#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৭
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে প্রকৃতিতে তখন চারদিকে ঘন কালো মেঘের আনাগোনা। এটা বসন্তকাল, সবসময় বৃষ্টি না হলেও, হঠাৎ করেই বৃষ্টি আসে আর যায়। এই হালকা বৃষ্টি বসন্তকালকে আরও দ্বিগুণ সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। শিউলির আবার বৃষ্টি ভীষণ প্রিয়। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে, যা শরীরের ওপর শীতল স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছিল।
বৃষ্টির দিনে বেশিরভাগ মানুষই উষ্ণ বিছানায় ঘুমিয়ে থাকে। আজ শুক্রবার, তাই শিমুল ভাই হয়তো কাজে যায়নি, বাড়িতেই আছে। তবে সকাল থেকে এখনও শিমুল ভাইয়ের সাথে তার দেখা হয়নি।
শিউলি বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা খেলা করছে, প্রকৃতি শান্ত, কিন্তু শিউলির ভেতরে তখন এক অস্থিরতা। জাবেদা বেগম ঘর থেকে ডেকে বললেন,
“শিউলি, এই সময় বাইরে যাস না। বৃষ্টি ভারি আইতাছে। একটু ঘুমা।”
শিউলি শুধু বলল, “আইচ্ছা।”
কিন্তু শিউলির মনে তখন অন্য কিছু ঘুরছে। এই সময় শিউলির পক্ষে বাইরে না গিয়ে থাকা মুশকিল।
কিছুক্ষণ পরই শিউলি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি যেন একরোখা জেদে প্রচুর বর্ষণ শুরু করল। আকাশ ভেঙে জলধারা নামল। বাতাসের দাপটে শিউলির গায়ের ওড়না উড়ে যেতে চাইল। কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই।
শিউলির পায়ে শিমুল ভাইয়ের দেওয়া সেই নতুন নূপুর দুটো।
শিউলি দ্রুত, ভিজে চুপসে শিমুল ভাইদের বাড়িতে ঢুকল। বারান্দার দিকে তার নজর যেতেই দেখল শিমুল বারান্দায় এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখ বাইরে, বৃষ্টির দিকে নিবদ্ধ। লোকটা যেন এই পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে, এক উদাসীন প্রশান্তিতে মগ্ন। বৃষ্টি তার চুল এবং শরীরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে, আর সে গভীর মনোযোগে সেই স্পর্শ অনুভব করছে।
ভেতরে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারল না শিউলি। হৃদয়ের সমস্ত আবেগ মিশিয়ে, কাঁপানো ঠোঁটে সে ডাকল,
“শিমুল ভাই!”
ধুম বৃষ্টির মাঝেও শিউলির কণ্ঠ শিমুলের কানে এসে পৌঁছাল।
শিমুল তাকালো বৃষ্টি ভেজা শিউলির মুখখানার দিকে। চুল লেপ্টে আছে শিউলির মুখের চারদিকে। শিমুল কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, তার আগেই শিউলি শিমুলের হাত ধরে টেনে, বৃষ্টি পড়তে থাকা উঠানে নামিয়ে আনল।
দু’জন হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পুকুর ঘাটে গেল।
শিমুল দাঁড়িয়ে রইলেন আর শিউলি গিয়ে পুকুরের ঘাটে বসে পা পানিতে ফেলে বৃষ্টি বিলাসে মগ্ন। শিমুল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। আজও মেয়েটার পরনে সাদা জামা পরিহিত। সাদা জামাতে মেয়েটাকে বেশিই সুন্দর লাগে, একদম বেলিফুলের মতো সুন্দর! ওড়নাটা পেঁচিয়ে থাকার কারণে শরীরের কোনো অংশ বুঝা যাচ্ছে না।
শিমুল ডেকে বললেন,
“শিউলি, তোর জ্বর আইব। চল, বাড়িতে যাই।”
শিউলি চিৎকার করে বলল,
“আসলে আসুক জ্বর! তুমি আছো তো, আমার ঔষধের মতো কাজ করবেন।”
শিমুল আর কথা বললেন না। এতটা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে শিমুল আর কখনো দেখা যায়নি। শিমুলএগিয়ে গিয়ে বসলেন শিউলির পাশে। শিমুলের চুলগুলো কপালে লেপ্টে আছে। তাদের মাঝখানে অনেকটা জায়গা ফাঁকা। শিউলি শিমুল ভাইয়ের আরেকটু কাছে গেল।
শিমুলএকটু দূরে সরে গিয়ে বলল,
“শিউলি, তুই কাছে আইগাচ্ছোস ক্যান? দূরে সর।”
“আর কত দূরে সরব? এমনিতেই তো দূরে! শুনো না শিমুল ভাই, আমারে বিয়া কবে করবা?”
শিমুল যেন বিয়ের কথা শুনে আকাশ থেকে পড়ল। সে ধীরে কণ্ঠে উচ্চারণ করল,
“বিয়া…!”
“হুম, বিয়া। কেন, আমাকে বিয়া করবা না তুমি? জানো শিমুল ভাই, তোমার সাথে সংসার করার তীব্র ইচ্ছে আমার। তোমার নামে চুড়ি পরার ভীষণ শখ আমার। একদিন লাল টুকটুকে বেনারসী পরে তোমার কুঁড়ে ঘরে প্রবেশ করব।”
শিউলি চোখ বন্ধ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ইচ্ছের কথা জানাল।
শিমুল গভীর জলে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,
“আমার সাথে তোরে এই সময় দেখলে লোকে মন্দ কইব।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠল, যেন এই বৃষ্টির শব্দে শুধু তার গানই শোনা যাক,
“জানলে জানুক লোকে মন্দ কী হায়!
লুকোচুরি করে কি প্রেম করা যায়?
তুমি ছাড়া, একা-একা যে
বাঁচা দায়।”
শিমুল শিউলির গান শুনে বলল, “বাহ্! তোর গানের গলা চমৎকার! কিন্তু এসব কথা গানেই ভালো মানায়। বাস্তবে ভীষণ ভয়ংকর।”
শিউলি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,
“যদি এমন কোনো সময় আসে যে আমাদেরকে বাড়ি থেকে মেনে নিবে না, তখন কী করবা?”
“কিছু করমু না।”
শিমুল ভাইয়ের সোজা-সাপটা জবাবে শিউলি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তারপর অভিমানী স্বরে বলল,
“শিমুল ভাই, তুমি প্রেমিকার মন চুরি করতে পারলেও প্রেমিকাকে খুশি করতে ব্যর্থ।”
শিউলির কথা শুনে শিমুল উচ্চস্বরে হাসতে লাগল। শিউলি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ‘কী অদ্ভুত! আমি হাসার মতো কী বললাম?’
তবে শিমুল ভাইয়ের হাসি দেখে কিছু বলার মতো জায়গা পেল না শিউলি। সে বলল, “জানো শিমুল ভাই, তোমার এই হাসি দিনদিন আমার মরণের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।”
★★★
সিদ্দিক ইকবাল বসে আছেন। হাতে খবরের কাগজ। এলাকার কয়েকজন এসেছেন, তাদের সাথেই বসে কথা বলছেন তিনি। তামিম এসে দাঁড়াল তার বাবার পাশে। সিদ্দিক ইকবাল ছেলের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“কিছু কি বলবে?”
“হ্যাঁ, একটা কথা আছে।”
সিদ্দিক ইকবাল লোকেদের সাথে কথা শেষ করে তামিমকে বললেন, “কী বলবে বলো।”
“আব্বু, আমি বিয়ে করতে চাই।”
সিদ্দিক ইকবাল চক্ষু বড় বড় করে তাকিয়ে বললেন,
“বিয়ে করবে? এতদিন ধরে বলছি বিয়ে করার জন্য, কিন্তু করছো না। আজ হঠাৎ বিয়ের কথা?”
“বিয়ের কথা তো মানুষ হঠাৎই বলে, নাকি প্রতি সেকেন্ডে বলে বেড়ায় আমি বিয়ে করব!” তামিম বিরক্তির স্বরে বলল।
সিদ্দিক ইকবাল ছেলের কথায় কিছুটা অসন্তোষ হলেও তা প্রকাশ করলেন না। তিনি বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আজ থেকে মেয়ে দেখা শুরু করছি।”
তামিম মাথা নেড়ে বলল,
“মেয়ে দেখতে হবে না।”
সিদ্দিক ইকবাল ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“মেয়ে দেখব না তো কী দেখব? ছেলে দেখব নাকি?!”
তামিম বলল, “মেয়ে আমার দেখা আছে।”
“কে?”
“মেম্বারের মেয়ে।”
“মেম্বারের মেয়ে? মেম্বারের মেয়ে তো ছোট।”
“বড় মেয়ের কথা বলছি। তুমি তাকে দেখোনি।”
সিদ্দিক ইকবাল বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি একসময় গিয়ে মেম্বারের মেয়েকে দেখে আসব।”
তামিম বলল,
“তোমার দেখার কী প্রয়োজন? আমার পছন্দ হয়েছে, তোমার পছন্দে কোনো যায় আসে না। আর চাইলে তুমি দেখে আসতেই পারো, তবে তোমার পছন্দ-অপছন্দ আমার কাছে ব্যক্ত করবে না। আমি শিউলিকে বিয়ে করব মানে তাকেই বিয়ে করব।”
সিদ্দিক ইকবাল এবার রেগে গেলেন,
“তুমি এভাবে কেন কথা বলো আমার সাথে? আমি তোমার বাবা হই, তুমি মনে হয় ভুলে গেছো! তুমি একটু মিষ্টি করে কথা বলা শিখতে পারলে না?”
“তোমরা ছোটবেলায় আমার মুখে মধু দাওনি, তাই আমার মুখ দিয়ে মধু বের হয় না। এটাও কি আমার দোষ?”
সিদ্দিক ইকবাল রাগে উঠে চলে গেলেন, কথা না বাড়িয়ে।
★★★
সন্ধ্যা পর প্রতিদিনের মতো পড়তে বসল শিউলি। হঠাৎ রুমে ফুলঝুরি এসে বলল, “আপা, চেয়ারম্যান আইসে।” শিউলির কাছে এটা স্বাভাবিকই মনে হলো, কারণ তার বাবা যেহেতু মেম্বার, তাই সবসময় এই সেই আসতেই থাকে। কিন্তু চেয়ারম্যানকে কখনো এই বাড়িতে আসতে দেখা যায়নি। শিউলি আবারও মনোযোগ দিল নিজের পড়ায়।
কিছুক্ষণ পর জাবেদা বেগম এসে বললেন,
“শিউলি, ওই রুমে আই তো একটু। চেয়ারম্যান সাহেব তোকে দেখতে চাইতেছে।”
শিউলি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“আমারে দেখতে চাচ্ছে মানে? কেন?”
“তা আমি কী করে বলব? চল, ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করেই চলে আসবি।”
শিউলি ‘আচ্ছা’ বলে পাশের রুমে গেল। চেয়ারম্যান বসে আছেন সোফাতে। শিউলি গিয়ে সালাম দিল। চেয়ারম্যান সাহেবও সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
“তোমার নাম কী মা?”
“শিউলি।”
চেয়ারম্যান সাহেব আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। নিজের রুমে ফিরে গেল শিউলি।
চেয়ারম্যান ইদ্রিস খন্দকারকে বলল,
“মেম্বার, আমি আমার ছেলে তামিমের সাথে আপনার মেয়ের বিয়ে দিতে চাই।”
জাবেদা বেগম ও ইদ্রিস খন্দকার দু’জন দু’জনের দিকে তাকাল। জাবেদা বেগম চোখের ইশারায় ‘না’ করে দিলেন।
ইদ্রিস খন্দকার এবার বললেন,
“আমার মেয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। তাই আপনার এই প্রস্তাবটা রাখতে পারলাম না।”
চেয়ারম্যান সাহেব চুপ করে রইলেন। তার মুখের ওপর তার প্রস্তাব কেউ নাকচ করল এতে হয়তো তিনি অপমান বোধ করলেন। আবারও চেয়ারম্যান বললেন,
“একবার ভেবে দেখো মেম্বার।”
এবার জাবেদা বেগম বললেন,
“না, এটা সম্ভব না। আমার বোনের ছেলের সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে, তাই ওইখানে বিয়ে দিব।”
চেয়ারম্যান সাহেব কথা বাড়ালেন না, উঠে গেলেন। অপমানিত বোধ নিয়ে তিনি নীরব পদক্ষেপে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
#চলবে

