#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৬
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিউলি নিজের রুমে ঢুকেই দেখল মিলি মেয়েটা নিজের ব্যাগ গুছাচ্ছে। শিউলি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। মেয়েটাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না হাত দুটো অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপছে। শিউলি সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল,
“মিলি, তোর কি হয়েছে? ব্যাগ গুছাচ্ছিস কেন?”
মিলি থামল না। এমন মনে হচ্ছে যেন সে শিউলির কথা শুনতেই পেলো না। শিউলি এবার অধৈর্য হয়ে মিলির হাত ধরে টেনে তার সামনে দাঁড় করাল। মিলির চোখ দুটো ফুলে আছে। অস্বাভাবিক ভাবে লাল হয়ে আছে। ‘মেয়েটা কি কেঁদেছে! তাই হবে হয়তো!’ শিউলি মিলির দুই গালে নিজের দু’হাত রেখে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তোর? তোর চোখগুলো এমন দেখাচ্ছে কেন?”
শিউলির কাছ থেকে মিলি নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। এমন ভাবে ছাড়িয়ে নিল, যেন সে শিউলিকে নিজের সামনে দেখতে একদমই পছন্দ করছে না। মিলি আবারও নিজের কাপড় গুছাতে লাগল। শিউলি এবার টান দিয়ে ব্যাগ কেঁড়ে নিয়ে সামান্য রাগি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কথা বলছিস না কেন? আর সোহাগ এসেছে, তুই নাকি দুপুরে কল দিয়ে আজই আসতে বললি, তুই শহরে ফিরে যাবি বলে। কী সমস্যা তোর, আমাকে বল!”
মিলি চিৎকার করে উঠল,
“প্লিজ আপু, লিভ মি অ্যালোন।”
মিলির চিৎকারে শিউলি হালকা কেঁপে উঠল। মিলি মেয়েটা হঠাৎ কেঁদে উঠল। সে বিছানায় ধপ করে বসে মুখে হাত ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। শিউলি থমকে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মিলির পাশে বসে মেয়েটাকে বুকে জড়িয়ে নিল। কারো কান্না দেখলে শিউলির নিজেরই কান্না চলে আসে। কিছুক্ষণ মিলিকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখল, তারপর আবারও একই প্রশ্ন করল,
“কী হয়েছে?”
মিলি নিজের চোখ মুছে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপু, জানো? আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, ভীষণ।”
শিউলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মিলি আবারও বলল, “আপু, ক্ষমা করো। তোমার ডায়রিটা আমি তোমাকে না বলেই পড়ে নিয়েছি।”
মিলির কথা শুনতেই শিউলির শিরদাঁড়া দাঁড়িয়ে গেল। শিউলির ডায়রিতে শিমুল ভাইকে নিয়ে সকল মনের কথা লেখা। শিউলি তো বুঝতে পেরেছিল আগেই যে মিলি শিমুল ভাইকে ভালোবাসে। মিলি আবারও বলল, তবে এবারের কণ্ঠে মিলির অসহায়তা ভর করল,
“আমি এই পনেরো বছরে স্যাক্রিফাইস করতে শিখে গেছি আপু।”
শিউলি কিছু বলতে পারল না। চুপ করে তাকিয়ে রইল মিলির দিকে। মিলি আবারও বলল,
“আচ্ছা আপু, আমি যদি তোমাকে বলি যে শিমুল ভাইকে তুমি আমাকে দিয়ে দাও। দিবে তুমি? বলো না আপু, আমাকে দিয়ে দিবে ওই একটা মানুষকে? পারবে তুমি স্যাক্রিফাইস করতে?”
শিউলির হৃৎস্পন্দন অবধি কেঁপে উঠল। শিমুল ভাইকে কাউকে দিয়ে দিতে কি সে আদৌও পারবে? না, কখনোই পারবে না। শিউলি পাথরের মতো বসে থেকে বাম-ডানে মাথা নাড়াল, যার অর্থ ‘না’।
মিলি অট্টহাসি হেসে উঠল। সে হাসতে হাসতে বলল,
“দেখছো আপু? তুমি আঠারো বছর হয়েও সামান্য একটা স্যাক্রিফাইস করতে পারছো না, আর আমি মাত্র পনেরো বছরের এক কিশোরী হয়ে আমার বয়ঃসন্ধিকালের প্রথম প্রেমকে মাটি চাপা দিয়ে দিলাম হৃদয়ের মাঝে! তাহলে বলো, আমি জিতে গেলাম না বলো?”
মিলি হঠাৎ নিজের মাঝে একটা অন্য রকম পরিবর্তন এনে সামনে এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি যদি শিমুলকে ভালোবাসো, তাহলে আমার ভাইকেও কেন ঠকাচ্ছো? ভাইয়ার সাথে তো তোমার বিয়ে হবে ক’দিন পর, তখন কী করবে?”
শিউলি এই ভয়টাই পাচ্ছিল যদি এখন মিলি সবাইকে শিমুল ভাইয়ের ব্যাপারে বলে দেয়, তখন কী হবে! যদি বলে দেয় যে শিউলি শিমুলকে ভালোবাসে, তাহলে যে বিয়ে হওয়ার কথা ছিল এক মাস পর, সেই বিয়েটা হয়তো আজ রাতেই দিয়ে দিবে। শিউলি অনুনয় করে বলল,
“প্লিজ বোন আমার, কাউকে বলিস না এসব কথা। তোর ভাইয়াকে আমি সব খুলে বলব, তবে তার আগে আমার একটু সময় দরকার।”
মিলি মুচকি হেসে বলল,
“চিন্তা করো না আপু, বলব না আমি। আমি না হয় না পাওয়ার যন্ত্রণাটাই সহ্য করি। তুমি শিমুল ভাইকে যত্নে রেখো।”
শিউলি কিছু বলল না, শুধু তাকিয়ে রইল মিলির দিকে।
★★★
রাতে মিলি আর সোহাগকে শহরে যেতে দেওয়া হলো না। কারণ, এতটা দূর রাস্তা রাতে যাওয়া ঠিক না। সকাল সকাল সোহাগরা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আর শিউলি এখন কলেজ যাচ্ছে, সাথে তার বান্ধবী বৃষ্টি। শিউলি মনমরা হয়ে পথ চলছে। শিউলিকে এমন অবস্থা দেখে বৃষ্টি জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে তোর?”
“তেমন কিছু না।”
বৃষ্টি জেদ করল, “বল না, কী হয়েছে আমাকে?”
শিউলি ধীর কণ্ঠে বলল,
“সোহাগের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।”
বৃষ্টি নিশ্চিত হতে চাইল,
“তোর খালাতো ভাই?”
“হুম।”
“কত তারিখে ঠিক হলো বিয়ে?”
“চৈত্র মাসের ত্রিশ তারিখ।”
বৃষ্টি শিউলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আজ তো ১৫ই চৈত্র। বিয়ের তো বেশি দিন বাকি নেই। বিয়েটা করে নিবি নাকি?”
শিউলি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। বৃষ্টির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বলল,
“কী বলছিস তুই! আমি সোহাগ কেন, কোনো পুরুষকেই নিজের জীবনসঙ্গী করতে পারব না একমাত্র আমার শিমুল ভাই ছাড়া।”
বৃষ্টি শিউলির কাঁধে হাত রেখে বোঝানোর স্বরে বলল,
“সত্যি কথা বলতে হলো, আমার মনে হয় না তুই শিমুলকে পাবি। আর শিমুলও তোকে নিজের করে নিতে পারবে না। আর তোর কি মনে হয়, তোর বাপ মেম্বার হয়ে শিমুলের হাতে তোকে তুলে দিতে রাজি হবে?”
“কেন রাজি হবে না! শিমুল ভাই এখন টাকা আয় করছে। কাজ করছে।”
শিউলির কথা শুনে বৃষ্টি হেসে বলল,
“ভালো কথা। কিন্তু তোর কি মনে হয়, তোর বাপ মেম্বার হয়ে একটা গরীব, দিন আনে দিন খায় ছেলের হাতে তোর বিয়ে দিবে?”
শিউলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বৃষ্টি যা বলছে, তা একদমই ভুল না। মেম্বার হয়ে কি নিজের মেয়েকে শিমুলের মতো ছেলের হাতে তুলে দেবে?
শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“তুই কী বলতে চাস?”
“আমি বলতে চাচ্ছি, তুই শিমুলকে ভুলে যা।”
শিউলি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, বলল,
“কেউ কি নিজের নিশ্বাস নেওয়া ভুলতে পারে? আমি কী করে আমার শিমুল ভাইকে ভুলে যাব? শিমুল ভাই যে আমার জীবনে বসন্তের রঙিন ফুল হয়ে এসেছে!”
“বসন্তের ফুল সবসময় থাকে না, কখনো না কখনো ঝরে যায়।” বৃষ্টি শিউলির সাথে কথায় ব্যর্থ হয়ে বলল বৃষ্টি।
তখনি হঠাৎ পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসল তামিমের।তামিম ছেলেটা শিউলির একদম সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“মনে আছে তো? আজ তিন দিন হয়ে গেছে। কী সিদ্ধান্ত নিলে?”
“আমি আগেও বলেছি, আমার সিদ্ধান্ত একই থাকবে। আগেও না করেছি, এখনও না-ই থাকবে।”
তামিম ঠোঁটের ফাঁকে সিগারেট ধরিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, সুইটহার্ট। এবার যা করার আমি করব।”
শিউলি আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সেই স্থানে। আবারও দ্রুত পা বাড়াল কলেজের দিকে।
শিউলি সিদ্ধান্ত নিল শিমুল ভাইকে বিয়ের বিষয়ে জানাতেই হবে। সোহাগের সাথে বিয়ের কথা ছিল বৈশাখ মাসে বিয়ের তারিখ ঠিক হবে, কিন্তু আজ সোহাগের বাবা কল করে ত্রিশ তারিখেই বিয়ের তারিখ ফাইনাল করেছে। শিমুল ভাই বাড়িতে আসতে আসতে সন্ধ্যার পর আসবে। তাই আজ সন্ধ্যার পরই দেখা করতে হবে।
★★★
শিউলি টেবিলে বসে পড়ছে। পড়ার ওপর তার কোনো মনোযোগ নেই। তার মনোযোগ পুরোটাই ইদ্রিস খন্দকার কখন বাড়ি থেকে যাবে, আর সে শিমুল ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যেতে পারবে সেই দিকে। বেশিরভাগ সময়ই ইদ্রিস খন্দকার সন্ধ্যার পরই বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারে যান আর বাড়ি ফেরেন দশটা-এগারোটার দিকে। কিন্তু আজ এখনো বাজারে যাননি। তিনি বসে বসে গল্প করছেন।
অনেকক্ষণ এভাবেই কাটল। ফুলঝুরি এসে বায়না করল যে, তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিক।
শিউলি ধমক দিয়ে বলল,
“যা, গিয়া আম্মার সাথে ঘুমা। আমার কাছে কী?”
ফুলঝুরি কেঁদে উঠল, আর চিৎকার করে বলতে লাগল,
“আম্মা, আপা আমারে মারে!”
শিউলি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
“কখন মারলাম আমি? কী মিথ্যাবাদী মেয়েরে বাবা!”
শিউলি বুঝতে পারল, এই মেয়ে যা বলছে, তাই করতে হবে।
“আয়, ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।”
শিউলি ফুলঝুরির সাথে শুয়ে ফুলঝুরির ছোট ছোট চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এতক্ষণে ইদ্রিস খন্দকারও বাজারে চলে গেছে।শিউলি উঠে দেখল, জাবেদা বেগমও ঘুমিয়ে গেছেন।
এই সুযোগ! শিউলি নিঃশব্দে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসল। সে সোজা চলে গেল শিমুল গাছের তলায়। সে শিমুল ভাইকে বলে রেখেছে সন্ধ্যার পর শিমুল গাছের কাছে আসতে। তার বুকে তখন এক দুরন্ত অস্থিরতা, কারণ হাতে সময় মাত্র পনেরো দিন।শিউলি সেখানে পৌঁছাতেই দেখল
শিমুল বসে আছে গাছের নিচে। শিউলির পদশব্দ পেয়ে শিমুল মাথা তুলে তাকাল। শিমুল উঠে এসে বলল,
“আমারে ক্যান এইহানে আসতে কইলি?”
“কেন, তুমি কি বিরক্ত হচ্ছো আমার সাথে দেখা করে? যদি তাই হয়, তাহলে চলে যাও।”
শিউলি অভিমানী স্বরে বলল।
“আরে না, বিরক্ত হমু ক্যান? কোনো কারণ তো থাকার কথা আমার লগে দেখা করনের। কী কারণ?”
“তোমাকে দেখার তৃষ্ণা পায় যে আমার সর্বক্ষণ।” শিউলি শিমুল ভাইয়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাল।
শিমুল বলল, “এত তৃষ্ণা ভালা না।”
শিউলি সহসা বলে উঠল,
“তোমাকে দেখার তৃষ্ণায় আমার মৃত্যু হোক, তবুও সেই তৃষ্ণা এই জীবনে না মিটুক।”
শিমুল আর কথা বলার জন্য জায়গা পেল না। চুপ করে চেয়ে রইল। শিউলি আবারও বলে উঠল,
“শিমুল ভাই, তোমার থেকে একটা স্বীকারোক্তি নিতে এসেছি। তোমার স্বীকারোক্তির উপর নির্ভর করবে আমার জীবন, অথবা আজই হবে তোমার-আমার শেষ দেখা।”
শিমুল চুপ করে তাকিয়ে রইল। শিমুল বুঝে উঠতে পারছে না, কী এমন স্বীকারোক্তি।
শিউলি শিমুল ভাইয়ের চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করল। শিউলির মনে হয়, এই লোকটার চোখে ভিন্ন কিছু আছে, যার ফলে তার মনে হয় যে এই পৃথিবীতে শুধুমাত্র তার শিমুল ভাই ছাড়া কেউ নেই।
শিউলি বলে উঠল,
“শিমুল ভাই, তুমি আমারে ভালোবাসো না কেন? আমারে কেন তুমি ভালোবেসে নিজের বুকে আগলিয়ে নাও না?”
শিউলির কণ্ঠ কাঁপছে। চোখে পানি টলমল করছে।শিমুল ভাই তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, একটা পাথরের মূর্তির মতো। শিউলি শিমুলকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“আমারে ভালোবাসো না, তাই তো? আচ্ছা, প্রয়োজন নাই তোমার ভালোবাসা। যেদিন আমি অন্যের বউ হয়ে তোমার সামনে দিয়ে চলে যাব, সেদিন বুঝবা তুমি কী হারাইছো।তারপর কাঁদতে কাঁদতে মমতাজের গান গাইবা। ”
শিউলি বাড়ির উদ্দেশ্যে মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা শুরু করল। হঠাৎ পেছন থেকে শিমুল ভাইয়ের কণ্ঠ শোনা গেল,
“পৃথিবীতে এতো মানুষ থাকার পরও আমার শুধু তোরেই লাগবো, এর থাইকা আর বড় স্বীকারোক্তি কী হইতে পারে?”
শিউলি থমকে দাঁড়িয়ে গেল। যেন সে নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। শিউলি ততক্ষণাৎ পেছন ফিরে তাকাল। সে বলে উঠল,
“সত্যি, তুমি আমারে ভালোবাসো?”
শিমুল এগিয়ে আসলো।একদম শিউলির সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভালোবাসি কিনা, জানি না। শুধু এইটুকু জানি, তোরে ছাড়া আমার একটা জীবন পার করা সম্ভব না। বসন্তের হিমেল হাওয়ার মতন তোরে আমার লাগব।ফুল ছাড়া যেমন বসন্তকাল অসম্পূর্ণ তেমনি শিউলি ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। ”
শিউলির মুখে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। শিমুল ভাইয়ের মুখ থেকে এই কথাগুলো শোনার জন্য কতগুলো বছর অপেক্ষা করতে হলো! ইচ্ছে হচ্ছে শিমুল ভাইকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু এখন ধরা যাবে না। একবারে বিয়ের পর শিমুল ভাইয়ের বুকে মাথা রাখবে বলে পণ করল শিউলি।
#চলবে…
(আজ ১৫০০+ শব্দ 😪🥱)

