#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৩
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
বসন্ত বিকালের শেষ লগ্নে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে চলেছে শিউলি আর শিমুল। সূর্য পশ্চিমের ঘন গাছপালার আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে।
শিউলি আর শিমুল সেই মেঠো পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। পায়ে পায়ে তাদের নরম মাটির গুঁড়ো উড়ছে, সেই ধুলো বিকেল বেলার সোনালী আলোয় চিকচিক করছে। পথটি বাঁক খেয়ে দূরে একটি আম গাছের দিকে চলে গেছে। গাছটিতে তার ডালপালা জুড়ে নতুন পাতার সবুজ আভা এবং মকুল চোখে পড়ছে।
বাতাসে মেশানো আলাদা মিষ্টি গন্ধ। সেটা হয়তো ধানের গোলায় রাখা সদ্য কাটা খড়ের গন্ধ, নয়তো দূরে কোথাও ফোটা কোনো বুনো ফুলের।
ডান পাশে যতদূর চোখ যায়, সবুজ সরষের ক্ষেত। আর বাঁ পাশে একটি ছোট পুকুর, সেখানে জল স্থির। হাঁটতে হাঁটতে শিমুল একটা ছোট নুড়ি(পাথরখন্ড) তুলে সামনের দিকে ছুঁড়ে দেয়।
আজকের বিকেলটা শিউলির কাছে প্রতিদিনের থেকে বেশিই সুন্দর মনে হচ্ছিল। তার কারণ হয়তো শিমুল ভাই সাথে থাকার জন্যই। আজ শিউলির ভয় নেই তার বাবা গঞ্জে যাবেন, আসতে আসতে অনেকটাই রাত হবে। মিলিকে বলে-কয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে আগেই।
শিউলি শিমুল ভাইয়ের পানে চাইল। ছেলেটার উসকো চুলগুলো বাতাসে অভিরাম নড়ছে। পরনে নীল রঙা একটা সাধারণ শার্ট আর বরাবরের মতো লুঙ্গি, পায়ে কোনো জুতো নেই। শিউলির পরনে সালোয়ার কামিজ আর মাথায় ওড়না টানা।
শিউলি এতক্ষণে মুখ খুলল, বলল,
“শিমুল ভাই, প্রতিটা বিকেল তোমার সাথে এভাবে কাটানোর এক আকাশ সমান ইচ্ছে আমার। তুমি পারবে না আমার সেই ইচ্ছেটা পূরণ করতে?”
শিমুল শিউলির দিকে তাকিয়ে অমায়িক হাসল, বলল,
“হুম, পারুম।”
শিউলি শিমুলের থেকে ‘হ্যাঁ’ উত্তর আশা করেনি,সে ভেবেছিল হয়তো বরাবরের মতো আজও শিমুল ভাই ‘পারব না’ বলবে। শিউলির হাসিটা আরও প্রসারিত হলো।
শিমুল ভাই শিউলিকে অবাক করে দিয়ে বলল,
“আইচ্ছা শিউলি, আমি যদি বিয়া করি, তাইলে বউরে খাওয়াইমু কী?”
শিমুলের কথায় শিউলি তার দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি দিল। শিমুল ভাই পেছনে দুই হাত বেঁধে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিউলি বলল,
“কেন, ভাত খাওয়াবে।”
“ভাতই তো খাওয়ামু, সেটা তো বুঝলাম। কিন্তু ভাত দিতে গেলেও তো ট্যাকা লাগব। ট্যাকা কই পামু?”
“ওহ, আচ্ছা এই কথা। তুমি চাইলে কাজ করতে পারো।”
শিমুল দাঁড়িয়ে গিয়ে বলল,
“তাইলে কালকের থাইকা পাশের বাড়ির রমজানের লগে টাউনে যামু কাজ করবার লাইগা। ওইখানে ইটের কলায় (brick kiln) কাজ করলে ভালা ট্যাকা পাওন যায়।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের পানের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিল না। লোকটা এখন নিজের ভালো নিজেই বুঝতে শিখছে। তবে শিউলির মনে মনে ভাবছে, লোকটা কি তার ভালোবাসা বুঝতে পেরেছে, নাকি এমনিই শুধু বিয়ের কথা বলল? তবে শিউলি আজ তার মনকে প্রশ্রয় দিল না। তার শিমুল ভাই নিজের ভালো বুঝছে, সেটাই বড় কথা।
শিউলি হেসে বলল,
“আচ্ছা, তাহলে আগামীকাল সকাল থেকেই যেও।”
শিউলি জানে, ইট ভাঙার কাজ করা বিরাট কষ্টের। এমনি সময় হলে শিউলি কাজ করতে যেতে না করে দিত। কারণ, শিমুল ভাইয়ের কষ্ট হলে মেয়েটা কি নিজেকে স্থির রাখতে পারবে! কিন্তু এখন না করার উপায় নেই। বড়জোর এক-দেড় মাস বিয়ের ডেট পিছিয়ে রাখতে পারবে, তার বেশি দিন বিয়ের তারিখ পিছিয়ে রাখতে পারবে না শিউলি। সে না চাইলেও বাড়ি থেকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেবে। তাই এই ক’দিনে শিমুল ভাইকে বুঝদার বানাতে হবে।
শিউলি চেয়েও শিমুল ভাইকে বিয়ের কথা বলতে পারল না এই ভয়ে যে, যদি শিমুল ভাই বলে ‘বিয়ে করে নে’, তাহলে সেই কথা শিউলি সহ্য করতে পারবে না। সে চায়, শিমুল যেন ভালোবাসার সম্পূর্ণ অর্থ বুঝে তবেই তার হাত ধরে।
শিউলি এসব ভাবতে ভাবতেই যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখল তার পাশে শিমুল ভাই নেই। এতটাই ভাবনার জগতে চলে গিয়েছিল যে, কখন শিমুল ভাই তার পাশ থেকে সরে গেল, টেরই পেল না।
শিউলি এদিক-সেদিক চোখ বুলিয়ে দেখল পুকুর ঘাটের ওই পার থেকে শিমুল ভাই আসছে হাতের মুঠোয় করে কিছু নিয়ে। শিউলি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
শিমুল দৌড়ে এসে শিউলির সামনে দাঁড়াল। ছেলেটা হাঁপাচ্ছে, দৌড়ে যাওয়া-আসার কারণেই হয়তো।
শিউলিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শিমুল ভাই নিজের কণ্ঠ কোমল করে শিউলির দিকে মুঠো করা হাতটা খুলল। হাতের মুঠোয় দেখা গেল সাদা রঙের এক মুঠো শিউলি ফুল।
শিমুল ভাই গভীর আবেশে বলল,
“তোরে দেওনের মতোন আমার কাছে কিছু নাই রে শিউলি। এই এক মুঠো শিউলি ফুলগুলো আমার শিউলিরে দিতে চাই। নিবি তো?”
শিউলি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নিজের চোখ বেয়ে দু’ফোঁটা আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শিউলির গলা কাঁপছে, কিছু বলতে পারছে না। তার শিমুল ভাই তাকে ফুল দিচ্ছে এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে!
শিউলি দু’হাত বাড়িয়ে দিল। শিমুল ভাই শিউলির হাতে পরম নরম ভাবে ফুলগুলো দিয়ে দিল।
তারা হেঁটে যাচ্ছে, তবে শিউলির চোখ এক মুহূর্তের জন্য অন্য দিকে সরছে না। শিউলি হঠাৎ কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“মানুষ মায়ায় পড়ে চোখের, সৌন্দর্যের, ব্যক্তিত্বের… আর আমি মায়ায় পড়েছি শিমুল ভাইয়ের কণ্ঠের, সরলতার, বোকামির।”
★★★
শিউলি বাড়ির কাছে গিয়েই দেখল মিলি দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির পেছনে। হয়তো তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। শিউলি পেছনে তাকিয়ে দেখল, শিমুল ভাই এতক্ষণে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেছেন। শিউলিকে দেখে মিলি এগিয়ে গিয়ে বলল,
“আপু, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?”
“কেন, কী হয়েছে?”
“হয়নি কিছু। অনেকক্ষণ ধরে বাড়িতে বসে ছিলাম একা, ভালো লাগছিল না তাই।”
শিউলি হেসে বলল, “আচ্ছা, চল বাড়ির ভেতরে যাই।”
মিলির চোখ গেল শিউলির হাতের শিউলি ফুলের দিকে। মিলি জিজ্ঞেস করল,
“আপু, শিউলি ফুল কোথা থেকে আনলে? আর তোমাকে আজ বেশ খুশি মনে হচ্ছে!”
শিউলির হাসি আরও গভীর হলো। বলল,
“একজনে দিয়েছে।”
মিলি জিজ্ঞেস করল, “কে দিছে?”
ততক্ষণাৎ মিলির মনে পড়ল সে শিউলিকে শিমুলের সাথে আসতে দেখেছে। তার মানে কি শিমুল দিয়েছে? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই মিলির মুখের হাসি উধাও হয়ে গেল। মিলি আরও ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কে দিছে আপু? শিমুল ভাই… না মানে ভাইয়া দিছে?”শিউলি মিলির প্রশ্নের উত্তর দিল না। শিউলি বলল,
“চল, বাড়ি চল। পরে একদিন বলব।”
মিলি আর কথা বাড়াল না। দুজনেই বাড়ির ভেতর ঢুকে গেল।বাড়ির ভেতর ঢুকেই দেখল ফুলঝুরি কান্না করছে। ফুলঝুরিকে কান্না করতে দেখে শিউলি এগিয়ে গিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলল,
“কী হয়েছে পটলকুমারীর?”
’পটলকুমারীর’ ডাক শুনলেই ফুলঝুরি আরও রেগে যায়। সে কান্নার গতি বাড়িয়ে দিল আরও।
শিউলি চাপা হেসে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে, তো বলো ফুলঝুরি, কী হয়েছে?”
“আম্মা মারছে!”
শিউলি জিজ্ঞেস করল, “কেন মারল?”
ফুলঝুরি কিছু বলার আগেই জাবেদা বেগম এগিয়ে এলেন। রাগী কণ্ঠে বললেন,
“কিছুক্ষণ আগে পড়াতে বসেছিলাম। কিন্তু ওনার এক কথাপড়বে না। এখন বল, এটারে মারব না তো কী করব?”
ফুলঝুরি কেঁদে বলল, “পড়তাম না আমি। আমি এই বাড়িত থাকুম না।”
ফুলঝুরির কথা শুনে মিলি আর শিউলি দুজনেই হেসে দিল। জাবেদা বেগম রাগী কণ্ঠে শুধালেন,
“পড়াশোনা করবি না তো কী করবি? বিয়ে বসবি নাকি?”
“হ, বিয়া বসমু।”
জাবেদা বেগম তেড়ে গেলেন ফুলঝুরির গায়ে হাত তোলার জন্য। ফুলঝুরি গিয়ে শিউলিকে জড়িয়ে ধরল। শিউলি জাবেদা বেগমকে আটকিয়ে বলল,
“থাক আম্মা, বাদ দাও। ছোট মানুষ।”
জাবেদা বেগম রাগে চলে গেলেন ঘরে। যেতে যেতে বললেন,
“বড়ডারে দেইখ্যা দেইখ্যা ছোটুডার এই হাল!”
মায়ের কথা শুনে শিউলি হেসে উঠল। বড় মেয়ে হলে এই এক জ্বালা ছোটগুলো কিছু করলেই দোষ এসে পড়বে বড়দের ঘাড়ে।
★★★
রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘরে যেতে চাইলেই জাবেদা বেগমের ফোনে কল আসল। কলটা জাবেদা বেগমই তুললেন। তিনি কিছুক্ষণ হাসি মুখে কথা বললেন। তারপর তিনি মিলির কাছে দিয়ে বললেন সোহাগ কল দিছে, কথা বল।
মিলি হাসি মুখে তার ভাইয়ের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলে গেল। একপর্যায়ে সোহাগ জিজ্ঞেস করল,
“শিউলি কোথায়?”
মিলি শিউলির দিকে আঁড়চোখে তাকিয়ে হেসে বলল, “এখানেই আছে। কথা বলবা?”
সোহাগ বলল, “হুঁ, দে।”
তার মাঝে শিউলি এসব লক্ষ্য করে হাত ইশারা করে না করতে লাগল তার কাছে দেওয়ার জন্য, কিন্তু মিলি শুনল না। মোবাইলটা দিয়েই চলে গেল।
শিউলি মোবাইলটা ধীর হাতে কানে তুলতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসল, “হ্যালো।”
শিউলি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল, “জ্বি।”
“কেমন আছো?”
“জ্বি ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো তাদের মাঝে। সোহাগের কথার প্রত্যুত্তরে শিউলি শুধু ‘হুঁ’, ‘হ্যাঁ’ উত্তর দিয়েছে। সোহাগ এক পর্যায়ে বলল,
“শিউলি, আমার মনে হচ্ছে তুমি আমার সাথে কথা বলতে ডিস্টার্ব ফিল করছো।”
শিউলি সোহাগের কথায় উত্তর দিল না। ওপাশ থেকে সোহাগ আবারও বলল,
“কিছুদিন পরই তো আমাদের বিয়ে, তাহলে এখন কথা বলতে সমস্যা কী?”
শিউলি চোখ বন্ধ করে নিল। এই বিয়ের কথা শুনলেই যে তার মাথা গরম হয়ে যায়, সেটা সে কী করে বোঝাবে!
শিউলি বলল,
“জ্বি, বিয়েটা হয়নি আগে হতে দিন নাকি! আর আমার আগামীকাল ক্লাস টেস্ট আছে। আশা করি, আমার কথা বুঝতে পারছেন আমাকে পড়তে হবে।” বলেই শিউলি কল কেটে দিল।
শিউলি দুই হাত মাথায় দিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। সে বুঝতে পারছে, এই বিয়ে নিয়ে বিশাল বড় ঝামেলা হবে। এসব ঝামেলা হওয়ার আগেই শিমুল ভাইকে বুঝদার বানাতে হবে।
#চলবে…

