যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৪১]

0
27

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৪১]

লোকে বলে, শোকের মেয়াদ তিনদিন। মানুষ আঘাত মনে রাখে, কিন্তু মৃতদের স্মৃতি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে যায় তাদের মানসপটে। সুবহান আলী শাহর কবর শুকিয়ে এখন খসখসে মাটি। আস্ত এক পথের কাঁটা চিরতরে শত্রুদের জীবন থেকে সরেছে যেন।
কার্তিকের অবসান ঘটিয়ে অগ্রহায়ণের হিমেল হাওয়া ছুঁয়েছে ধরা। ক্ষেতের পাকা আমন ধান কেটে তোলা হয়েছে ঘরে। গ্ৰামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে নবান্নের ঘ্রাণ, নতুন ধান ঘরে তোলার উৎসবমুখর আবেশ।

আসমানী গাছের নিচে মাচায় বসে আছে নাজির। উঠোনের গা ঝাঁঝালো রোদে মেলে দেওয়া হয়েছে সোনালী ধান। ক্ষণে ক্ষণে হারপাট চালিয়ে সেই ধান উল্টে দিচ্ছে মিছরি। রোদের তাপে মুখখানা লাল টুকটুকে বর্ণ ধারণ করেছে, নাকে ঝলমল করছে সোনার নাকফুল। সেই নাকফুল নাজির আগেই স্ত্রীর জন্য বানিয়ে রেখেছিল। শুধু নাক না ফোঁড়ানোয় এতদিন পরাতে পারেনি। হঠাৎ নাজির উঠে এসে হারপাটটা মিছরির হাত থেকে কেড়ে নিলো। নিজেই ধান নেড়ে দিতে দিতে বললো,“ভিতরে যাও, না হইলে কালা হইয়া যাইবা।”

একপলক স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে বাধ্য মেয়ের মতো বারান্দায় গিয়ে বসলো মিছরি। ঘরের পাশে নতুন রান্নাঘর উঠেছে। হাঁটু সমান মাটির দেয়াল দিয়ে টিনের চালার রান্নাঘর। সেখানে চুলার সংখ্যা মোটে একটা। মিজানের মা পিঁড়িতে বসে মাটি দিয়ে আরো এক জোড়া চুলা তৈরি করছেন। গত সপ্তাহেই সংসার আলাদা করেছে নাজির। উঠোনটাও অদৃশ্য রেখায় ভাগ হয়েছে, পুরো উঠোন এখন আর ঝাড়ু দেয় না কেউ। যে যার সীমানা পর্যন্ত পরিষ্কার করে চলে যায়।

আব্বাসকে কাচারি ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে নাজির তার পিছু নিলো। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছো, আব্বাস ভাই?”

সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো আব্বাস। এত মধুর সুরে নাজির তার সাথে কখনো কথা বলে না। মাথা নাড়িয়ে বললো,“আছি ভালা।”

“ভাবি, পোলাপাইন কেমন আছে?”

“ভালাই।”

“তোমার একটা চাচা আছিলো না? কী জানি নাম? উমম, মোতালেব না?”

“হ, ক্যান?”

“হেরে তো কহনো দেখলাম না। থাকে কই?”

“তোর কী দরকার?”

“কোনো দরকার নাই, এমনি কৌতূহল জাগলো মনে। বাজারে একজনের থাইক্যা গল্পের মাঝখানে হুনি আমগো গেরামে নাকি দুই মোতালেব। একটারে তো চিনি কিন্তু আরেকটা কেডা? পরে হুনি তোমার চাচা‌। আগে নাকি আমগো বাড়িত কাম করতো?”

“হ, এহন আর বাইচ্চা নাই। মরছে প্রায় বছর দশেক তো হইবোই।”

অধরের হাসি নিভে গেলো নাজিরের। পথিমধ্যে থেমে দাঁড়ালো। আব্বাস পিছু ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“কী হইছে আবার?”

“পরিবারে আর কেউ নাই? থাকতো কই?”

“বউ আছে, দুইডা পোলাও আছে। সবাই এহন টুঙ্গি থাহে।”

কী যেন ভাবতে ভাবতে নাজির আবারো বাড়ি ফিরে এলো।

বেলা গড়িয়ে প্রায় দুপুর হওয়ার পথে। ফরিদা আজ আগে আগেই রান্না বসিয়েছেন। পাশেই পুত্রবধূ বসে আনাজ কাটছে। সিরাজ উল্লাহ আর তাঁর ছোটো পুত্র সোহেলের যাতায়াত ইদানিং শাহ বাড়িতে বেড়েছে। আমিরুল শাহও কিছু বলেন না। যেন শালা এলে সবচেয়ে খুশি তিনিই হন। মর্জিনা রান্না করেন একটু দেরিতে। কুলোয় চাল বাছতে বাছতে মিছরিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,“মেজো বউয়ে আইজকা কী রানবা?”

মিছরি একটু ভাবলো। আগের মতো এখন আর রান্নায় সে ঢেঁকি নয়। ইতোমধ্যে বেশ কিছু রান্নাবান্না শিখেছে। কিছু ফরিদা, বিথীর বৌদলতে আবার কিছু বা স্বামীর বৌদলতে। বললো,“ভাত, করলা ভাজি আর ডিম ভুনা।”

“ডিম কোনো খাওন হইলো? এমনে তো চলবো না। মাছ রানতে পারো না? না পারলে শিখো না ক্যান? আমি রান্না করার সময় কাছে আইয়া বইলেও তো পারো।”

প্রত্যুত্তর করল না মিছরি। রান্নার নিয়ম সে জানে। কিন্তু মাছ কাটতে আর ভাজতেই তার যত ভয়। জ্যান্ত মাছ লাফালাফি করলে বুক কেঁপে ওঠে, তেল ছিটলে তো আর কথাই নেই। মর্জিনা বললেন,“আমার চুলা খালি পইড়া রইছে। ডিম সিদ্ধ বসাইয়া দেও। তোমার চুলা শুকাইতে আরো তিন-চাইরদিন লাগবো। এক চুলায় কতক্ষণে রানবা?”

মিছরি মাথা নাড়ালো। মর্জিনা নামক মহিলাটিকে সে বুঝতে পারে না। তাঁর আচরণ অদ্ভুত। এই খারাপ আচরণ করে, শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজে ঝগড়া করে তো এই আবার সবার উপকারে এগিয়ে আসে। তবে নাজির তাকে বলেছে,“রগচটা, বদমেজাজি হইলেও ছুডো চাচীর মন ভালা। যা কওয়ার মুখের উপরেই কইয়া দেয়।”

তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,“তোমার দেওরা কই? সকাল থাইক্যা তো দেখতাছি না।”

এবারের প্রশ্নের উত্তর নাজির নিজেই দিলো,“শহরে গেছে। ফিরতে দেরি হইবো।”

“ওর বউডা কই? শ্বশুর মরার মাস হইয়া যাইতাছে অথচ একবারও আইলো না। ঝামেলা হইছে? কিছু জিগাইলেও কয় না। জামাই, বউয়ে এতদিন আলাদা থাকা কী উচিত?”

“বউ বাপের বাড়িত। হের লগে আর নওশাদ সংসার করবো না। তালাকের ব্যবস্থা চলতাছে।”

উপস্থিত সকলে অবাক হলেন কথাটায়। ফরিদা নাজিরের উপর রাগ করে আছেন। আলাদা রান্নাঘর তোলার পর থেকেই কথা বলা কমিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে মিছরিকে তো সহ্যই করতে পারেন না। এই তো সেদিন বিথী বলছিল,“সব দোষ ওই বউয়ের। সংসারে আইতে না আইতেই ভাঙন ধরাইয়া দিছে।”

ফরিদা কথাটায় বিশ্বাস করলেন। নাহলে নাজিরের মাথায় এই বুদ্ধি বা চিন্তা কখনোই আসার নয়। এই যে মর্জিনা এত বছর ধরে ফরিদার থেকে নাজিরকে আলাদা করার কত চেষ্টা করলেন। পেরেছেন কী? কানে বিষ ঢেলেও তো কিছু করতে পারেননি। অথচ দুদিনের মেয়ে এসে কিনা সবকিছু বিগড়ে দিলো? প্রথমে গয়না হাতালো, তারপর টাকা পয়সার দায়িত্ব বুঝে নিলো, এখন আবার সংসারটাও? তবুও তিনি কৌতূহল দমন করতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, “কী কস! তালাক দিয়া দিবো মানে?”

“মানে টানে নাই। মাইয়ার বাপ-মা, ভাই সংসারে নাক গলায় বেশি। ওরা চায় নওশাদ ঘরজামাই থাকুক। এমনকি জামাই হিসেবেও সম্মান করে না। আমারে একবার হেগো বাড়িত ডাকাইয়া নিছিলো। আমি শর্ত দিয়া আইছিলাম, সংসার করলে এনে আইয়া করতে হইবো। কিন্তু তারা মানে নাই, নওশাদও আগাইতে চায় না।”

“এইডা কোনো কথা? একটা সংসার এমনে ভাইঙা যাইবো?”

মর্জিনা মুখ বাঁকিয়ে বললেন,“এতদিনে নওশাদ ঠিক সিদ্ধান্ত নিছে। অল্প বয়সী মাইয়া, তাই আবেগের বশে পলাইয়া আইছিল। হেরপর তার কান্ড কারখানা তো দেখলামই। কিছু কইলেই ছ্যাৎ কইরা উঠতো। এমন মাইয়ার লগে সংসার করা যায় না। সময় থাকতে থাকতে তালাক হইয়া গেলেই ভালা। পোলাপাইনও তো হয় নাই। আমগো নওশাদরে আরো ভালা ঘরের মাইয়ার লগে বিয়া দিমু।”

“নাজমুলের বিয়া কবে দিবেন? হেইদিন না মাইয়া দেখতে গেলেন? পছন্দ হয় নাই?”

“হয় নাই মানে? আমগো বংশের মাইয়া। চেহারা সুরৎ সুন্দর আছে, লগে সাংসারিক। সব কাম পারে। বাপের জমিজমার অভাব নাই, বছরের ধান নিজেরাই করে। এলাকায়ও কোনো দুর্নাম নাই। তাই আংটি পরাইয়া দিয়া আইছি। তোরে কই নাই?”

“তাইলে আরকি, তাড়াতাড়ি দিয়া দেন। হেরপরে তো আরো দুইডা পোলা আছে।”

“হ, ওর পরে শাহরিয়ারের বিয়া দিমু। জাহিদেরটা আরো দেরি আছে।”

আলোচনা ধীরে ধীরে ওখানেই শেষ হলো। লিলিকে এত বোঝানোর পরেও মেয়েটা আর সংসারে ফিরলো না। নিজের কথায় অনড় সে। বয়স অল্প, হয়তো বাবা-মাও কিছু বুঝিয়েছে। গত মাসে তার বাবা নিজেই তালাকের আবেদন করল আদালতে। সপ্তাহ দুয়েক আগে ডাকপিয়ন মারফত সেই চিঠি নওশাদ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তার দুদিন পরেই উকিলের সাথে কথা বলে সব ঠিকঠাক করে এসেছিল সে। আজ বোধহয় স্বাক্ষর হবে। ওখান থেকে ফেরার পথে অবশ্য এম্বাসিতেও যাবে। পরিচিত মুদি দোকানির সাথে কথা বলে ঠিকানা এনেছে নাজির। কোথায়, কীভাবে যেতে হবে, কী করতে হবে সব তথ্যও জেনে এসেছে। ভাইকে এই দেশ থেকে তাড়ানোর যেন ভীষণ তাড়া তার!

চুলা বানানো শেষে মিজানের মা চলে গেলেন নিজের বাড়ি। এই পাড়ার মধ্যে তিনিই এই ধরণের চুলা ভালো বানাতে পারেন। তাই তাকেই এসব কাজে ডাকা হয় সবার আগে। মিছরি ডিম সেদ্ধ বসিয়ে সর্বপ্রথম পেঁয়াজ,মরিচ কুঁচি করে কাটলো, তারপর ধরলো করলা। নাজির নীরবে স্ত্রীর কাজকর্ম দেখছে। হাতের গতি খুবই ধীর। কোন ফাঁকে সোহেল এসে বিপরীত বারান্দায় যে বসেছে সে খেয়াল কেউ করেনি। ধানে শেষ আরেকটা নাড়া দিয়ে পূর্বের স্থানে এসে বসতেই ছেলেটাকে নজরে পড়ল নাজিরের। গালে হাত রেখে তাকিয়ে আছে মিছরির দিকে। ঠোঁটে মৃদু হাসি, দৃষ্টি অদ্ভুত। কিঞ্চিৎ রাগ হলো নাজিরের। কড়া গলায় বললো,“কী রে, তুই এনে কী করোস?”

সোহেলের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলো। সোজা হয়ে বসে বিরক্তি নিয়ে নাজিরের দিকে তাকালো। দৃষ্টি মিলিত হওয়ায় সামান্য হাসলো,“বইয়া রইছি।”

“ক্যান বইয়া রইছোস? ঘন ঘন এই বাড়িত কী?”

“এহন কী ফুফুর বাড়ি আইতে পারমু না?”

“আগে তো কহনো এত দেখি নাই। ইদানিং ফুফুর কথা বেশি মনে পড়তাছে না?”

ভাতের পাতিল ঘরে রাখতে গিয়ে কথাটা শুনে ফেললেন ফরিদা। তিনিই উত্তর দিলেন,“তাতে তোর কী? ওয় ওর ফুফুর কাছে যহন ইচ্ছা তহন আইবো।”

“তা আসুক, কিন্তু ফুফুর দিকে না তাকাইয়া আমার বউয়ের দিকে তাকাইয়া থাকলে আমার আবার অনেক কিছু। সময় থাকতে থাকতে দৃষ্টির হেফাজত কর, সোহেল।”

“যেই না একটা বউ!” মুখ বাঁকিয়ে বললেন ফরিদা।

“ক্যান, হিংসা হয়? বয়স তো কম হইলো না অথচ আমার বউরে হিংসা করেন?”

“খাইয়া দাইয়া আর কাম নাই। আমার সমান হওয়ার যোগ্যতা আছে তোর বউয়ের যে হিংসা করমু?”

“এইডাও হিংসার কথাই। আমার বউ আমনের সমান হইতে যাইবো ক্যান? ওর বাপ, ভাই কী চোর ছেচ্ছড় নাকি? ভালা বংশের মাইয়া।”

এমন করে নাজির কথা বলে শুধু মর্জিনার সাথে। তাও মজার ছলে। অথচ আজ কিনা ফরিদার সঙ্গে বলছে! ভাবতেই অবাক হন ফরিদা। বলেন,“আমার বাপ, ভাইরে তুই চোর কইলি?”

মর্জিনা মাঝখানে বলে উঠলেন,“এইডা আর নতুন কী? জোয়ানকালে তোর মায়রে হিংসা করছে, আর বুইড়াকালে করে তোর বউরে। পোলার বউডাও কম না। রগে রগে দুইডার হিংসা আর কুইটনামি।”

ফরিদার রাগ বাড়লো। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “তুই বুঝি ভালা মানুষ? তুই কম হিংসা করছোস?”

“আমনের মতো কহনো করি নাই। আমার লগে হের সম্পর্ক ভালাই আছিলো। আমনেই কানপড়া দিয়া কাইজ্জা লাগাইতেন।”

“হ, তুই পোলাপাইন মানুষ যে আমার কথায় কাইজ্জা লাগতি।”

মাঝখানে ফুফুর নাক গলানোয় বিরক্ত হলো সোহেল। বললো,“আহা থামো তো, ফুফু। ভাবি কিন্তু সুন্দর আছে। একবার দেখলে খালি দেখতেই মন চায়। কি উচ্চতা, কি শরীরের গড়ন!”

মিছরির হাত থেমে গেলো। মাথা তুলে লোকটার দিকে তাকালো। কথা বলার ধরণ খুবই বাজে। নাজিরের বুনো দৃষ্টি মুহূর্তের মধ্যেই হিংস্র হলো। কোথাকার না কোথাকার এক ছেলের এত বড়ো সাহস যে নাজিরের বউ নিয়ে কু মন্তব্য করে! দ্রুত পা ফেলে এগিয়ে গিয়ে শক্ত হাতে সে চড় বসালো সোহেলের গালে। চোয়াল শক্ত করে বললো,“জবান খোলার আগে মনে রাখা উচিত কারে নিয়া কথা কইতাছোস। এইবার থাপ্পড় মারছি, পরেরবার তাকাইলে চোখ তুইল্যা কুত্তা দিয়া খাওয়ামু, গোলামের পুত।”

হঠাৎ এমন একটি কান্ডে উপস্থিত সকলেই অবাক হলো। সোহেল গালে হাত দিয়ে একপলক সবার দিকে তাকিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ফরিদা দৌড়ে গিয়ে ভাইপোর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। ধমকের সুরে বললেন,“এইডা কী করলি, নাজির? এত বড়ো পোলার গায়ে হাত তুললি?”

“মুখ সামলাইতে না পারলে হাত তো তুলতেই হইবো। সাহস কেমনে হয় আমার বউয়ের গড়ন, উচ্চতা লইয়া কথা কওয়ার?”

“ভাবির লগে কী মাইনষে মশকরা করতে পারে না? একটু মশকরা করছি, তার লাইগা তুই আমার গায়ে হাত তুললি?” সোহেল বললো।

“কীয়ের ভাবি? তুই কেডা? শাহ গো রক্তের কেউ? জাহিদেও তো আইজ পর্যন্ত চোখ তুইল্যা চাওনের সাহস পায় নাই। আমার নিজের ভাইও খুব প্রয়োজন ছাড়া কহনো কথা কয় না। তুই এত সাহস পাইলি কইত্তে? মশকরা করলে সামিউল ভাইয়ের বউয়ের লগে গিয়া কর। আমার বউয়ের লগে না। দেওর, ভাবির নষ্টামি আমার পছন্দ না। আইজকার পর থাইক্যা তোরে যদি আর এই বাড়িত দেহি তাইলে লুলা বানাইয়া দিমু। কথা যাতে মনে থাহে, না হইলে বনখড়িয়া গেরামের আশেপাশে আর আইতে পারবি না।”

নাজির গিয়ে পুনরায় মাচায় বসলো। আমিরুল শাহ, সিরাজ উল্লাহ ঘরে বসে গল্প করতে করতে হুক্কা টানছিলেন। চেঁচামেচির শব্দে তাঁরাও ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তাই নাজিরের শেষ কথাটা তাদের কর্ণগোচর হলো। তবে আমিরুল শাহ কিছু বললেন না। নইলে সব রাগ এসে পড়বে তাঁর উপর। এমনিতেই বাবার মৃত্যুর পর থেকে ছেলেটা শান্ত হয়ে গিয়েছে। হুটহাট চাচাদের খোঁচা মারা, বিরুদ্ধাচরণ করার স্বভাব বন্ধ হয়েছে। অযথা রাগিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কী? ইশারায় স্ত্রীকেও চুপ থাকার নির্দেশ দিয়ে পুনরায় তিনি চলে গেলেন ঘরে। শ্যালকের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমার পোলাডার নজর সুবিধার না। আমি অনেক আগেই টের পাইছিলাম। একেবারে তোমার মতন লুচ্চা হইছে। ওরে সাবধান কইরা দিও।”

সিরাজ উল্লাহ হাসলেন,“পোলার বয়স কম, কিন্তু পছন্দ ভালা। এই বয়সে এমন একটু আধটু হয়।”

“ফাইজলামি বাদ দেও। ওইডা কাশেমের একমাত্র মাইয়া, আকবর মিয়ার ছুডো নাতিন। এই মাইয়ার লাইগা ওই বুইড়ায় নিজের মাইয়ার ঘরের নাতিন জামাইরে পর্যন্ত গুলি করছে। আর তুমি মশকরা মারাও?”

“আমি কাউরে ডরাই না, দুলাভাই। নাসরিনের বাপ, ভাইরাও কী কম আছিলো? কিন্তু কিছুই করতে পারে নাই। আমার পোলা আমার থাইক্যাও চালাক।”

“দুইডারে একলগে মিলাইয়া লাভ নাই। ওই মাইয়ার বাপের বাড়ি এক গেরামে। হেগো প্রভাব কম না। বাপ, ভাইরা তো আছেই, তার উপরে বউডা কার হেইডাও তো দেখতে হইবো? আমগো নাজিরের বউ। হুনলা কী কইছে? বুইড়ার লগে মিল্যা তুমগো বাপ, পুতের পিছনে আইক্কা ওয়ালা বাঁশ দিবো নে।”

বিরতি টেনে বললেন,“সাবধান কইরা দিও। ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর চাই না। শেষ বয়সে আমারে একটু শান্তি দেও তোমরা।”

“অথচ লোভ আর চুট্টামি এহনো যায় নাই।”

চোখ রাঙালেন আমিরুল শাহ। ঘন ঘন হুক্কায় টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন।
_________

আদালতের দোরগোড়ায় পা রাখতেই পরিচিত এক মুখ নজরে পড়ল। সেই মুখের অধিকারিণী লিলি। মুহূর্তেই নওশাদের বুকের ভেতরটা ধূ ধূ মরুভূমির মতো হাহাকার করে ওঠে। চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ে এক কোণার ফাঁকা একটি বেঞ্চে। কিছুক্ষণ পর পিয়নের ডাকে সম্বিত ফিরতেই উঠে দাঁড়ায়। ভেতরে ডাক পড়েছে তার।

লিলি আর ফারুক পাশাপাশি বসে আছে। নওশাদ গিয়ে তাদের সামনের সারিতে বসতেই লিলির সঙ্গে চোখাচোখি হলো। একসময় যে চোখে নওশাদের জন্য একচ্ছত্র ভালোবাসার দেখা মিলতো, আজ সেখানে তার ছিটেফোঁটাও নেই। ঠান্ডা, অনুভূতিহীন, অদ্ভুত একজোড়া দৃষ্টি। দুজনার মধ্যে আর কোনো কথা হয় না। অথচ এই মেয়েটাই একদিন তার জন্য পাগলামি করেছিল, বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে পালিয়ে এসে ধরেছিল শূন্য নওশাদের হাত। সময়ের নির্মম পরিক্রমায় এখন হয়তো লিলি বুঝে গিয়েছে, নওশাদ নামের পুরুষটির হাত ধরে, তাকে ভালোবেসে ঠিক কত বড়ো ভুলটাই না সে করেছিল এই জীবনে।

কালো কোর্ট পরিহিত উকিল খসখস শব্দ করে কিছু কাগজপত্র গোছাচ্ছেন। সম্ভবত এগুলোই তাদের তালাকনামা। দৃশ্যটা দেখে দরদর করে ঘেমে ওঠে নওশাদ, ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা গ্ৰাস করে। জুতার ভেতরে পা জোড়া অসাড় হয়ে আসে, যেন নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা দায়। মাথার উপরে ক্যাটক্যাট শব্দ তুলে ঘুরছে পুরোনো একটি ফ্যান। নওশাদ হঠাৎ টের পায় চারিদিকে কি বিচ্ছিরি, দমবন্ধকর এক গন্ধ! যা তার ভেতরের হাহাকার আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উকিল সাহেব গলা খাঁকারি দিয়ে উভয়ের মনোযোগ আকর্ষণ করে বললেন,“সব কাগজপত্র প্রস্তুত। আপনারা চাইলে আরেকবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা সেরে নিতে পারেন। এখনো সময় আছে, প্রক্রিয়াটা একবার শেষ হয়ে গেলে পরে হয়তো আর সুযোগ পাবেন না।”

নওশাদ প্রবল আশা নিয়ে প্রিয়তমার দিকে তাকায়। এই শেষ সময়ে একবার, শুধু একবার মেয়েটা বলুক সে শুধু নওশাদকে চায়। সে নওশাদের সাথেই সমস্ত সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে আদর্শ স্ত্রী হয়ে কাটিয়ে দিতে চায় গোটা জীবন। তাহলে আজ এই মুহূর্তে সব কিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নওশাদ বেছে নেবে লিলিকে। কিন্তু লিলি মুখ তুলে একপলকের জন্যও তার দিকে চোখ তুলে তাকায় না। বরং পিতা ফারুক তাড়াহুড়ো করে বললেন,“কোনো আলোচনা নেই। ঝামেলা দ্রুত মিটে গেলেই ভালো।”

উকিল তবুও লিলির উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনিও কী একমত? কিছু বলার নেই?”

লিলি দুদিকে মাথা নাড়ায়। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,“না।”

নওশাদ আশাহত হয়। বুকে চিনচিনে ব্যথার সৃষ্টি হয়। মেয়েটা ভীষণ জেদি। নওশাদও কী কম? সে-ই তো প্রথম বিচ্ছেদের নাম নিয়েছিল। এমনকি এখনো নিজেদের মধ্যকার সমস্যা ঠিক করার চেষ্টা করছে না। উকিল সাহেব ফাইলের উপরে একটি কাগজ এগিয়ে দেয়, কী কী যেন লেখা আছে তাতে। নওশাদ পড়ার মতো শক্তি পায় না। লিলি স্বাক্ষরের জন্য কলম হাতে কাগজটি টেনে নিতেই আচমকা সেটা ধরে ফেলল সে। শব্দ করে শ্বাস ফেলে বললো, “আমার কথা আছে।”

উপস্থিত সবার দৃষ্টি পুরুষালি ঘর্মাক্ত মুখমন্ডলে গিয়ে স্থির হলো। ফারুক চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, “বললাম তো, কোনো কথা নেই। এভাবে আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ নষ্ট হতে পারে না। দ্রুত তাকে মুক্তি দাও।”

নওশাদ নিজের কথায় অনড়। লিলি বাধ্য হয়েই সায় দিলো। নীরবতা পেরিয়ে উঠে দাঁড়ালো নওশাদ। ধীরে ধীরে বাইরের দিকে পা বাড়িয়ে বললো,“চলো।”

রোদের তাপে বাইরে ভীষণ গরম। নওশাদ একটি গাছের নিচে এসে দাঁড়ালো। লিলিও তার পেছন পেছন এলো। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললো,“কী বলবে? বলো।”

মেয়েটার দিকে ফিরে তাকালো নওশাদ। আপাদমস্তক দেখলো। কী অদ্ভুত একটি দিন! লিলি তার চোখের দিকে তাকাচ্ছে না। বুকটা যেন ধক করে উঠলো। বললো,“অনেক হয়েছে, লিলিফুল। চলো, সব ভুলে ফিরে যাই, নতুন করে আবার শুরু করি। জীবনে অর্থবিত্ত, উঁচু দালানই সবকিছু নয়। এখন আমার যা নেই ভবিষ্যতেও যে তা থাকবে না তার কী নিশ্চয়তা? জীবনে সম্মান, ভালোবাসাটাই আসল। চলো এখান থেকে। তোমাকে ছাড়া থাকতে আমার খুব কষ্ট হবে।”

লিলির চোখ জোড়াও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। তারও কী কষ্ট হচ্ছে? হচ্ছেই তো। নাহলে চোখে অশ্রু জমবে কেন? কান্না গিলে খেয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বললো, “এই সম্পর্ক আর এগিয়ে না নেওয়াই ভালো। তুমি আমার কৈশোরের ভুল। ভুল সারাজীবন বয়ে নিয়ে চলা অন্যায়‌। মানিয়ে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি সুখী হতে চাই, আর এই সুখী হওয়ার পথে বাবা আমায় শেষ একটা সুযোগ দিয়েছেন। সেই সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে পারবো না।”

“আমি তোমায় অসুখী রেখেছিলাম?”

উত্তর দেয় না লিলি। উল্টো ঘুরে ভেতরে যেতে যেতে তাড়া দিয়ে বলে,“দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

শেষ সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে গেলো নওশাদের। যে থাকতে চায় না তাকে জোর করে রাখার মধ্যে কোনো মহত্ত্ব নেই। কিছু সময়ের মধ্যে দুজনেই স্বাক্ষর করে দিলো তালাকনামায়, এবং শেষ হলো একটি সম্পর্ক। যেই সম্পর্কে একসময় ভালোবাসা ছিল, ভবিষ্যতের পথচলার স্বপ্ন ছিল।
এখানকার কাজ শেষ হতেই নিষ্ঠুরের মতো পিতার হাত ধরে মেয়েটা চলে গেলো। শেষবারের মতো একবারও পিছু ফিরে তাকালো না পর্যন্ত। কেবল নওশাদ সেই নিষ্ঠুরতা দেখাতে পারলো না। সেদিকেই ঝাপসা চোখে তাকিয়ে রইল। বিড়বিড় করে বললো, “তুমি মেঘের মতো কোমল, নদীর মতো সরল। যাকে ধরা যায়, ছোঁয়া যায়, কিন্তু সারাজীবন বয়ে নেওয়া যায় না।”

চলবে __________

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here