#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৫
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
গোধূলির আকাশ তখন শেষ লগ্নে। সূর্যের অস্ত্র তখন পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে। সুন্দর একটা শীতল বাতাস বইছে, যে বাতাস শরীরকে আরাম দেওয়ার সাথে সাথে মনও শান্ত করতে যথেষ্ট। তবে শিউলির উদাসীন মন কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছে না। শিউলি শিমুল গাছের নিচে বসে আছে। এই গাছটা বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই।
সে অধীরভাবে অপেক্ষা করছে তার শিমুল ভাইয়ের জন্য। লোকটা কাজে গেছে, কখন আসবে শিউলির জানা নেই। কিন্তু সে নিশ্চয়তা ছাড়াই বসে অপেক্ষা করছে যদি সন্ধ্যার আগে ফিরে আসে, তাহলে হয়তো দেখা হয়ে যাবে।
আজ শিউলির মনটা একদমই ভালো নেই। কলেজ ছুটির পরই তামিমের সাথে দেখা। সে ছেলেটাকে ঠিক বুঝে পায় না। এই তামিম ছেলেটা অন্য কোনো মেয়েকে কখনোই বিরক্ত করে না, একমাত্র শিউলিকে ছাড়া।
কলেজ থেকে ফেরার পথে শিউলি দেখেছিল তামিম দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তখন প্রতিদিনের মতো ছেলেটার হাতে সিগারেট ছিল না। ছেলেটা একদম ভদ্র ছেলেদের মতোই বলল,
“শিউলি, সত্যিই আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি যদি আমার বেকার, ভণ্ড চরিত্রের জন্য অপছন্দ করো, তাহলে খোদার কসম, আমি সব ছেড়ে দিব। শুধু একবার বলো, ভালোবাসি।”
শিউলি শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। এতটা শান্ত গলায় কথা বলতে তামিমকে কখনোই দেখেনি শিউলি।
আজ হঠাৎ শিউলির তামিমের জন্য অন্যরকম সহানুভূতি কাজ করছিল।
আবারও তীব্র বাতাস এসে শিউলির মাথা থেকে ওড়নাটা পড়ে গেল। শিউলির ধ্যান ভাঙল। সে নিজেকে শাসন করল কেন সে তামিমের কথা ভাবছে! সে আবারও তাকাল সেই পথে, যে পথ দিয়ে শিমুলের আসার কথা। তখন মাগরিবের আযান দিবে দিবে অবস্থা। শিউলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির দিকে মুখ ফেরাল।
কয়েক কদম হাঁটার সাথে সাথে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসল এক অচেনা নামে,
“ফুল…!”
শিউলির পা থেমে গেল। কণ্ঠটা তার চেনা। কিন্তু এই ডাক, ‘ফুল’ এই ডাকে তো কখনোই ডাকেনি! শিউলি তৎক্ষণাৎ পিছু ফিরল। দেখা গেল শিমুল হাসোজ্জ্বল মুখখানা নিয়ে এগিয়ে আসছেন। এতক্ষণের ক্লান্তি শিমুলকে দেখার সাথে সাথে উবে গেল।
শিউলির মনে হলো, সে আজ অন্যরকম এক শিমুল ভাইকে দেখছে। লোকটার চোখে-মুখে সারাদিনের কাজ করার ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।
শিমুল শিউলির মুখপানে তাকিয়ে থেকেই প্রশ্ন করল,
“এইহানে কী করস?”
“অপেক্ষা…”
“কার লাইগা?”
“আমার জীবনের সকল অপেক্ষা, সুখ, দুঃখ, আনন্দ, হতাশা, মানসিক শান্তি একমাত্র শিমুল ভাইকে ছাড়া আর কার জন্য অপেক্ষা করব! বলতে পারো কি?” শিউলি শিমুল ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
শিমুল চোখে হাসির ঝলক নিয়ে নিচু হয়ে বলল,
“এত্ত সুন্দরী একটা মাইয়া শিমুল গাছের নিচে দাঁড়াইয়া আছে গোধূলি বেলায়। যদি কোনো ভূত-পেত্নী আছর করে তহন?”
“করলে করুক, তাতে ক্ষতি কী? তবে করবে না। এত সুন্দর আমাদের জোড়া দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইবে।” শিউলি হেসে বলল।
শিউলি আবারও বলল,
“সারাদিন কাজ করেছ, খুব কষ্ট হয়েছে তাই না শিমুল ভাই?”
শিমুল উদাস ভাবে হাসল। তার চোখে ভালোবাসার এক নীরব স্বীকারোক্তি, যা সারাদিনের ক্লান্তিকে যেন তুচ্ছ করে দেয়।
“আরে না, কিসের কষ্ট? তোর মতো এত সুন্দর মুখের দর্শন হলে কষ্ট থাকে নাকি?”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের কথায় মুচকি হাসল। তার মন ভরে গেল এই সরল প্রশংসায়। শিমুল ভাই বলল,
“গাছের নিচে একটুখানি বসবি?”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে, সবুজ ঘাসের নিচে গিয়ে বসে পড়ল।
শিমুলও শিউলির ঠিক সামনেই বসল। শিমুল নিজ শার্টের বুকপকেট থেকে যত্ন করে মোড়ানো একটি কাগজ বের করে আনল। শিউলির বুক ধুকধুক করছে কী আছে সেই মোড়কের ভেতর?
শিউলি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “এটা কী শিমুল ভাই?”
শিমুল শিউলির কথায় উত্তর না দিয়ে, ধীরে ধীরে মোড়কটি খুলল। ভেতরে বেরিয়ে এল রূপালী রঙের ঝুমঝুমে দুটো নতুন নূপুর।
শিউলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল, “নূপুর?”
শিমুল তার চোখে চোখ রেখে বলল,
“হুম, নূপুর। নূপুর পরতে তো তোর ভীষণ পছন্দ, তাই না? কয়েক দিন ধরেই দেখলাম তোর পায়ে নূপুর নাই। এই সুন্দর চরণ দুটো খালি থাকলে ঠিক মানায় না।”
শিমুল এখন বুঝদার হয়েছে। সে শিউলির ছোট ছোট ইচ্ছেগুলোও মন দিয়ে খেয়াল করে।
শিমুল গভীর আবেশে বলল,
“আমার প্রথম রোজগার শিউলি।আ্যইজ তিনশ টাকা কাম কইরা পাইছি।।হঠাৎ দেখলাম রাস্তার পাশে বিভিন্ন রকম মাইয়াগোর জিনিস লইয়া দোকান বইছে।আমি তো অন্য কিছু জিনিসের নাম জানিনা তাই এই নুপুর জোড়া আনলাম।”
শিউলির মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। ইদানীং যা ঘটছে, সবই তার কাছে যেন নিছক কাল্পনিক মনে হয়। ভালোবাসার এমন নিবিড় স্পর্শ সে কখনো কল্পনা করেনি।
শিমুল এবার আরও নরম স্বরে বলল,
“তোর পা দুটা সামনে বাড়া। পরাইয়া দেই নূপুর।”
শিউলি যেন সম্মোহিতের মতো তার সুন্দর, লাজুক পা দুটি শিমুলের দিকে এগিয়ে দিল। এই প্রথম শিমুল শিউলির পায়ে হাত দিল। এক পবিত্র ভালোবাসার উষ্ণতা অনুভব করল শিউলি।
শিউলি আজ আশ্চর্যের ওপর আশ্চর্য হচ্ছে। এটাও কি হতে পারে?
শিমুল শিউলির ফর্সা চিকন পা দুটোর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দৃঢ় হাতে নূপুর দুটো পরিয়ে দিলেন। শিউলির চোখ শিমুল ভাইয়ের দিকেই নিবদ্ধ। নূপুরের ঝুমঝুম শব্দে চারপাশের নীরবতা যেন আরও গভীর হলো।
শিমুল হেসে বলল, “বাহ্, এহন পা দুইটা পরিপূর্ণ।”
শিউলিকে দেখে মনে হচ্ছে সে এই পৃথিবীতেই নেই। সে এক প্রাণহীন, চাপা আকাঙ্ক্ষার কণ্ঠে বলল,
“আমি তো পরিপূর্ণ সেদিন হবো, যেদিন তুমি আমার হবে…”
শিউলির গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে তার অজান্তেই। শিউলির চোখের জল দেখে শিমুল ঘাবড়ে গেল। কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ত…তোর কী হইছে শিউলি? কান্দোস ক্যান?”
শিউলি দ্রুত নিজের চোখ মুছে নিল। হাসি মুখে বলল,
“কই না তো, কই কান্দি! জানো শিমুল ভাই, আমার যখনই মনে হয় তুমি আমার হচ্ছো, ঠিক তখনই আমার মনে ভয় চলে আসে যে আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলব।”
শিমুল শিউলির কথার প্রত্যুত্তরে কিছু বলতে পারলেন না।
হঠাৎ শিউলির নজর গেল শিমুল ভাইয়ের হাতের দিকে। সেই দিকে নজর যেতেই শিউলি চমকে উঠল। কী করুণ অবস্থা হাতের! হাতে কেমন ঘা-য়ের মতো হয়ে গেছে।
শিউলি চমকে শিমুলের হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নিল।
“এসব কেমন করে হলো শিমুল ভাই? এগুলো কী হয়েছে?”
শিমুল হেসে নিজের হাত দুটো শিউলির থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল,
“তেমন কিচ্ছু না রে। ওই যে ইট হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে গেলে তো হাতে একটু আঘাত লাগবই। আজ প্রথম দিন তাই এমন হইছে, পরে আর হইব না।”
শিউলির ঠোঁট দুটো অবিরত কাঁপছে। শিউলি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“তোমার আর কাজ করতে হইব না। তুমি আর কাজে যাইবা না।”
শিমুল এবার সরাসরি শিউলির চোখের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, যা এই প্রথম শোনা গেল।
“কাজ না করলে মেম্বার কি তার মাইয়ারে একটা বেকার পোলার হাতে তুইলা দিব?”
শিউলি আবারও থমকে গেল। তার মানে! তার মানে শিমুল ভাই কাজ করছে একমাত্র আমার জন্যই! যাতে সে আমাকে বিয়ে করতে পারে, আব্বা যাতে ‘বেকার’ বলে আপত্তি জানাতে না পারে!
এসব চিন্তা মাথায় আসতেই শিউলির মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। সে অবিশ্বাসের স্বরে বলল,
“তার মানে… তার মানে তুমি আমারে ভালোবাসো?”
শিমুল শিউলির কথার উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি যেন এই মুহূর্তের তীব্রতা থেকে দু’জনকে বাঁচাতে চাইলেন।
“চল শিউলি। মাগরিবের আযান দিয়া দিব একটু পরই। চল, বাড়িতে যাই।”
শিউলিও কোনো আপত্তি না করেই উঠে দাঁড়াল। তার মুখে তখন এক নীরব তৃপ্তির হাসি। শিমুল সরাসরি ‘ভালোবাসি’ না বললেও, তার নূপুর, তার পরিশ্রম এবং তার এই কথা সবকিছুই শিউলির কাছে সেই তিনটি শব্দের চেয়ে বেশি দামি।
দুজন একসাথে হেঁটে চলল। আজ তাদের এই সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী রইল সেই শিমুল গাছ, আর সন্ধ্যা নেমে আসার আবছা আলো।
★★★
শিউলি বাড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথেই মাগরিবের আযান প্রতিধ্বনি হতে শোনা গেল। শিউলির আজ ভয় নেই। যখন বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, তখন তার আব্বা এবং আম্মা দুজনকেই বলে গিয়েছিল বৃষ্টিদের বাড়ি যাচ্ছে একটা গুরুত্বপূর্ণ নোট আনার জন্য। বৃষ্টিদের বাড়ি তেমন দূরে নয়। আর যাওয়ার সময় দেখেছে মিলি শুয়ে আছে। মেয়েটা সকাল থেকেই কেমন মনমরা হয়ে শুয়ে আছে।
শিউলি ঘরে ঢোকার আগেই ভেতর থেকে কারো আওয়াজ শুনতে পেল।
শিউলি ঘরে ঢোকার আগেই উঁকি দিয়ে দেখল ভেতরে বসা সোহাগ। শিউলি চমকে উঠল। এই লোক আজ এই সন্ধ্যার সময় শহর থেকে কেন আসল? কিছুই বুঝতে পারছে না সে। ভেতরে কেমন যেন একটা ভয় ভয় করছে। কে জানে, আবার কী ঝামেলা শুরু হয়!
#চলবে…

