#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৪
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
ফজরের আযান দিচ্ছে। শেষ আযানের সাথে সাথেই শিউলির ঘুম ভেঙে গেল। শিউলি নিজের চোখ হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ঘষে চোখ মেলল। পাশেই মিলি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
শিউলি বিছানা থেকে নেমে বাইরে বের হতেই দেখল উঠানের সাইটের বৈদ্যুতিক বাতিটা অন করা। হেঁটে আসতে দেখা গেল ইদ্রিস খন্দকারকে। তিনি নামাজের অজু করেই আসছেন। শিউলিকে দেখে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“এত তাড়াতাড়ি উঠলি?”
“নামাজ পড়তে উঠলাম আব্বা।”
মেয়ের কথা শুনে ইদ্রিস খন্দকার দারুণ হেসে বললেন,
“হুম, প্রতিদিন এভাবে নামাজ পড়বি।”
বলেই তিনি ঘরে ঢুকে গেলেন।
এখন এতটা ঘন অন্ধকার নেই। অনেকটা আলোকিত হয়েছে। শিউলি অজু করে এসে নামাজ পড়ে নিল। আজ জাবেদা বেগম বাড়ি নেই। গতকাল সন্ধ্যার পরই খবর আসল জাবেদা বেগমের ভাই মানে শিউলির মামা অসুস্থ। তাই রাতেই ইদ্রিস খন্দকার জাবেদা বেগমকে পৌঁছে দিয়ে আসলেন। তিনি রাতে বাড়ি ফিরে আসেন, কারণ মেয়েরা বাড়িতে একা।শিউলি প্রতিদিন এত তাড়াতাড়ি উঠে না, বা উঠলেও নামাজ পড়েই আবার শুয়ে পড়ে। তবে আজ শিউলি শুয়ে পড়ল না।
আজ শিমুল ভাই প্রথম কাজে যাবে। তার উদ্দেশ্য শিমুল ভাইয়ের জন্য কিছু রান্না করবে আলাদাভাবে। আজ মা-ও বাড়িতে নেই, তাই কাউকে কৈফিয়ত দেওয়ারও প্রয়োজন নেই যে কার জন্য রান্না করবে।
শিউলি রান্নাঘরে ঢুকল। কোথায় কী রাখা, তা তার জানা নেই। সবকিছু একে একে খুঁজে বের করল।
তারপর মাটির উনুনে আগুন ধরিয়ে রান্না বসাল। মৃদু আঁচে রান্না হচ্ছে, আর সেই ভোরের আলো-আঁধারিতে শিউলির মন ভরে আছে এক নীরব ভালোবাসায়। আজ শিমুল ভাইকে ভালোভাবে খেয়ে কাজে যেতে হবে এই ভাবনাতেই তার সব মনোযোগ।
★★★
শিমুল গোসল করে এসে মাথার চুল নিজের গামছা দিয়ে মুছে নিচ্ছে। এখন বাজে সকাল সাড়ে ছ’টা। আছিয়া বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত। খুব তাড়াতাড়ি রান্না করছেন তিনি। তার ছেলে কাজে যাবে শুনে তিনি খুবই খুশি। এতদিনে ছেলেটার মাথায় একটু সুবুদ্ধি আসছে এটাই অনেক বড় কথা।
শিমুল হাঁক দিয়ে ডেকে বলল,
“আম্মা, রান্না হইছে?”
আছিয়া বেগম বললেন, “হ, শ্যাষ। আনতাছি।”
আছিয়া বেগম ভাত নিয়ে এলেন। বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে খাবার দিয়ে দিলেন। শিমুল বলল,
“তুমিও খাইয়া লও আম্মা।”
“তুই খা। আমার কাম আছে। আর কিছু লাগলে ডা দিস।”
বলেই তিনি আবারও রান্নাঘরে চলে গেলেন।
শিমুল মাথা নিচু করে খেতে আরম্ভ করল।
শিমুলের খাওয়া শেষ হলে হাত ধুয়ে উঠতে নিলেই দেখল শিউলিকে। শিমুল হেসে জিজ্ঞেস করল,
“কী রে শিউলি, এত সকাল সকাল আমাদের বাড়িত?”
শিউলি শিমুলের সামনে ফাঁকা মাদুরে বসে পড়ল। হাতের থাকা ওড়না দিয়ে ঢাকা প্লেটটা বের করে শিমুলের সামনে রেখে বলল,
“হুম, তোমার জন্য পায়েস রান্না করেছি।”
শিমুলের চোখে-মুখে বিস্ময়! শিউলির চোখে তখন গভীর মমতা। তার ভালোবাসার মানুষটি আজ কঠিন কাজে যাচ্ছে, তাই এই উপহার এই ভাবনাতেই শিমুলের হৃদয় ভরে উঠল এক অদ্ভুত আবেশে। এই পায়েস শুধু খাবার নয়, এই হলো শিউলির ভালোবাসার প্রথম নৈবেদ্য।
শিমুল পায়েসের বাটির দিকে তাকিয়ে খুশিতে হাসল। শিমুলের পায়েস ভীষণ প্রিয়। শিউলির দিকে তাকিয়ে বলল,
“চাচি রান্না করছে?”
শিউলি ডানে বামে মাথা নাড়াল, যার অর্থ ‘না’।
শিমুল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে কেডা?”
শিউলি নিজের মুখে একটু মিথ্যা রাগী অভিমান ফুটিয়ে বলল, “ক্যান, আমি কি রান্না করতে পারিনা? আমি সব পারি বুঝলে!”
শিমুল হাসি মুখে এক চামচ পায়েস মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
“উফফ! কী বানাইছিস রে শিউলি! এত মজা পায়েস খাইতাছি নাকি অমৃত!”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের থেকে প্রশংসা শুনে ভীষণ খুশি হলো। শিমুল ভাই খেতে খেতে বলল,
“তোর স্বামী বড় ভাগ্যবান হইব।”
শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“কীভাবে?”
“তোর হাতের এত মজার রান্না খাইতে পারব। আর তোর মতো ফুলরে পাইব।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। সহসা বলে উঠল,
“তোমারে পাইলেও যে এই আমিও ভাগ্যবতী হবো।”
শিমুল শিউলির কথাটা ঠিক করে শুনতে পারল না। বলল, “কী কইলি?”
শিউলি হেসে দুইদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল, “কিছু না।”
শিউলি ততক্ষণ সেখানেই বসে রইল যতক্ষণ পর্যন্ত শিমুল ভাইয়ের খাওয়া শেষ না হয়। খাওয়া শেষ হলে শিউলি প্লেট নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলে উঠল,
“শিমুল ভাই, সাবধানে কাজ কইরো। শিমুল ফুলে আঘাত লাগলে, বুঝে নিও কোনো এক স্থানে শিউলি ফুলটাও ব্যথায় কুঁকড়াচ্ছে।”
বলেই শিউলি দ্রুত চলে গেল। শিমুল ভাই তাকিয়ে রইল শিউলির যাওয়ার পানে। আর বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“এত্ত ভালোবাসার দাম কি তোরে দিতে পারুম আমি?”
★★★
মিলি দাঁড়িয়ে আছে শিউলি আর শিমুলদের রাস্তাটার ধারে। গতকাল শিউলি বলেছিল, আজ থেকে শিমুল কাজে যাবে। মিলি দাঁড়িয়ে রইল এক ধ্যানে তাকিয়ে শিমুলদের বাড়ির দিকে। লোকটা একবার বের হলে, একটা বার দেখার উদ্দেশ্য।
এই ছোট্ট পঞ্চদশী (পনেরো বছর বয়সী) মেয়েটা যে সেই শিমুল নামক পুরুষটাকে ভালোবেসে ফেলেছে। তখনি দেখা গেল শিমুলকে আসতে। মিলি এগিয়ে গিয়েই শিমুলের পথ আটকে দাঁড়াল। মিলিকে দেখে প্রথমে অবাক হলেও ততক্ষণাৎ শিমুল বলল,
“তুমি এইখানে কী করো?”
“কিছু না। আপনাকে দেখতে আসছিলাম।”
শিমুল একটু ঘাবড়ে গেল। বলল,
“আমারে…! ক্যান?”
মিলি কালক্ষেপণ করল না। সোজা ভাবেই বলে বসল,
“আমার আপনাকে ভীষণ ভালো লাগে। আই রিয়েলি লাভ ইউ।”
এতটুকু ইংরেজি বোঝার ক্ষমতা শিমুলের আছে। শিমুল ভাই মিলির কথা শুনে চোখ পাকিয়ে তাকাল। কণ্ঠে রাগ মিশ্রিত গলায় বলল,
“কী কইতাছো তুমি? ভাইবা কইতাছো তো!”
মিলি ধীর কণ্ঠে বলল, “হ্যাঁ, আমি ভেবেই বলছি।”
“তোমার বয়স কত মাইয়া? মাত্র চোদ্দ-পনেরো বছরের মাইয়া হইয়া এসব কইতাছো?”
শিমুল ভাইয়ের কথা শুনে মিলির হাসিটা গায়েব হয়ে গেল। মেয়েটা বলল,
“আপনি আমারে ভালোবাসেন না?”
শিমুল বলল,
“না…”
মিলির বুক ফেটে কান্না আসতে চাইল। শহরে কত কত ছেলে তার জন্য পাগল, আর গ্রামের একটা ছেলে তাকে রিফিউজ করল সেটা ভেবেই তার কষ্ট হচ্ছে। মিলি বলল,
“তাইলে আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন?”
শিমুল কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ হয়ে গেল। তার চোখে ভেসে উঠল শিউলির সরল হাসিমাখা মুখটা। শিমুল বলল,
“হ, বাসি।”
মিলিও থমকে দাঁড়াল। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “কাকে? সে কেমন? আমার থেকেও সুন্দর?”
“সে এমন একজন যার গুণ বর্ণনা করা যাইব না। তার রূপ কোনো ফুলের লগে তুলনা করলেও কম হইয়া যাইব। কারণ সে নিজেই একটা ফুল, যে ফুল অমূল্যবান ।”
বলেই শিমুল দ্রুত জায়গা ত্যাগ করল। একটি বিধ্বস্ত চোখ তাকিয়ে রইল তার দিকে অসহায়ের মতো। মিলি কাঁপা পায়ে বাড়িতে ঢুকে গেল।
★★★
দুইতলা বিশাল বড় বাড়িটার সামনে দুটো চেয়ারে বসে আছেন সিদ্দিক ইকবাল, যিনি এলাকার চেয়ারম্যান। আর তার সামনে আরেকটা চেয়ারে বসা ইদ্রিস খন্দকার। সামনে থাকা চায়ের কাপটা থেকে এখনো ধোঁয়া উঠছে।
সিদ্দিক ইকবাল হাসি মুখে বললেন,
“ইদ্রিস সাহেব, গ্রামের জন্য কয়টা ঘর আসছে?”
ইদ্রিস খন্দকার মনে করে বললেন,
“এই তো, একান্নটা।
“বিশটা ঘর আমাদের দলের লোকদের দিয়ে দিবেন। আর বাকিগুলো গ্রামের লোকদের দিয়ে দিবেন।”
ইদ্রিস খন্দকার নীরবে মাথা নেড়ে ‘আচ্ছা’ বললেন।
হঠাৎ দেখা গেল তামিম হেঁটে এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। সে সরাসরি প্রশ্ন করল,
“কেন, বিশটা নিজ দলের লোকদের দিবেন? আমার জানামতে, আমাদের দলের লোকদের ঘর এর আগেও দেওয়া হয়েছে। এখন আবার কেন?”
সিদ্দিক ইকবাল ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু ধমকের স্বরে বললেন,
“তোমাকে এসব বিষয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই।”
তামিম বাবার ধমকের তোয়াক্কা না করেই বলল,
“কেন দরকার নেই? আমিও এই গ্রামেরই একজন বাসিন্দা। তাহলে অবশ্যই এই বিষয়ে প্রশ্ন করার দরকার আছে। আপনারা সরকার থেকে যেসব অনুমোদিত জিনিস আছে, তার বেশিরভাগ ভাগাভাগি করে দেন আপনাদের চামচাদের। আর তারা তা দরিদ্র মানুষের কাছে অর্ধেক মূল্যে বিক্রি করে! অথচ সেই দরিদ্র মানুষগুলো বুঝতেও পারে না তাদের জিনিসই তাদের কাছে বিক্রি করছে। আসলে আপনারা দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধি হয়ে তাদেরই জিনিস ভোগ করেন!”
ছেলের এহেন কথায় সিদ্দিক ইকবাল হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, বললেন,
“তুমি কী বোঝো এসব বিষয়ে? সারাদিন তো বেকার ঘুরো!”
ইদ্রিস খন্দকারের মনে হলো, এই সময় এইখানে থাকা ঠিক না। তিনি বললেন,
“চেয়ারম্যান সাহেব, তাহলে আমি এখন যাই।”
ইদ্রিস খন্দকার অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন।
সিদ্দিক ইকবাল ছেলের দিকে তেড়ে গিয়ে বললেন, “বাইরের মানুষের সামনে আমাকে এভাবে বেইজ্জতি করার মানেটা কী?”
তামিম হেসে বলে উঠল,
“তোমার ইজ্জত থাকলে তো বেইজ্জতি করব! গিয়ে দেখো, যারা তোমাদের সামনে সামনে সালাম দেয়, তারাই তোমাদের পেছনে বাঁশ ঢুকায়।”
বলেই তামিম সামনে থাকা নিজের বাইকে চড়ে বসল। সিদ্দিক ইকবাল রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি রাগে পেছন থেকে অনেক কথাই শোনালেন, কিন্তু তামিম তা শোনার প্রয়োজন মনে করেনি। বাইকে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট দিল। তার উদ্দেশ্য কলেজের বাইরে গিয়ে শিউলিকে প্রতিদিনের মতো বিরক্ত করা।
তামিম কলেজের সেই টংয়ের দোকানের সামনে গিয়েই দাঁড়াল। তবে আজ আসতে দেরি হয়ে গেছে। এতক্ষণে কলেজের সকল স্টুডেন্ট কলেজের ভেতর ঢুকে গেছে। শিউলিকে দেখার জন্য এসেও দেখা না হওয়ায় তামিমের ভীষণ রাগ হচ্ছে। এরই মাঝে তার সকল বন্ধুরাও এসে গেছে।
তামিমের চোখ-মুখের ভাব দেখে এরশাদ নামক ছেলেটা বলল,
“কী ভাই তামিম? চোখ-মুখের এই অবস্থা কেন?”
তামিম বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে সিগারেট ধরিয়ে বলল,
“দূর! আজ শিউলির সাথে দেখা হলো না।”
“হয়তো আজ আসে নাই কলেজ।” এরশাদ বলল।
তামিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “আসেনি বলছিস?”
এরশাদ বলল, “হতেও পারে। চল, এখানে দাঁড়িয়ে এখন লাভ নেই।”
তামিম বাঁধা দিয়ে বলল,
“না রে তোরা যা। আমি এখানেই দাঁড়াই, হয়তো শিউলি আসছে। ওরে না দেখলে ভালো লাগব না।”
এরশাদ এবং সাথের সকলেই এক জোট হয়ে হেসে উঠল। এরশাদ তামিমের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“বাহ্ বাহ্! একদম প্রেমিক পুরুষ হয়ে গেলি দেখছি!”
তামিম হেসে বলল,
“কী আর করব বল! প্রেম যে খুব জ্বালাতন করে। ঠিকমতো ঘুমাতে দেয় না, খেতে দেয় না।”
এরশাদ সহ বাকিরা চলে গেল। তামিম একই ভাবে গিয়ে কাঠের টেবিলে বসল। দোকানদারকে বলল, এক কাপ চা দিতে।
#চলবে…
(নোট—যারা বলো আরো বড় করে পর্ব দিতে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, আমি প্রতিদিন গল্প দেওয়ার চেষ্টা করি।তাই এতটুকু সময়ের মাঝে এর চেয়ে বড় করে পর্ব দেওয়া সম্ভব হয় না।আমার পড়াশুনা আছে, ফ্যামিলি আছে তাদেরও সময় দিতে হয়।তাই আশা করব আমার পাঠকরা বুঝবে।অথবা আপনারা বললে একদিন পরপর গল্প দিব।তাহলে হয়তো বড় করে দিতে পারব গল্প।আজ পর্বে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ শব্দ আছে।অন্যআন্য লেখিকারা তিনদিন পরপর পর্ব দিয়েও সেই চৌদ্দশ বা পনেরোশ শব্দেরই পর্ব দিয়ে থাকে।অবশ্য আমার গল্পের সাথে অন্যসবার গল্পের তুলনা দেওয়াও পাপ কারণ যা আবোলতাবোল লেখি আমি🐸)

