যাত্রাপথ লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই [পর্ব:৭৫]

0
26

#যাত্রাপথ
লেখনীতে: #মাশফিত্রা_মিমুই
[পর্ব:৭৫]

কুয়াশার চাদরে মোড়ানো ধরণী। শালিকের মনে হচ্ছে সে দিবাস্বপ্নে মত্ত। সামনে দাঁড়ানো লোককে ভ্রম ভেবেই কয়েক কদম এগিয়ে এসে কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,“আমনে কী হাছাই আইছেন? নাকি স্বপ্ন?”

“না, মিছা মিছা আইছি। সব স্বপ্ন।” বলেই হাসলো।

শালিকের দেহখানা কাঁপলো খানিক। হাত আলগা হয়ে বাসনপত্র নিচে পড়ে যাওয়ার অভিমুখে লাগেজ ছেড়ে দ্রুত এসে সেসব ধরে ফেলল নওশাদ। মিছে রাগ দেখিয়ে বললো,“ঠিক মতো খাও না? এত দুর্বল হলে চলে?”

শালিকের চোখে অশ্রু টলমল করছে। নওশাদ তার হাত থেকে পরিষ্কার বাসনপত্র বারান্দায় নিয়ে রেখে দিলো। এগিয়ে এসে দুই হাত দুদিকে মেলে বললো, “বুকে আসতে চাইলে এখনি আসতে পারো। পরে কিন্তু সুযোগ পাবে না।”

দিগ্বিদিক ভুলে স্বামীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেয়েটা। নওশাদ শব্দহীন হাসলো। তাকে সান্ত্বনা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। বাচ্চাদের মতো নাক টেনে শালিক অভিযোগ জানালো,“আমনে যে আইবেন জানান নাই ক্যান? চিঠিতে তো ঠিকই লিখছিলেন, আইতে আরো বছর দেড়েক লাগবো।”

“আগেই সত্য জানিয়ে দিলে শালিক পাখিকে এভাবে কাঁদতে দেখতে পেতাম?”

“আমার প্রতি আমনের একটুও মায়া, মোহাব্বত নাই। খারাপ লোক।”

“এইতো চলে এসেছি। এখন থেকে অনেক মোহাব্বত করবো, সাথে আদর যত্নও।”

নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল শালিক। কিন্তু দীর্ঘ দিন স্বামীর অপেক্ষায় একাকিত্বময় জীবনের কাছে চোখের অশ্রুগুলো নিছক সাধারণ ঠেকল। নিরবতা ডিঙিয়ে হঠাৎ ভেতর থেকে মিছরির কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,“শালিক আপা! এত ঠান্ডার মধ্যে বাইরে কী করছিস? বলেছিলাম, রোদটা উঠতে দে। তারপর না হয় ওগুলো মেজে ফেলবো। তা না, রোগ বাঁধাতে চাইছে।”

স্বামীকে দূরে ঠেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো শালিক। আঁচলে চোখ-মুখ মুছলো। তার জবাব না পেয়ে গায়ে চাদর জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিছরি। কিছু বলতে যাবে তখনি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে বেশ চমকালো। নওশাদ হাসলো,“আসসালামু আলাইকুম, ভাবি। কেমন আছেন?”

“ওয়া আলাইকুমুসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি এখন?”

“চলে এলাম আরকি। গতকাল বিকেলে বিমানে উঠেছিলাম। দেশে এসে বাকি অর্ধেক রাত তো বিমান বন্দরেই কেটে গেলো।”

“বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভেতরে আসুন। কী রে, শালিক আপা!”

লাগেজ ধরতে গেলো শালিক। নওশাদ দিলো না তাকে। দুটো লাগেজ আর একটা বিশাল বড়ো বাক্স নিজ হাতে বারান্দায় উঠিয়ে ঘরের দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করল,“ভাই কই, ভাবি?”

“উনি বাড়িতে নেই। ফজরের সময় বের হয়েছে। বলেছে, নামাজ পড়ে ক্ষেতে যাবে একটু। নতুন করে আবার ধান লাগানো হচ্ছে তো।”

ঘর থেকে বাচ্চার কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো। মিছরি সেদিকে ছুটলো। কিছুক্ষণ আগেই ছেলের ঘুম ভেঙেছে। তাকে পরিষ্কার করে খাইয়েছে মিছরি। তবুও মুখে হাসি নেই, কোল থেকে নামালেই কাঁদছে। নওশাদ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল,“নক্ষত্র কাঁদছে?”

কৌতূহল নিয়ে পেছন ফিরে তাকালো মিছরি। নওশাদ হেসে বললো,“শালিক চিঠিতে জানিয়েছে। আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসছি, ওকে কোলে নেবো। ওর জন্য অনেক কিছু এনেছি। ঘুম পাড়াবেন না কিন্তু।”

মাথা নাড়িয়ে ঘরে চলে এলো মিছরি। দোলনা থেকে কোলে নিলো ছেলেকে। কপালে, গালে চুমু দিয়ে কোমল স্বরে বললো,“কী হয়েছে, সোনামণি? কাঁদো কেন? এইতো মা এখানে। আ আ, কাঁদে না।”

কাঁদতে কাঁদতে একসময় থামলো নক্ষত্র। চোখ আর নাকের পানি গামছায় মুছে দিলো মিছরি। এতকিছু করেও ছেলেটাকে হাসাতে পারলো না। মুখ ভার করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। ছেলের হাবভাব মিছরি বোঝে না। অল্প বয়সে নিজেই মা হয়ে বসে আছে। কীভাবে এতশত বুঝবে? যতটুকু করে তাও মা, ভাবি, জায়ের শিখিয়ে দেওয়া।

নওশাদ একেবারে গোসল সেরে এসেছে। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শরীরে তেল মাখছে। শালিক বিছানায় বসে স্বামীকে পর্যবেক্ষণ করছে,“ঠিক মতন খাওয়া-দাওয়া করেন না? চেহারা সুরতের এই হাল ক্যান? বাড়ি থাইক্যা যহন গেছেন তহন তো তাজাতোজা আছিলেন।”

“তুমি আর তোমার হাতের রান্না ছিল না যে তাই এই হাল।”

“ঢং, যাওয়ার আগে কয়দিন সংসার করছিলেন? মান ভাঙানের চেষ্টা।”

নওশাদ হাসলো,“নিজের রান্না নিজেরই করে খেতে হতো। সারাদিন কাজ করে আবার রাতে ফিরে রান্না করতে ইচ্ছে করতো না। এসব আমি ভালো পারিও না। তার উপর এক ঘরে এত মানুষ ঘুমাতে হতো! সব মিলিয়েই এই অবস্থা।”

“ওই বাক্সে কী? একটু বেশিই যত্ন করতাছেন।”

“এটায় টেলিভিশন।”

“কী ভিশন?”

“টেলিভিশন, মানে টিভি। বিদেশে বেশ চলে। দেশেও অবশ্য আছে তবে গ্ৰামে তেমন একটা নেই। থাকলেও সব সাদাকালো। তাই আসার পথে রঙিন টিভি কিনে নিয়ে এসেছি।

“ওহ, আমি আমার ফুফুর বাড়িত দেখছিলাম।”

“তোমার ফুফু আছে?”

“প্রতিবেশী ফুফু।” থেমে জিজ্ঞেস করল,“এহন ভাত খাইবেন নাকি রুটি? শীত আওয়ার আগেই কতগুলা গম ভাঙাইয়া রাখছে ভাইজানে। নাকি খিচুড়ি রানমু? ঘরে অনেক আনাজ আছে।”

“তোমার যা সুবিধা হয়।”

শালিক মাথা নাড়িয়ে চলে যাচ্ছিলো। নওশাদ পিছু ডাকলো,“এখনি রাঁধতে বলিনি। আগে বসো, কথা বলি একটু। ওই লাগেজটা খোলো তো, দেখো তোমার জন্য কত কী এনেছি।”

“পরে দেখমু, আগে রাইন্ধা লই। খাইয়া তারপর বইয়া কথা কমু। আমনে জিড়ান। চোখের নিচেও কালি পইড়া গেছে।”

শালিক চলে গেলো। শরীরে পোশাক জড়িয়ে ঘর থেকে বের হলো নওশাদ। কুয়াশা কেটে সামান্য রোদের দেখা মিলেছে। বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখলো সে। ইটের গাঁথুনি এখনো দেওয়া হয়নি। এত বড়ো একটা বাড়ির কাজ ধরেছে অথচ ভাই তাকে জানায়নি পর্যন্ত। মুহূর্তেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ঘর থেকে নারিকেল পাতার পাটি এনে উঠোনে বিছিয়ে জোর গলায় ডাকলো,“ভাবি, ভাতিজাকে নিয়ে আসেন। একটু দেখি, কোলে নেই।”

মিছরি নক্ষত্রকে এনে নওশাদের কোলে দিলো। ভাতিজাকে পেয়েই প্রথমে বুক জড়িয়ে ধরলো নওশাদ। দুই গালে চুমু দিয়ে বললো,“মাশাআল্লাহ, কেমন আছেন, আব্বা?”

অপরিচিত মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো নক্ষত্র। চিনতে না পেরে আচানক চোখ-মুখ খিচে কেঁদে দিলো। নওশাদ ঘাবড়ে গিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো,“কাঁদে কেন, আব্বা? আমায় চিনতে পারছো না? আমি তোমার চাচা হই। বাবার ভাই চাচা। বাবার পরে একমাত্র চাচার অধিকার। কান্না থামাও। তোমার জন্য কত খেলনা এনেছি জানো? টিভিও এনেছি।”

“চাচা না, মামার অধিকার বেশি। বিয়ার পর সম্পদ ভাগাভাগির সময় চাচারাই ভাতিজার বড়ো শত্রু হইয়া যায়। কিন্তু মামারা চিরকাল এক রকম থাকে।”

কথাটা শুনে পিছু ফিরে তাকালো নওশাদ। নক্ষত্র এখনো কাঁদছে। মাসুম এগিয়ে এলো। হাতের মাটির হাড়িটা মিছরির হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,“রাইতের বেলা মা-চাচীরা দুধ চিতই বানাইছিল। কাউরে খাইতে না দিয়া তোর আর ফাহমিদার লাইগা আগে তুইল্যা রাখছিল। সকাল হইতেই আমারে দিয়া পাঠাইয়া দিছে। রুহুল আবার গেছে ফাহমিদার বাড়ি।”

মিছরি হাড়িটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে হাঁটা ধরলো। মাসুম জিজ্ঞেস করল,“আমার মামায় কান্দে ক্যান? আমার কাছে দে। অচেনা মানুষ দেখলেই ডরায়।”

নওশাদ সরে গেলো,“আমি অচেনা মানুষ? বরং আমি তোর থেকেও বেশি আপন। দুইজনের শরীরে সুবহান আলী শাহর রক্ত।”

“আইছে আমার আপনজন!”

“হ্যাঁ, মামারাও কম না। বোন ওয়ারিশ চাইতে গেলেই আসল রূপ বেরিয়ে আসবে। ভাবি, চেয়ে দেখবেন।”

নওশাদের থেকে জোরপূর্বক নক্ষত্রকে ছিনিয়ে নিলো মাসুম। বললো,“আমরা লোভী না। আমগো ফুফুগো বিয়ার সময় দাদা সব ওয়ারিশ হেগো বুঝাইয়া দিছে। কাজল, রেশমা আপা, ফাহমিদার ওয়ারিশও চাচা দিয়া দিছে। মিছরিরটাও দিয়া দিমু। আঠারোডা খালি হউক। না গো, মামা?”

কান্না থামিয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে কথা শুনছে নক্ষত্র। মাসুম বিশ্বজয়ের হাসি দিয়ে বললো,“দেখ, কইছি না আমার ভাইগ্না অচেনা মানুষ দেখলে ডরায়? আমার কোলে আইতেই চুপ হইয়া গেছে। আর ডরাইয়ো না, তোমার মামা আইয়া পড়ছে।”

নওশাদ চোখমুখ কুঁচকে নিলো। বললো,“দেখতে দেখতে আমাকেও চিনে ফেলবে।”

“হঠাৎ দেশে? এত তাড়াতাড়ি আইতে দিলো?”

“এত তাড়াতাড়ি কোথায়? গত বছরের এপ্রিলে গেলাম, এখন জানুয়ারি চলছে।”

শীতকালীন সবজি দিয়ে খিচুড়ি রান্না করছে শালিক। মিছরি ঘর থেকে ছোটো ছোটো বাটি এনে পিঠা বেড়ে নওশাদ আর মাসুমকে দিলো। উঠোনের রোদের মধ্যে বসে গল্প করছে তারা। লুঙ্গির কোণা ধরে গুণগুণ করতে করতে নাজির বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। মাসুমকে পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে। বললো,“ঘরে নতুন বউ রাইখা আমগো বাড়িত কী করোস?”

মাসুম একপলক পেছনে দেখে ভাগ্নের উদ্দেশ্যে অভিযোগ করে বললো,“তোর বাপ একটা মস্ত বড়ো বেয়াদব। সম্বন্ধিরে এহনো সম্মান করতে জানে না।”

“বয়সে আমার হাঁটু সমান তুই।”

নওশাদের সাথে চোখাচোখি হতেই বললো,“হেই দোকান পাড় থাইক্যা হুইন্না আইলাম, তুই নাকি আইয়া পড়ছোস। শুরুতে বিশ্বাসই হয় নাই। এহন দেহি হাছাই। তা হঠাৎ? কোনো সমস্যা হইছে নাকি?”

“না, কীসের সমস্যা? তোমাদের কথা খুব মনে পড়ছিল, মালিকও খুশি হয়ে ছুটি দিয়ে দিলেন তাই চলে এলাম।”

“আওয়ার আগে জানাইলি না ক্যান? একলা একলা এতদূর থাইক্যা আইলি।”

“এমনি জানাইনি। ভাবলাম চমকে দেই। কিন্তু তোমার ছেলে আমায় দেখে কাঁদছে, চাচাকে চেনে না।”

“প্রথম প্রথম সবার কোলে গিয়াই কানছিল। দেখতে দেখতে এহন চিন্না গেছে। খালি আমার কোলে আইয়া কান্দে নাই। প্রথম নিতেই এমন হাসি দিছিলো!”

নাজির হাত ধুয়ে এলো। বাবার কণ্ঠ শুনেই মুখ দিয়ে শব্দ করতে করতে মামার কোল থেকে বাবাকে দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি মারছে নক্ষত্র। নওশাদ অভিযোগ জানিয়ে বললো,“আর মাসুম ভাই বলছে শুধু আমার কোলে এসেই নাকি কাঁদছে।”

নাজির এসে পাটিতে বসে পড়ল। ছেলের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে বললো,“এই ভন্ডর কথা বিশ্বাস করতে হয়? ওর কোলে প্রথম গিয়া কানতে কানতে আমার আব্বা মুইত্তা দিছিলো। কী রে কস নাই?”

মাসুম সরু দৃষ্টিতে তাকালো। নক্ষত্র বাবার কোলে এসে আনন্দে হাত-পা ছুঁড়ে অ্যা অ্যা করে কী যেন বলছে। নাজির তার থুতনিতে নাক ঘষে বললো,“তুমি আমার লাইগা অপেক্ষা করতাছিলা, আব্বা? তোমার বাবা একটু কামে গেছিলো। কামে না গেলে হইবো? বড়ো হইলে তোমারেও লইয়া যামু। এহন হাসো।”

নক্ষত্র খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো। মিছরি এদের বাপ- ছেলের কান্ড দেখে অবাক হলো। অভিযোগের সুরে বললো,“এতক্ষণ মা, মামু, চাচার কোলে এমন ভান করে ছিল যেন আমাদের সে পছন্দ করে না। বাপকে পেতেই মুখে কী হাসি!”

মাসুম বোনের সাথে তাল মিলিয়ে বললো,“বাপের মতন ভন্ড হইয়া যাইতাছে। রক্ত দেখতে হইবো না!”

“হ, মামু খুব ভালা।”

মাসুম উঠে গেলো,“বাড়িত যাই। দাদীর অনেক অসুখ, আইয়া দেইখা যাইস।”

“কাইল বিহালে গিয়াও গপ্পো কইরা আইছি। নাশতা কইরা যা।”

মাসুম মাথা নাড়িয়ে অনাগ্ৰহ প্রকাশ করল,“না, বউ ভাত লইয়া বইয়া রইছে। নতুন বউরে কষ্ট দেওয়া যাইবো না।”

“তুমিও বিয়ে করে নিয়েছো!” নওশাদ অবাক হয়ে বললো।

“তোর মতন ছুডো মানুষ দুইবার বিয়া করতে পারলে আমি একবার পারমু না ক্যান? বিয়ার তিন সপ্তাহ চলতাছে। বাড়িত আইয়া বেড়াইয়া যাইস।”

“দেখলে, ভাই? অপমান করছে। দাঁড়াও, বিদেশ থেকে অনেক কিছু এনেছি। সঙ্গে করে নিয়ে যাও।”

“পারতাম না, দিয়া যাইস।”

মাসুম চলে গেলো। নাজির বললো,“শুধু মাসুম না, কয়দিন আগে মিল্টনেরও বিয়া হইছে। লতিফ মনে হয় সামনের মাসে করবো।”

“বলো কী? এতকিছু হয়ে গেলো!”

নাজির হাসলো। জিজ্ঞেস করল,“থাকবি তো কয়দিন?”

“যদি একেবারে থেকে যাই?”

“মানে?”

“যদি সেখানে আর ফিরে না গিয়ে দেশেই তোমাদের সাথে থেকে যাই, তাহলে কিছু হবে?”

ললাটে ভাঁজ পড়ল নাজিরের। ছেলেকে দোলাতে দোলাতে বললো,“কী হইবো? তোর ইচ্ছা। তবে…

তাকে কথা শেষ করতে দিলো না নওশাদ। নিজেই বললো,“বেকার খাবো না। জীবন নিয়েও এবার আর হেলাফেলা করবো না। ভাবছি ব্যবসা করবো। চাল আর শুঁটকির ব্যবসা কেমন হয়? একবার বইয়ে পড়েছিলাম, এসবের খুব চাহিদা। কিছু টাকা আমি জমিয়ে রেখেছি। দোকানে কাজ করলেও অবসরে টুকটাক আরো কিছু কাজ করেছি। এ কদিন আমি একটুও বসে খাইনি।”

নাজির কিছুক্ষণ চুপ রইল। নওশাদ প্রশ্ন ছুঁড়লো, “বাড়ি করছো আমায় জানাওনি কেন? বলেছিলাম না, টাকা পয়সার ব্যাপার হলে আমায় জানাতে? এত টাকা কোথায় পেলে?”

“ট্যাহার কী অভাব? আমি কী এক কাম লইয়া বইয়া থাকি? গেছে বছর আমন ধান বেচছি, লগে মিলও ভালাই চলছে, প্রত্যেক মৌসুমে আনাজ চাষ করি, গরুর দুধ বেচি, ঈদেও গরু, খাসি বেচছি। হেই ট্যাহা দিয়াই এইটুকু তুলছি। আপাতত কাম কয়দিন ধইরা বন্ধ। হাছা কইতে ট্যাহার কারণেই বন্ধ আছিলো। তয় হেই সমস্যাও মিটা গেছে।”

“কীভাবে মিটলো?”

“এক বিঘা জমি বেচছি।”

“কীহ!” অবাক হলো সে।

“আমিরুল শাহর থাইক্যা যে হুনাকড়ি জমি নিছিলাম সেইখান থাইক্যাই আরকি। ওইদিকে বহুদিন ধইরা সামাদ মিয়ার নজর আছিলো। আমার ট্যাহা পয়সার দরকার, আর হের জমি। হুদাই ঝামেলা কইরা লাভ আছে? তাই বেইচ্চা দিছি। জীবনে বাঁচলে আরো কত জমি কিনতে পারমু!”

“তাই বলে?”

“হুন, আমগো পায়ের তলার মাটি আরো শক্ত করতে হইবো। সামিউল ভাই এহনো জেলে। জেল থাইক্যা বাহির হইলে আমরা শান্তিতে থাকতে পারমু বইল্যা তোর মনে হয়? এই শত্রুতা আর কহনো মিটবো না। এমনেই চলতে থাকবো চিরকাল। চলুক, আমরা বরং আমগো অবস্থা বদলাই।”

“জেলে কেন?”

“পরে কমু না হয়।”

“তুমি ঠিক আছো তো?”

“হ, ঠিক থাকমু না ক্যান?”

“মিথ্যে বলো না। আমি সব জানি।”

ভ্রু কুঁচকে নিলো নাজির,“কী জানোস?”

“যা তুমি আমার থেকে লুকিয়ে গেছো। যার থেকে আমায় রক্ষা করার জন্য দূরে সরিয়ে দিয়েছিলে তাই জেনেছি। নিজের কথা আর কবে ভাববে বলো তো?”

“নিজের কথাই ভাবি। মাইনষের কথা ভাবার সময় আছে?” থেমে বললো,“এসব কেডায় জানাইছে? তোর বউ?”

“না।”

“তাইলে কেডা?”

“কেউ একজন জানিয়েছে।”

“এর লাইগাই আইয়া পড়ছোস?”

উত্তর দিলো না নওশাদ। বাবার কোলে নক্ষত্র ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে নিয়ে উঠে গেলো নাজির। বললো, “ইচ্ছা না হইলে যাওয়ার দরকার নাই। বউ লইয়া মন দিয়া সংসার কর। চাইল, শুঁটকি কীয়ের নাকি ব্যবসা করবি? কর। কাম করা ভালা। আমিও এইবার গুঁড়ের ব্যবসা ধরছি। লগে সরিষার ক্ষেত আর মাছের প্রজেক্ট। ধান দুই বিঘা জমির মধ্যে লাগাইছি। তুই চাইলে তোর ব্যবসা দাঁড়ানোর আগ পর্যন্ত আমারটা দেখভাল করতে পারোস।”

কথা শেষে নাজির ঘরে চলে গেলো। নক্ষত্রকে দোলনায় শুইয়ে দিয়ে সবাই মিলে সকালের নাশতা খেলো। খাওয়া শেষে লাগেজ খুলে বসলো নওশাদ। সবার জন্য আনা জিনিসপত্রগুলো বের করে ভাই, ভাবি, ভাতিজাকে ভাগ করে দিলো। মিল্টনকে দেখতেই সাবান, শ্যাম্পু, স্নো, পাউডার ধরিয়ে দিয়ে বললো,“এই নে, এগুলো তোর। শুনলাম, বিয়ে করেছিস? আগে জানলে তো তোর বউয়ের জন্যও কিছু নিয়ে আসতাম। এই লিপস্টিক আর চুলের ক্লিপগুলোই না হয় রাখ।”

উপহার পেয়ে মিল্টনের আনন্দ যেন আর ধরে না। এতকিছু সে আশা করেনি। তাই একটু বেশিই খুশি হয়েছে ছেলেটা। নওশাদের ফেরার খবর শুনে বেলা বাড়তেই প্রতিবেশীরাও দেখা করতে বাড়িতে ভিড় জমালো।

বাড়ির বউয়েরা উঠোনে রোদের মধ্যে বসে আছে। খুশবু শাশুড়ি দিলারার মাথা থেকে উকুন আনছে। বেলী উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। পলি তাকে টেনে ধরে কোলে বসালো। পারুল মুখ ভার করে বললেন,“আম্মার লাইগা খারাপ লাগতাছে আমার। আগে তো হাঁটতে পারতো না, এহন বইতেও পারে না। এত ভালা মাইনষে কীয়ের শাস্তি পাইতাছে কও তো?”

দিলারা বেগম দুই হাতের বুড়ো আঙুলের নখে পিষে উকুন মারতে মারতে বললেন,“বয়স কী কম হইছে? দেখ, আমরাই নানী, দাদী হইয়া গেছি। চুলে হেই কবে পাক ধরছে। মাজায় বিষ। তাইলে আম্মার কী বয়স কম?”

“তাও ঠিক, আল্লাহর কাছে দোয়া করি আল্লাহ যেন আমগো এমন ভোগান না ভোগায়। শীতের মাঝে বুইড়া মানুষটা কত কষ্ট করতাছে?”

শাশুড়িকে নিয়ে পুত্রবধূদের আফসোসের শেষ নেই। হালকা কেশে ভেতরে প্রবেশ করল মাসুম। দেবরকে দেখে খুশবু দ্রুত ঘোমটা টানলো। পারুল আড়চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন,“বেলা কত হইছে? টো টো কইরা কই ঘুরতাছিলি?”

“তুমিই তো পিঠা দিতে পাঠাইছিলা।”

“কতক্ষণ লাগে? কাছে থাইক্যা কাছে।”

“আরে নওশাদে আইছে। তাই কথা কইতে কইতে বেলা হইয়া গেছে।”

“হেয় না বিদেশ আছিলো?” দিলারা বললেন।

“সকালে আইয়া পড়ছে। সুজাতা, সিফাত কই? তগো লাইগা লজেন্স আনছে। যা।”

শুনেই সুজাতা, সিফাত দৌড়ালো। এই বিষয় নিয়েই তাদের মধ্যে কথাবার্তা চলছে এখন। মাসুম এসে বেলীকে কোলে তুলে নিলো। আঙুল ঝাঁকিয়ে বললো, “সকালে খাইছো, মা?”

বেলী মাথা নাড়ালো দুদিকে। পলি খ্যাক করে উঠলো, “ওই, খাস নাই তুই? তাইলে এক বাডি খিচুড়ি কার পেডে গেছে?”

বেলী খিলখিল করে হেসে চাচার ঘাড়ে মুখ লুকালো। পারুল ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন,“বউ খাওন লইয়া বইয়া রইছে। যা, খা গিয়া। সবাই কইছিল, পোলাডার বিয়া দিলে ঠিক হইয়া যাইবো। কই? যা ছিল এহনো তাই আছে, হারামজাদা।”

মায়ের কথা কানে না নিয়ে খাওয়ার ঘরে চলে এলো মাসুম। আপাদমস্তক ঘোমটা টেনে মাদুরে বসে আছে নববধূ। নববধূই লাগছে তাকে। দুই হাতে রং উঠে যাওয়া মেহেদী, পায়ে আলতা। হাতে সোনার নতুন বালা। লজ্জায় নত করে রেখেছে মুখখানা। মাসুম একপলক তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“তুমি খাইছো, রুবিনা?”

জড়তা নিয়ে জবাব দিলো,“আমনের আগে কেমনে খাই?”

“তাইলে বাইড়া ফেলাও, একলগে খাই।”

বেলীকে নিয়ে বসে পড়ল মাসুম। রুবিনা খাবার বেড়ে থালাটা এগিয়ে দিলো তার দিকে। মাসুম অসন্তোষ প্রকাশ করে বললো,“দেখতাছো না আমার কোলে বেলী ফুল? নিজ হাতে খাওয়াইয়া দেও।”

রুবিনা চমকে গেলো। নত চোখ জোড়া তবুও তুললো না। মাসুম মনে মনে হাসলো। মুখ এগিয়ে নিয়ে ঠোঁট ফাঁক করে বললো,“আ।”

রুটি ছিঁড়ে স্বামীর মুখের সামনে ধরলো রুবিনা। হাত কাঁপছে তার। আঙুলে নরম ঠোঁটের ছোঁয়া পেতেই দেহখানাও কেঁপে উঠলো। রুটি চিবোতে চিবোতে মাসুম বললো,“এমনে কাঁপতাছো ক্যান, রুবিনা? তোমার কী মিরকি ব্যারাম উঠছে?”

রুবিনার ইচ্ছে হলো ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে। তার ভাগে একটা অদ্ভুত লোক পড়েছে। যে প্রতি মুহূর্তে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে তাকে লজ্জায় ফেলে দেয়। তবে লোকটার মুখে নিজের পুরো নাম শুনলে ভালোই লাগে। তাই যেতে পারে না। মাসুম তার থেকে কোনো জবাব না পেয়ে বেলীর কাছে অভিযোগ করে বললো,“দেখ ফুল, তোর চাচী খালি লজ্জা পায়। এত লজ্জা পাওয়া বউ দিয়া আমার মতন নির্লজ্জ মানুষ কী করবো?”

বেলী চাচার কথা বুঝলো না। ফ্যালফ্যাল করে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ঘুরালো চাচীর দিকে।

দুপুরের আগেই নাজির গিয়ে থলে ভরে বাজার করে এনেছে। এক জোড়া হাঁসও এনেছে। শীতে হাঁসের গোশত খেতে সুস্বাদু লাগে।
শালিক আর মিছরি মিলে দুপুরে রান্নাবান্না করল। জম্পেশ খাওয়া-দাওয়া হলো। সন্ধ্যায় কুপি জ্বালিয়ে বানানো হলো চিতই পিঠা। সঙ্গে আনা টিভিটাও তখনি নওশাদ লাগিয়েছে। কিন্তু এন্টেনা না থাকায় চালু করা গেলো না। এই এন্টেনা আনতে আবার শহরে দৌড়াতে হবে।

সব কোলাহল, আড্ডা শেষে ঘরে ফিরে দরজায় খিল দিলো নওশাদ। শালিক বিছানা গুছিয়ে বসে পড়ল। ঠান্ডায় ঠকঠক করে কাঁপছে। ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে তার সামনে বসলো নওশাদ। ব্যাগটা সে এতক্ষণ বের করেনি। তাই স্ত্রীর সামনেই খুললো। শালিক কৌতূহল নিয়ে দেখছে।

ব্যাগ থেকে বেশ কিছু সাজসজ্জার সরঞ্জাম এবং দুটো শাড়ি বের করল নওশাদ। বললো,“এগুলো তোমার।”

“এত সাজুনি!”

“হ্যাঁ।”

খুশি হলো সে,“সাজতে আমার অনেক ভাল্লাগে।”

“তাই তো এনেছি। আর ওই ব্যাগে যা জিনিসপত্র আছে তা তোমার বাবা-মা, ভাই-বোনদের জন্য।”

“হেগো কথাও আমনের মনে আছে?”

“মনে থাকবে না কেন? চারটা না পাঁচটা না একমাত্র শ্বশুর-শাশুড়ি আর শালা, শালী আমার। ওদের জন্য না আনলে হয়? আমার সাথে এক লোক থাকতেন। উনাকে নিয়ে সপ্তাহ খানেক ধরে কেনাকাটা করেছি। আরো কিছু আনার ইচ্ছে ছিল কিন্তু আনতে পারিনি। বেশি কিছু আনলে আবার বেশি টাকা দিতে হয়। তাই ভাবলাম, শহর থেকেই কিনে নেবো।”

ব্যস্ততার মধ্যেও স্বামীর যে শ্বশুরবাড়ির কথা মনে আছে তা জেনেই মুচকি হাসলো শালিক। তার হাসি দেখে নওশাদও হাসলো। বিছানা খালি করে আলো নিভিয়ে দিয়ে বললো,“এ কদিন তোমার কথা খুব মনে পড়েছে। এবার থেকে অভিযোগ করার আর কোনো সুযোগ দেবো না।”

চারিদিকে নিরবতা বিরাজ করছে। মিছরি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াচ্ছে। ছেলেকে নিয়ে বিছানায় বসে আছে নাজির। বাপ-ছেলে দুজনেই তাকে দেখছে। একসময় ছেলের উদ্দেশ্যে নাজির বললো,“দেখছো তোমার আম্মায় কত সুন্দর? আগে এত সুন্দর আছিলো না। শরীরে খালি চর্বি আর চর্বি। মানে অনেক মুডা আছিলো। কথায় কথায় ছ্যাত কইরা উঠতো। আমারে বিয়া করার পর এত সুন্দর হইছে।”

মিছরি চোখমুখ কুঁচকে পিছু ফিরে তাকালো। নাজির পুনরায় বললো,“দেহো কেমনে চায়। আহা, রাগলেও এই মাইয়ারে সুন্দর লাগে। বড়ো হইলে তোমারেও সুন্দর একটা মাইয়া দেইখা বিয়া দিমু। বউ সুন্দর হইলে পুরুষ মাইনষের জীবনে প্রত্যেকদিন ঈদ।”

চুল বেঁধে নাজিরের থেকে ছেলেকে কেড়ে নিলো মিছরি। পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,“এমন বদমাইশ বাপ জীবনেও দেখিনি। আমায় পেয়ে জিতেছে তা মুখ ফুটে বলতে পারছে না। বাপের কথা কানে নিস না। মায়ের মতো হবি, ভদ্র হবি। বউ জীবনেও বেয়াদব বলতে পারবে না।”

“আমি বেয়াদব, বদমাইশ?”

“কোনো সন্দেহ?”

“তুই তাইলে ন…

“নোংরা শব্দ উচ্চারণ করলে ঘর থেকে বের করে দেবো। সারারাত বাইরে কাটাবেন।”

নাজির চোখ-মুখ কুঁচকে থেমে গেলো। ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে বিছানায় এলো মিছরি। পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেই ছেলেটা ঘুমিয়ে যায়। তবে জেগেও ওঠে দ্রুত। বাবাকে না দেখলে তো হয়ে যায় মুখ ভার। সারাদিন পর স্ত্রীকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে চোখ বুজলো নাজির। মিছরি সোজা হয়ে শুয়ে ঘাড় কাত করল।‌ জিজ্ঞেস করল,“ক্ষতগুলো তো এখনো শুকায়নি। দেখতেও দেন না। লজ্জা যেন উতলে উতলে পড়ছে আজকাল। আব্বা বললো, শীতে নাকি এসবে টান লাগে বেশি। কিছু হয়ে গেলে? বেশি বুঝা ভালো না। আরেকবার বরং হাসপাতাল থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে এলে ভালো হতো।”

“সব শুকাইয়া গেছে, খালি দাগটি রইয়া গেছে। এই দাগ আর যাইতো না।”

“আর পরীক্ষা-নিরীক্ষা?”

“সব ঠিক আছে। হায়াতের মালিক আল্লাহ। এত চিন্তা করলে হইবো না।”

মিছরি বিরক্ত হলো। এই লোকটা তার কোনো কথা শোনে না।
“শরীর গরম কেন? জ্বর এসেছে? নিষেধ করার পরেও কাঁদা পানিতে নেমেছেন?”

হাত দিয়ে কপাল ছুঁতে গেলো মিছরি। নাজির তার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে গলায় মুখ ঘষে বললো, “ধুর, আমি না মিল্টন নামছে। এহন ঘুমাও।”

(ফলো – উপন্যাস)
“ছেলেকে পেয়ে বউকে ভুলে গেছেন? এখন আর আমায় ভালোবাসেন না? পুরুষ মানুষ ভালো না।”

নাজির হেসে ফেলল। মুখ তুলে অন্ধকারেই স্ত্রীর দিকে তাকালো। গাল দুটো চেপে ধরে বললো,“এহন পোলাডারেও হিংসা করতাছো, ময়না পাখি ?”

“হিংসে নয়, সত্য কথা।”

“আইচ্ছা, এবার থাইক্যা বাড়িত আইয়াই তোমারে আগে কোলে নিমু। খুশি?”

“অসভ্য লোক।”

“এহন আবার অসভ্য হইয়া গেলাম?”

মুখ ফিরিয়ে নিলো মিছরি। নাজিরের বাঁধন শক্ত হলো। ফিসফিস করে বললো,“এই অসভ্য লোকই তোমার পোলার বাপ।”

মিছরি প্রত্যুত্তর করল না। শুরু হলো নিরবতা। শোনা যাচ্ছে শুধু দুজনার নিঃশ্বাসের শব্দ। কথা খুঁজে পাচ্ছে না কেউ। তবুও দুজনেই যেন তাদের অনুভূতি সম্পর্কে অবগত।

রাত শেষে সকাল এলো। শীতকালে রাত দীর্ঘ হলে দিন হয় ছোটো। কখন যে সময় চলে যায়! পরেরদিন বিকেলেই মেয়ে আর জামাতাকে নিয়ে যেতে মহিষের গাড়ি পাঠালেন অলিউল খান। ছেলেটার দেশে ফেরার সংবাদ লোক মারফত তিনি পেয়েছেন। তাই নওশাদও লোকটাকে ফেরাতে পারলো না। বড়ো ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি জামাই আদর খেতে চলে গেলো।

শীতকাল বিদায় নেওয়ার আগেই আরো একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘটে গেলো। সেদিন সন্ধ্যা নামার পূর্বে সৈয়দুন নেছাও ইন্তেকাল করলেন। সেই যে অসুস্থ হলেন, তারপর আর উঠে দাঁড়াতে পারলেন না। মাস্টার বাড়ির শেষ গুরুজনও বিদায় নিয়ে চলে গেলেন এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।

চলবে _______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here