#বসন্তের_ঝরা_ফুল
#পর্ব_২০
কলমে #নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
শিউলি একটি খড়কুটোর রান্না ঘরে ভাতের হাঁড়িতে ভাত রান্না করছে। শিমুল ভাই সকালে কাজে গেছে। প্রতিদিনের মতো দুপুরে এসে খেয়ে দেয়ে আবারও ইঁটের ভাটায় কাজ করতে যাবে। শিউলি ভীষণ তাড়াহুড়ো করছে, যোহরের আযান দিয়ে দিয়েছে, কিছুক্ষণের মাঝেই এসে যাবে শিমুল । শিউলি কখনো ভাবতে পারেনি এতকিছুর পর এত সহজ ভাবে তাদের একটা সুন্দর সংসার হবে।শিমুল আর আগের মতো বোকা নেই।ছেলেটা নিজের স্ত্রীর কথা মুখ ফুটে না বললেও বুঝে যেতে পারে এখন।
হঠাৎ শিমুল শিউলিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল। শিউলি চমকে উঠল আকস্মিক জড়িয়ে ধরার কারণে। শিমুল শিউলির কাঁধে মুখ রেখে খুবই আদুরে স্বরে বলল,
“কী হইলো বউ? ডরাইছো নাকি?”
শিউলি রাগি রাগি মুখ করে শিমুলের দিকে ফিরল। শিউলির এরকম রাগি মুখ দেখে শিমুল ভাই হেসে দিল। শিউলি বলল,
“তুমি দিন দিন পঁচা হয়ে যাচ্ছো শিমুল ভাই। এভাবে কেউ হঠাৎ করে এসে জড়িয়ে ধরে বুঝি?”
শিমুল এক ভঙ্গিতে বলল,
“কেউ না ধরুক, আমি তো আমার বউরে ধরমুই।”
“হইছে, এবার ছাড়ো। ভাতগুলো বেশি নরম হয়ে যাবে।”
শিমুল শিউলির কথায় শিউলিকে ছেড়ে দিল। শিউলি ভাতের পানি নিগড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হাতে গরম পানি পড়ে গেল। শিউলি মৃদুস্বরে চিৎকার দিয়ে উঠল।
শিমুল দৌড়ে শিউলির কাছে গিয়ে বসে পড়ল।শিউলির হাত খানা নিজের দুই হাতে আগলে ধরল।তাড়াহুড়ো করে মুখ দিয়ে হাওয়া দিতে লাগল। চিন্তা ভরা কণ্ঠে বলল,
“কইছিলাম সাবধানে কর, কিন্তু না, তুই আমার কথা হুনবি না। এহন দেখ, কতটা ব্যাথা পেলি! হাতটা বোধহয় অনেকটা পুড়ে গেছে।”
শিউলি শিমুল ভাইয়ের চিন্তা ভরা মুখখানার দিকে তাকিয়ে রইল। শিউলি ফিসফিস করে বলল,
“শিমুল ভাই নামক স্বামী থাকলে গরম পানির কী-ই বা সাহস যে হাত পুড়িয়ে দিবে!”
শিমুল শিউলির মুখশ্রীর দিকে তাকাল। শিমুলের চোখে জল টলমল করছে। একেই বুঝি ভালোবাসা কয় একজনের ব্যাথায় অন্যজন ব্যাথা পায়। শিমুল সহসা বলে উঠল,
“আমার ফুলের কিছু হইলি আমি কেমনে বাচমু? ”
শিমুল শিউলির কপালের চারদিকে পড়ে থাকা চুলগুলো নরম হাতে সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিজের ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিল। শিউলি সেই আদুরে স্পর্শে চোখ বন্ধ করে নিল।
শিউলি ধড়ফড়িয়ে বিছানা থেকে উঠে বসল। চারদিকে চেয়ে বুঝার চেষ্টা করল, সে তার রুমেই আছে। কোথাও শিমুল ভাই নেই। এতক্ষণ শিউলি স্বপ্ন দেখছিল তার আর শিমুল ভাইয়ের একটা সুন্দর সংসার হয়েছে। এরকম এতটা স্পর্শকাতর স্বপ্ন সে কখনোই দেখেনি, এই প্রথম এতটা গভীর স্বপ্ন দেখল।
তবে আজকে এত সুন্দর স্বপ্ন দেখার পরও শিউলির ভীষণ কান্না পেতে লাগল। চারদিকে তাকিয়ে বুঝল, সকাল হয়ে গেছে। এতক্ষণ ঘুমালো কিন্তু কীভাবে? কপালে হাত দিতেই ব্যাথা অনুভব করল। মুহূর্তেই তার মনে পড়ল গতকাল রাতের সেই অপমান, সেই চিৎকার আর ইটের আঘাতের কথা।
অন্ধকার স্বপ্ন ভেঙে আলোতে উঠে এলেও, তার বর্তমান পরিস্থিতি স্বপ্নের চেয়েও অনেক বেশি অন্ধকার।
★★★
শিমুল শিউলিদের বাড়ির ভেতর ঢুকল। পুরো বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম এক নিস্তব্ধ, ভারী বিষাদের ছায়া। সে যেন কল্পনা করতে পারছিল গতকাল রাতের দৃশ্য। সে তাকিয়ে দেখল, জাবেদা বেগম পাকা দরজায় বসে আছেন, মুখে কষ্ট, চিন্তা আর হতাশার চাপ স্পষ্ট।
শিমুল গিয়ে ধীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“শিউলি কই চাচি?”
তিনি শিমুলের দিকে তাকালেন। সম্ভবত তিনি বুঝতে পারছিলেন শিমুলের আগমনের উদ্দেশ্য। ধীর কণ্ঠে বললেন,
“ঘরে শুইয়া আছে।”
শিমুল আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে শিউলিদের ঘরে ঢুকে পড়ল। সে শিউলির রুম চেনে। দরজার কাছে দাঁড়াতেই দেখল, শিউলি জানালার দিকে মুখ করে বসা। মেয়েটার মুখ মলিন হয়ে আছে যেন সমস্ত রক্ত শুষে নিয়েছে কেউ।যে শিউলির মুখটা সবসময় ফুলেদের মতো রঙিন হয়ে থাকতো সেই শিউলির মুখে আজ বিষাদের ছায়া। কপালের আঘাতের দাগটাও স্পষ্ট।
শিমুল ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল। সে ভীষণ ধীর কণ্ঠে ডাকল,
“ফুল…”
ডাকটা শোনার সাথে সাথেই শিউলির আত্মা অবধি কেঁপে উঠল। তবে সেটা ভয়ের কাঁপা নয়, বরং প্রত্যাশিত জিনিস পেয়ে যাওয়ার মতো এক প্রশান্তির কাঁপন। শিউলি তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে তাকাল। শিউলি শিমুল ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই কেঁদে উঠল। সে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ল।
শিমুলের শুধু ঠোঁট দুটো অনবরত কাঁপছে । সে শিউলিকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না, কারণ জড়িয়ে ধরার অধিকার বা বৈধতা নেই এই মুহূর্তে সমাজের চোখে তারা কেউ নয়।
শিমুল শিউলির সামনে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কাঁদোস ক্যান পাগলি?চাইয়া দেখ আমার পানে।তোর শিমুল ভাই আইছে তো।”
শিউলি মাথা তুলে শিমুলের ভাইয়ের দিকে তাকালো।তারপর হাহাকার ভরা কন্ঠে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি কলঙ্কিনী হয়ে গেছি শিমুল ভাই।সমাজের চোখে,এই গ্রামের চোখে,সবার চোখে আমি কলঙ্কিনী হয়ে গেছি।”
শিমুল শিউলির দুই গালে নিজের হাত স্পর্শ করে ধরে বলল,
“পুরো পৃথীবি যদি এই কথাটা বিশ্বাস করে তবুও আমি বিশ্বাস করমু না।আমার ফুল পবিত্র। আমার শিউলি কলঙ্কিনী হতে পারে না।”
শিউলি আবারও কেঁদে দিল।এতটা কান্না হইতো গতকালের ভয়ংকর রাতেও কাঁদেনি মেয়েটি।শিমুলের বুক ফেটে যাচ্ছে এভাবে তার শিউলিকে দেখবে কখনো ভাবেনি। শিউলি ভাঙা কন্ঠে অভিযোগের স্বরে বলল,
“শিমুল ভাই তুমি কই ছিলা?তোমারে কেন আমার বিপদের দিন পাশে পাইলাম না?তুমি জানো শিমুল ভাই আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল তোমাকে না দেখে।তুমি কেন আসলে না?”
শিমুল অসহায় ভাবে বলল,
“তোর লগে দেখা কইরা বাড়িত গিয়াই দেখি আম্মার হাঁপানি ভাসছে।আম্মারে লইয়া তখনি গঞ্জে যাই কবিরাজের কাছে।গঞ্জে যাইয়া আওনের সময় হুনবার পায় তোর কথা।আমি রাতে আইছিলাম শিউলি।কিন্তু বাড়িত তহন কেউ আছিল না।আমি তোর জানালার কাছে পুরো অর্ধেক রাইত দাঁড়াইয়া ছিলাম।কিন্তু তের দেহা পায় নাই।’’
শিউলি আগের থেকেই জানত শিমুল তার বিপদের না এসে পারবে না।শিমুল ভাই সহসা বলে উঠল,
“ওই তামিমরে আমি ছাড়ুম না।ওই আমার পবিত্র ফুলকে সামাজে কাছে অপবিত্র প্রামান কইরা দিতে চাই।”
শিমুল ভাইয়ের কন্ঠে এবার শিউলি সর্বোচ্চ রাগ টের পেল,জিদ টের পেল।এতটা অন্য রকম শিমুল ভাইকে কখন দেখেনি শিউলি।শিউলি শিমুল ভাইকে অনুরোধ করে বলল,
“না শিমুল ভাই তুমি তামিমের কাছে যাইবা না।ওই তোামরে আবার মারব।”
শিমুল জেদি কন্ঠে বলল,
“আমারে বাঁধা দিস না শিউলি…”
শিমুলকে নিজের কথা শেষ করতে দিল না শিউলি। শিমুল ভাইয়ের হাত সহাসা নিজের মাথায় রেখে বলল,
“আমার মাথা ছুঁয়ে বলো তুমি তামিম রে এই বিষয়ে কিছু বলবা না।”
শিমুল অসহায় নয়নে শিউলির দিকে তাকিয়ে রইল।শিউলি আবারও বলল,
“তোমার কিছু হইলে আমি কি নিয়া বাঁচবো! বলতে পরো তুমি?”
শিমুল এবার কিছুক্ষণ শিউলির দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“তোর বাপ কই?”
“জানিনা,মনে হয় বাড়িত নাই।”
শিমুল আর কিছু না বলেই উঠে গেল।শিউলি পেছন থেকে ডেকে বলল,
“কি করবা শিমুল ভাই আব্বারে খুঁজো কেন?”
শিমুল পা তামিয়ে পেছন ফিরে তাকালো।ভীষণ আদুরে মৃদুস্বরে বলল,
“তোরে আমার বউ বানানো লাইগা সব কিছু করতে রাজি আছি রে শিউলি।আগেও বলেছিলাম তোরে ছাড়া এক জনম পার করা অসম্ভব।”
কথাটা বলেই শিমুল একটা বারও থামলো না রুম থেকে বেরিয়ে গেল।শিউলি অবাক হয়ে শিমুল ভাইয়ের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল।মনে মনে বিরবির করল,
‘এতটা বোঝদার আমার শিমুল ভাই কবে থেকে হলো?’
শিমুলকে বের হতে দেখে জাবেদা বেগম বললেন,
“শিমুল শিউলি কি কইলো?মাইয়াডারে আমার সমাজের লোকেরা ভাইঙা ঘুরাইয়া দিছে।”
শিমুল জাবেদা বেগমের কথার উত্তর না দিয়ে বলল,
“চাচি, চাচা কই?”
“শিউলির বাপ চেয়ারম্যানের বাড়ি গেছে।”
শিমুল আর দাঁড়ালো না, বাড়ি থেকে দ্রুত বেরিয়ে গেল। জাবেদা বেগম জানেন না, শিউলি আর শিমুল দু’জন দু’জনকে ভালোবাসে। জানলে কি শিমুলকে ঘরে ঢুকতে দিত! এই সমাজে প্রেম করা মহা অন্যায়। গ্রামীণ সমাজে প্রেমকে মানুষ ধর্ষণের চেয়েও ভয়ংকর মনে করে।
জাবেদা বেগম শিউলির রুমে ঢুকে গেলেন। দেখলেন শিউলি বিছানায় মাথা নিচু করে বসা। জাবেদা বেগম ধীর পায়ে মেয়ের কাছে গেলেন। মাকে দেখেও শিউলি মাথা তুলল না।মা হয়ে হয়তো মেয়ের কষ্ট বুঝতে পারছিলেন তিনি।জাবেদা বেগম চুপ করে থেকে তারপর মুখ খুললেন,
“আই, হাত-পা ধুয়ে খাবার খাইয়া নে।”
শিউলির মাথায় তখন ঝড়ো হলো অন্য চিন্তা। গতকাল রাতে শেষ ফয়সালা কী হয়েছিল। সে তাড়াহুড়ো করে জিজ্ঞেস করল,
“আম্মা, গতকাল আমি অজ্ঞান হওয়ার পর কী হইছিল?”
জাবেদা বেগম শিউলির কথার উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। শিউলি অস্থির হয়ে বলল,
“ও আম্মা, বলো না কী হইছিলো?”
জাবেদা বেগম মুখ তুলে অত্যন্ত বিষণ্ণ স্বরে বললেন,
“তোর আর তামিমের বিয়ে ঠিক হইছে। ত্রিশ তারিখেই।”
কথাটা কর্ণপাত হতেই শিউলির পুরো শরীর বেয়ে কী যেন দৌড়ে গেল। পুরো শরীর অচলের মতো হয়ে গেল। তামিমের সাথে বিয়ে! ওই লোকটার সাথে, যে শিউলির নামে এত বড় অপবাদ দিল? অবশ্য তামিম তো এটাই চেয়েছিল, যাতে শিউলিকে বিয়ে করতে পারে। যখন দেখল তার বাপকে পাঠিয়েও কাজ হচ্ছে না, তখন এই ভয়ংকর খারাপ জিনিসটা করল।
জাবেদা বেগম আবারও বলে উঠল,
“একদিকে ভালাই হয়ছে।এখন সমাজের লোক এই নিয়া কথা কম কইবো।”
শিউলি মায়ের এমন কথায় চমকে তার মায়ের দিকে তাকালো।পূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে বলল,
“ভালো হয়ছে?কীভাবে ভালো হইছে?ওই ছেলেটাকে কীভাবে বিয়ে করতে পারি?যে ছেলেটা আমার এত বড় ক্ষতি করল!”
জাবেদা বেগম শিউলির কথা ধীর কন্ঠে বলল,
“তুই ভালোই থাকবি তামিমের লগে।”
শিউলি নিজের মা কে চিনতে পারছে না।তার মা সবসময় নিষ্ঠা শিক্ষা দিয়েছে ছোট থেকে।কিন্তু আজ তিনি কেন এসব বলছেন।তখনি শিউলির মনে প্রশ্ন জাগল।সে নিজের মনের প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেই ফেলল,
“আচ্ছা মা তুমিও গ্রামের সবার মতো ওই নোংরা মিথ্যা কথাটাই বিস্বাস করো?”
জাবেদা বেগমে শিউলির কথায় থতমত খেয়ে গেলেন।তিনি আর বসলেন না, শুধু রুম থেকে বেরিয়ে গেল।শিউলি জাবেদা বেগমের যাওয়ার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে রইল।শিউলি মনে মনে বিরবির করল,
‘তার মানে সমাজের সকলের মতো আম্মা-ও বিস্বাস করে আমি অপবিত্র,কলঙ্কিত,চরিত্রহীন!কেন আমার কথা বিস্বাস করছে না কেউ?কিন্তু শিমুল ভাই তো ঠিকই বিশ্বাস করল।’
ইচ্ছে হলো ফ্যানে ঝুলে পরতে।কিন্তু তা করা যাবে না।শিমুল ভাইয়ের জন্য হলেও আমাকে বাঁচতে হবে।আমাদের সুন্দর একটা সংসারের জন্য হলেও বাঁচতে হবে।শিমুল ভাইয়ের সাথে এক জনম পার করতে হলেও আমাকে বাঁচতে হবে।
#চলবে…
(ভেবেছিলাম বিশাল বড় পর্ব দিব কিন্তু শরীরে অসুস্থতা…
আচ্ছা যাই হোক দোয়া করবেন।আজ ভীষণ কষ্ট হয়েছে গল্প লিখতে।শরীরের কন্ডিশন ঠিক না হলে গল্প আসা বন্ধ থাকবে।)

