়ে ফেলো। ”

“ঠিক আছে মা।”

—————-

আদনান ফরাজীর চেয়ারম্যান বন্ধুর বাসায় যাওয়ার জন্য মেঘলা সন্ধ্যা বেলায় রেডি হচ্ছিল। তার পরনে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। আরশাদ ও আলমারি হতে তার কাপড় নিতে এলো। সে প্রথমে একটা আকাশী কালারের শার্ট বের করলেও মেঘলার সাথে ম্যাচিং করতে সাদা কালারের একটা কুর্তা পড়ল। কিন্তু হঠাৎ কুর্তার বাটনের দিকে খেয়াল হতেই দেখলো সেটা ছিঁড়ে গেছে। আরশাদ বেশ বিরক্তি নিয়ে বললো,

“ধ্যাত, এটা আবার কখন ছিড়লো? ”

আরশাদের বিরক্তি টের পেয়ে মেঘলা পিছনে ফিরে বললো,

“আপনার আবার কি হলো? ”

“দেখো না বাটনটা ছিঁড়ে গেছে।”

“জাস্ট এটার জন্য এতো বিরক্তি? দাঁড়ান আমি এখনি সেলাই করে দিচ্ছি।”

মেঘলার আঙুলগুলো খুব যত্ন করে কুর্তার বাটনটা সেলাই করছিল। মেঘলার শাড়ি এখনো ঠিকভাবে পিন আপ করেনি। তাই তো শাড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে তার মসৃন কোমরটা দৃশ্যমান হচ্ছে। হুট্ করে আরশাদের নজর ও সেই দিকে চলে গেলো। মেঘলার কোমর দেখে সে বেশ জোড়ে একটা ঢোক গিললো। আরশাদ জাস্ট মনে মনে নিজেকে যেনো কন্ট্রোল করতে পারে সেই প্রার্থনাই করছে। আরশাদ একটু হেসে মৃদু আওয়াজে মেঘলাকে বলল,

“তুমি সবকিছু এত সুন্দর করে করতে পারো কীভাবে?”

মেঘলা চোখ না তুলেই উত্তর দিল,

“ছোট ছোট জিনিস ঠিক রাখতে হলে এরকম অনেক কিছুই করতে জানতে হয়।”

হুট্ করে আরশাদের যে কি হলো সে নিজেও জানে না। সে খুব ধীরে সাবধানে মেঘলার কাছে এগিয়ে এল। মেঘলা কিছু বুঝে উঠার আগেই সে হালকা করে তার কোমরে হাত রাখল। আরশাদ এভাবে হুট্ করে তাকে স্পর্শ করায় সে কিছুটা হতচকিয়ে আরশাদের দিকে তাকালো । তাঁদের দুজনের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আটকে রইল। এবার আরশাদ ধীরে ধীরে মেঘলার ঠোঁটের খুব কাছে চলে এলো। সে তার এতটাই কাছে এলো যে তার নিঃশ্বাসের বাতাস মেঘলার ঠোঁটে লাগছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় হঠাৎ ঠকঠক করে আওয়াজ হলো। হঠাৎ এমন শব্দ পেয়ে তারা দুইজনেই চমকে উঠলো ।মেঘলা দ্রুত সরে গিয়ে শাড়িটা ঠিক করতে লাগল। অন্যদিকে আরশাদ এক লাফে একটু দূরে গিয়ে গলা পরিষ্কার করে বলল,

“কে?”

বাইর থেকে আদিবের গলার আওয়াজ এলো,

“ভাই, গাড়ি রেডি।”

“ঠিক আছে, তুই যা। আমরা এখনি আসছি।”

আদিব চলে যেতেই মেঘলা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললো,

“ধ্যাত শাড়িটা একবারে এলোমেলো করে দিলেন।

আরশাদ এবার মেঘলার শাড়ির কুচিগুলো নিজের হাতে ঠিক করে দিতে দিতে বললো,

“এলোমেলোর কি আর দেখলে? যখন আমি সত্যিই সত্যিই এলোমেলো করা শুরু করবো তখন তুমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে।”

আরশাদের কথার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে মেঘলা তার দিকে তাকিয়ে হালকা লজ্জা মেশানো হাসি দিলো।

——————

আরশাদ, মেঘলা, ইরিনা, আদিব, পিকু আর মিকু এরা সবাই এক গাড়িতে উঠেছে। আদিব গাড়ি ড্রাইভ করছিলো। হঠাৎ করেই আদিব মেঘলাকে বলে উঠলো,

“ভাবী, আপনি কি জানেন ভাইয়া কিন্তু আপনার জন্য সন্ন্যাসী হতে চেয়েছিলো। আপনি ওকে বিয়ে না করলে ও হয়তো ফিউচারে সন্ন্যাস গ্রহণ করতো।”

এবার আরশাদ পিছন থেকে আদিবের মাথায় চাটি মেরে বললো,

“তুই আবার আমার রুম এলোমেলো করেছিস? আমার ডায়েরিটা পড়েছিস তুই? ”

আদিব এবার ইনোসেন্ট স্বরে উত্তর দিলো,

“এবারের কালপ্রিট পিকু আর মিকু। ওরাই তোমার ডায়েরি পরে মেঘলা ভাবীর প্রতি তোমার ১০ বছরের সাধনার ব্যাপারে জেনেছে। আর তারপর সেই খবর পুরো বাড়িতে ছড়িয়েছে। ”

এবার আরশাদ পিছনে ফিরে পিকু আর মিকুর দিকে চোখ কটমট করে তাকালো। মেঘলা আরশাদকে বাধা দিয়ে বলল,

” ওদের দিকে এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? আর ডায়েরি মানে কি? আপনি কি আমাকে নিয়ে কবিতা লিখতেন? ”

” আহা মেঘলা,তুমি ছোট মানুষ। তোমার এত জানার দরকার নেই। ”

এবার পিকু পিছন থেকে চিৎকার করে মেঘলাকে বলল,

” অনেক কিছু লিখেছে ভাবি। আমরা বাড়ি গিয়ে ডায়েরিটা আপনার হাতে হস্তান্তর করব।”

” থ্যাংক ইউ সো মাচ, ননদিনীরা। আমার এতো বড় উপকার করার জন্য আমি তোমাদেরকে অবশ্যই একটা ভালো ধরণের ট্রিট দেবো। ”

মেঘলার কথা শুনে আরশাদ আর কিছু না বলে মুখ গোমড়া করে থাকলো। এই মেয়ে তার ডায়েরী পড়লে হয়েছে। সারাদিন ধরে তাকে ক্ষেপাতে থাকবে।

——————

আদনান ফরাজীর বন্ধুর বাসা থেকে ফিরতে ফিরতে সবার প্রায় রাত দশটা বাজল। বাসায় ফিরে সবাই যে যার রুমে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ করে আরশাদ বলে উঠলো,

” তোমরা সবাই আরো কিছুক্ষন এখানে থাকো। আমার তোমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলার আছে। ”

আরশাদের কথা শুনে সবাই ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পড়ল। হেনা খাতুন কেয়াকে বলল,

” তুই যা সবার জন্য চা বানিয়ে নিয়ে আয়। ”

এবার আরশাদ হেনা খাতুনকে থামিয়ে দিয়ে বললো,

” আহা ফুপু, ও কেন যাবে? আজকের এই মিটিং এর মুখ্য চরিত্র তো ও? ”

আরশাদের কথা শুনে হেনা খাতুন এর বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠলো। তারপরও সে নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রেখে আরশাদকে বললো,

” তুমি এসব কি বলছো? বুঝলাম না তো।”

আরশাদ এবার হালকা হেসে বলল,

” সবই বুঝতে পারবেন ফুফু, একটু অপেক্ষা করুন। ”

এবার আরশাদ আবার বলা শুরু করলো,

“কিছুদিন আগে চট্টগ্রামে একটা ঘটনা ঘটে। ব্যাপারটা আমাদের পুরো পরিবারের জন্যই খুব লজ্জাজনক ছিলো। সেই ঘটনায় সব দোষ আমার আর মেঘলার উপর চাপিয়ে আমাদের বিয়ে ও দিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন আগে আমি ঘটনাক্রমে জানতে পারলাম সেই ঘটনার মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলো আমার দূর সম্পর্কের ফুফু হেনা খাতুন।”

আরশাদের বলা কথা শুনে সবাই চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।মনোয়ারা বেগম বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল,

” আরশাদ,তুই এসব কি বলছিস? হেনা এসব কেন করবে?তোর আর মেঘলার সাথে ওর শত্রুতা কিসের? ”

” দাদি আমাদের দুজনের কারোর সাথেই উনার শত্রুতা নেই। আর সেদিনের ঘটনাটা উনি নিজের লাভের জন্য ঘটিয়েছিল। কিন্তু ঘটনা উল্টো হয়ে গিয়েছে। ”

এবার মিতা ফরাজী কিছুটা কৌতূহলের স্বরে বলল,

” মানে? তোদের বিয়ে দিয়ে ওর কি লাভ? ”

” আহা উনি আমাদের বিয়ে দিতে চাইনি।উনি চেয়েছিল উনার মেয়ে কেয়ার সাথে আমার বিয়ে দিতে। কিন্তু সেদিন ঘটনাক্রমে কেয়ার জায়গায় কিভাবে যেন মেঘলা সেদিন ফেঁসে গিয়েছে। হয়তো আমাদের ভাগ্যে এটাই লেখা ছিল। এমনকি সে তারপরও ক্ষান্ত হয়নি। সে এবার কেয়াকে নিয়ে ঢাকায় ও এসেছে যেন কেয়া কে আমাদের বাড়ির বউ বানানো যায়। সে সম্পত্তির জন্য নিজের মেয়েকে আমার দ্বিতীয় স্ত্রী বানাতেও রাজি। ”

এবার আদনান ফরাজী আরশাদ কে বলল,

” তুই এসব কি বলছিস? তুই সব ঠিকঠাক বলছিসতো? ”

” হ্যাঁ বাবা ঠিকই বলছি।আদিবের রিসিপশনের দিন আমি ঘরের বাহিরে দাঁড়িয়ে ওনাদের মা মেয়ের কথা শুনে ফেলেছিলাম। এমনকি হসপিটালে উনি ওনার নিজের মেয়েকে রেখে আসতে চেয়েছে। শুধু তাই না উনি কাল রাতে আমাদের বাড়ির এক কাজের লোককে দিয়ে মানুষ অচেতন করার ওষুধ ও আনিয়েছে।আর সেই কাজের লোককে আমি হাতেনাতে ধরেছি।হয়তো আবার উনি সেই চট্টগ্রামের মত কোনো কান্ড করার প্ল্যান করছিলো। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি ওনার রুম খুজলে এখন সেই ঔষুধ পাওয়া যাবে।”

এবার পিকু আর মিকু একসাথে আরশাদের কথায় সায় দিয়ে বলে উঠলো,

” ভাইয়া সত্যিই বলছে। ওনাকে আর ওনার মেয়েকে আদিব ভাইয়া রিসিপশনের দিন এসব নিয়ে কথা বলতে শুনেছি। আমরা তখন ওই রুমের বারান্দায় ছিলাম। ”

এবার মিতা ফরাজী পিকু আর মিকুকে জিজ্ঞেস করলেন,

” তোরা দুই জন আগে থেকে জানতি তাহলে আমাদের বলিস নি কেন? ”

” তোমরা যদি আমাদের কথা বিশ্বাস না করো, তাই।”

এবার তাদের কথার মাঝে মেঘলা বলে উঠলো,

” আমিও কাল রাতে শিওর হয়েছি যে চট্টগ্রামের ঘটনা উনিই ঘটিয়েছে। কারন চট্টগ্রামের ঘটনায় শর্বরী পাতার ধোঁয়া ইউজ করা হয়েছিল। শর্বরী পাতায় মানুষ অচেতন হয়ে পড়ে। গাছ-গাছালি সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে এমন মানুষই শুধু এই ব্যাপারে জানতে পারে। আর বাড়িতে শুধুমাত্র ওনারই এই ব্যাপারে জ্ঞান রয়েছে। আমিও প্রমাণের অভাবে কাউকে কিছু বলিনি। ”

ইতিমধ্যে হেনা খাতুন এর রুম খুঁজে ইরিনা তার ঔষধের বক্স নিয়ে এসেছে। আদিব বক্স খুঁজে একটা ওষুধের পাতা নিয়ে বলল,

” ভাইয়ের কথাই ঠিক। এইযে ওনার বক্সে নতুন ঔষধের পাতাটা, এটা মানুষ অচেতন করার ঔষধ। ”

সবকিছু শুনে মনোয়ারা বেগম হুট করে হেনা খাতুনকে একটা চড় লাগিয়ে দিল। সে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,

” তোকে এত বছর ধরে বাড়িতে জায়গা দিয়েছি এইসব করার জন্য। আমার বাড়ির ছেলেদের সম্মান নষ্ট করবি। তোর এত বড় সাহস। আদনান ড্রাইভারকে বল ওদের এখনই চট্টগ্রাম নিয়ে যেতে। তোরা চট্টগ্রামে গিয়ে কেয়ারটেকারের কাছ থেকে নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে কালকে সকালের মধ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবি। তোদের মত কালনাগিনী আমার বাড়িতে দরকার নেই। ”

এবার হেনা খাতুন মনোয়ারা বেগমের পা জড়িয়ে ধরে বলল,

” আম্মা এরকম আপনি আমার সাথে করবেন না? কই যাব আমি এই মেয়েটাকে নিয়ে? ”

” কই যাবি সেটা আমি কিভাবে জানব? তুই যদি এসব তামাশা না করতি তাহলে তোর মেয়েকে আমি ভালো জায়গায় বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু নিজের লোভে তুই সবকিছু হারালি।”

সেই সময় সাথে সাথেই ড্রাইভারকে দিয়ে হেনা খাতুন আর তার মেয়ে কেয়াকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে পাঠানো হলো। বাড়ি থেকে এত বড় ঝামেলা বিদায় হওয়ায় বাড়ির সবাই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো।

—————

মেঘলা নিজের বেডরুমে এসে জুয়েলারি গুলো একে একে খুলে রাখছিলো। হুট্ করে আরশাদ এসে দরজা খুলে রুমে ঢুকলো। মেঘলা তার সাথে কোনো কথা না বলে মুখ গোমড়া করে আবার নিজের জুয়েলারি খুলতে লাগলো। এবার আরশাদ মেঘলার গালে একটু টোকা দিয়ে বললো,

“কি হলো আমার সুন্দরী বউটা এমন মুখ গোমড়া করে আছে কেনো?”

মেঘলা এবার আরশাদের দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করে বলল,

” আপনি এতদিন ধরে এই বিষয়টা জানতেন?তাহলে আমাকে জানালেন না কেন?”

” আসলে আমি ভয় পেয়েছিলাম। ওদের মা মেয়েকে আমার বেশি সুবিধার মনে হয়নি। ভয় ছিল এসব যেনে যদি তুমি মাথা গরম করে ওই মেয়েটাকে কিছু বলে ফেলো। আর ওই মেয়েটা তো অনেক বছর যাবত আমাদের বাড়িতে ছিল। ও যদি তখন উল্টা আমার নামে খারাপ কিছু বলে দেয়। তখন তুমি তা বিশ্বাস করে যদি আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাও। ”

মেঘলা আরশাদের কুর্তার কলার টেনে ধরে বললো,

“একটা মেয়ের মুখের কথায় আমি আপনাকে অবিশ্বাস করবো, আরশাদ? নিজের ভালোবাসার উপরে এতো কম ভরসা আপনার?”

মেঘলার অস্থিরতা বুঝতে পেরে আরশাদ মেঘলাকে নিজের আরো কাছাকাছি টেনে তার কোমর জড়িয়ে ধরে বললো,

“তোমার উপর ভরসা আছে আমার।কিন্তু আমার নিজের ভাগ্যের উপর ভরসা নেই। ভয় লাগে এতো বছরের সাধনার পর মানুষের এই নোংরা খেলায় যদি আমি তোমাকে আবার হারিয়ে ফেলি।”

“কখনো হারাবো না আমি। আমি আপনার সাথে অনেক বছর বাঁচতে চাই।একসাথে বৃদ্ধ হবো আমরা। ফিউচারে আমাদের অনেকগুলো কিউট কিউট বাচ্চা থাকবে।কমপক্ষে ৩ টা বাচ্চা তো থাকবেই।”

এবার আরশাদ মেঘলার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বললো,

“কিন্তু বউ এতোগুলো বাচ্চার জন্য তো অনেক মেহনত করতে হবে? ”

আরশাদের কথার মানে বুঝতে পেরে মেঘলা লজ্জা পেয়ে বললো,

“আপনার মাথায় সবসময় উল্টাপাল্টা জিনিস ঘোরে । সরুন আমার শাড়ি চেঞ্জ করতে হবে।”

“আহা বউ তুমি তো অনেক ক্লান্ত, আজ না হয় তোমার শাড়িটা আমি চেঞ্জ করে দেই।”

মেঘলা কিছু বলার আগেই আরশাদ মেঘলাকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় নিয়ে গেলো। মেঘলাকে বিছানায় আলতো করে শুয়িয়ে দিয়ে আরশাদ তার দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে রইলো। আরশাদকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেঘলা বুঁকের মধ্যে অদ্ভুত কাঁপুনি শুরু হলো। সে কিছুটা লজ্জামাখা সুরে বললো,

“এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো? আমার খুব লজ্জা লাগছে।”

আরশাদ কিছুটা ঝুকে মেঘলার কানে ফিসফিস করে বললো,

“এই তো আর কিছুক্ষন। তারপর তোমার সব লজ্জা ভেঙে যাবে সুন্দরী।”

পর মুহূর্তেই আরশাদ মেঘলার কানে খুব ধীরে একটা চুমু খেলো। আরশাদের ঠোঁটের পরশে মেঘলা নিজের চোখ বন্ধ করে নিলো।এবার আরশাদ ধীরে ধীরে তার চিবুকটা তুলে ধরলো,

” আজকের রাতের পরে আমাদের জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে। তুমি রাজি তো? ”

মেঘলা আরশাদের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে লজ্জায় নিজের মুখ লুকিয়ে ফেললো। এবার আরশাদ ধীরে ধীরে মেঘলার আরো কাছে পৌঁছে গেলো। এতোটা কাছে পৌছালো যেখানে গেলে দুইটি আত্না এক হয়ে যায়। বাহিরের কালবৈশাখী ঝড়ের শব্দে তাঁদের দুইজনের জীবনের প্রথম সুখময় অনুভূতি গুলোর শব্দ চাপা পরে গেলো। সবকিছুর সমাপ্তি হতে হতে রাত প্রায় দুইটা বাজলো। আরশাদের মত ওরকম একটা শক্তপোক্ত পুরুষের চাপে মেঘলার শরীর একদম নেতিয়ে গিয়েছে।আরশাদ ফিসফিসিয়ে মেঘলাকে বলো,

“সরি বউ, তোমার অনেক কষ্ট হলো।”

আরশাদের কথার উত্তরে মেঘলা কিছু বলল না। শুধু নিজের ক্লান্ত শরীরটাকে আরশাদের বুঁকের উপর এলিয়ে দিলো । তারপর খুব মৃদু কণ্ঠে বললো,

“অনেক ভালোবেসে ফেলেছি আরশাদ। আপনি আমার চোখে দেখা সবচেয়ে পবিত্র পুরুষ।”

“আর তুমি আমার কাছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র নারী।”

কথাটা বলেই আরশাদ মেঘলার কপালে টুপ্ করে একটা চুমু খেলো। তারপর মেঘলার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,

“বারান্দায় যাবে। বাহিরের খোলা বাতাসে ভালো লাগবে।”

“যাবো কিভাবে? উঠতে কষ্ট হচ্ছে।”

“ডোন্ট ওরি আমি তোমাকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছি।”

———————

মেঘলা খোলা বারান্দায় দোলনায় বসে দোল খাচ্ছিলো।আরশাদ ও তার পাশেই বসা ছিলো । হুট্ করে মেঘলা বলে উঠলো,

“শুনলাম আপনি নাকি আমার জন্য সন্ন্যাসী হতে ও চেয়েছিলেন?

আরশাদ ঘাড় মৃদু নাড়িয়ে উত্তর দিলো,

“হু ”

মেঘলা তার উত্তর শুনে তার দিকে ইনোসেন্ট ভাবে তাকিয়ে বললো,

“ভাবতে পারেন আমি আপনাকে না ভালোবাসলে আপনার সারাজীবন সন্ন্যাসী হয়ে থাকতে হতো। তো এখন আমাকে সুন্দরমতো থ্যাংক ইউ বলেন।”

মেঘলার আবদার শুনে আরশাদ কিছুটা মুচকি হেসে মেঘলার সামনে হাটু গেড়ে বসলো।

“আমার পরম সৌভাগ্য যে তুমি আমাকে ভালোবেসেছো। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। তোমার এই ভালোবাসা আমি সারাজীবন মনে রাখবো।”

চলবে………..

এতো বিশাল পর্ব আমি আমার পুরো লাইফে কখনো লেখিনি। কেমন লাগলো আপনাদের?কমেন্টে জানাবেন ❤️

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here