মন_হারালো_বেঘোরে #লেখনীতে_মেহেরীন #পর্ব_২০

0
27

#মন_হারালো_বেঘোরে
#লেখনীতে_মেহেরীন
#পর্ব_২০

আরশান সকালেই জানতে পারে যে দশদিনের জন্যে ওকে কোনো একটা কাজে শহরের বাইরে যেতে হবে, তাই ও জরুরিভাবে রিমির সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো। ওর মুড অনেক ভালো ছিলো কিন্তু এখানে আসার পর যে এমন একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে সেটা কে জানতো? অবশ্য আরশান এতে নিজের দোষের থেকে রিমির দোষটাই বেশি দেখছে! রিমির থা’প্পড় খেয়ে আরশান ওই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায়। ওর মাথাটা ডানদিকে ঘুরে গেছে, গালের ওপর রিমির আঙুলের লাল দাগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ও খুব ধীরলয়ে নিজের হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁটের কোণটা মুছে নিল। সেখানে রিমির র’ক্তের দাগ লেগে আছে। ওর চোখে তখন এক ধরণের বিচিত্র তৃপ্তি আর হিমশীতল হিংস্রতা! গাড়ির ভেতরটা তখন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আরশান রিমির চোখের দিকে তাকাল সেখানে আজ ভয়ের চেয়ে ঘৃণাটাই বেশি স্পষ্ট। রিমি আর একটুও দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে যায়, আরশান তখন নিজেকে নিয়ন্ত্রনে রেখেছিলো। নইলে মুহূর্তে হয়তো ও রিমির সঙ্গে এমন কিছু করে বসতো যা পরিস্থিতি আরো বিগড়ে দিত! সেদিনের পর থেকে আরশানের সঙ্গে যোগাযোগ এক প্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রিমির, ওর সঙ্গে যোগাযোগ তো দুর বরং আরশানের নাম শুনলেও রাগ হচ্ছে রিমির। একটা মানুষ যে এতটা স্বেচ্ছাচারী হতে পারে তা হয়তো আরশানকে না দেখলে রিমি জানতেই পারতো না! আরশানের এই অকারণ অধিকারবোধ দেখানো সহ্য না করতে পেরে রিমি একবার সিদ্বান্ত নিয়েই ফেলেছিল যে মা যে ছেলেকে বলছে বিয়ে করে ফেলবে কিন্তু পরক্ষণে আবার নিজেকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করলো কারণ তাড়াহুড়ো করে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে আফসোসও হতে পারে! এক বিকেলে ক্যাফেটারিয়ায় বসে ছিল রিমি আর ইনায়া। ক্লাসের ধকল শেষে এক কাপ কফি আর হালকা স্ন্যাকস সামনে নিয়ে বসলেও ইনায়ার মনটা ছিল অন্য কোথাও। আজ শাফিন সাথে নেই, তাই হয়তো ওর কথার ঝুলিটা একটু বেশিই উপচে পড়ছে। ইনায়া কফির মগে চুমুক দিয়ে লাজুক হেসে বলল — ভাবছি থার্ড ইয়ারে উঠলেই শাফিনের কথা বাসায় বলে দেবো। বাসা থেকেই বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে বলবো”

রিমির হাতের চামচটা মাঝপথেই থেমে গেল। ও জানত এই দিনটা আসবে, কিন্তু ইনায়া যে এত দ্রুত নিজেকে অন্ধ করে ফেলেছে তা ও কল্পনাও করেনি। রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল — “ইনায়া, শাফিন তোর উপযুক্ত ছেলে না। তুই কি সত্যিই দেখতে পাচ্ছিস না ও তোর আবেগ নিয়ে খেলছে?”

ইনায়া থমকে গেল। ওর চোখে বিস্ময় আর হালকা অভিমান খেলে গেল — “রিমি, তুই ভুল বুঝছিস। শাফিন আমার জন্য পা’গল। তুই ওকে পছন্দ করো না বলে যা তা বলিসনা প্লিজ!”

রিমির ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেল। ও ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে আবিদের দেওয়া সেই অডিও রেকর্ডটা প্লে করল। ফোনের স্পিকার থেকে শাফিনের সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল যেখানে শাফিন অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ইনায়াকে জাস্ট একটা টাইম পাস বলেছিলো। রেকর্ডিংটা শেষ হওয়ার পরও ক্যাফেটেরিয়ার কোলাহলের মাঝে ইনায়ার কানে সেই শব্দগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। ওর চেনা সেই কণ্ঠ, সেই কথা বলার ধরণ ভুল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। ইনায়ার হাত কাঁপতে শুরু করল, ওর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ইনায়া অস্ফুট স্বরে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল — “না… এটা শাফিন হতে পারে না”

রিমি প্রায় ধমকের সুরে বলল — “মজা? এটাকে তোর মজা মনে হচ্ছে ইনায়া? তুই ওই ছেলের কণ্ঠস্বর চিনিস না? এই ছেলেটা তোর সাথে এতদিন ধরে শুধু অভিনয় করে এসেছে। তুই কি সত্যিই এতই নির্বোধ যে একটা প্রতারককে চিনতে পারছিস না?”

রিমি থামল না। ও ফোনের গ্যালারি থেকে শাফিনের আরও কিছু ছবি বের করে ইনায়ার সামনে ধরল। যেখানে শাফিনকে অন্য একটি মেয়ের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।

“তাকিয়ে দেখ এগুলো! এই ছেলেটাকে তুই তোর জীবনের সবটুকু বিশ্বাস দিয়েছিলে? যার কাছে তুই ওইসব সস্তা মেয়েদের মতোই একজন যাদের সাথে ও শুধু ফ্লার্ট করে আর টাইম পাস করে? তুই কি সত্যিই চাস এমন একটা লম্পটের জন্য নিজের পরিবার আর নিজের সম্মান জলাঞ্জলি দিতে?”

ইনায়ার দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। ওর সাজানো স্বপ্নের তাসের ঘরটা এক মুহূর্তেই চুরমার হয়ে গেল। ও যে মানুষটাকে নিজের পৃথিবী ভেবেছিল, সেই মানুষটাই ওকে এত অবলীলায় ‘টাইম পাস’ বলে অভিহিত করল?

ইনায়া মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রিমির কঠোর শাসন ওকে যেন বাস্তবতার কঠিন মাটিতে আছাড় দিল। রিমি ইনায়ার কাঁধে হাত রাখল, ওর নিজের চোখও ভিজে এসেছে। ও জানে, এই সত্যটা তেতো, কিন্তু ইনায়াকে বাঁচানোর জন্য এই দহনটুকু যে খুব দরকার ছিল! ওই মুহূর্তের ইনায়ার সবটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল ঠিকই কিন্তু যা শুনেছে দেখেছে সেসব তো বাস্তব তাই ও ঠিক করলো এখন থেকে শাফিনের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলে চেষ্টা করব!
_________________________________

কয়েকদিন ধরে রিমির মনে হচ্ছিল ওর চারপাশের মানুষগুলো যেনো রহস্যময় হয়ে উঠেছে! যে বাড়িতে ও এক প্রকার আশ্রিতের মতো থাকত, যে জায়গার মানুষ ওর অগোচরে প্রায়ই নানান কটু কথা বলতো সেই বাড়ির মানুষগুলোর আচরণ হুট করেই আমূল বদলে গেল। ইলোরা বেগমের ছোট জা, যিনি আগে রিমির দিকে ঠিকমতো তাকিয়েও দেখতেন না তিনি ইদানীং ওর সামনে যেন স্নেহের সাগর উথলে দিচ্ছেন। সকাল-বিকেল মজার মজার নাস্তা বানিয়ে খাওয়াচ্ছেন, আর কথায় কথায় রিমির রূপ আর গুণের প্রশংসা করছেন। রিমি কিছুতেই এই আচমকা বদলটা হজম করতে পারছিল না। ওর মনের কোণে খচখচ করছিল, কারণ ওর মা ও বিয়ের কথাটাই যেনো বারবার তুলছেন। রিমি বুঝে উঠতে পারছিলো না কি করবে, একবার মনে হচ্ছিল আরশানের থেকে বাঁচতে বিয়েটা করে নেওয়া উত্তম, কিন্তু ওর নকন এই মুহূর্তে বিয়ের জন্যে প্রস্তুত না। সবমিলিয়ে এক দারুন দোটানায় পড়েছে মেয়েটা। এর মধ্যেই একদিন বাড়িতে মোটামুটি জাঁকজমকপূর্ণ একটা দুপুরের খাবারের হয়েছিলো। দুজন অচেনা মহিলা একজন পুরুষ এলেন, তাঁদের কথাবার্তা আর চাউনি ছিল বড্ড অস্বস্তিকর। ওনারা রিমিকে আপাদমস্তক এমনভাবে পরখ করছিলেন, যেন কোনো শোরুমের সাজানো পণ্য দেখছেন! রিমি তখনও বিষয়টা তেমন গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখেছি কিন্তু এর পেছনে সত্যটা যে এত নিষ্ঠুর হতে পারে, সেটা রিমির কল্পনাতেও ছিল না। কিন্তু একদিন ও সত্যিটা জানতে পারলো যে কেনো ওর বিয়ে দেওয়া নিয়ে এ বাসার সবাই মরিয়া হয়ে আছে! আসলে এই বাড়িটা অনেক আগে থেকেই মর্গেজ রাখা ছিল। ঋণের জালে পুরো পরিবারটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে, ব্যাংকের সেই বিশাল অঙ্কের লোন শোধ করার কোনো ক্ষমতা বা উপায় কারো ছিল না। বাড়িটা হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম ঠিক তখনই দেবদূতের মতো উদয় হন সেই মহাজন লোকটা। যাঁর কাছে বাড়িটা বন্ধক রাখা হয়েছে, তিনি আর তাঁর ছেলে একদিন বাড়িতে এসেছিলেন পাওনা টাকার তাগাদায়।কিন্তু রিমির ওপর চোখ পড়তেই লোকটার মতলব বদলে যায়। ওনার ছেলে রিমিকে দেখে পছন্দ করে বসে। লোকটা প্রস্তাব দেন যদি রিমিকে তাঁর ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়, তবে তিনি মর্গেজের অর্ধেক টাকা মওকুফ করে দেবেন! রিমির মায়ের শশুরবাড়ি পরিবার এই সুযোগটাকেই যেন মেঘ না চাইতেই জল হিসেবে লুফে নিয়েছে। এসব জানার পর রিমি অন্ধকারে নিজের বিছানায় কুঁকড়ে বসে রইল। ওর দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। এতদিন ভেবেছিল বাবার বাসা ছাড়ার পর মায়ের কাছেই হয়তো একটু নিরাপদে এসে থাকতে পারবে, অবশ্য ইলোরা বেগম নিজেও মেয়েকে সম্পূর্ন নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কিন্তু মাসখানেক যেতেই যে উনি সহ পরিবারের সকলে মিলে ওকে একটা ঋণ শোধ করার কিস্তির মতো একটা অচেনা মানুষের হাতে ওকে সঁপে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করবে সেটা ও স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি! ছেলেটার চরিত্র যে বিশেষ ভালো না এ সম্পর্কেও রিমি কিছুটা আভাস পেয়েছিলো কারণ ছেলেটার সঙ্গে ওর একটু কথা হয়েছিলো।
বিয়ের এই ফেও বিষয়টা সম্পর্কে রিমি গোপনে জানতে পেরেছে, জানার পর থেকেই এই বাসার কারো সামনে যাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে না। সবাই যে এভাবে স্বার্থপরতা শুরু করে দেবে সেটা ওর ভাবনাতেই ছিলো না, তাই ও রাতে সবার সঙ্গে বসে খেতে আসেনি। বাড়ির অন্যরা খেতে বসেছিলো তখন কলিং বেজে উঠলো। ইলোরা বেগম গিয়ে দরজা খুলে দেখলেন কুরিয়ার বয় এসেছে, রিমির পার্সেল! তো উনি গিয়ে রিমিকে ডাকলেন, এই অসময়ে পার্সেল এসেছে শুনে রিমি খানিকটা অবাক হলো বটে। রিমি এসে দরজায় দাঁড়াতেই কুরিয়ার বয় একটা বক্স ওর হাতে দিয়ে খাতা বের করে কলম এগিয়ে দিয়ে বললো — “এখানে একটা সাইন করে দিন”

রিমি বক্সটা একটু নেড়েচেড়ে দেখলো, মধ্যম সাইজের একটা বক্স। ভেতরে কি আছে সেটা এখনও আন্দাজ করতে পারছেনা। কাগজে সাইন করার পর কুরিয়ার বয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রিমি ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো — “ভাইয়া, আমাদের কি আগে কোথাও দেখা হয়েছে? আপনার মুখটা ভীষণ চেনা চেনা লাগছে”

কুরিয়ার বয় ভীষণই শান্তভাবে চোখের চশমাটা ঠিক করে মৃদু হেসে উত্তর দিলো — “আমার ফেসটা অনেক কমন ম্যাডাম, হয়তো আমার মত কাউকে দেখেছেন। আমাদের আগে দেখা হয়নি”

দরজার ওপাশে কুরিয়ার বয়ের চলে যাওয়ার শব্দটা মিলিয়ে যেতেই রিমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হাতে ধরা মাঝারি সাইজের বক্সটা কেন জানি বড্ড ভারী মনে হচ্ছে। বক্সের ভেতরে কী আছে তার চেয়েও বেশি রিমির মাথায় ঘুরছে ওই লোকটার মুখটা। চশমার আড়ালে থাকা সেই শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ চোখ দুটো ও আগে কোথাও দেখেছে। রিমি মনে করার চেষ্টা করল, কিন্তু ওর মস্তিষ্ক এখন জট পাকিয়ে আছে। গত কয়েকদিনের মানসিক ধকল ওর চিন্তা করার ক্ষমতা যেন শুষে নিয়েছে। পেছনে তাকাতেই দেখল ডাইনিং টেবিলে বসে থাকা মানুষগুলো ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। ইলোরা বেগমের ছোট জা, যিনি এতক্ষণ রিমির রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, তাঁর চোখে এখন এক অদ্ভুত কৌতূহল। আর ওর মা? ইলোরা বেগম নিজে মেয়ের দিকে তাকাতে পারছেন না, অপরাধবোধে ওনার চোখের পাতা নুয়ে আছে। রিমি বুঝতে পারল, এই বাড়ির প্রতিটি দেয়াল এখন ওর জন্য এক একটা অদৃশ্য ফাঁস। সবাই মিলে ওকে একটা ঋণের দলিলে পরিণত করেছে। রিমি কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা আটকে দিল। বক্সটা বিছানার এক কোণে রেখে ও অন্ধকারে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। আগামীকাল ওর জন্মদিন, হয়তো ইনায়াই এটা পাঠিয়েছে। কিন্তু ও জানে না, ওই কুরিয়ার রিসিটের আড়ালে আরশান মির্জা ওকে বন্দী করার সবচেয়ে বড় পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করে ফেলেছে!
__________________________________

বরাবর ক্লান্তিতে ঘুম চলে এলেও আজ রিমির চোখে ঘুম নেই, ও বিছানায় শুয়েছিলো। রাত বারোটা বাজতেই ইনায়ার ভিডিও বার্থডে উইশ এলো! রিমি এটা দেখে বেশ খুশি হলো কারণ এতকিছুর মধ্যেও ইনায়ার ওকে উইশ করার কথা মনে থাকবে সেটা ভাবেনি। রিমি উঠে বসে ওই বক্সটা আনলো। ওপরের দামী কালো সিল্কের র‍্যাপিং পেপারটা সরাতেই দেখলো একটা পারফিউম। কৌতূহলবশত পারফিউমের মুখ খুলতেই এক অদ্ভুত মাদকতাময় সুবাস ওর নাকে তীব্রভাবে ধাক্কা দিল। এই ঘ্রাণটা যে ওর বড্ড পরিচিত! এ তো আরশানের পারফিউম! রিমি মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেলো! ওর আর বুঝতে বাকি রইলো না যে আরশান এই উপহার পাঠিয়েছে। বক্সের ভেতরে আরেকটি ছোটো বক্স, সেটা খুলে একটি অতি সূক্ষ্ম এবং দামী সিলভার লকেট পেলো রিমি। লকেটটা দেখতে খুব সাধারণ নয়, ওটা একটা ছোট হার্টশেপড কেজ বা খাঁচার মতো। লকেটের খাঁচার ভেতরে খুব ছোট একটি হীরা জ্বলজ্বল করছে। লকেটের পেছনের অংশে খুব সুক্ষ্মভাবে খোদাই করা একটি তারিখ যা আজকের তারিখ! কিন্তু তার নিচে কোনো নাম নেই, শুধু দুটো শব্দ লেখা: “AR”। এসবের মানে কি? পারফিউমের মাধ্যমে আরশান কি বোঝাতে চেয়েছে রিমি বুঝেছে যে ও দূরে থাকলেও যেভাবেই হোক নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করবেই! কিন্তু এই লকেটের বিষয়টা রিমি বুঝতে পারলো না কিছুতেই। কি বোঝাতে চাইছে এর মাধ্যমে লোকটা? ওদিকে…. সারাদিন ভীষণ ক্লান্ত থাকায় সন্ধ্যায় ফিরেই আরশান ঘুমিয়ে গেছিলো। কয়েকটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওরা ফার্ম প্রজেক্ট করার পরিকল্পনা করেছে, তার জন্যেই শহরের বাইরে রয়েছে কিছুদিন ধরে আরশান। সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকলেও রাতের এই নীরবতা ওকে শুধু রিমির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেদিনের রিমির ওই আচরণ সে এখনও মানতে পারেনি! বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে, জানালার ওপাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আরশান একটা টিনের ঘরের ভেতর ছিলো, চালে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ হচ্ছে। ও একটা বিশাল কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলো! এ ঘরে ছোটো একটা স্টোভ আছে, সেখানেই পানি গরম করে একটু কফি বানিয়ে নিলো। রাত তখন গভীর! দরজায় মৃদু করাঘাত হলো। আরশান গিয়ে দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকল ইয়াসির। ওর গায়ের রেইন কোটটা খুলে রাখলো, কুরিয়ার বয়ের ইউনিফর্মটা তখনো ওর গায়ে। চোখের মোটা ফ্রেমের চশমা ও দাঁড়িটা খুলেই ও একটা নীল রঙের ফাইল আরশানের দিকে এগিয়ে দিলো। ও ফাইলটা খুলে ভেতরের কাগজটা বের করল। সাদা কাগজের নিচের দিকে রিমির গোটা গোটা অক্ষরের সই — ‘Rubaiya samad’ যা রিমির প্রকৃত নাম। আরশান সইটার ওপর আলতো করে নিজের তপ্ত আঙুল বুলিয়ে প্রশ্ন করলো — “ও কি কিছু টের পেরেছে?”

ইয়াসির কিছুটা ইতস্তত করে বলল…

“উনি খুব মন দিয়ে আমার ফেসটা দেখছিলেন। সম্ভবত ওনার আমাকে কিছুটা চেনা চেনা লেগেছে, তবে আমি পরিস্থিতি সামলে নিয়েছি কিন্তু উনি আমাকে মাত্র একদিন দেখেছেন তাতেই যে আমার মুখটা ওনার মনে থাকবে সেটা অপ্রত্যাশিত ছিলো।”

আরশানের ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক এবং তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। ও গ্লাসে একটা বড় চুমুক দিয়ে বলল ….

“I know she is a Smart girl! কাল সকালেই উকিলের কাছে সব পেপারস পাঠিয়ে দেবেন। সইটা যেহেতু অরিজিনাল, তাই আইনিভাবে রেজিস্ট্রি হতে আর কোনো বাধা নেই। আগামীকালের মধ্যেই কাজটা হয়ে যাওয়া চাই”

আরশান কথা বলল না। ও উঠে গিয়ে জানালার কপাট খুলে দাঁড়াল। বৃষ্টির ঝাপটা এদিক ওদিক আছড়ে পড়ছে, বৃষ্টির যেনো নিজস্ব কোনো গতি নেই। হাওয়া যেভাবে তাকে চালনা করছে সেভাবেই সে চলছে, ঠিক এভাবেই এখন থেকে রিমির জীবনটা আরশান নিজের ইচ্ছেমত চালনা করবে। আরশান মনে মনে সেই মুহূর্তটার কথা ভাবল, যেদিন রিমি ওর গাড়িতে বসে ওর চোখের ওপর চোখ রেখে অধিকারের কথা বলেছিল! কথাটা মনে পড়তেই আরশানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ও হাতের কাগজটা এমনভাবে ধরল যেন ও রিমিকেই ধরে আছে। ও খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে নিজের মনেই আওড়ালো…

“অধিকার? তুমি বলেছিলে যে তোমার ওপর আমার কোনো অধিকার নেই কিন্তু এখন থেকে তোমার ওপর আমার অধিকার নিয়ে আর প্রশ্ন করতে পারবে না তুমি। Legally, you are mine from now on”

আরশান ঠিক করে নিয়েছিল যে আপাতত আইনিভাবে এবং পরবর্তীতে ধর্মীয় নিয়ম মোতাবেক বিয়ের কার্য সম্পন্ন করবে। আইনি পর্যায়ে সব ঠিক থাকলে রিমি সম্পর্ক অস্বীকার করতে পারবে না, পরে নিজেই বাধ্য হবে অন্যান্য নিয়ম মেনে বিয়েটা করতে! রিমির অজান্তেই কিন্তু ওর স্বেচ্ছায় করা সাক্ষরের মাধ্যমেই খুব সতর্কতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আরশান নিজের প্রিয় “শখ” রিমির ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলো!

চলবে….

[নোট: এটি সম্পূর্ন ফিকশনাল/কাল্পনিক গল্প বিধায় বাস্তবের সঙ্গে সাদৃশ্য নেই! গল্পের চরিত্র, কাহিনী সবকিছুই কাল্পনিক হিসেবেই পড়ার আহ্বান রইলো ‼️]

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/share/p/1AbWXZeiB9/?mibextid=oFDknk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here