বসন্তের_ঝরা_ফুল #পর্ব_১৯

0
22

#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_১৯
লেখা #নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★
শিউলির ভেতর তখন তীব্র ভয় খেলা করছে। এই লোক এখানে কী করে? কোন মতলবে এলো? শিউলি আবারও কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি এখানে কেন এলেন? কীভাবে এলেন?”

​শিউলির কথায় বিছানায় বসে থাকা তামিম উঠে দাঁড়াল। সে সামনে এগিয়ে আসল। আর শিউলি ভয়ে কয়েক কদম পেছনে সরে গেল। তামিম বাঁকা হেসে বলল,
“বুঝতে পারছো না সুইটহার্ট কেন এসেছি? খালি বাড়ি… এর চেয়ে ভালো সুযোগ কী হতে পারে বলো?”

​শিউলির শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল। এই লোকের চোখে-মুখে সে ভয়ংকর উদ্দেশ্য স্পষ্ট দেখতে পেল। শিউলি জলদি রুম থেকে বের হতে চাইলে তামিম দরজা আগলে দাঁড়ালো। শিউলি চিৎকার করে বলল,
“দরজা ছাড়ুন! তা না হলে আমি চিৎকার করব!”

​তামিম অট্টহাসি হেসে বলল,
“চিৎকার করবে? হুম, চিৎকার করো! অনেক মানুষ আসবে, চিন্তা নেই।”

​শিউলি শিমুলের থেকে বিদায় নিয়ে আসার সময় টের পেয়েছিল মানুষের চলাচলের আওয়াজ, আর এখন তামিমের কথা শুনে সত্যিই মনে হচ্ছে, বাড়িতে অনেক মানুষ আছে। কিন্তু সেই মানুষগুলো কি তার জন্য?
​শিউলি ভয়ার্ত গলায় বলল,
“আপনি কী করতে চাইছেন? প্লিজ এখান থেকে চলে যান। আব্বা-আম্মা কিছুক্ষণের মাঝেই এসে যাবে। বুঝতেই পারছেন, ওরা আসলে আপনাকে ছেড়ে দিবে না।”

শেষের কথাগুলো শিউলি তামিমকে ভয় দেখানোর জন্যই বলেছে, যদিও সে জানে তার বাবা-মা ফিরতে দেরি হবে। শিউলির হৃদপিণ্ড তখন দ্রুত তালে বাজছে, আর চোখ দুটো ভয়ে ছলছল করছে।
তামিম আবারও হাসল, যেন তার কথায় ছেলেটা মজা পেয়েছে। শিউলির মন জানান দিচ্ছে আজ ভয়াবহ কিছু হবে। তামিম শিউলির দিকে এগিয়ে আসছে। শিউলি পেছাতে শুরু করেছে। শিউলি পেছাতে পেছাতে বিছানায় গিয়ে পড়ল।
​তামিম বিছানায় এক পা তুলে ঝুঁকে এসে বলল,
“উফফ, সুইটহার্ট! তোমারে ভীষন সুন্দর লাগতাছে, সাথে তোমার ভয়ার্ত চেহারা!”
★★★
​মেম্বার বাড়িতে এখন মানুষে ভরপুর। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ, বিশেষ করে বয়স্ক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ সকলেই উপস্থিত। উপস্থিত হবেই না বা কেন? মানুষের কাজই তো এটা! বিপদের সময় না আসুক, কিন্তু মজার সময় ঠিকই আসবে। এই ভিড় প্রমাণ করে দিচ্ছে, শিউলির এই ব্যক্তিগত বিপর্যয় এখন আর ব্যক্তিগত নেই এটা গ্রামের সর্বজনীন আলোচনার বিষয়, যা তারা উপভোগ করতে এসেছে।

​ঘরের একপাশে ইদ্রিস খন্দকার মাথা নিচু করে বসে আছেন। লজ্জায়, অপমানে তার মুখ রক্তশূন্য। তিনি যেন এই মুহূর্তের ভারে মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছেন। তার পাশেই চেয়ারে বসে আছেন চেয়ারম্যান সিদ্দিক ইকবাল নিশ্চুপ, কিন্তু তার উপস্থিতিই বুঝিয়ে দিচ্ছে ক্ষমতার দাপট। অন্যদিকে, ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে আছে তামিম, তার মুখে লেগে আছে এক শীতল, বিজয়ী হাসি। সে যেন নিজের পরিকল্পনা সফল হওয়ার তৃপ্তিতে বিভোর।

​এক নীরব, অস্বস্তিকর পরিবেশ। সেই নীরবতা ভাঙল গ্রামের একজন প্রবীণ ব্যক্তির কণ্ঠে। তিনি ইদ্রিস খন্দকারকে বিদ্রূপ করে বললেন,
“এভাবে বইসা থাকলে কী হইবো মেম্বার? গ্রামের সব বিচার তো তুমিই করো, আর আজ নিজের মাইয়ার বেলায় কী করবা?”

​এরপর মধ্যবয়সী শমসের যেন ফণা তুলে উঠল। তার চোখ-মুখে ছিল চরম ঘৃণা আর পরনিন্দা করার আনন্দ। তিনি গলা চড়িয়ে বললেন,
“কী করবে মানে! ওইরকম মাইয়ারে মাটি চাপা দিয়া দেওন উচিত! গ্রামের মানসম্মান খাইছে। ছিহ! ছিহ! ঘরে পরপুরুষ ঢুকাইয়া পূর্তি করে! এমন মাইয়ারে সমাজে রাখাই উচিত না!”
শমসেরের সাথে তাল মিলিয়ে আরও কয়েকজন বলল, “ঠিক বলেছেন, একদম ঠিক বলেছেন!”
​শমসেরের এই তীব্র রাগের পেছনে কিন্তু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ লুকিয়ে ছিল। শমসের মনে মনে ভাবল, ‘ভালোই হইছে। ওইদিন শিমুলরে কাম করবার কইবার কইছিলাম বইলা আমার সাথে কীভাবে কথা কইছিল! এখন বোঝা যাইবে, কার শক্তি বেশি!’

​ভিড়ের প্রতিটি চোখ শিউলির দিকে তাক করে আছে। ঘরের কোণে শিউলি পাথরের মতো বসে আছে, শুনতে পাচ্ছে তার চরিত্রের উপর ছুঁড়ে দেওয়া প্রতিটি বিষাক্ত মন্তব্য। এই ভিড়, এই অপমানের চিৎকার সবই তামিমের সুপরিকল্পিত প্রতিহিংসার ফল তা শিউলির আগেই বুঝা হয়ে গেছে।পাশেই তার মা জাবেদা বেগম কান্না করছেন। শিউলির চোখের অশ্রু ঝরছে নীরবে।
​জাবেদা বেগম বললেন,
“আমার মেয়ের এত বড় সর্বনাশ কীভাবে করল!”

​শিউলি মায়ের কথায় বলে উঠল,
“আম্মা, কিসের সর্বনাশ? আমারে কিছু করতে পারে নাই আম্মা, বিশ্বাস করো তোমরা।”

​সাথের দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাগুলো থেকে একজন খুবই তিক্ত স্বরে বলে উঠলেন। তার কণ্ঠস্বর ছিল ধারালো ছুরির মতো, যা শিউলির সম্মানকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে চাইল।
“কী বেশরম মাইয়ারে বাবা! ঘরে পোলার লগে ফুর্তি কইরা এখন কেমনে অস্বীকার যায়!”

​শিউলি রেগে বলল,
“মুখ সামলিয়ে কথা বলুন। আমি কিচ্ছু করিনি। আর তামিম আমার ঘরে এসেছিল আমার অজান্তে, কিন্তু আমাকে কিছু করেনি।বিস্বাস না হলে দিলওয়ারা খালারে জিজ্ঞেস করুন। ”

“দিলওয়ারা খালারে জিজ্ঞেস করছে চেয়ারম্যানে ওই কয়ছে দিলওয়ারা সন্ধায় বাড়িত চইলা গেছিল।” পাশ থেকে এক মহিলা কথাটা বলল।

শিউলি বিস্মিত হলো দিলওয়ারা খালা কেন মিথ্যা বলল?উনি তে সন্ধার সময়ও ঘরেই ছিল।আমি যখন শিমুল ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেছিলাম তখন সে ঘুমাচ্ছিল।শিউলি মনে মনে এসব ভেবেই অবাক হচ্ছিল। কিন্তু এখানের কেউ এখন শিউলির কথা বিস্বাস করবে না তাই শিউলি এই বিষয়ে আর মুখ খুলল না।

​ঠিক তখনই পাশের বাড়ির ভাবি ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলেন। তিনি নরম কণ্ঠে শিউলির পাশে বসে সান্ত্বনার চেষ্টা করলেন।
“আমি তোমারে চিনি শিউলি। তুমি পরপুরুষ ঘরে ঢুকানোর মতো মাইয়া না।”
তবে সমাজের চোখে যা দেখা যায়, তার যুক্তিই ভাবি তুলে ধরলেন, যা শিউলির জন্য আরও ভয়ঙ্কর।
“তোমার কথা অনুযায়ী যদি তামিম নামক পোলাটা তোমার ঘরে যাইয়াও থাকে, তাহলে তো আর এমনি এমনি কিছু না কইরা তোমারে ছাড়ে নাই।”
ভাবির এটা সান্ত্বনা ছিল না বরং কাটা গায়ে নুনের ছিটার ন্যায় ছিল।

​ভাবির এই কথাতেই চারপাশের জনতার কানাকানি আরও বেড়ে গেল। শিউলি বুঝতে পারল, তার সততা এখানে কোনো প্রমাণ নয়। সমাজ ততটুকুই বিশ্বাস করবে, যা তারা বিশ্বাস করতে চায় আর তা হলো কেবল অপমান আর কলঙ্ক।
একটি মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের অবস্থা কেন এরা বুঝতে পারছে না? সমাজ এতটা নির্দয় কেন? কেন মেয়েদের কথাকে এতটা অমূল্য করা হয়? আজ সবাই তিক্ত কথাতে ব্যস্ত। সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ নেই। শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে, যদি এখনি মরে যেতে পারত। তাহলে হয়তো এই লোকলজ্জা থেকে বাঁচতে পারত।
​হঠাৎ কোথা থেকে যেন ফুলঝুরি এসে শিউলিকে জড়িয়ে ধরল। ছোট্ট মেয়েটা শিউলিকে জড়িয়ে ধরে অজস্র ধারায় কেঁদে উঠল। ফুলঝুরির সেই বিশুদ্ধ কান্না দেখে শিউলিও এবার মৃদু শব্দে কেঁদে উঠল। ফুলঝুরি কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আপা, সবাই তোমারে খারাপ কথা কইতাছে ক্যান আপা? আমার কষ্ট হইতাছে আপা।”

​খানিক পরেই মজলিসের মধ্য থেকে শিউলিকে ডাকা হলো। কয়েকজন মহিলা ধরে শিউলিকে এত এত মানুষের মাঝে দাঁড় করালো। চারদিক থেকে তিক্ত কথা শিউলির কানে আসছে। এতটাই নষ্ট, খারাপ কথা যে শিউলির ইচ্ছে হচ্ছে, যদি এখনি মাটির তলায় ঢুকে যেতে পারত। শিউলি নিচু চোখেই তার জন্মদাতা পিতার দিকে তাকাল। লোকটা কপালে হাত দিয়ে মাথাটা নিচু করে বসে আছে। লোকটির চোখে জল শিউলির দৃষ্টি এড়াল না। কিন্তু আজ ইদ্রিস খন্দকার মেয়েকে এই বিষয়ে কোনো কথাও জিজ্ঞেস করলেন না।
​শিউলির চোখ চারদিকে একটা মানুষকে খুঁজছে সেটা হলো শিমুল। কিন্তু আজ শিমুল নেই। ‘কেন নেই শিমুল ভাই? আজ আমার এই দুর্দশায় শিমুল ভাই কোথায় হারালেন?’ এই চিন্তা শিউলির বুক বিদীর্ণ করে দিল।

​সিদ্দিক ইকবাল এবার মুখ খুললেন। তার কণ্ঠে কিছুটা কর্তৃত্ব, কিছুটা যেন নিরীহ ভাব। তিনি বললেন,
“আমার ছেলে এই কাজ করেছে, এটার প্রমাণ কী?”

​একজন লোক এগিয়ে এসে বলল,
“আমি তার প্রমাণ।”

​চেয়ারম্যান লোকটি জিজ্ঞেস করলেন,
“কী প্রমাণ আছে?”

​“আমরা বাড়ির পেছন দিয়ে যাওয়ার সময় অস্বাভাবিক আওয়াজ শুনি ঘরে, আর আমরা কৌতূহলবশত ঘরের ভেতর ঢুকে… ছিহ ছিহ চেয়ারম্যান সাহেব! তার পরের কাহিনি আর বলার মতো না।” লোকটি মুখে তিক্ততা নিয়ে বললেন। তার বলা প্রতিটি শব্দ যেন শিউলির গায়ে কষাঘাত হানল।শিউলি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল। চিৎকার করে ভাঙা গলায় বলল,
“এভাবে কেন আপনারা মিথ্যা বলছেন! আমার আল্লাহর কসম, এরকম কিছু হয়নি। সত্যিটা কী, সেটা আমি বলছি।”

​কথাটি বলা শেষ করার সাথে সাথে পাশের বাড়ির কুলসুমের মা এসে শিউলির গালে জোরে চড় বসিয়ে দিলেন। সেই আঘাত শিউলির মুখটা একদিকে ঘুরিয়ে দিল। তিনি রেগে বললেন,
“কী খারাপ ছেমরি দেখছো নি! কেমন কইরা মিছা কথা কইতাছে?”
​মহিলাটির বয়স প্রায় ষাটের কাছাকাছি,এই মহিলাটিও লোকটির কথা বিশ্বাস করে নিল। কিছুদিন আগেই তো মহিলাটা যখন রোগে বিছানায় পড়ে ছিল, ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার মানুষ ছিল না, তখন শিউলি নিজে মহিলাটাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। আর আজ সবার কী রূপ! এটা

​শমসের মিয়া আবারও তিক্ত কণ্ঠে বলল,
“এসব ন** মাইয়ারা তো এহন অস্বীকারই করব। ওই পোলারে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়।”

​শিউলির দু-চোখ বন্ধ হয়ে এল। ‘এই দিনটা দেখতে হতো!’ এতটা খারাপ দিন কী করে আসল আমার জীবনে! কী এমন পাপ করেছিলাম? কী করে বুঝাবো তামিম আমার সর্বনাশ করেনি, বরং সে নিজেই শিস বাজালো, আর তার সাথে সাথে কতগুলো মানুষ ঘরে ঢুকে এলো। তামিম এমনটা করার কারণ শিউলির কাছে স্পষ্ট, তার বদনাম করার জন্য এতশত নাটক। সে শুধু অনুভব করতে পারল, তার সম্মান আর অস্তিত্বের শেষ চিহ্নটুকুও জনতার ক্রোধে চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

তামিমকে জিজ্ঞেস করা হলো যে অভিযোগ উঠেছে, তা সত্যি কিনা। তামিম সবার সামনে গলা উঁচু করে বলল,
“হ্যাঁ, সব সত্যি। আমার সাথে শিউলির প্রেমের সম্পর্ক ছিল, তাই আজ যেহেতু শিউলির আব্বা-আম্মা বাড়িতে ছিল না, তাই এসেছিলাম।”
তামিম কথাটা বলার সময় তার কন্ঠে কোনো বাঁধা ছিল না। তার কারণ সে পুরুষ। কলঙ্ক কখনো পুরুষদের ছুঁতে পারে না,নষ্টা অপবাদ কখনো পুরুষদের হতে পারেনা,চিরত্রহীনা কখনো পুরুষরা হতে পারে না।সকল কলঙ্ক, নষ্টামি নারীরা করে।নারীরা এই সমাজের কাল।নারীদের এই সমাজে থাকার অধিকার নেই।নারীরা কখনো সত্যি বলে না,সবসময় মিথ্যাই বলে।এরকমটাই মনে করে আমাদের সমাজ।শুধু মনে করে না বরং পূর্ণ বিস্বাস করে।

​তামিমের এই ঠান্ডা মিথ্যা স্বীকারোক্তি যেন আগুন জ্বালিয়ে দিল জনতার মাঝে। এবার সকলে এক সাথে ছিহ্ ছিহ্ শুরু করল। শিউলিকে এখনি মেরে ফেলতে পারলো না শুধু মাত্র মেম্বারের ভয়ে তারা পিছপা হলো নয়তো এই জনতা হয়তো তাকে মেরেই ফেলত।
​শিউলি নিজের পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পেল না। কী হচ্ছে তার সাথে? কেন হচ্ছে এসব? তামিমের চোখে সে দেখল চূড়ান্ত প্রতিহিংসা, ভালোবাসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ।
​ছোট্ট ফুলঝুরি এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তার বোনকে জড়িয়ে ধরল। সে ডুকরে কেঁদে উঠল।
“আমার আপা কিছু করে নাই। আমার আপা অনেক ভালা। কেউ আমার আপারে কিছু কইতে আসবেন না। সবাই আমাদের বাড়ি থেকে বাহির হইয়া যান!”

​কিন্তু ফুলঝুরির এই সরলতাও ছাড় পেল না। কয়েকজন বলে উঠল,
“বড়ডা যেমন হইছে, ছোটটাও তেমনি হইব।”

​শিউলি ফুলঝুরির মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল।
“চুপ কর বোইন আমার। মেয়েদের কথা কেউ শুনে না। এই সমাজে মেয়েদের দাম নাই রে বোইন। যেমন করে এই আধুনিক যুগে এসে দুই টাকার কয়েনের কোনো দাম নাই, তেমন কইরা মেয়ে মানুষেরও কথা বলার কোনো মূল্য নাই।”

​জামিল চাচা ইদ্রিস খন্দকারের দিকে তাকিয়ে তার চূড়ান্ত আঘাতটি হানলেন।
“মেম্বার হইয়া মাইয়াডারে মানুষ করতে পারলা না। তোমার তো মিয়া গলায় দড়ি দিয়া মরা উচিত।”

​ শিউলি নিশ্চিত হলো, এই অপমান থেকে বাঁচার আর কোনো পথ খোলা নেই।শিউলি এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তীব্র রাগের স্বরে চিৎকার করে হুশিয়ারি দিয়ে বলল,
“খবরদার! আমার আব্বারে কিছু বলবেন না আপনারা!”

​ইদ্রিস খন্দকার এইবার অসহায় নয়নে নিজের মেয়ের দিকে তাকালেন। এতক্ষণে এই প্রথম তিনি মাথা তুললেন। তার চোখে তখন মেয়ের জন্য কষ্ট আর সমাজের কাছে পরাজিত হওয়ার যন্ত্রণা।
​ঠিক তখনই, ভিড়ের মাঝ থেকে কেউ একজন সজোরে একটি ভাঙা ইটের টুকরা ছুঁড়ে মারল। ইট এসে পড়ল শিউলির কপালের বাম দিকে। শিউলি আর্তনাদ করে উঠল,“আহ্…”
​গলগল করে র’ক্ত পড়তে লাগল কপাল কেটে। জাবেদা বেগম দৌড়ে এসে মেয়েকে ধরলেন। ফুলঝুরি আবারও চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। শিউলির এই সময়টাতে তার মা আর ছোট বোনটা ছাড়া কেউ এগিয়ে আসল না। সমাজের নিকৃষ্ট মানুষগুলো তখন পাথর। তারা যেন শিউলির রক্ত দেখেও তৃপ্ত হতে চাইল।

​শিউলি ততক্ষণাৎ জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল মায়ের কোলে। কিন্তু মেয়েটার এমন মর্মান্তিক অবস্থা দেখেও কারো মনে অনুশোচনা জাগল না। বরং তারা আরও বলতে লাগল, “সবটাই নাটক করতাছে!”
​সেই জনতা, যারা একটু আগে ন্যায়ের কথা বলছিল, তারাই এখন শিউলির রক্তপাতের পরও তাকে মিথ্যাবাদী প্রতিপন্ন করতে ব্যস্ত।

#চলবে…
(এবার আমার পাঠকরা আমাকে বকা দাও আর নাই দাও আমার কিছু করার নেই।গল্পটা আমি যেভাবে কল্পনা করেছি ঠিক সেভাবেই আমাকে লিখতে হবে।এরকম পর্ব লিখতে কিন্তু আমারও ভালো লাগে না সত্যি বলছি।)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here