#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৬৩]
মাত্র দুদিনের ব্যবধানে অদৃশ্য ঝড়ের দাপটে ফরিদার সাজানো সংসার এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। মৃত স্বামী আমিরুল শাহর সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সব রং যেন হারিয়ে গিয়েছে। নাকের সুন্দর নাকফুলটা অবহেলায় আলমারির এককোণে পড়ে আছে, সাথে আছে স্বর্ণের এক জোড়া বালা। অথচ স্বর্ণ পরতে তিনি কত পছন্দই না করতেন!
আব্দুল্লাহ ছুটে এসে দাদীর গা ঘেঁষে দাঁড়ালো। আদো আদো কণ্ঠে বললো,“দাদী, দাদা কই? মুরে গেচে?”
দেয়ালে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসেছিলেন ফরিদা। চোখে এখনো অশ্রু শুকিয়ে আছে। সারারাত ধরে জ্বরে ভুগেছেন। নাতির কথায় সোজা হয়ে বসলেন। দৃষ্টি আচানক হিংস্র হয়ে উঠলো। বাচ্চাটাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলেন নিচে। কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন,“আমার সুখ সহ্য হয় না তগো? এর লাইগাই আমার জামাইডারে খাইছোস? একলা একলা সব ভোগ করতে চাস? কিচ্ছু দিমু না। কাউরে কিচ্ছু দিমু না। সবাইরে জানে মাইরা দিমু।”
নরম দেহে বেশ ব্যথা পেয়েছে আব্দুল্লাহ। নিচে বসেই কেঁদে দিলো। মায়ের চিৎকার আর ছেলের কান্না শুনে নিজের ঘর থেকে ছুটে এলো সামিউল। বাবার শেষ কাজের পেছনে ছোটাছুটির চক্করে ঠিকঠাক খাওয়া হয়নি। সবে সকালের খাবার খেতে বসেছিল। খাওয়া ছেড়ে উঠে এসে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলো সে। পিঠে হাত বুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা চালিয়ে মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,“বয়স তো কম হয় নাই, এত নাটক আইয়ে কইত্তে? এমন ভান করতাছেন যেন আব্বারে কত ভালাবাসতেন?”
ছেলের কথায় ফরিদা অবাক হলেন। কিছু বলার পূর্বেই আব্দুল্লাহকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো সামিউল। হাতের কাজ ফেলে বিথী ছুটে এসেছে। ছেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো,“বারবার নিষেধ করছি, দাদীর কাছে যাইস না। দাদীর মাথা এহন ঠিক নাই। সেই গেলোই। ওরে আমার কোলে দেন। আমনে গিয়া ভাত খান।”
“আমার পোলার কান্না আমিই থামাইতে পারমু। তাই না, বাজান? কান্দে না, আইয়ো আমরা ঘুইরা আহি।”
বিথী কথা বাড়ালো না। বাপ-ছেলেকে ফটক দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখে নিজেও হেঁশেলের দিকে ছুটলো।স্ত্রীকে দুইবেলা উত্তম মধ্যম দিলেও ছেলে-মেয়ে অন্ত প্রাণ সে। ফরিদার গালমন্দ, প্রলাপ বন্ধ হলো না। বরং ছেলের কথা শোনার পর থেকে আরো বাড়লো। শেষে ক্লান্ত হয়ে উন্মাদের মতো কাঁদতে লাগলো। আয়েশা এসে মাকে সামলালো।
নাজির বারান্দায় বসে মুড়ি চিবোতে চিবোতে সেই কান্নার শব্দ শুনছে। তার ভেতরে সন্তুষ্টি কাজ করছে। তবে বেশি নয়, সামান্য। যতদিন না এই মহিলাকেও প্রাপ্য কোনো শাস্তি দিতে পারছে ততদিন পর্যন্ত শান্তি সে পাবে না।
মুমিনুল শাহ, বদরুল আর সাদ্দাম উঠোনে কেদারায় বসে আছে। কিছুক্ষণ আগে নওশাদের দেশ ছাড়ার সংবাদ শোনার পর থেকে নাজিরের উপর তিনি নারাজ হয়ে আছেন। চোখেমুখে সেই রাগও স্পষ্ট ফুটে উঠলো। মুখ ভার করে বললেন,“এতকিছু কইরা ফেললি অথচ একটাবার আমগো জানাইলি না? পাসপোর্ট তো আর একদিন বা দুইদিনে হয় নাই। এর লাইগাই কী তবে জমি বন্ধক দিছিলি? আমি তো ভাবছিলাম অন্যকিছু।”
নাজির নির্বিকার ভঙ্গিতে এখনো মুড়ি চিবোচ্ছে। হাত ঝেড়ে বললো,“কইয়া লাভ কী? ট্যাহা পয়সা দিয়া তো আর কহনো সাহায্য করতেন না। উল্টা বাগড়া দিতে হাজির হইয়া যাইতেন।”
মুমিনুল শাহ অপমানিত হলেন। বদরুল দুদিকে মাথা নাড়িয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বললো,“এইডা তুমি ঠিক করো নাই, নাজির। ময় মুরুব্বি গো মান্য কইরা চলতে হয়। তোমরা তো টিকা আছোই চাচাগো লাইগা।”
“যা জানেন না তা লইয়া কথা কইয়েন না, দুলাভাই। প্রত্যেক পরিবারেই রাজনীতির মারপ্যাঁচ থাকে। পারিবারিক রাজনীতি খুবই ভয়ংকর হয়। বাপ, ভাই, ভাতিজারাও এর সামনে তুচ্ছ।”
বদরুল মিইয়ে গেলো। মুমিনুল শাহর ভ্রু জোড়ার মাঝখানে সরু ভাঁজ পড়ল। ছেলেটা মাঝেমধ্যে কী যে বলে বুঝতে পারেন না। আবার ভয়ও হয়। কথা শুনে মনে হয় যেন সবজান্তা। অথচ তার জানার কথা নয়। নওশাদ দেশ ছাড়বে বিষয়টাও তিনি মেনে নিতে পারছেন না। আমিরুল শাহর হঠাৎ মৃত্যুতে তাঁর অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো। এত বছর ধরে মনে মনে কী ফন্দি এঁটে রেখেছিলেন কে জানে? তবুও ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন,“কাইল হঠাৎ ভাইজান মইরা গেলো। আইজ দ্বিতীয়দিন। নওশাদ গেলে গা মাইনষে তো…
বাকি কথা তাকে বলতে দিলো না নাজির। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। গোয়ালের দিকে যেতে যেতে বললো, “মাইনষের চিন্তা ভাবনায় আমার কিছু আইয়ে যায় না। বড়ো চাচা এমন কোনো মহান লোক আছিলো না যে হের লাইগা বইয়া বইয়া দুঃখ পাইতে হইবো। আমনে বরং নিজেরে লইয়া ভাবেন। জীবনে কী কী আকাম কুকাম করছেন হের ফর্দ লইয়া বহেন। বউ পোলাপাইন সেই খবর জানে তো?”
মুমিনুল শাহ বলার মতো আর কথা খুঁজে পেলেন না। কোন অপকর্মের কথা বলছে নাজির? আশেপাশে একবার তাকিয়ে দেখলেন, মর্জিনা বা ছেলেরা কেউ আছে নাকি। কথাবার্তা ওখানেই সমাপ্ত হলো।
বেলা বাড়তেই নওশাদ ব্যাগপত্র নিয়ে তৈরি হলো। শালিকের মুখ ভার। অথচ গতরাতেও মেয়েটাকে ভালোবাসা দিতে কোনো কার্পণ্য করেনি সে। গাল টেনে দিয়ে বললো,“বেশি না, শুধু তিন-চার বছর কষ্ট করো। নিজেদের ভালোর জন্যই তো যাচ্ছি। পৃথিবীর সমস্ত সুখ তোমার কাছে এনে দেবো।”
“মাইয়া মাইনষের সুখ হইতাছে তাগো স্বামী।”
নওশাদ নিঃশব্দে হাসলো। লিলি এভাবে কখনো তাকে বলেনি। কথায় কথায় শুধু তার অপারগতা দেখাতে ব্যস্ত থাকতো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়ালো, “আমরা ভুল মানুষকেই জীবনে বেছে নেই, গুরুত্ব দিয়ে সময় নষ্ট করি।”
স্ত্রী এবং পরিবারের বাকিদের থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল নওশাদ। বহুদূর গেলেও জন্মভূমির কথা তার খুব মনে পড়বে, সাথে মনে পড়বে তার ছোট্ট জীবনে কষ্ট দেওয়া মানুষগুলোকেও। তাকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য নাজির গেলো। সাথে পারভেজ আর মিল্টনও ছিল। মিল্টনের বহুদিনের শখ সামনে থেকে সে বিমানের উড়ে চলা দেখবে। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েই ছুটে এসেছে তাদের সঙ্গে। পারভেজ এসেছে এমনিই। বাড়ির পরিবেশ তার ভালো লাগছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
বিমান ছাড়তে এখনো ঘণ্টা খানেক বাকি। মিল্টন হেসে বললো,“ভাই, আমার লাইগা কিন্তু সাবান সুনু পাঠাইতে হইবো। হুনছি, বিদ্যাশের সাবান সুনু গায়ে গতরে মাখলে নাকি মাইনষে ধলা হইয়া যায়?”
“তোর জন্য কেন পাঠাবো? পাঠালে তোর বউয়ের জন্য পাঠাবো। এসে যেন মিল্টনের বাচ্চাকাচ্চা কোলে নিতে পারি।”
মিল্টন ভারি লজ্জা পেলো,“কী যে কন না, ভাই!”
নাজির বিস্কুট, চানাচুরের প্যাকেট কিনে এনে ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“সাবধানে থাকবি, খাওয়া- দাওয়ায় অনিয়ম করবি না, নিজের যত্ন নিবি, অযথা কারো লগে আলগা খাতিরের দরকার নাই। দুনিয়ার মানুষ ভালা না। কেমনে অন্যরে ভাঙাইয়া খাইবো, অন্যের ক্ষতি করবো সেই চিন্তায় থাকে। এদিককার চিন্তা করিস না। আমি আছি, সব সামলাইয়া নিমু।”
নওশাদ ভিড় থেকে একটু সরে দাঁড়ালো। বড়ো ভাইয়ের সব কথা মেনে নিয়ে বললো,“চিন্তা করতে নিষেধ করলেও আমার চিন্তা হচ্ছে; তোমার জন্য, ভাবির জন্য, শালিকের জন্য। ওদেরকে আমার ভয় হয়। বিশেষ করে সামিউল ভাই আর ছোটো চাচাকে। তুমি সাবধানে থেকো। আমি অনেক পরিশ্রম করবো দেখো। সব ঋণ পরিশোধ করে অনেক টাকা পাঠাবো। যত দ্রুত সম্ভব তুমি ওদের থেকে দূরে সরে যেও। বাপের ভিটে বাড়ির কোনো প্রয়োজন নেই, ভাই। জীবনে শান্তিটাই আসল।”
নাজিরের যে চিন্তা হচ্ছে না তাও নয়। তবুও সে কথা ঘুরালো। একসময় সবার থেকে বিদায় নিয়ে ভেতরে চলে গেলো নওশাদ।
দুপুরের দিকে বাড়ির পথে রওনা দিলো তারা। বাসে মুখ ভার করে পাশের আসনে বসে আছে পারভেজ। মিল্টন পেছনে। কনুই দিয়ে তাকে গুঁতা মারলো নাজির। জিজ্ঞেস করল,“মুখ কডার মতন কইরা রাখছোস ক্যান? বাপের কথা খুব মনে পড়তাছে?”
নাক টেনে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টা করল পারভেজ। জানালার বাইরে দৃষ্টি রেখে বললো,“কী যে হইতাছে কিচ্ছু বুঝতাছি না, ভাই। আমগো লগেই ক্যান এমন হইতাছে? কাইল সকালেও আব্বারে সুস্থ দেখলাম। খাওয়ার সময় কইলো, মন দিয়া কামকাজ শিখ। কয়দিন পর তোর বিয়া দিমু। দুপুরে আইয়া দেহি আমার সেই সুস্থ সবল আব্বায় হাসপাতালে লাশ হইয়া পইড়া রইছে।”
“তাইলে বোঝ, এতদিন আমি আর নওশাদ কত কষ্টে আছিলাম? আমরাও তো শহর থাইক্যা ফিরা বাপের লাশই দেখছি। আমগো সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কেউ আছিলো না। তগো তো তাও সব আছে।”
হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছলো পারভেজ। নাজির তার কাঁধে ভরসার হাত রাখলো। ছেলেটা আসলেই সাদাসিধে বোকা কিছিমের। অন্তত বাবা-মা, ভাই- বোনদের থেকে ভালো। নাজির অন্যমনস্ক হয়ে বললো,“যেইদিন সত্য জানতে পারবি হেইদিন আর কষ্ট লাগবো না। বরং এমন অমানুষের ঘরে পয়দা হইছোস বইল্যা আফসোস করবি।”
পারভেজ সেকথা শুনলো কী শুনলো না বুঝা গেলো না।
দুপুরের রান্নার সময় আজ আর শালিককে হেঁশেলের আশেপাশেও দেখা গেলো না। স্বামীর বিরহে বিছানায় শুয়ে আছে সে। মিছরিই আজ চুমকিকে নিয়ে রান্নাটা সারলো। মেয়েটাকে আজকাল কম দেখা যায়। ক’দিন পর নাকি তার বিয়ে।
রান্না শেষে ভাতের হাঁড়ি ঘরে রেখে গোসল সেরে এলো মিছরি। নামাজ পড়ে ভেজা চুল ঝাড়তে ঝাড়তে জায়ের ঘরে এসে বসলো। হাতে চিমটি কেটে বললো, “বিয়ের মাস পেরোয়নি অথচ স্বামীর বিরহে মেয়েটা দিন দুনিয়া ভুলে বসেছে।”
“তুই কী বুঝবি? তোর জামাই তো তোর কাছেই।”
“তবুও তোর মতো কখনো করিনি।”
“ঢং, সেদিন না কাইন্দা কাইন্দা নাকের পানি চোখের পানি এক করছোস?”
“সেটা তো চিন্তায় করেছি। আমাদের বিয়েরও অনেক মাস পেরিয়েছে।”
“যা তো, পেডে ছাও লইয়া ঢং মারায়। আমার তো ছাওডাও নাই।” ফুঁপিয়ে উঠলো সে।
“দিয়ে যেতে বললি না কেন?”
শালিক চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলো বিছানায়। মিছরি বার কয়েক তাকে খাওয়ার জন্য ডাকালেও এলো না।
______
নাজমুল, শাহরিয়ার বাবার বিশ্রামাগারে বসে আছে। কিছুক্ষণ আগেই তাদের ডাক পড়েছে। চারিদিকে কাগজের স্তুপ দেখা যাচ্ছে, মাঝখানে ছোটো চকি আর সামনে উঁচু আসন। মুমিনুল শাহ তাঁর ব্যবসায়িক সকল কাজকর্ম, হিসাব-নিকাশ এখানে বসেই করেন। এমনকি অর্থ কড়ি রাখার লকারও এ ঘরেই। মুমিনুল শাহ এলেন কিছুক্ষণ পর। কেদারায় বসে পানি পান করে বললেন,“তগো আম্মার হাতের রান্ধার জবাব নাই। পেটের কী অবস্থা হইছে দেখছোস!”
শাহরিয়ার প্রয়োজনের বাইরে কথা কম বলে। হা হু না করে তাড়া দিলো,“ডাকছিলেন যে, আব্বা? গুরুত্বপূর্ণ কিছু কইবেন?”
“সবসময় এত কাম কাম করোস ক্যান? কতদিন পর তগো একলগে পাইলাম। নাজমুলের কী খবর? সারাজীবন কী ক্ষেতই সামলাবি? ব্যবসায় যাওয়ার ইচ্ছা নাই? ছুডো ভাইডারে দেখ, কত পরিশ্রমী।”
“আমার ব্যবসা বাণিজ্য ভাল্লাগে না, আব্বা।”
অসন্তুষ্ট হলেন মুমিনুল শাহ,“ক্যান ভাল্লাগে না?”
“অন্যের অধীনে কাম আমার পোষায় না। এতকাল তো বড়ো চাচা আর সামিউল ভাইয়েই সামলাইছে। ফাঁকে আমগো খালি দিছে হুকুম। জানেন তো, অন্যের হুকুম আমার সহ্য হয় না।”
বড়ো ছেলের জন্য মুমিনুল শাহর ভীষণ মায়া হলো। সামিউলটা সর্বদা বাপের মতো মালিকানা জাহিরে ব্যস্ত থাকে। বললেন,“এই জন্যই তো কই দুই ভাই মিলমিশ থাইক্যা একলগে কাম কর। তোরা এক থাকলে কার সাহস আছে আদেশ দেওয়ার? নাজির, নওশাদরে দেহোস না? দুই ভাইয়ের কি মিল মোহাব্বত! তগোও তেমন হইতে হইবো। মেজো ভাইজানে আমার কথা কোনোকালেই তো হুনলো না। যদি হুনতো তাইলে হের ওই অবস্থা হইতো? নাকি হের পোলাগো ওই অবস্থা হইতো? আমারেও নত থাকতে হইতো না। আগামী তিনদিন মনে হয় সামিউলে ঘাটে যাইবো না। যতই হোক, বাপ মরছে। তোরা দুই ভাইয়ে যাবি। নিজেগো ভাগ বুইঝা লইবি। মনে রাখবি, শাহ গো সবকিছুর উপরে তগোও হক আছে। তোরা তিন ভাই, শক্তি বেশি। বুঝছোস?”
নাজমুল, শাহরিয়ার মাথা নাড়ালো। মুমিনুল শাহ পান চিবোতে চিবোতে আজ ছেলেদের সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করলেন। সচরাচর ছেলেদের খোঁজও তিনি নেন না। তবে অতীত পুনরাবৃত্তি হোক চান না বলেই হয়তো এত সাবধানতা।
নাজির বাড়ি ফিরলো সন্ধ্যায়। পোশাক বদলে কলের ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল সেরে এলো। বাইরে যত যাই খাক না কেন, ঘরে এসে একমুঠো ভাত না খেলে তার পোষায় না। মিছরি খাবার বেড়ে তার অপেক্ষায় বসে আছে।
নাজির চুল মুছে সামনে এসে বসলো। হেসে জিজ্ঞেস করল,“তুমি খাইছো?”
মিছরি তার দিকে তাকালো না। ছোট্ট করে উত্তর দিলো,“হ্যাঁ।”
“তোমার লাইগা একটা শাড়ি আনছি। দেহো তো পছন্দ হয় কিনা?”
“পরে দেখবো, আপনি খেয়ে নিন। এমনিতেই যা দুরাবস্থা, এখন আবার অযথা এত খরচ করার কী প্রয়োজন?”
“তোমারে এইসব লইয়া ভাবতে নিষেধ করছি না?”
মিছরি আর উত্তর দিলো না। নাজির গতকাল থেকে খেয়াল করছে মেয়েটা তার দিকে ঠিক করে তাকাচ্ছে না, হাসছে না, কথায়ও নেই কোনো মাধুর্য। হলো কী? ভাত মাখিয়ে প্রথম লোকমাটা স্ত্রীর মুখের সামনে ধরলো সে। অদ্ভুত ব্যাপার, আজ আর হা করল না মিছরি। মুখ ফিরিয়ে নিলো,“আপনি খান।”
বসা থেকে উঠে যেতে নিতেই তার হাত টেনে ধরলো নাজির। সরাসরি জিজ্ঞেস করল,“কী হইছে, বউ? রাগ করছো ক্যান? কইছি না, অযথা আমার উপরে রাগ করবা না। যদি কোনোকিছুতে খারাপ লাগে সরাসরি আমারে আইয়া কইবা, অভিযোগ জানাইবা। তবুও আড়ালে অভিমান জমাইয়া রাইখো না। খারাপ লাগে।”
মিছরি এবার মানুষটার চোখের দিকে তাকালো। অনেকক্ষণ কোনো কথা বললো না। নাজির খাওয়া থামিয়ে জবাবের আশায় তাকিয়ে আছে। একসময় অধৈর্য হয়ে ফের জিজ্ঞেস করল,“কী হইছে? কও না ক্যান? শরীর খারাপ লাগে? কাইলই ডাক্তরের কাছে লইয়া যামু।”
“শরীর তো আপনার খারাপ। শুধু শরীর নয়, সাথে মাথাটাও খারাপ হয়ে গেছে। ডাক্তারের কাছে আপনার যাওয়া উচিত।”
নাজির অবাক হলো,“আমি ক্যান যামু? শরীর, মাথা সবই তো ঠিক। খারাপ কই দেহো?”
“খারাপই, আপনি অসুস্থ একটা মানুষ।”
“আবার উল্টাপাল্টা কথা!”
“সুস্থ মানুষ কখনো মানুষ মারে না।”
নাজির চমকে গেলো। মিছরি তবুও থামলো না। একনাগাড়ে বললো,“এত অভিনয় কীভাবে করতে পারেন? আর কেউ না জানলেও আমি কিন্তু সব জানি।”
“কী জানো?”
“বড়ো চাচাকে আপনি মেরেছেন।”
নাজির কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, বলবে বুঝতে পারে না। কুঁচকানো ভ্রু জোড়া আরো কুঁচকে গেলো। জোরপূর্বক হেসে বললো,“দিনে ঘুমাও নাই? কী যে কইতাছো! মাইনষের কানে গেলে কী হইবো ভাবতে পারতাছো? ব্যাডায় মরছে বুকের বিষে। ডাক্তরেও হেই কথাই কইছে। আর এই মাইয়ায় কয় আমি নাকি মারছি। বুইড়াকালে এমন একটু আধটু হয়।”
খাওয়ায় মনোযোগ দিলো নাজির। মিছরি নীরবে তার খাওয়া দেখতে লাগলো। রাগ বেড়ে দ্বিগুণ হলো। শক্ত কণ্ঠে বললো,“আমাকে এখন মিথ্যে বলছেন? একটুও লজ্জা লাগছে না? অপরাধবোধ হচ্ছে না? কখনো নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেছেন? আপনাকে দেখে রীতিমতো আমি অবাক হচ্ছি।”
গলা দিয়ে খাবার আর নামলো না নাজিরের। খাবার ভর্তি থালায় হাত ধুয়ে উঠে গেলো। মিছরি হতাশ হলো। চোখের সামনে একটা লোক কীভাবে এত বদলে যেতে পারে? উদাস কণ্ঠে বললো,“আজ অন্ন নষ্ট করছেন? অথচ নিজেই আমায় শিখিয়েছিলেন, অন্ন নষ্ট করা পাপ। কোথায় গেলো সেসব নীতিবাক্য? কোথায় গেলো পাপের ভয়? আজকাল নামাজেও অনিয়ম করছেন, কথায় কথায় মিথ্যে বলছেন।”
নাজিরের সহ্য হলো না কথাগুলো। এত কথার পিঠে মিথ্যেও বলতে পারলো না। বিছানায় বসে পড়ল সে। দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“তুমি জানলা কেমনে? তুমি তো…
মিছরি নিচ থেকে উঠে এলো। বিছানায় মুখোমুখি বসে বললো,“তখন নামার জমিতে বাড়ির দিকে মুখ করে আমি বসেছিলাম। ওখান থেকে ফটক পর্যন্ত সব দেখা যায়। তাই আর কেউ না দেখলেও আপনাকে আমি বাড়িতে ঢুকতেও দেখেছি, বের হতেও দেখেছি। আর তারপরেই চাচাকে মৃত পাওয়া গেলো। মোটামুটি সুস্থ একটা লোক হঠাৎ কীভাবে হার্টের অসুখে মারা যেতে পারে? আর আপনিই বা মিলে না গিয়ে হুট করে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন কেন? বড়ো চাচার সাথে বরাবরই আপনার দ্বন্দ্ব। শুধু বড়ো চাচা নয়, এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের সাথে আপনার দ্বন্দ্ব। তাই আপনিই যে কিছু একটা করেছেন তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। কী করেছেন? ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলেন?”
নাজির কিছুক্ষণ চুপ থাকে। কাজল কালো চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে না পেরে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুদিকে মাথা নেড়ে বললো,“আমি ফালাই নাই। এমনি পইড়া গেছে।”
মিছরির মনে হয়, সামনের লোকটাকে সে চেনে না। একে সে বিশ্বাস করে না, ভালোবাসে না। এ অন্য এক নাজির। তবুও সে আজ বলে,“শুধু এটাই নয়, আপনি ওই খারাপ মহিলার ভাইকেও মেরেছেন তাই না? এত নিষ্ঠুর কীভাবে হতে পারেন? একা একা তো এতকিছু করা সম্ভব নয়। কে ছিল সঙ্গে? আমাদের বাড়ির কেউ? না, তারা হবে না। সবাই তো হলুদে ব্যস্ত ছিল। তাহলে? আপনার ভাই?”
আজ বোধহয় নাজিরের অবাক হওয়ার পালা। চতুর নাজিরের চতুরতা কিনা শেষমেশ ধরা পড়ে গেলো এই পুঁচকে মেয়ের কাছে? জিজ্ঞেস করল,“এইডা জানলা কেমনে?”
“আপনার ভুলের কারণে জেনেছি।”
“আমার ভুল?”
“আপনাকে আমি যতটুকু চিনি, আপনি কথার খেলাপ করার মানুষ নন। বলেছিলেন, রুহুল ভাইয়ের হলুদে যাবেন কিন্তু সময়মতো যাননি। যখন গেলেন তখন আপনাকে অদ্ভুত লাগছিল, চোখে ছিল ভয়। ভয় আপনার সাথে যায় না। সর্বশেষ শার্টের কলারে রক্তের দাগ। জিজ্ঞেস করার পর কী বোকা বোকা সব যুক্তি দিলেন বলুন তো? বাড়িতে ফেরার পর শুনলাম উনার নিখোঁজের সংবাদ। এরপরেও কী আর কিছু বোঝার বাকি থাকে?”
মিছরি থামলো। চোখ ভিজে উঠেছে তার। পুনরায় বললো,“আমায় কী এখনো বাচ্চা মনে করেন? হ্যাঁ, বয়সে অভিজ্ঞতায় হয়তো আমি আপনার হাঁটু সমান। কিন্তু শাহ বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর থেকে আমার বয়স অনেক আগেই বেড়ে গেছে। এখানে এসে আমি অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, সাংসারিক প্যাঁচ শিখেছি, নিজেকে রক্ষা করতে শিখেছি, সংসার সামলাতে শিখেছি, আপনাকে বুঝতে শিখেছি। এই যে দেখুন, আপনার সন্তানও গর্ভে ধারণ করে বসে আছি। এত কঠিন কাজ কী ছোটো মানুষরা করতে পারে? মা বলে, মেয়েদের শারীরিক এবং মানসিক বয়স বাড়ে বিয়ের পর, সংসারের জাঁতাকলে পড়ে। আমারো তো বেড়েছে।”
কথা বলতে বলতে স্বামীর হাতটা টেনে ধরে নিজের গর্ভে ছোঁয়ালো সে। নাজিরের শরীরটা যেন খানিক কেঁপে উঠলো। নারীদের মাতৃত্ব জেগে ওঠে গর্ভে সন্তানের উপস্থিতি টের পাওয়ার পর থেকে, আর পুরুষদের পিতৃত্ব জেগে ওঠে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে। কিন্তু নাজিরের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন। স্ত্রীর গর্ভে নিজের সন্তান আগমনের সংবাদ শোনার পর থেকেই সে বেপরোয়া, গম্ভীর হয়ে উঠেছে। কী করবে না করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
মিছরি তার হাতটা ছাড়লো না। নিজের আরেকটা হাত স্বামীর গালে রেখে বললো,“বিশ্বাস করুন, আপনার সাথে পাপ শব্দটা একদম যায় না। সোহেলের ঘটনা ভিন্ন। সেদিন ওই বাজে পরিস্থিতিতে না পড়লে আমি কখনো তাকে আঘাত করতাম না, আপনাকেও করতে দিতাম না। কিন্তু এখন যা করছেন তা অনুচিত। সবাই যখন জানতে পারবে? সেসব ছাড়ুন। আমাদের সন্তান বড়ো হয়ে যখন জানতে পারবে, তার বাবা কাউকে খুন করেছে তখন তার মনের উপর কী প্রভাব পড়বে ভাবতে পারছেন? আমি আপনাকে হারাতে পারবো না। আমাদের সামনে এখনো গোটা জীবন পড়ে আছে, আপনার সাথে আমার সংসার করা বাকি, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত একসঙ্গে পথচলা বাকি। আপনি আমার সেই স্বপ্ন ভাঙতে পারেন না।”
কেঁদে ফেলল মিছরি। নাজির তাকে নিজের বুকের মাঝে আগলে নিলো। চোখ বন্ধ করে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ছেড়ে বললো,“আমার অর্ধেক জীবন গেছে আমার বাপের দেখভাল আর ভাইয়ের স্বপ্ন পূরণের পিছে। বাকি অর্ধেক শুধু তোমার আর আমগো সন্তানের। এই জীবনে আমি আমার মায়ের লাইগা ঘৃণা ছাড়া কিচ্ছু করতে পারি নাই। যহন সত্য জানছি তহন কেমনে মুখ ফিরাইয়া নেই কও তো? প্রতি পদে পদে ওরা আমারে ভাঙতে চাইছে। কহনো আমার বাপরে আঘাত কইরা, কহনো আমার বউরে আঘাত কইরা, আবার কহনো আমার খামার, ফসল নষ্ট কইরা। তুমি কিচ্ছু জানো না। তুমি জানো না আমি কত কষ্টে হেগো মাঝে বড়ো হইছি। তুমি জানো না, একবেলা খাওন জোগানের লাইগা কত পরিশ্রম আমি করছি। তুমি জানো না, আমার খারাপ দিনে কেউ আমার মাথায় হাত রাখার মতো আছিলো না, কেউ আছিলো না আমার কথা হুনার। ওরা নিজেরা অন্যায় কইরা তোমার দাদারে এত বছর ধইরা আমগো কাছে অপরাধী কইরা রাখছিল। আমি যদি ওগোরে শেষ না করতাম তাইলে ওরা আমাগো শেষ কইরা দিতো, আমগো সংসার বাচ্চা সব শেষ কইরা দিতো। বাপ, স্বামী হইয়া এইসব আমি কেমনে শেষ হইতে দেই কও তো? তুমি না বুঝলে আমারে আর কেডায় বুঝবো, বউ?”
নাজিরের কষ্ট মিছরি উপলব্ধি করতে পারে। তারও কষ্ট হয়, তবু পাপ যে মেনে নিতে পারে না। সে চায় না তার স্বামীর কোনো বিপদ হোক, খুনি অপবাদ গায়ে লাগুক। দাদাজান তো নাজির শাহর পরিশ্রম, সততা, প্রতিবাদের ভাষা দেখেই মিছরিকে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মিছরিও সেসব কারণেই বিরক্তিকর লোকটার প্রেমে মজেছিল, ভরসা করেছিল, পড়েছিল সংসারের মায়ায়। কিন্তু আজ কী হচ্ছে এসব?
শক্ত করে স্বামীকে জড়িয়ে ধরলো মিছরি। বললো, “দুনিয়ার ভার নিজের কাঁধে নিয়েন না। দুনিয়া আল্লাহর হাতে। আল্লাহ ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না। তারা অন্যায় করলে আল্লাহ তাদের বিচার করবেন। আল্লাহ ন্যায় বিচারক। আপনি তাদের শাস্তি দেওয়ার কে? কীই বা শাস্তি দেবেন? মৃত্যু? কেউই তো অমর নয়। আমি, আপনি, সবাই একদিন মৃত্যুবরণ করবো। তাহলে? নানা বলতেন, অন্যায় বা মিথ্যে কখনো চাপা থাকে না। তুমিও যদি অন্যায়কারীর মতো আচরণ করো তাহলে তার আর তোমার মধ্যে পার্থক্য কোথায় থাকলো? সে অধম বলিয়া কী তুমি উত্তম হইবে না? প্রয়োজন হলে এখান থেকে আমরা অন্য কোথাও চলে যাবো। আব্বা তো বলেছে, যেকোনো সমস্যা হলে সাহায্য করবে। তবুও আপনি পাপ থেকে বেরিয়ে আসুন। নিজের হাতে রক্ত তুলে নেবেন না। আল্লাহ নিশ্চয়ই আমাদের জন্য ভালো কিছু রেখেছেন। আমি জানি, আপনি বিশ্বাসী। এখনো বেশিদূর যাননি। দয়া করে এখানেই থেমে যান। তওবা করুন। আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন নিশ্চয়ই। তিনি তো ক্ষমাশীল। তবুও এভাবে জীবনটা নষ্ট করবেন না। এই জীবন শুধুই আল্লাহর আমানত।
আমি আপনাকে কখনো ঘৃণা করবো না। ঘৃণা করতে পারবো না। আব্বা আর ছোটো ভাইজানের পর আপনিই একজন যাকে আমি খুব ভালোবাসি, ভরসা করি।”
নাজির হতভম্ব হয়ে বসে রইল। সহধর্মিণীর কথায় আজ তার অহমিকার প্রাচীর যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। উপলব্ধি করল, এত গভীরভাবে কখনো সে ভাবেনি। সৃষ্টিকর্তার কাছে আশ্রয় চায়নি। এতদিন শুধু প্রতিশোধের নেশায় মত্ত ছিল। প্রতিশোধ আসলে কী? কী আছে এতে? মানুষ কী আদৌ কারো ন্যায্য বিচার করতে পারে? শুধু মৃত্যুই কী অন্যায়ের শাস্তি?
চলবে_______

