বসন্তের_ঝরা_ফুল #পর্ব_১২

0
22

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১২
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
আগের মতো আজও তামিম শিউলির পথ আটকে দাঁড়িয়েছে। শিউলির ভীষণ রাগ হচ্ছে এমনিতেই আছে চিন্তায়, তার মাঝে এই তামিমের উগ্র ঝামেলা!
​তামিম সিগারেটে টান দিয়ে বলল,
“কী শিউলি, কয়েকদিন ধরে কলেজে যাচ্ছো না যে?”

​শিউলি রাগী কণ্ঠে বলল,
“সেটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে না।”

​“আমার কাছে দিবে না মানে, সুইটহার্ট? তাহলে আর কার কাছে দিবে শুনি?”

​“প্লিজ, আমার পথ ছাড়ুন। ভালো লাগছে না আপনার এসব ফালতু প্যাঁচাল।”

​তামিম শিউলির চারপাশে ঘুরে বলল,
“ওকে, ফালতু প্যাঁচাল শুনতে হবে না। আমার সাথে প্রেম করো, একটু ভালোবাসো।”

​শিউলি চক্ষু লাল করে তাকিয়ে বলল,
“আপনার মতো ছেলেকে দুনিয়ার কোনো মেয়েই ভালোবাসবে না। আপনার মতো খারাপ বখাটে ছেলে গ্রামে একটা আছে?!”

শিউলির এই অপমানজনক কথাও তামিমকে থামাতে পারল না।
​“ওকে, সুইটহার্ট, আমাকে ভালোবাসতে হবে না। বিয়ে করে নাও আমাকে। বিশ্বাস করো, রানী করে রাখব তোমায়।”

​শিউলি বরাবরের মতোই বিরক্ত হচ্ছে।
“প্লিজ রাস্তা ছাড়েন, আমি যাই।”
​তামিম বলল,
“ওকে, ঠিক আছে যাও। তবে আর মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা সময় তোমার কাছে। তারপর তুমি সিদ্ধান্ত দিবে। যদি তারপরও আমার কথায় রাজি না হও, তাহলে পরেরটা আমি করব।” বলেই তামিম বাঁকা হাসল।

​শিউলি তামিমের দিকে তাকাল। লোকটাকে এই পর্যন্ত ভালো করে দেখা হয়নি। লোকটার মুখে চাপ দাড়ি। গোঁফটা ঘন। শ্যামলা গায়ের রং। দেখতে তো মাসাআল্লাহ, তাহলে কাজকাম এরকম অস্তাগফিরুল্লাহ কেন! শিউলি মনে মনে ভাবল।
​শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“কী করবেন যদি আমার সিদ্ধান্ত না পাল্টায়?”

​“সবকিছু বলে দিলে তো শেষই। তাহলে সাসপেন্স থাকবে কী? বরং পরেই দেখে নিও আমি কী করতে পারি।”
​শিউলি আর কথা বাড়াল না। চলে এল। শিউলি পিছনে ফিরল না, তবে বুঝতে পারল তামিম তাকিয়ে আছে তার দিকে।
★★★

সোহাগরা আজ বিকেলে শহরে ফিরে যাবে। সকলেই রেডি। উঠোনে দাঁড়িয়ে তারা সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।
​জুলেখা বেগম শিউলির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“ভালো থাকিস মা। আর ভালো করে খাওয়া-দাওয়া করিস। ছোটবেলা থেকেই ঠিক করে খাস না। শরীরের দিকে দেখ তো, শরীরটা কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে দিন দিন।”

​শিউলির ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে আজ অথচ তার খালা তার পছন্দের একজন। ছোটবেলা থেকে কত আদর করেছেন। অথচ আজ এত অস্বস্তি লাগছে, তার কারণ হয়তো বিয়ের আলোচনাটাই।
​এবার জুলেখা বেগম নিজের আঙুলের পরা ফুলের ডিজাইন করা আংটিটা শিউলির আঙুলে পরিয়ে দিতে চাইলেন। শিউলি সাথে সাথে বাঁধা দিল,
“কী করছো খালা! আংটি খুললে কেন?”

​পাশ থেকে জাবেদা বেগমও বললেন,
“হ্যাঁ রে জুলেখা, এসবের কী প্রয়োজন? এসব দেওয়ার দরকার নেই।”

​জুলেখা বেগম বললেন,
“আমার যা, সব তো শিউলিরই হবে। তাহলে আজকে দিলে কী সমস্যা?”

​পাশ থেকে সোহাগ কখন থেকে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। সোহাগের বাবা আর ইদ্রিস খন্দকার তারা আগেই বেরিয়ে গেছেন বাড়ি থেকে, গাড়ি আটকাতে হবে তাই।
​আজ মিলিকে ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। এমনিতে তো মেয়েটা একদম হাসি-খুশি থাকে।
জুলেখা বেগম শিউলির কথা না শুনে আংটিটা পরিয়েই দিলেন। আর বললেন,
“আংটি একদম খুলবি না। মনে কর, এটা তোর খালার দেওয়া শুধুমাত্র গিফট, আর কিছুই না।”

​শিউলি আর কিছু বলল না। তারা সকলে বাড়ির বাইরে বের হয়ে গেল। শিউলিও বের হতে চাইলে পেছন থেকে সোহাগ ডাকল,
“শিউলি..!”
​শিউলি পিছন ফিরে তাকাল। বলল,
“জ্বি, বলুন।” শিউলির চোখ মাটির দিকে নিবদ্ধ।

​সোহাগ বলল,
“শহরে গিয়ে তোমার কথা খুব মনে পড়বে। মাঝে মাঝে কল দিব, কথা বলবে তো!”
​শিউলি সোহাগের কথায় কোনো প্রত্যুত্তর করল না।
​সোহাগ আবারও বলল,
“নিশ্চয় জানো, তোমার সাথে আমার বিয়ের কথা হয়েছে।”

​শিউলি মাথা উপর-নিচ নাড়াল, যার মানে সে জানে। আজ কলেজ থেকে ফেরার পরই তার মা বিয়ের কথাটা সরাসরি বললেন।
​সোহাগ শিউলিকে চুপ থাকতে দেখে বলল,
“তুমি কি আমার ওপর বিরক্ত?”

​শিউলির ইচ্ছে হলো বলে দিতে ‘আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। আমি অন্য কাউকে আমার মন বিলিয়ে দিয়েছি।’ কিন্তু পারল না বলতে কথাটা।
​সোহাগ বলল,
“আচ্ছা, এখন যাচ্ছি। কিছুদিন পর আবারও আসব। কারণ, তোমাকে এতদিন না দেখে থাকাটা আমার জন্য কেন, কোনো পুরুষই পারবে না।”

​শিউলি বলল,
“খালা আপনাকে ডাকছেন, যান।” শিউলি কথাটা বলল সোহাগের থেকে বাঁচার জন্যই।
​সোহাগ হেসে বলল,
“আল্লাহ হাফেজ।”

সকলেই রাস্তা ধরেছে।মিলি তাকিয়ে আছে শিমুলদের বাড়ির দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় শিউলি লক্ষ্য করল, মিলি কেমন যেন মনমরা হয়ে আছে। শিউলি জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে মিলি? কোনো অসুবিধা? সকাল থেকে দেখছি কেমন মনমরা হয়ে আছিস?”

​মিলি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর হঠাৎ তার মাকে বলে উঠল,
“আম্মু, আমি শহরে ফিরে যাব না।”

​এরকম হঠাৎ কথাটা শুনে সকলেই মিলির দিকে বিস্ময়ে তাকাল। শিউলি বেশ খানিকটা অবাক হলো। জুলেখা বেগম বললেন,
“কেন, কী হয়েছে? যাবি না কেন?”

​“আসলে আম্মু, আমি গ্রামে কয়েকদিন থাকতে চাই।”
​সোহাগ বলল,

“থাকবি মানে? তোর স্কুল আছে না? তাহলে তুই থাকবি কী করে?” সোহাগ শাসনের স্বরে বলল।
মিলি বায়না করল, “প্লিজ ভাইয়া, থাকি না!”

​জাবেদা বেগম বললেন,
“হ্যাঁ, থাকুক না কিছুদিন গ্রামে। তারপর না হয় সোহাগকে পাঠিয়ে দিস, এসে নিয়ে যাবে।”

​শেষ পর্যন্ত মিলিকে রেখেই সকলে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। শিউলি শুধু তাকিয়েই রইল মিলির দিকে। একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের মনের ভাব পড়া না গেলেও শিউলি বুঝতে পারল মিলির মনে শিমুল ভাইকে নিয়ে দুর্বলতা কাজ করছে।
★★★

পাশের বাড়ির শমসের চাচা শিমুলকে দেখেই ডাক দিল,
“শিমুল! অ্যাই শিমুল, এদিকে আয়।”

​শিমুল তার ডাক শুনে কাছে গিয়ে বলল,
“কী হইছে চাচা? কও কী কইবা?”

​তিনি বেশ আদেশের স্বরে হুকুম করলেন,
“নে তো, এই ব্যাগটা বাড়িত দিয়া আয়।”
হাতে থাকা বাজারের ব্যাগটা শিমুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন কথাটা।

​শিমুল গা-ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
“পারুম না আমি। নিজের জিনিস নিজে লইয়া যাও।”

​শিমুলের মুখ থেকে এমন কথা শুনে যেন শমসের মিয়া আকাশ থেকে পড়লেন। তার বিস্ময়ে মুখ হাঁ হয়ে উঠল!
​“এডা কীরে! ভূতের মুখে রাম রাম! আজ কী হইলো তোর? মুখের ওপর না করোস?”

​শিমুল এবার আরও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তো না করমু না তো কী করমু? অনেক কাটাইছো
আমারে। এহন থাইকা অন্য জনের কাম আর কইরা দিমু না আমি। নিজের কাম নিজে করো।”​

শিমুলের মুখের উপর না করে দেওয়া শমসের মিয়া রেগে গেলেন। তিনি হাত উঁচু করলেন শিমুলের গালে চড় মারার উদ্দেশ্যে। শিমুল ভয়ে ঘাবড়ে গেল, চোখ বন্ধ করে নিল।কিন্তু পরক্ষণে যখন বুঝতে পারল চড় এসে গালে পড়ল না, তখন সে চোখ খুলে দেখল শমসের মিয়ার হাত রাগে ধরে রেখেছে শিউলি। শিউলির চোখে ক্রোধ স্পষ্ট।
​শমসের মিয়া রেগে শিউলিকে বললেন,
“অ্যাই মাইয়া, অ্যাই! তুমি আমার হাত ক্যান ধরলা? এত বড় সাহস তোমার?”

​“তার আগে আপনি বলেন, কোন সাহসে আপনি শিমুল ভাইয়ের দিকে হাত উঠান?”

শিউলি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে মারল। শিউলির এরকম কথায় শমসের মিয়া থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি বললেন,
“হাত তুলি আর যাই করি, তাতে তোমার কী মাইয়া?তুমি কডা শিমুলের হ্যা?মেম্বারের মাইয়া হইছো বইলা যা মন চায় তাই করবা?”

​শিউলি আরও নিজের কণ্ঠে তেজ বজায় রেখে বলল,
“আমি যাই হই না কেন, সেটা কোনো বিষয় না। আপনি কোন অধিকারে হাত তুলবেন? আপনার কাজ করে দেয়নি বলে? যদি তাই হয়, তাহলে শিমুল ভাই একদম ঠিক কাজ করেছে। কেন সে আপনাদের কাজ করে দিবে? আর কোনো দিন শিমুল ভাইয়ের গায়ে হাত তোলার সাহস দেখাবেন না, তাহলে এর পরিণতি ভয়ানক হবে, বলে দিলাম!”

​শমসের মিয়া শিউলির সাথে কথা বলে না পেরে শেষমেশ বললেন,
“এত পড়াশোনা কইরা এসব শিখতাছো? বড়দেরকে সম্মান করতে পারো না! ছিহ্!”​
বলেই শমসের মিয়া হনহন করে জায়গা ত্যাগ করলেন। শমসের মিয়ার কথায় শিউলির হাসিই পেল। এই লোকগুলো এরকমই যখন কথায় হারাতে পারবে না, তখন পড়াশোনার দোহাই দেবে।

​শিমুল শিউলির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অবাক নয়নে। শিমুল বলল,
“ক্যান শুধু শুধু ঝামেলা করতে গেলি?”

​“শুধু শুধু মানে? আর তুমি তো দেখছি এখনো বোকাই রয়ে গেলে! ওরা তোমার গায়ে হাত তোলার সাহস কী করে দেখায়? তুমি কিছু বলতে পারো না?”

​শিমুল কণ্ঠস্বর স্থির করে বলল,
“কইলাম দেখেই তো মারবার আইলো।”

​“এখন থেকে মারতে আসলে তুমি প্রতিবাদ করবে। ঠিক আমি যেভাবে প্রতিবাদ করলাম।”

​শিমুল বলল,
“আইচ্ছা, তাই করুম।”

​শিউলি হেসে বলল, “হুঁ, তবে তুমি যে কাম করবা না সেটা না করেছো, সেটা দেখে সত্যিই অনেক ভালো লাগছে।”

​শিমুল শিউলির কথায় হাসল। শিউলি আবারও বলল,
“সবসময় এভাবেই প্রতিবাদ করবা। জানোই তো, বিড়াল নরম জায়গাতে কামড়ায় বেশি। শক্ত হতে শেখো।”

​শিমুল আর শিউলি দু’জন এক সাথে রাস্তা ধরল। শিমুল সব বলতে বলতে যাচ্ছিল। আজ সকাল থেকে সে কী করেছে, সব কিছু শিউলির সাথে বলল শিমুল ভাই।

#চলবে…
(এমনিতেই গল্পে রিচ নাই তার মাঝে দুইদিন ধরে দেখলাম রিচ আরো কমতেছে,রিয়েক্ট করো না কেন তোমরা?তোমাদের উপর মায়া করে প্রতিদিন এত ব্যস্ততার মাঝে গল্প লিখি।আমি মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত তবুও শুধু মাত্র তোমাদের জন্য গল্প লিখি কিন্তু তোমরা গল্পটা পড়েই চলে যাও।কয়েকজন বাদে কেউই গল্পে রিয়েক্ট কমেন্ট করে না।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here